
দুর্গাপুজোর পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র নিয়ে কখনও কখনও কোথাও কোথাও একটু ধন্দ তৈরি হয়। তৈরি হয় সংশয়। এ বিষয়ে সাধারণত দু’রকম মত প্রচলিত। এক পক্ষের মত, একই মন্ত্র চারদিন উচ্চারণ করতে হয়। অন্য পক্ষ বলেন, চারদিন চারটি ভিন্ন মন্ত্র উচ্চারণই রীতি। এই ভিন্ন মন্ত্রের দিকেই অবশ্য পাল্লা ভারী। তবে, এর বাইরেও কথা আছে। সাধারণত, মণ্ডপে-মণ্ডপে বা বিভিন্ন বাড়ির পুজোগুলিতে কখনও কখনও সংশ্লিষ্ট পুরোহিত হয়তো একটু স্বাধীনতা নেন বলে শোনা যায়। তাঁরা চণ্ডীর ভিন্ন ভিন্ন শ্লোক মন্ত্র হিসেবে অনেক সময়ে তুলে আনেন নিজের মতো করেই। আর সেই সব শুনে মনে হয়, এগুলি বুঝি ভিন্ন কোনও মন্ত্র; আরও মনে হয়, ইনি হয়তো প্রথাসিদ্ধ মন্ত্র-ঐতিহ্যে কোনও ব্যত্যয় ঘটাচ্ছেন, নতুবা ইনিই হয়তো ঠিক করছেন, অন্যেরা ভুল।
এইবিষয়ে কথা বলছিলাম নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীর সঙ্গে। উনি বললেন, “মন্ত্রের যে মাধুর্য, যা শুনে আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়েছি এককালে, সেই মন্ত্র তো এখন আর কেউ পড়েন না। সেটা বৈদিক মন্ত্র। যজ্ঞানুষ্ঠানে ব্যবহৃত বৈদিক মন্ত্রের যে জায়গা, তা ছেড়ে যখন পৌরাণিক কালে একজন পৃথক দেবতা এবং শুধু দেবতানির্ভর মন্ত্রগুলো তৈরি হল, সেগুলো তো বেদকে পাশে সরিয়ে রেখেই তৈরি হয়েছিল। যজ্ঞের বদলে পূজার পরিবর্তন হল, ফলত বৈদিক মন্ত্রেরও পরিবর্তন হল। মন্ত্রের এই যে পরিবর্তন তা বহুকাল আগেই হয়েছিল। বৈদিক যুগ থেকে পৌরাণিক যুগে মন্ত্রের বদল হয়েছিল সময়ের দাবি মেনে।” তাতে কি কোনও দোষের সম্ভাবনা থাকে? জবাবে নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী জানালেন, “দেবতা পাষাণ কিংবা কাঠের মধ্যে থাকেন না। ভাবের মধ্যেই দেবতা অধিষ্ঠান করেন। যার ফলে শুধু ‘মা মা’ বললেই চলে, তাতে কোনও অত্যুক্তি হয় না। কোনও দোষ হয় না।”
বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে তিনি জানালেন, “দোষটা হবেই বা কোথায়? আমি তো আর্তির মধ্যে ভগবানকে দেখতে পাচ্ছি। সংস্কৃত শব্দ যখন আমরা উচ্চারণ করি, সেই উচ্চারণ তো ঠিক হচ্ছে না। উচ্চারণ যদি কেউ ঠিকও করেন, তাতে কি তাঁরা দেবতাকে নামিয়ে আনতে পারছেন? আমি তা মনে করি না। মায়ের কাছে যদি তুমি নিজের আর্তি জানাতে পারো, সেটাই সব থেকে বড় মন্ত্র।”
