
৭৩, নৌবিদ্রোহের শহিদ মানকুমার বসু
দুর্গাপুজোর পর দীপাবলি এসেছে। ঢাকার মালখাননগরে বসু বাড়িতে আনন্দের হুল্লোড়। তাদের ঘরের ছেলে মানকুমার ছুটিতে ঘরে এসেছেন। মানকুমার বসু। ভূপতিমোহন আর হেমপ্রভার সন্তান। ঢাকা জগন্নাথ কলেজে পড়ার সময়ে ব্রিটিশ নৌবাহিনীতে যোগ দেন তিনি। বাড়ির লোকেদের মত ছিল না। তেরোটি বিভাগীয় পরীক্ষায় অধিকার করেন শীর্ষস্থান। চতুর্থ ভারতীয় আর্টিলারি রেজিমেন্টে জায়গা করে নেন। কোলাবায় প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। সাহসিকতার জন্য অর্জন করেন প্রশংসা।
সেই ছেলে, সেই মানকুমার ঘরে ফিরেছেন। তাই আনন্দ।
আশপাশের বাচ্চারা ঘিরে থাকে তাঁকে। শুনতে চায় যুদ্ধের গল্প। কাকভোরে তিনি তাঁর মাউথ অর্গানে বাজান সেনাবাহিনীর ব্যাণ্ডের সুর। উদ্দীপনাময় সে সুরে জেগে ওঠে মানুষ।
মানকুমারের ছোট বোন মানসী। মানকুমার তাঁকে বলেন ইংরেজদের অত্যাচারের কথা। একদিন আবেগে উদ্দীপ্ত হয়ে মানকুমার বলতে থাকেন, ‘লোকে বলে বাঙালি কাপুরুষ। বলে যুদ্ধটুদ্ধ তাদের জন্য নয়। কামানগুলো সব পশ্চিমের দিকে লক্ষ্য করে তৈরি। দেখবি, একদিন আমরা পূর্বদিকে কামানের মুখ ঘুরিয়ে দেব। শত্রুদের হত্যার জন্য। তারপর মানুষ জানতে পারবে বাঙালি কি করতে পারে, বুঝলি?’
না, মানসী সেদিন সবটা বুঝতে পারেন নি। নিতান্ত কিশোরী ছিলেন বলেই বুঝতে পারেন নি। কিছুদিন বাদে মা-বাবাকে কাঁদতে দেখে তার কারণ জানতে চেয়েছিলেন। শুনেছিলেন তাঁর দাদা আর কোনদিন বাড়ি আসবেন না, কারণ তাঁর ফাঁসি হয়েছে।
মানকুমার বসু (১৯২০-১৯৪৩) মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন তিনি। নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন এই স্কুলেরই ছাত্র। তারপর আই এস সি পড়ার জন্য ভর্তি হন জগন্নাথ কলেজে। এখানেই শ্রীসঙ্ঘের কিছু সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ হয় এবং তিনি ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের অনুপ্রেরণা লাভ করেন। তারপরই বাড়ির নিষেধ সত্ত্বেও ব্রিটিশ রেজিমেন্টে যোগ দেন। ভারত ছাড়ো আন্দোলন ও নেতাজি সুভাষের আজাদ হিন্দ ফৌজের কর্মকাণ্ড মানকুমারকে উদ্দীপ্ত করে তোলে গভীরভাবে। তাঁর নেতৃত্বে রেজিমেন্টের সৈনিকরা প্রস্তুত হয় বিদ্রোহের জন্য। উৎপল দত্ত তাঁর ‘কল্লোল’ নাটকে যে ‘খাইবার’ জাহাজের বিদ্রোহের কাহিনি লিখেছেন, তা এর পরবর্তী ঘটনা। মানকুমারের নেতৃত্বে সেনারা গোলা-বারুদ সমুদ্রে ফেলে দেন, পুড়িয়ে দেন সেনাবাহিনীর ব্যারাক।
পুজোর ছুটির পরে মানকুমার আবার কোচিনে পৌঁছান। আবার বিদ্রোহের গোপন কাজ শুরু হয়। কিন্তু এক বিশ্বাসঘাতক কর্তৃপক্ষের কাছে ফাঁস করে দেয় বিদ্রোহের পরিকল্পনা। ১৮৪৩ সালের ১৮ এপ্রিল গ্রেপ্তার হন মানকুমার। তাঁর সঙ্গে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন নন্দকুমার দে, নিরঞ্জন বড়ুয়া, চিত্তরঞ্জন মুখোপাধ্যায়, ফণীভূষণ চক্রবর্তী, সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়, কালীপদ আইচ, নীরেন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, আব্দুল রহমান, রবীন্দ্রনাথ ঘোষ, অমলচন্দ্র দে।
মানকুমার বসুকে প্রলোভিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল সরকারি সাক্ষী হয়ে ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা জানালে তাঁকে বিরাট পুরস্কার দেওয়া হবে। কিন্তু দেশপ্রেমিক মানকুমার প্রলোভিত হন নি কোনভাবেই।
১৯৪৩ সালের ৫ আগস্ট বিচারের রায় ঘোষণা করা হয়। ১২ জনের মধ্যে আব্দুল রহমান ও রবীন্দ্রনাথ ঘোষকে দ্বীপান্তরিত করা হয়, অমরচন্দ্র দে-কে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং বাকি ৯ জনকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
ফাঁসির আগে মানকুমারের লেখা দুটি চিঠির কিছু অংশ তুলে ধরছি। ছোট বোন মানসীকে লিখছেন :
“সেপ্টেম্বর আমার মৃত্যুর সঠিক তারিখ। ভোরের আলোয় যখন গাছ থেকে ফুল ঝরে পড়বে, সেই একই সময়ে আমার জীবনও আমার জাতির জন্য ফুলের মতো ঝরে পড়বে। পরের পৃথিবীতে আমি তোমাকে দেখতে পাব। ”
জামাইবাবু ড. প্রতুলচন্দ্র রক্ষিতকে লিখছেন :
“২৪ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার ভোরে বেঙ্গালুরুর কেন্দ্রীয় কারাগারে আমার নশ্বর কুণ্ডলী ঝাড়তে যাচ্ছি। আমি অগণিত কষ্ট সহ্য করেছিলাম এবং অবশেষে পবিত্রতা ও সত্যের রোদে নিজেকে স্নান করালাম। আমার মৃত্যুর পার্থিব কারণ ছিল রাজমুকুটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অভিযোগ।। যাই হোক না কেন,আমার দিন সংখ্যায় শেষ এবং এখন আমি যেখান থেকে এসেছিলাম সেখানেই ফিরে যাচ্ছি। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আমি আমার সমস্ত প্রিয়জনকে জীবিত ও সুখী রেখে এত তাড়াতাড়ি চলে যেতে পেরে ভাগ্যবান। আমার কোন অনুশোচনা নেই। আমি আশা করি তুমি আমার ক্ষতির জন্য শোক করবে না কারণ আমি পৃথিবীর কোনও ধরনের বিদ্বেষ ছাড়াই মন এবং দেহে পবিত্র থাকতে পেরেছি। আমার জীবনের শেষ মুহূর্তে আমি তোমার কাছ থেকে সমস্ত ভালোবাসা, সহানু্ভূতি এবং বস্তুগত সাহায্যের জন্য তোমাকে অনেক ধন্যবাদ জানাই, যা আমার তেইশ বছরের জীবনের নাগরিক কর্মজীবনকে রূপ দেবার জন্য অনেক এগিয়ে গেছে।”