
বিমল মিত্রর ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ উপন্যাসের চরিত্র ভূতনাথ যে বাবুর বাড়ির সহিসের ঘোড়া-দলাইমালাই করা ও তাকে দানা দেওয়ার বিবরণ দিয়েছেন, তাতে প্রমাণ হচ্ছে বনমালী সরকার স্ট্রিটের বাড়িতে ঘোড়ার গাড়ি ও সহিসের যুগপৎ অবস্থান ছিল।
অতীতের উত্তর কলকাতায় ঘোড়ার আস্তাবল (আড়গোড়া) এবং সহিসদের ইতিহাস কলকাতার ঔপনিবেশিক এবং বাবু সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আঠারো এবং উনিশ শতকে যখন এ শহরে যাতায়াত ও আভিজাত্যের প্রধান মাধ্যম ছিল ঘোড়ার গাড়ি, তখন উত্তর কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে বিশাল কর্মযজ্ঞ গড়ে উঠেছিল।
সেকালের উত্তর কলকাতার ঘোড়ার আস্তাবল এবং সহিসদের জীবনযাত্রার একটি ঐতিহাসিক রূপরেখা দেওয়া যাক।
উত্তর কলকাতার ঘনবসতিপূর্ণ এবং বনেদি এলাকাগুলোতেই মূলত ঘোড়া এবং গাড়ি রাখার আস্তাবল বা আড়গোড়া গড়ে উঠেছিল।
রাজাবাজার ও সংলগ্ন এলাকা: উত্তর কলকাতার রাজাবাজার, শিয়ালদহ এবং নারকেলডাঙা অঞ্চল ছিল আস্তাবলের মূল কেন্দ্র। আজও রাজাবাজারের ‘সুরকি কল’ সংলগ্ন এলাকায় পুরনো আস্তাবলের স্মৃতিবাহী কিছু কাঠামো এবং ব্যবসার খোঁজ মেলে।
কুমারটুলি ও শোভাবাজার: কুমারটুলি অঞ্চলে অতীতে কলকাতার বহু বিশিষ্ট ও বনেদি বাবুর আবাসবাটি ছিল। বাবুদের নিজস্ব ‘জুড়িগাড়ি’ বা ‘ফিটন গাড়ি’ রাখার জন্য তাঁদের বাড়ির নিচতলায় বা সংলগ্ন অংশে বড় বড় ব্যক্তিগত আস্তাবল থাকত। শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণদেব ইংরেজের কাছ থেকে ৩০০০ অশ্বারোহী সৈনিক (সওয়ার) পেয়েছিলেন, পরে তা বেড়ে ৪০০০ হয়। এইসমস্ত ঘোড়ার দেখভালের জন্যে ঘোড়ার সহিস লাগত। তাদের জন্যে গড়ে ওঠে সন্নিহিত অঞ্চল কুমারটুলির সহিস-মহল্লা।
ঘোড়ার গাড়ি সংস্কৃতির মেরুদণ্ড ছিলেন এই সহিস বা অশ্বপালক (যারা ঘোড়ার দেখভাল করত) এবং কোচোয়ান (যারা গাড়ি চালাত)।
আস্তাবলের জীবন: সহিসদের একটি বড় অংশ আসতেন বিহার, উত্তরপ্রদেশ এবং ওড়িশা থেকে। আস্তাবলের এক কোণে বা ঘোড়ার ঘরের ওপরেই ছোট ছোট ঘরে অত্যন্ত কষ্টকর পরিবেশে তাঁরা দিন কাটাতেন।
দায়িত্বঃ ভোরবেলা থেকে ঘোড়াকে মালিশ করা, খড়-দানা খাওয়ানো, খুর পরিষ্কার করা এবং গাড়ি ধুয়ে চকচকে রাখার কাজ একহাতে সামলাতেন সহিসরা। বাবুদের গাড়ি রাস্তায় বেরোনোর সময় সহিসরা অনেক সময় গাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতেন, যাতে প্রয়োজনে নেমে ঘোড়া সামলাতে পারেন।
ঘোড়াদের জল খাওয়ানোর জন্য তৎকালীন পুরসভা উত্তর ও মধ্য কলকাতার বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে লোহার বা সিমেন্টের বড় বড় বাঁধানো পাত্র বা চৌবাচ্চা তৈরি করে দিয়েছিল। উত্তর কলকাতার রাজাবাজার, আমহার্স্ট স্ট্রিট বা বিধান সরণির আশেপাশে খুঁজলে আজও রাস্তার ধারে এই ঐতিহাসিক জলাধারগুলোর দু-একটি নমুনা বা ধ্বংসাবশেষ চোখে পড়ে।