উনি বিষয়টা আরও পরিষ্কার করে বললেন — “মন্ত্র ভুল বললেও কোনও অসুবিধে নেই। কেন কি চৈতন্য মহাপ্রভু একবার দক্ষিন দেশে গেছেন তীর্থ দর্শনে। তা সেখানে একটা মাতৃ মন্দির দর্শন করার পর নৃসিংহদেবের মন্দির দেখে তিনি রাস্তায় বেরিয়ে এসেছেন। দেখলেন রাস্তার ধারে একটা গাছের তলায় একজন বসে গীতা পাঠ করছেন। উনি দেখলেন সেই মানুষটি গীতা পাঠ করতে করত শুধু কেঁদে যাচ্ছে। উনি কাছে গেলেন, দেখলেন মানুষটি ভুলভাল গীতা পাঠ করছেন, একটা উচ্চারনও ঠিক নয়। উনি কিন্তু কিছু বললেন না, গীতাপাঠ শেষ হতে তিনি কাছে গিয়ে বসলেন। বললেন, তুমি গীতা পাঠ করছো তোমার চোখে জল কেন? তা সেই মানুষটি বললেন, আমি তো ঠিক মতো পাঠ করতে পারি না। তবে গুরু বলেছেন তাই পাঠ করি। আমি এই সব শ্লোকের একবিন্দু অর্থও বুঝতে পারিনা। কিন্তু আমি দেখতে পাই যুদ্ধস্থলে অর্জুন চিন্তিত মুখে রথের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন। আর স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ রথের রসি হাতে তাঁর দিকে মুখ ফিরিয়ে কথা বলছেন। তাঁক আশ্বস্ত করছেন। এই দৃশ্য দেখতে পাই আমি। তখন চৈতন্য মহাপ্রভু মুচকি হেসে বললেন, তুমি সঠিক গীতা পাঠ করছো। কেননা বহু মানুষ শুদ্ধ উচ্চারনে বারবার গীতা পাঠ করছেন ঠিক কিন্তু তোমার মতো গীতা পাঠ করতে গিয়ে এই চিত্র তাঁরা দেখতে পাননা।

আমাদের সংস্কৃতে একটা শ্লোক আছে ‘মূর্খা বদন্তি বিষ্ণায় নমঃ/ধীরা বদন্তি বিষ্ণবে নমঃ’। মাথায় রাখতে হবে আমরা যখন বিষ্ণুকে নমস্কার করি তখন আমরা উচ্চারন করি বিষ্ণবে নমঃ। আর যারা মুর্খ তারা বলবে বিষ্ণায় নমঃ। কিন্তু পরের লাইনটি মারাত্মক — ‘উভয়র ফল সামান্যম’। অর্থাৎ এই যে দু-ভাবে বলা হচ্ছে দুটোরই ফল এক। কেন? ‘ভারগ্রাহী জনার্দন’। অর্থ? জনার্দন শুধুমাত্র ভক্তের ভারটাই গ্রহন করেন। কে কি উচ্চারন করলো তা মোটেই নয়। তাই আমি বলে থাকি ভগবান কিন্তু সমস্ত ভাষাই বোঝে ভাই। কে বলেছে ভগবান শুধু সংস্কৃত ভাষাই বোঝে। এটা ভাবনা করাই ভুল। মন্ত্রের মাধুর্য আছে, হেন আছে তেন আছে, সব স্বীকার করে নিলাম। সবচেয়ে বড়ো কথা তুমি আন্তরিকভাবে ভাব দিয়ে ভগবানকে প্রনাম করছো সেটাই সব।”
মন্ত্রের সমস্যা আরো আছে — ‘ওঁ আয়ুর্দেহি যশো দেহি। ভাগ্যং ভগবতি দেহি মে। পুত্রান্ দেহি ধনং দেহি সর্বান্ কামাংশ্চ দেহি মে।’ দেবীর পুষ্পাঞ্জলিতে উচ্চারিত এই মন্ত্রের অনুরণন এখনও বাতাসে৷ পার্বতীর কাছে ভক্তের আকুল প্রার্থনা, মা খ্যাতি দাও, সৌভাগ্যের দিশা দাও, সম্পদ দাও, সর্বোপরি কোল আলো করে ছেলে দাও৷ স্বভাবতই প্রশ্ন উঠতে পারে, মেয়ে কি দোষ করল! কেন নয় পুত্রের সঙ্গে কন্যাসন্তানের কামনাতেও প্রার্থনা৷
