
[সংক্ষিপ্তসার — গ্রান্ট এই পর্বে জাফর খানের ব্যক্তিগত সম্পদ বিশ্লেষণ করে প্রাচ্যের রাষ্ট্রনীতির মৌলিক প্রথা তুলে ধরেছেন — রিভার্সনারি রাইট reversionary right, অর্থাৎ রাষ্ট্রের সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার সম্পত্তিতে রাজকীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠা। তিনি দেখান — জাফর খান [মুর্শিদকুলি খান] পদের নিম্নস্তরে থাকলে, জীবনের শেষে যে সম্পদ অর্জন করেছেন, ততটা সম্পদ অর্জন করতে পারতেন না; তাঁর প্রকৃত সম্পদ এসেছিল গোপন আদায়ের মাধ্যমে — বার্ষিক প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা। ১৫ বছরে তা দাঁড়ায় ১ কোটি ৯৫ লক্ষ; তবে খাসনভিসি ও অন্য খাতের বার্ষিক ২ লক্ষ বাদ দিলে প্রকৃত অতিরিক্ত আয় ছিল বার্ষিক ১৩ লক্ষ। জাফর খানের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারী সম্রাটের কোষাগারে জমা দেন ৬১ লক্ষের কিছু কম — যা থেকে ঋণ পরিশোধে ১৪ লক্ষেরও বেশি বাদ যায়। গ্রান্টের মতে — সুজা খানের শ্বশুর-সংক্রান্ত সম্পত্তির হিসাব থেকে তাঁর হাতে থাকা নগদ ও রত্নালঙ্কার মিলিয়ে এক কোটি সত্তর লক্ষ সম্পদ অবশিষ্ট ছিল; একইভাবে পুত্র সরফরাজ খানের সুবাদারি আরোহণের সময়ও সমপরিমাণ সম্পদের হিসাব ধরা যায়। গ্রান্ট দেখান — প্রাচ্যের শাসকদের জন্য শান্তির সময়ে সঞ্চয় অপরিহার্য; যে শাসক শান্তির দশ বছরে যুদ্ধের ব্যয় নির্বাহের তহবিল গড়তে পারেন না, তিনি অদূরদর্শী। তিনি বলেন — ২৫ বছরে বাংলা থেকে দিল্লিতে প্রেরিত অর্থের পরিমান থেকে বোঝা যায়, বাংলার বাণিজ্য-ভারসাম্য থেকে প্রতি বছর এক মিলিয়ন স্টার্লিং পাউন্ড উদ্বৃত্ত আয় প্রয়োজন ছিল। সবশেষে তিনি সুজা খানের মৃত্যু-স্মরণে ব্যবহৃত ফারসি বাক্যাংশ “রৌনেশ আজ বেঙ্গলেহ রফত” (বাংলা থেকে জৌলুস হারিয়ে গেল) উল্লেখ করেন — যার অক্ষরমূল্য হিজরি ১১৫২।]
পূর্ববর্তী বিবরণগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় — যা থেকে আমরা আমাদের আলোচ্য বিষয়ের প্রেক্ষিতে একটা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাই — তা হলো রাজকোষে জমা হওয়া জাফর খানের সম্পত্তির একাংশ। এটা প্রাচ্যের রাষ্ট্রনীতির সেই সর্বজনীন প্রথার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, যেখানে বলা হয় রাষ্ট্রের সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তির মৃত্যুর পর সম্পত্তির ওপর রাজকীয় মালিকানা বা রিভার্সনারি রাইট reversionary right প্রতিষ্ঠিত হতো। এখানে আমরা এই ধরণের স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার নীতিমালার ওপর বিস্তারিত আলোচনা করব; এই ব্যবস্থা মূলত দুর্নীতিপরায়ণ প্রতিনিধিদের সৃষ্ট ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে প্রবর্তিত হয়েছিল — দুর্নীতি হয়তো যেকোনো শাসনব্যবস্থারই অবিচ্ছেদ্য অংশ, বিশেষ করে যে শাসনব্যবস্থা জনস্বার্থ বা নাগরিক সততা বোধে প্রতিষ্ঠিত নয়। তবে আমাদের উদ্দেশ্যের জন্য এটুকু উল্লেখ করাই যথেষ্ট, রাজপ্রতিনিধিকে delegate সব ধরনের আর্থিক আদায়ের যে পরোক্ষ ক্ষমতা দেওয়া হতো, তার সুফল শেষ পর্যন্ত শাসকের (শাহজাদার) ভাণ্ডারেই জমা হতো; এবং আলোচ্য ক্ষেত্রে, সুবাদার (ভাইসরয়) তাঁর শাসনকালে বিপুল ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ে তুলতেন। পদের নিম্নস্তরে থেকে এই পরিমাণ সম্পদ — এমনকি