বিংশ শতকের শুরুতে ট্রাম এবং মোটর গাড়ির আগমনের সাথে সাথে উত্তর কলকাতার বাণিজ্যিক আস্তাবলগুলো বন্ধ হতে শুরু করে। বর্তমানে উত্তর কলকাতার এই ঐতিহ্যবাহী আস্তাবলগুলো সম্পূর্ণ অবলুপ্ত। এখন কলকাতার ঘোড়ার গাড়ি শুধুমাত্র ময়দান এবং ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল চত্বরেই সীমাবদ্ধ।

কুমারটুলির ইতিহাস অনেক পুরনো। কলকাতার বহু সম্ভ্রান্ত লোকের বাস ছিল এখানে। কুম্ভকারদের জায়গা বলে কুমারটুলি নাম, এই ধারণা সর্বাংশে সত্যি নয়।
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-এ আছে, ‘কুমার’ শব্দটির অন্যতম প্রধান অর্থ হল ‘ঘোড়ার সহিস’।
১৭৫২ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ডিরেক্টরদের নির্দেশমাফিক কলকাতার জমিদার জন জেফানিয়া হলওয়েল সাহেব কলকাতার পেশাভিত্তিক স্থানবিভাজন করেছিলেন। মুচিপাড়া, ডোমটোলা, দর্জিপাড়া, আহিরিটোলা, কলুটোলা, আর্মানিটোলা, শুঁড়িপাড়া, গোয়ালাপাড়া, কেরানিপাড়া, কুমারটুলি ইত্যাদি অঞ্চলের সৃষ্টি হয়।
যে যে পেশার লোক তাকে তার নির্দিষ্ট অঞ্চলেই থাকতে হবে, এই নিয়ম চালু হল।
কুমারটুলির আদি বাসিন্দা কুম্ভকার বা কুমোর, না কুমার তথা ঘোড়ার সহিস, তা বলা দুষ্কর। ১৭৫৭-য় শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা রাজা নবকৃষ্ণ দেব কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পীদের কলকাতায় আনেন নিজের বাড়ির দুর্গাপ্রতিমা তৈরির জন্যে। পলাশির যুদ্ধে জয়লাভের পর লর্ড ক্লাইভ ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের নিমন্ত্রণ করেছিলেন তিনি সেই পুজোয়। সেই সমস্ত মৃৎশিল্পী তথা পটুয়াদের উত্তর কলকাতায় এখন যেখানে কুমোরটুলি, সেই অঞ্চলে নাকি থাকতে দেওয়া হয়। ক্রমশ তারা সংখ্যায় বাড়তে থাকে। কলকাতায় বারোয়ারি পুজোর বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কৃষ্ণনগর থেকে বহুসংখ্যায় মৃৎশিল্পীর আগমন ঘটতে থাকে। কুমোর আর পটুয়া সমার্থক। দুর্গাপ্রতিমার চাহিদাবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কুমার বা পটুয়ার সংখ্যাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য প্রতিমাও তৈরি করতে থাকে এই পটুয়ার দল। সরস্বতী, লক্ষ্মী, গণেশ, কার্তিক, কালী ইত্যাদি ঠাকুরের মূর্তির চাহিদাও বাড়তে থাকে। তাই প্রতিমাশিল্পীদের মহল্লা হিসেবে কুমারটুলি তথা কুমোরটুলির খ্যাতি উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে।
আবার কলকাতার ঘোড়ার সহিসদের কথাও মনে পড়বে সকলের। সহিসরা ঘোড়ার দেখাশোনা বা রক্ষণাবেক্ষণ করে। কোচোয়ান বা কোচম্যানদের হাতে ঘোড়ারগাড়ির ঘোড়ার লাগাম থাকে। এক ঘোড়ায় টানা ঘোড়ার গাড়িকে টমটম বা টাঙ্গা বলে। দুই ঘোড়ায় টানা ঘোড়ার গাড়িকে জুড়িগাড়ি বলে। সহিসদের কাজ হল হেঁটে হেঁটে ঘোড়ার গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করা, সঠিক পথে নিয়ে যাওয়া। তাই তাদের অশ্ববারকও বলে। তাদের ভালো নাম হল কুমার।পুরনো কলকাতার বনেদিবাড়ির লোকজন জুড়িগাড়ি করে বেড়াতে বেরোত, সাহেবরাও তাই। সাধারণ মানুষ টমটমের বা টাঙ্গা চড়তেই অভ্যস্ত ছিল। এছাড়া ব্রুহ্যাম, ল্যান্ডো, গিগ নামের ঘোড়ার গাড়িও ছিল কলকাতায়। রাধারামণ মিত্র তাঁর লেখা বই ‘কলিকাতা-দর্পণ’-এ লিখেছেন, “সব রকম গাড়ির নিয়মই ছিল এক, ‘যতগুলো ঘোড়া, ততগুলো সইস’।”
