
লোকবিশ্বাস, পুরাণ ও আধ্যাত্মিকতার মেলবন্ধনে কার্তিক মাসের ‘আকাশপ্রদীপ’ জ্বালানো কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, অতীতের সঙ্গে আত্মিক সংযোগেরও প্রতীক।
“আকাশ প্রদীপ জ্বলে দূরের তারার পানে চেয়ে” লতা মুঙ্গেশকরের কন্ঠে এই জনপ্রিয় গানটি বাঙালিকে নস্টালজিক করে তোলে। কিন্তু এই ‘আকাশ প্রদীপে’র সঙ্গে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের রয়েছে এক গভীর ধর্মীয়, লৌকিক ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাস। পূর্বপুরুষের স্মরণে লৌকিক কাজের অন্যতম অনুষঙ্গ হলো আকাশ প্রদীপ জ্বালানো। এই আলো চিনে পূর্বপুরুষেররা ফিরে আসেন তাঁদের উত্তরসূরীদের আশীর্বাদ করতে। সেই বিশ্বাস থেকেই এই লোকাচার।
হিন্দু পুরাণ মতে আশ্বিন মাসের অমাবস্যায় মহালয়ার দিন পূর্ব পুরুষকে উদ্দেশ্য করে তর্পণ করা হয়। তার পরের একটা মাস মৃত পূর্ব পুরুষেরা ধরাধামে আসেন। থেকে যান আমাদের সঙ্গে। আনন্দ উৎসব উদযাপনে শামিল হন ক’টা দিন। কালী পূজার অমাবস্যায় তাঁদের ফিরে যাওয়ার পালা। ফিরে যাবেন পরলোকে। কে পথ দেখাবে তাঁদের? তাই আকাশ প্রদীপ জ্বেলে রাখা রাতভর। এই প্রদীপ দেখে আত্মারা বুঝতে পারেন তাঁদের উত্তরসূরীরা এখনও বেঁচে আছে ও তাঁদেরকে স্মরণ করে সন্ধ্যায় জ্বালিয়েছে আকাশ প্রদীপ। এই সংস্কৃতিতে বারবার ফিরে এসেছে অতীতের কাছে ফিরে যাওয়া। অতীত মানে স্মৃতি। ভারতীয় দর্শন সবসময় স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আর সেই শ্রদ্ধা মিশে রয়েছে ওই সাঁঝবেলায় জ্বালিয়ে রাখা আকাশ প্রদীপে।
হিন্দু পুরাণের অন্য একটি মতানুসারে, কার্তিক মাসে ভগবান বিষ্ণু চার মাসের যোগনিদ্রা থেকে জেগে ওঠেন। তাঁকে প্রসন্ন করতে ভক্তরা কার্তিক মাসের প্রথম দিন থেকে সংক্রান্তি পর্যন্ত প্রতিদিন সন্ধেবেলায় মাটির প্রদীপে ঘি বা তেল দিয়ে জ্বালিয়ে রাখেন। বাড়ির সব চেয়ে উঁচু স্থানে উত্তর বা পূর্বদিকে মুখ করে রেখে এই প্রদীপ জ্বালানো হয়। বাঁশের ডগায় ছাদের উপরেও এই প্রদীপ দিতে দেখা যায়। বর্তমান সময়ে প্রদীপের পরিবর্তে বৈদ্যুতিক বাতিও দেন অনেকে। সনাতনীদের বিশ্বাস, ভক্তদের আকাশ প্রদীপ অর্পণে সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান বিষ্ণু তাদের মনস্কামনা পূরণ করেন। সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধিতে ভরে ওঠে ভক্তদের জীবন। আরোগ্য ও আর্শীবাদ প্রদান করেন ভগবান বিষ্ণু।
বৈষ্ণব মতে কার্তিক মাসকে দামোদর মাস বলা হয় এবং এটি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে অত্যন্ত প্রিয় ও পবিত্র মাস হিসেবে বিবেচিত হয়। এই মাসে ভক্তরা ব্রত পালন করেন এবং ভগবান বিষ্ণুর সেবা করেন যা তাদের পূণ্য অর্জন করতে সাহায্য করে। এই মাসে আকাশ প্রদীপ ও দীপ প্রজ্জ্বলন করা হয় যা ভগবান শ্রী হরিকে তুষ্ট করে বলে বিশ্বাস করা হয়। আকাশপ্রদীপ দেওয়ার সময় উচ্চারণ করা হয় মন্ত্র-
‘‘আকাশে সলক্ষ্মীঃ বিষ্ণোস্তোষার্থং দীয়মানে প্রদীপঃ সাক্ষীবৎ।’’
অর্থাৎ আকাশে লক্ষ্মীর সঙ্গে অবস্থান করছেন যে বিষ্ণু, তাঁর উদ্দেশে দেওয়া হল এই প্রদীপ। ভগবান বিষ্ণু পৃথিবীর পালক। জীবের জীবনে তাঁর অধিকার। মৃত্যুর পরে অবিনিশ্বর জীবনেও অধিশ্বর তিনিই।
আগেকার দিনে ঘি, কর্পূর বা তিল তেল দিয়ে মাটির প্রদীপ জ্বালাই নিয়ম ছিল। এই সাধারণ মাটির প্রদীপের মধ্যেও নিহিত রয়েছে গভীর প্রতীকী তাৎপর্য। মাটির তৈরি প্রদীপকে মানবদেহের প্রতীক হিসেবে কল্পনা করা হয়। ভারতীয় দর্শনের পঞ্চভূততত্ত্ব অনুযায়ী, মানবদেহ গঠিত ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম—অর্থাৎ পৃথিবী, জল, আগুন, বায়ু ও আকাশ—এই পাঁচটি মৌল উপাদানে। প্রদীপের মাটির পাত্র যেন দেহের প্রতিরূপ। প্রদীপের আলো যেমন একসময় নিভে যায়, তেমনই একদিন অবসান ঘটে পার্থিব জীবনের। অথচ সেই ক্ষণস্থায়ী জীবনের মধ্য দিয়েই মানুষ চিরন্তনের সন্ধান করে। এই অর্থে, আকাশপ্রদীপের নিবেদন কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়; নশ্বর দেহের প্রতীক প্রদীপ নিবেদন করা হয় জীবন দেবতাকে।
আকাশ প্রদীপ স্থাপনের সময় উচ্চারণ করা হয় —
“নিবেদ্য ধর্মায় হরায় ভূম্যৈ দামোদরায়াপ্যথ ধর্ম্মরাজ,
প্রজাপতিভ্যশ্চ তথা পিতৃভ্যঃ প্রেতেভ্য এবাথ তমঃ স্থিতেভ্যঃ।”
লোকবিশ্বাসে, আকাশপ্রদীপের আলো কেবল লক্ষ্মী-নারায়ণের উদ্দেশে নিবেদিত হয় না। তাঁর সঙ্গে আবাহন করা হয় পিতৃলোক, প্রেতলোকে থিতু হওয়া পূর্বপুরুষেদেরও। যাতে তাঁরা সেই আলোর চিহ্ন দেখে আশীর্বাদ দিতে আসতে পারেন উত্তরসূরীদের।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এখন বাল্ব আর টুনি লাইট স্থান নিয়েছে আকাশ প্রদীপের জায়গায়। চিরাচরিত আকাশ প্রদীপের চল নেই বললেই চলে। গ্ৰামের ছাদেও জ্বলে টুনি বাল্ব। কিন্তু যাদের ছাদ নেই, মাটির ঘরই সম্বল, তাদের উঠোনে তুলসী মঞ্চ আজও উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে সাবেক আকাশ দীপের আলোয়।