
দেবী দুর্গার আবাহন মর্ত্যে যে দু’জন প্রথম করেন, তাঁরা হলেন রাজা সুরথ ও বণিক সমাধি বৈশ্য।
বণিকের পৃষ্ঠপোষকতা ও রাজাদের উদ্যোগ ছাড়া দেবী দুর্গার আরাধনা যে করা অসম্ভব ছিল, তা পরবর্তীকালে শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণদেব আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন। পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজের জয়লাভের পর রাজা নবকৃষ্ণ দেব যে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন, তা ছিল মূলত জয়ী ইংরেজ সেনাপতি লর্ড ক্লাইভ ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের তোয়াজ করার জন্যে। যদিও রাজশাহীর তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ রায় বাহাদুর বাংলায় প্রথম সর্বজনীন ও আধুনিক শারদীয় দুর্গাপূজার প্রবর্তন করেন।
দুর্গাপূজা কোনওদিন নিম্নবর্গের পূজা ছিল না। নিম্নবর্গের লোকজনের কাজ ছিল সেই পূজায় রবাহূত বা অনাহূত অবস্থায় কাঙালভোজনে যাওয়া। সঙ্গে ফাও রাজারাজড়ার বাড়ির দুর্গাপ্রতিমাদর্শন।
চণ্ডী ও দেবী মাহাত্ম্যমের অন্যতম প্রধান ও তাৎপর্যময় চরিত্র হলেন সমাধি বৈশ্য। সনাতন ধর্মগ্রন্থে (যেমন মার্কণ্ডেয় পুরাণ ও শিব পুরাণের উমা সংহিতা) বর্ণিত রাজা সুরথ এবং সমাধি বৈশ্যের উপাখ্যান কেবল একটি পৌরাণিক কাহিনী নয়, বরং এটি মানুষের মোহ, মায়া, বৈরাগ্য ও পরম জ্ঞান লাভের এক শাশ্বত রূপক। যেখানে রাজা সুরথ ছিলেন রাজসিক শক্তির প্রতীক, সেখানে সমাধি বৈশ্য ছিলেন জাগতিক দুঃখের মধ্য দিয়ে পরমার্থিক জ্ঞান বা মোক্ষ লাভের এক অনন্য পথপ্রদর্শক।
পৌরাণিক বর্ণনা অনুযায়ী, সমাধি ছিলেন এক অত্যন্ত ধনী ও প্রতিষ্ঠিত বণিক (বৈশ্য) পরিবারের এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি। স্বভাবগতভাবে তিনি ছিলেন সত্যবাদী, দয়ালু এবং ধার্মিক। সততার সঙ্গে বাণিজ্য করে তিনি বিপুল ধনসম্পত্তির অধিকারী হয়েছিলেন এবং নিজের সমস্ত অর্থ পরিবারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য বিলিয়ে দিতেন।
কিন্তু তাঁর স্ত্রী, পুত্র এবং আত্মীয়রা ছিল অত্যন্ত লোভী ও স্বার্থপর। সমাধির বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাঁর অগাধ সম্পত্তির প্রতি তাঁদের লোভ তীব্র আকার ধারণ করে। একপর্যায়ে, তাঁর স্ত্রী ও সন্তানরা ছলে-বলে-কৌশলে তাঁর সমস্ত ধনসম্পত্তি কেড়ে নেয় এবং তাঁকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে নিজের বাড়ি ও সমাজ থেকে তাড়িয়ে দেয়।
সবকিছু হারিয়ে, নিদারুণ মানসিক কষ্ট ও শূন্যতা নিয়ে সমাধি বৈশ্য এক গভীর বনে আশ্রয় নেন। সেই বনেই ছিল পরম ব্রহ্মজ্ঞানী মেধস মুনি বা ঋষি মেধার পবিত্র আশ্রম। আশ্রমে ঘুরে বেড়ানোর সময় তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হয় কোলা-বিধ্বংসী রাজা সুরথের, যিনি নিজের মন্ত্রীদের বিশ্বাসঘাতকতা এবং শত্রুদের আক্রমণে রাজ্য হারিয়ে একইভাবে বনে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