কলকাতার সিমলার ছেলে নরেন্দ্রনাথ দত্ত তথা বালক স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন, বড় হলে তিনি ঘোড়ার সহিস হবেন।
অবন ঠাকুর তো তাঁর লেখায় সমশের কোচোয়ান, রামু কোচোয়ান আর আক্কেল সহিসের কথা বারবার বলেছেন।
তবু যেন সহিসরা কাব্যে উপেক্ষিত।
উত্তর কলকাতায় ঘোড়ার আস্তাবলগুলি ক্রমশ অবলুপ্ত হচ্ছে। তবে ঘোড়াদের জল খাওয়ার বাঁধানো পাত্রগুলো রাস্তার পাশে কোথাও কোথাও চোখে পড়ে।
কুমারটুলি অঞ্চলে অতীতে কলকাতার বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির আবাসবাটি ছিল। ১৭০০ সালে কুমারটুলির নন্দরাম সেন কলকাতার প্রথম কালেক্টর নিযুক্ত হন।এঁকে ব্ল্যাক ডেপুটি বলা হত। কুমারটুলিতে বর্তমানে তার নামে একটি রাস্তা আছে। পরবর্তী ব্ল্যাক ডেপুটি গোবিন্দরাম মিত্র এই অঞ্চলে ১৬ একর জমিতে এক প্রাসাদোপম অট্টালিকা নির্মাণ করেন। তাঁর তৈরি ব্ল্যাক প্যাগোডা নামক নবরত্ন মন্দির কলকাতার অন্যতম দ্রষ্টব্য। ১৭৩৭-এর প্রলয়ঙ্কর ঝড়ে তার চুড়ো ভেঙে পড়েছিল।
লৌকিক ছড়ায় উল্লিখিত বনমালী সরকার বাড়ি ঊনিশ শতক পর্যন্ত কুমারটুলিতে অবস্থিত ছিল। কুমারটুলিতে তার নামে একটি বিখ্যাত গলি রয়েছে। এখানে এখনও রয়েছে গোবিন্দরাম মিত্র, অভয়চরণ মিত্রদের বংশধরদের বসবাস। তবে সে রামও নেই, সে অযোধ্যাও নেই। ভিটে বলে কিছু আর নেই, আছে ফ্ল্যাট বা আবাসন। সেখানেই থাকেন অভয়চরণের বংশধররা।
এই সমস্ত নামীদামি ব্যক্তির বাড়িতে ঘোড়ার গাড়ি যেমন মজুত ছিল, ঘোড়ার সহিস ও কোচোয়ানও ছিল। বাগবাজার, শোভাবাজার ও শ্যামবাজারের বনেদিবাড়ির ঘোড়ার গাড়ির সহিসদের আস্তানা ছিল কুমারটুলিতে। কুমারটুলির মৃৎশিল্পীদের এককুটুরি ঘর, তার ভিতর ম্যাজেনাইন একতলা বা বাঁশের মাচায় তাদের কষ্টকর জীবনযাপনের সঙ্গে সহিসদের ঘোড়ার আড়গোড়ার উপরের একচিলতে ছোটঘরে কষ্টকর জীবনযাপনের অদ্ভুত সাদৃশ্য পাওয়া যায়।
মনে হয় সিংহের আকার-আকৃতি নিয়ে কুমারটুলির মৃৎশিল্পীদের কোনও ধারণা না থাকায় তারা সামনে রাতদিন হাজির ঘোড়ার মুখই সিংহের মুখ হিসেবে চালিয়ে দিয়েছিলেন। আলিপুর চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে। তার আগে কলকাতায় সিংহের উপস্থিতি ছিল অলীক কল্পনা। এইভাবেই শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গার বাহন হল ‘ঘোটকমুখী সিংহ’। বলাবাহুল্য সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে।
একটু তলিয়ে দেখলে মনে হবে, ঘোড়ার চল কমে আসার সুযোগে পরিত্যক্ত আস্তাবল বা আড়গোড়ার উপর একচিলতে ঘরগুলোই পরবর্তীকালে মৃৎশিল্পীরা অধিকার করে নেয়। কারণ কুমার তথা সহিসরা জীবিকার দিক দিয়ে তখন সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছিল, কুমোর তথা মৃৎশিল্পীরা তখন উদীয়মান শ্রেণী।