
ফ্রানস বালথাজার সলভিনস(১৭৬০-১৮২৪) ছিলেন এক ফ্লেমিশ বা বেলজিয়ান চিত্রকর। তিনি অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ থেকে ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধের কলকাতার সাধারণ মানুষ, বিশেষত শ্রমিক শ্রেণীর মানুষের রিয়্যালিস্টিক ছবি এঁকে গেছেন। তেমনই একটি হল, The Syce (Groom) অর্থাৎ ঘোড়ার সহিসের ছবি। কোম্পানি পেন্টিংস বলে পরিচিত এই সব ছবিই প্রাচীন কলকাতার দলিল। এছাড়া শেখ মুহাম্মদ আমীর নামে একজন চিত্রকর ১৮৪৫ সালে সহিসের ছবি এঁকে গেছেন। The groom with a horse and carriage তাঁর আঁকা বিখ্যাত সহিস-চিত্র। তিনি কড়ায়া ও চৌরঙ্গীতে ঘোড়ার সহিসের ছবি আঁকেন। Company painting নামে পরিচিত এই ছবিগুলি অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে উত্তর ও মধ্য কলকাতায় সহিসের উপস্থিতির অকাট্য প্রমাণ।
গোবিন্দরাম মিত্রই কুমারটুলি নামের স্রষ্টা। তাঁর আস্তাবলে অসংখ্য ঘোড়া ছিল। প্রত্যেক ঘোড়ার পেছনে একজন করে সহিস থাকত। সহিসদের শুদ্ধনাম কুমার। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ, সুবলচন্দ্র মিত্রর ‘আদর্শ বাঙ্গালা অভিধান ও নগেন্দ্রনাথ বসুর বিশ্বকোষ-এ কুমার শব্দের অন্যতম প্রধান অর্থ দেওয়া হয়েছে ঘোড়ার সহিস। কলকাতায় যেমন কুমারটুলি, মুর্শিদাবাদের কান্দিতে তেমনি আছে সহিসপাড়া। এছাড়া, কুমারগ্রাম, কুমারখালি- স্থাননামের মধ্যেও লুকিয়ে আছে ঘোড়ার সহিস।

সলভিনসের আঁকা সহিস।
প্রাচীন কলকাতার ঘোড়ার সহিসদের কথা আমাদের মনে পড়বেই। সহিসরা ঘোড়ার দেখাশোনা বা রক্ষণাবেক্ষণ করে। কোচোয়ান বা কোচম্যানদের হাতে ঘোড়ারগাড়ির ঘোড়ার লাগাম থাকে। এক ঘোড়ায় টানা ঘোড়ার গাড়িকে টমটম বা টাঙ্গা বলে। দুই ঘোড়ায় টানা ঘোড়ার গাড়িকে জুড়িগাড়ি বলে। সহিসদের কাজ হল হেঁটে হেঁটে ঘোড়ার গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করা, সঠিক পথে নিয়ে যাওয়া। তাই তাদের অশ্ববারকও বলে। তাদেরই ভালো নাম হল কুমার।পুরনো কলকাতার বনেদিবাড়ির লোকজন জুড়িগাড়ি করে বেড়াতে বেরোত, সাহেবরাও তাই। সাধারণ মানুষ টমটম বা টাঙ্গা চড়তেই অভ্যস্ত ছিল। এছাড়া ব্রুহ্যাম, ল্যান্ডো, গিগ, কেরাঞ্চি, ছ্যাকড়া- নামের ঘোড়ার গাড়িও ছিল কলকাতায়। রাধারামণ মিত্র তাঁর বই ‘কলিকাতা-দর্পণ’-এ লিখেছেন, “সবরকম গাড়ির নিয়ম ছিল এক, ‘যতগুলো ঘোড়া, ততগুলো সইস’।”
কলকাতার সিমলার ছেলে বিলে তথা বালক স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন, বড় হলে তিনি ঘোড়ার সহিস হবেন।
অবন ঠাকুর তো তাঁর লেখায় সমশের কোচোয়ান, রামু কোচোয়ান আর আক্কেল সহিসের কথা বারবার বলেছেন।
তবু যেন সহিসরা কাব্যে উপেক্ষিত।
উত্তর কলকাতায় ঘোড়ার আস্তাবলগুলি ক্রমশ অবলুপ্ত হচ্ছে। তবে ঘোড়াদের জল খাওয়ার বাঁধানো পাত্রগুলো রাস্তার পাশে কোথাও কোথাও চোখে পড়ে। গোবিন্দরাম মিত্রের ঘোড়ার ট্র্যাডিশন কুমারটুলিতে সমানে চলছে না আর।
গোবিন্দরামের পুত্র রঘু মিত্র নিজের নামে গঙ্গার ধারে একটি স্নানের ঘাট নির্মাণ করান (মতান্তরে গোবিন্দরাম স্বয়ং এটি নির্মাণ করিয়েছেন)। এটি পরবর্তীকালে বাগবাজার ঘাট নামে পরিচিত হয়। রঘু মিত্রের পৌত্র অভয়চরণ মিত্র ২৪ পরগনার কালেক্টরের দেওয়ান ছিলেন এবং তাঁর আধ্যাত্মিক গুরুকে এক লক্ষ টাকা প্রদানের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন। কুমারটুলিতে একটি রাস্তা তাঁর নামে রয়েছে।

সেখ মুহাম্মদের আঁকা সহিস
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কলকাতার উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত জোড়াবাগান-এর নামকরণের নেপথ্যে এই অঞ্চলে গোবিন্দরাম মিত্র ও উমিচাঁদের দুটি বাগানবাড়ির উপস্থিতি।
গোবিন্দরামের জীবনকাল সম্বন্ধে অনেক বিভ্রান্তি আছে। কেউ কেউ তাঁকে চার্নকের আমলের লোক বললেও সেটা সত্যি নয়। কোম্পানির কাগজপত্রে ১৭৭৭ সালে তাঁর উল্লেখ আছে লবণব্যবসার অংশীদার হিসেবে। তাই মনে হয় জোব চার্নকের বেশ কয়েকবছর পর তিনি কলকাতায় আসেন।
গোবিন্দরাম মিত্র কলকাতার ব্ল্যাক জমিন্দার হিসেবে বিখ্যাত এবং কুমারটুলি নামের নেপথ্যে আছে তাঁর পোষ্য ঘোড়াদের সহিস বা কুমাররা। তিনিই কলকাতার প্রথম ঘোড়ার গাড়ির পত্তনকারী।
সেকালের এক তরজায় কলকাতার আট বাবুর সম্বন্ধে বলতে গিয়ে কুমারটুলির গোবিন্দরাম মিত্র সম্বন্ধে বলা হয়েছে, —
‘কালো দেশের কালো মানুষ কালো জমিদার
গোবিন্দরাম মিত্রি আনেন জুড়িগাড়ির বাহার।’
কলকাতার পুরনো কালের আর একটি ছড়াতে বলা হয়েছে, —
নন্দরামের ছড়ি
উমিচাঁদের দাড়ি
হুজুরিমলের কড়ি
আর গোবিন্দরামের গাড়ি।
কলকাতায় ঘোড়ায় টানা জুড়িগাড়ির প্রথম মালিক হিসেবে গোবিন্দরাম মিত্রর নাম স্মরণ করা হয়।
কভারের ছবি সেখ মুহাম্মদের আঁকা সহিস