একই রকম ভাগ্যাহত দুই মানুষ — একজন রাজ্যহারা রাজা এবং অন্যজন পরিবার-বিতাড়িত বণিক — একে অপরের মুখোমুখি হন। রাজা সুরথ সমাধি বৈশ্যর মলিন ও বিষণ্ণ চেহারা দেখে তাঁর দুঃখের কারণ জানতে চান। সমাধি তখন অশ্রুসজল চোখে নিজের জীবনের করুণ কাহিনী রাজার কাছে ব্যক্ত করেন।
কথোপকথনের সময় সুরথ ও সমাধি বৈশ্য উভয়েই একটি অদ্ভুত মানসিক প্যারাডক্স বা বৈপরীত্য লক্ষ্য করেন। সমাধি স্বীকার করেন যে, তাঁর স্ত্রী ও সন্তানরা তাঁকে চরম অপমান করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে, তাঁর বেঁচে থাকার উপায়টুকুও কেড়ে নিয়েছে; অথচ তাঁর মন এখনও সেই কুচক্রী পরিবারের জন্যই ব্যাকুল হয়ে ওঠে। তারা ঠিকমতো খাচ্ছে কিনা, কোনো বিপদে পড়েছে কিনা — এই চিন্তায় তাঁর রাতে ঘুম আসে না।
রাজা সুরথও নিজের ক্ষেত্রে একই জিনিস অনুভব করেন; যে প্রজারা ও মন্ত্রীরা তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তাদের কল্যাণ চিন্তাই তিনি অহর্নিশ করে চলেছেন। এই তীব্র মানসিক দ্বন্দ্বের উত্তর খুঁজতে তাঁরা উভয়েই মেধস মুনির শরণাপন্ন হন এবং প্রশ্ন করেন — “যে আত্মীয়রা আমাদের ত্যাগ করেছে, যারা লোভী ও শত্রুভাবাপন্ন, তাদের প্রতি আমাদের এই দুর্নিবার আকর্ষণ ও ভালোবাসা কেন জাগছে? কেন আমরা এই মোহ কাটাতে পারছি না?”
ঋষি মেধস তাঁদের এই ব্যাকুলতা দেখে হাসলেন এবং বললেন যে, এটিই হলো জগৎসংসারের মূল চালিকাশক্তি, মহামায়ার প্রভাব। ঋষি ব্যাখ্যা করেন যে, পরমেশ্বর বিষ্ণুর যে যোগনিদ্রারূপী শক্তি, তিনিই হলেন মহামায়া। এই মহাবিশ্বের প্রতিটি জীবকে তিনি মোহের আবরণে আবৃত করে রেখেছেন। পাখিরা নিজেরা ক্ষুধার্ত থেকেও যেমন সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেয় প্রকৃতির নিয়মে, মানুষও তেমনি মোহের বশে শত্রুভাবাপন্ন সন্তানের প্রতি আকৃষ্ট থাকে। এই মায়াজাল ছাড়া সংসার টিকে থাকা অসম্ভব।
ঋষি মেধস বলেন, এই মহামায়াই যেমন মানুষকে সংসারে বেঁধে রাখেন, তেমনি তিনি প্রসন্ন হলে মানুষকে পরম মুক্তি বা মোক্ষ দান করেন। এরপর ঋষি সুরথ ও সমাধি বৈশ্যকে মহামায়ার মহিমা বোঝাতে শ্রীশ্রী চণ্ডীর তিনটি প্রধান চরিত্র বা রূপের (মহাকালী, মহালক্ষ্মী ও মহাসরস্বতী) এবং মধুকৈটভ বধ, মহিষাসুর মর্দিনী এবং শুম্ভ-নিশুম্ভ বধের পবিত্র উপাখ্যান শোনান।
মেধস মুনির উপদেশ শুনে রাজা সুরথ এবং সমাধি বৈশ্যের অন্তরে দিব্য চেতনার উদয় হয়। তাঁরা জাগতিক শোক ভুলে মহামায়ার সাধনায় ব্রতী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ঋষির আশ্রমের অদূরে এক পবিত্র নদীর তীরে (মতান্তরে অজয় নদের তীরে বা পশ্চিমবঙ্গের গড় জঙ্গলে) তাঁরা একটি নির্জন স্থান নির্বাচন করেন।
সেখানে তাঁরা মাটির দেবী প্রতিমা নির্মাণ করে কঠোর তপস্যা শুরু করেন। সমাধি বৈশ্য কোনো রকম খাবার ও জল ছাড়া, সম্পূর্ণ ইন্দ্রিয় সংযম করে দীর্ঘ তিন বছর ধরে দেবীর আরাধনা ও জপ করতে থাকেন। তাঁর সমস্ত চিত্ত ঈশ্বরের চরণে সমর্পিত হয়েছিল।