পুত্রসন্তানের প্রার্থনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে মন্ত্র? উত্তরে পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন শাস্ত্র বিশেষজ্ঞ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি৷ তাঁর বক্তব্য, ‘বদলাবেটা কে, বিধান দেবে কে? আগেকার দিনে স্মার্তরা বিধান দিতেন৷ সেই অনুযায়ী কিন্তু শাস্ত্রগত ভাবে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়েছে৷ ধরুন বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহের সপক্ষে সওয়াল করেছিলেন পরাশর সংহিতার সূত্র ধরে৷ সমস্যা হল, সেই স্মার্তদের আর উদ্ভব হবে না৷ ধরুন, আমি যদি বিধান দিই, কেউ শুনবে? অনেক সময়ই তো বলি লক্ষ্মীপুজো বা সরস্বতী পুজোর জন্য পুরোহিত দরকার নেই৷ কেউ কি শুনছে৷’
ইতিহাস ও সমাজ বিবর্তনের ধারায় নৃসিংহপ্রসাদ এই মন্ত্রের ব্যাখ্যাও করেছেন৷ তিনি বলেন, ‘সে আমলে আর্যদের বিশেষ করে পুত্র কামনা করার একটা প্রেক্ষাপট ছিল৷ আর্যরা ছিল পশুপালক ও যুদ্ধবাজ৷ তারা ভিন দেশ থেকে এ দেশে এসে ভূমিপুত্রদের সঙ্গে যুদ্ধবিগ্রহ করে অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল৷ ফলে, তাদের নিজেদের গোষ্ঠীতে পুত্রসন্তান চাওয়ার একটি সময়োপযোগী যুক্তি ছিল৷ আজকের দিনে তার মানে নেই৷’ এই প্রসঙ্গে সর্বভারতীয় প্রাচ্য বিদ্যা অ্যাকাডেমি’র অধ্যক্ষ জয়ন্ত কুশারী ‘পুত্রান্’ শব্দটি অবশ্য দ্বৈত অর্থেই প্রয়োগের পক্ষপাতী৷ তাঁর ব্যাখ্যায়, ‘শাস্ত্রে এও বলেছে, ‘পুত নরকাত্ ত্রায়তে ইতি পুত্র৷’ অর্থাত্, পুত নামক নরক থেকে যে ত্রাণ দেয় তা-ই পুত্র৷ জনকের মৃত্যুর পর যে শ্রাদ্ধ তর্পণ করে, সেই পুত্র৷ কোনও কোনও ক্ষেত্রে তো কন্যাদেরও সেই দায়িত্ব পালন করতে হয়৷ মনুতেও বলা হয়েছে ‘কন্যাপেবং পালনীয়া শিক্ষণীয়াতি বিশেষতঃ’৷ কন্যাকেও পুত্রের মতো যত্ন করে পালন এবং শিক্ষাদান জরুরি৷ আসলে, দুর্গার মন্ত্রে ‘পুত্রান্’-এর গূঢ় অর্থে পুত্র ও কন্যা দুই-ই নিহিত রয়েছে৷’
বাংলা মঙ্গলকাব্যে এবং আগমনীগানে শিবজায়া হিমালয়দুহিতা পার্বতীর কথা আছে। রয়েছে তাঁর বিবাহিত জীবনের বর্ণনা। রয়েছে সপরিবার পিতৃগৃহে অবস্থানের আনন্দময় দিনগুলির কথাও। হিমালয়গৃহে বা বাপের বাড়িতে দুর্গার এই দিনগুলিই হল আমাদের এই সাধের দুর্গাপূজা। সেই পুজোয় আচারের কড়াকড়ি যেমন থাকে, তেমনই থাকে মনের স্বাভাবিক আবেগের আনন্দোচ্ছলতা। আগামী ক’দিন বাঙালি তাই যুগপৎ এই মন্ত্রে-তন্ত্রে মজে থাক! সার্থক হোক শারদীয়া উৎসব।