
৭৪. সাধু রামচাঁদ মুর্মুর সাধনা
‘দেবন তিঙ্গুন আদিবাসী বীর’। সাঁওতালি ভাষায় লেখা এই বাক্যটির অর্থ হল : এসো জাগি আদিবাসী বীর। এটি একটি গানের লাইন। গানটি জনপ্রিয় হয়েছিল। এই গানের ঢেউ আছড়ে পড়েছে পুরুলিয়ার পাহাড়ি বনে। অনুরণন সৃষ্টি করেছে সরল সাঁওতালদের মনে। এই গান ছোটনাগপুর আর ঝাড়খণ্ডের আদিবাসীদের জাতীয় সংগীত হয়ে উঠেছে।
এই গানের লেখক সাধু রামচাঁদ মুর্মু (১৮৯৭-১৯৫৪)। ঝাড়গ্রাম জেলার শিলদার নিকটবর্তী কামারবাঁদি গ্রামে তাঁর জন্ম। মোহন মুর্মু তাঁর বাবা আর মা হলেন কুনি মুর্মু। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে রামচাঁদ হলেন সর্বকনিষ্ঠ। গ্রামের স্কুলে তাঁর অক্ষর পরিচয়। মধ্য ইংরেজি স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন তিনি। মূলত অর্থনৈতিক কারণে আর এগোয় নি প্রথাগত লেখাপড়া। কিন্তু লেখাপড়া একেবারে ছেড়ে দেন নি রামচাঁদ। ধীরে ধীরে তিনি স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হন।
সহজাত সংগীত প্রতিভা ছিল তাঁর। সুর তাল ছন্দের জ্ঞান ছিল। নিজের ভাবনাকে তুলে ধরতেন নিজের লেখায়। সুর দিতেন তাতে। নিজেই গাইতেন গান।
কিন্তু রামচাঁদকে ‘সাধু’ বলা হত কেন? বলা হত তাঁর জীবনাচরণের পবিত্রতার জন্য। ছলনা ও কপটতা ছিল না রামচাঁদের। দেশবাসীর মঙ্গলের জন্য তাঁর আত্মত্যাগের মধ্যে কোন ফাঁকি ছিল না। যত তিনি বড় হতে লাগলেন ততই বুঝতে পারলেন বাইরের সমাজে সাঁওতালরা বড় অবহেলিত ও ঘৃণিত। এই অবহেলা আর ঘৃণা ধীরে ধীরে সাঁওতালদের মনে হীনমন্যতার জন্ম দিচ্ছে। বাইরে গেলে দুই সাঁওতাল নিজেদের ভাষায় কথা বলতে দ্বিধা করে। পাছে লোকে কিছু বলে। মাতৃভাষার প্রতি এই অবহেলা সাঁওতালদের উন্নতির প্রধান বাধা। তিনি উপলব্ধি করেন যে ভাষা ও সাহিত্য ছাড়া কোন জাতির বিকাশ সম্ভব নয়।
জয়দীপ মিত্র লিখেছেন :
“প্রথম প্রহরে যখন সাঁওতালি ভাষায় লিখিত সাহিত্য ছিল না বললেই হয়, তখন সাধু রামচাঁদ নতুন নতুন কবিতা লিখে ক্ষয়িষ্ণু সাঁওতাল সমাজকে সচেতন করতে চেয়েছিলেন। নিজেকে কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য সাধু রামচাঁদের ছিল না, বরং সাঁওতালি ভাষাকে প্রতিষ্ঠাপূর্বক সাঁওতাল জাতিকে সংঘবদ্ধ করার সংকল্প ছিল তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।
“… সাধু রামচাঁদের পূর্ণ বিকাশ ঘটে ১৯৩৫-৩৬-এর কাছাকাছি। এক কথায় ১৯৩০-৩৯ সাল ছিল সাঁওতাল সমাজের ত্রিবেণী সঙ্গমের যুগ। ভারতের স্বাধীনতার আন্দোলন ও স্বজাতিপ্রীতির প্রবল আকর্ষণ, আদর্শবোধ, আদিবাসী মহাসভার দ্বারা আদিবাসীদের প্রতিষ্ঠা করার আগ্রহ এক ঘূর্ণাবর্ত সৃষ্টি করে।”
সাহিত্যের বিকাশে যে জাতির বিকাশ, এ কথা বুঝতে পেরে রামচাঁদ সাঁওতালি সাহিত্যের বিকাশের জন্য কঠিন সাধনা শুরু করেন। এমন কি নিজের সংসার ছেড়ে, বাড়িঘর ছেড়ে তিনি সাহিত্য সাধনায় নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছিলেন। যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন, তাঁর কোন রচনা মুদ্রিত হয় নি। আর্থিক অনটন ছিল তার মূল কারণ।
তাঁর মৃত্যুর পরে সাধু রামচাঁদ মুর্মু স্মৃতি কমিটি ও মারাংবুরু প্রেসের কর্ণধার ড. সুহৃদকুমার ভৌমিকের চেষ্টায় রামচাঁদের পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করা হয় এবং গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা হয়। রামচাঁদের জন্মশতবার্ষিকীতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর প্রকাশ করে ‘সাধু রামচাঁদ অনলমালা’ অর্থাৎ সাধু রামচাঁদের রচনাবলি। এই রচনাবলিতে আছে :
১] সারি ধরম সেরেঞ পুঁথি
২] অল দহ অনড়হে
৩] লিটা গোডেৎ
৪] সংসার ফেঁদ
৫] ঈশরড়
কিন্তু রামচাঁদ স্মৃতি রক্ষা কমিটির সদস্যদের আক্ষেপ আছে। সংগঠনের সম্পাদক সঞ্জয় হাঁসদা বলেন, ‘সরকারিভাবে সাধু রামচাঁদের সমাধিস্থল সংরক্ষণের কাজ হয় নি। এমন কি দর্শনীয় স্থান হিসেবে কামারবান্দি গ্রামটি জেলার পর্যটন মানচিত্রেও অন্তর্ভুক্ত হয় নি।… সাঁওতালি ভাষা গবেষণার কাজে অনেকেই গ্রামে আসেন। অথচ সাঁওতালি সাহিত্যের ভগীরথ রামচাঁদের কোনও সংগ্রহশালা আজ পর্যন্ত হল না।’