তিন বছরের কঠোর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে আদ্যাশক্তি মহামায়া সুরথ ও সমাধির সামনে প্রত্যক্ষ আবির্ভূত হন এবং তাঁদের অভীষ্ট বর প্রার্থনা করতে বলেন। রাজা সুরথ তাঁর স্বভাবসুলভ রাজসিক প্রবৃত্তির কারণে এই জন্মে তাঁর হারিয়ে যাওয়া রাজ্য ফেরত চান এবং পরবর্তী জন্মে অখণ্ড পৃথিবীর অধিপতি (সাবর্ণি মনু) হওয়ার বর প্রার্থনা করেন। দেবী তাঁকে সেই বরই দান করেন। কিন্তু সমাধি বৈশ্য জাগতিক কোনো ধনসম্পদ, বৈভব বা নিজের পুরনো পরিবার ফিরে পেতে চাননি। সংসারের অনিত্যতা ও স্বার্থপরতা তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তিনি দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন পরম জ্ঞান (তত্ত্বজ্ঞান), যা মানুষকে “আমি” ও “আমার” (অহংকার ও অস্মিতা) এই দুই বন্ধন থেকে চিরতরে মুক্তি দেয়।
জগজ্জননী দেবী দুর্গা অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে সমাধিকে ব্রহ্মজ্ঞান বা তত্ত্বজ্ঞান দান করেন। এই জ্ঞান লাভের পর সমাধি বৈশ্যের সমস্ত জাগতিক মোহ কেটে যায় এবং তিনি জীবন্মুক্ত হয়ে মুক্তি বা মোক্ষের পথে যাত্রা করেন।
সমাধি বৈশ্যের চরিত্রটি সনাতন ধর্মে অত্যন্ত গভীর তাত্পর্য বহন করে। ‘সমাধি’ শব্দের একটি অর্থ হলো চিত্তবৃত্তির নিরোধ বা ধ্যানের চরম উৎকর্ষ, যেখানে মানুষ বাহ্যিক জগত ভুলে পরমাত্মায় লীন হয়। এই বৈশ্যের নাম ‘সমাধি’ হওয়ার কারণেই তিনি শেষ পর্যন্ত নিজের মনকে ঈশ্বরের চরণে সম্পূর্ণ নিবদ্ধ করে পরম জ্ঞান অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন। তিলক থেকে ত্যাগে রূপান্তর: সনাতন সমাজ ব্যবস্থায় বৈশ্যদের কাজ হলো অর্থ উপার্জন ও সঞ্চয়। কিন্তু সমাধি বৈশ্য দেখিয়েছেন যে, তীব্র বৈরাগ্য এলে একজন ব্যবসায়ীও সমস্ত ধনসম্পত্তির মায়া ত্যাগ করে পরম যোগী বা মুনিদের চেয়েও উচ্চ স্তরের আধ্যাত্মিক মুক্তি লাভ করতে পারেন। যোগসাধনার রূপক: যোগশাস্ত্রে সুরথ ও সমাধির মিলনকে ইড়া ও পিঙ্গলা নাড়ীর মিলন এবং কুণ্ডলিনী শক্তির জাগরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। সমাধি বৈশ্য এখানে শান্ত ও অন্তর্মুখী চেতনার প্রতীক। শ্রীশ্রী চণ্ডীর কাহিনীতে সমাধি বৈশ্য হলেন প্রতিটি সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি, যারা জীবনের কোনো না কোনো মোড়ে আপনজনদের দ্বারা প্রতারিত বা আঘাতপ্রাপ্ত হয়। কিন্তু সেই আঘাতকে হতাশায় রূপান্তরিত না করে কীভাবে ঈশ্বরমুখী সাধনায় বিলীন করা যায়, সমাধি বৈশ্য তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। রাজা সুরথ জাগতিক সুখ ও পুনঃপ্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন, কিন্তু সমাধি বৈশ্য পেয়েছিলেন শাশ্বত শান্তি ও পরম মুক্তি। তাই চণ্ডী পাঠের অন্তিমে সমাধি বৈশ্যের চরিত্রটি আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, সংসারের মোহ ক্ষণস্থায়ী, একমাত্র ভগবত জ্ঞানই মানুষের জীবনের চরম ও পরম লক্ষ্য।
ছবি : দেবত্তম চক্রবর্তী