এর সামান্য অংশও — সঞ্চয় সম্ভব ছিল না। এশিয়ায় পদোন্নতির সাধারণ পথ হলো ঘুষ প্রদান; আর এর প্রাথমিক পর্যায়ে প্রচুর অর্থব্যয় করতে হত, যদিও শেষ পর্যন্ত তা থেকে পাওয়া আয় বা প্রতিদান বিশাল হত। ওড়িশা বা বিহারের রাজস্ব থেকে পাওয়া আনুষঙ্গিক আয়ের মাধ্যমেও এই সম্পদ অর্জিত হওয়া সম্ভব ছিল না। কারণ, বাংলার সীমান্ত অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত এই প্রদেশ দুটো — সাম্রাজ্যের অস্থিতিশীলতার সময় যখন নবাব বা প্রতিনিধিরা সার্বভৌম স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখছিলেন — তখন প্রায় সম্পূর্ণভাবেই সামরিক জায়গির বা সামন্ততান্ত্রিক ভূসম্পত্তি হিসেবে নিকটাত্মীয় বা বিশ্বস্ত অনুচরদের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছিল; যা ছিল মূলত বিদ্রোহী মনোভাবাপন্ন প্রধানের প্রতি ব্যক্তিগত আনুগত্যের আগাম পুরস্কার। এমনকি জাগির-ই-আলি (Ali-র জায়গির) থেকে পাওয়া আয়ের উদ্বৃত্ত বা সঞ্চয় থেকেও এর উল্লেখযোগ্য কোনো অংশ গড়ে ওঠা সম্ভব ছিল না। কারণ, সেই আয় বিশাল হলেও তা কেবল নাজিমের বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনের ব্যয়ভার বহনের জন্যই যথেষ্ট ছিল; আর সেই তহবিলটি আপাতদৃষ্টিতে ক্রমবর্ধমান মনে হলেও — দেশের কৃত্রিম বা নামমাত্র কর বৃদ্ধির মতোই — তা কেবল নগদ অর্থের প্রবাহের অনুপাতে সংখ্যাগতভাবেই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। সংক্ষেপে বলতে গেলে, যেহেতু বাংলার সাধারণ ও নির্ধারিত রাজস্বের চেয়েও বেশি পরিমাণ অর্থ বিশ্বস্ততা ও নিয়মিতভাবে রাজকোষে জমা দেওয়া হতো, তাই সর্বোচ্চ সরকারি দায়িত্বে নিয়োজিত ওই কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সম্পদ কেবল আমাদের উল্লিখিত সেই অসাধারণ ও গোপন আদায়ের মাধ্যমেই অর্জিত হওয়া সম্ভব ছিল। আমরা এই অর্থের পরিমাণ আনুমানিক ১৫ লক্ষ হিসেবে নির্ধারণ করেছি; হিসাব অনুযায়ী ১৫ বছরে এর মোট পরিমাণ দাঁড়াত ১ কোটি ৯৫ লক্ষ — অবশ্য এক্ষেত্রে খাস-নভিসি ও অন্য খাত থেকে পাওয়া উদ্বৃত্ত হিসেবে বার্ষিক ২ লক্ষ টাকা বাদ দিতে হবে, যা কেবল ওই নির্দিষ্ট কর বা শুল্ক থেকে পাওয়া আয়ের অতিরিক্ত। অথচ জাফর খানের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারী সম্রাটের কোষাগারে ৬১ লক্ষের কিছু কম জমা দেন; আর যদি ধরে নেওয়া হয় যে এটাই ছিল তাঁর সমস্ত সম্পত্তি, তবুও ঋণ পরিশোধের জন্য তা থেকে ১৪ লক্ষেরও বেশি অর্থ বাদ দিতে হয়। তবে হিন্দুস্তানে, সরকারি পদে আসীন ব্যক্তির ব্যক্তিগত বা স্থাবর সম্পত্তি (যদি আদৌ তেমন কিছু থাকে) আইনত শাসকের অধিকারে চলে গেলেও, রাজনৈতিক উদারতার বশবর্তী হয়ে বা অনুগ্রহস্বরূপ শাসক সাধারণত সেই সম্পত্তির বড় অংশটিই প্রকৃত উত্তরাধিকারীদের হাতে ছেড়ে দেন। কারণ, হারেম বা অন্তঃপুরের পবিত্র অধিকার ক্ষুণ্ণ না করে ওই সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা সম্ভব নয়; আর সম্ভবত সেই হারেমের প্রাচীরের আড়ালেই — কোনো প্রিয় বেগম বা তাঁর খোজা পরিচারকের অগোচরে — সেই সঞ্চিত সম্পদ গচ্ছিত রাখা হতো, যাতে উচ্চাকাঙ্ক্ষার বশবর্তী হয়ে ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণের পথে তা সহায়ক হতে পারে, কিংবা প্রাচ্যের মানুষের জীবনে অবশ্যম্ভাবী ভাগ্যবিপর্যয়ের সময় তা কাজে লাগানো যায়। সুতরাং, সামগ্রিক সম্পদের একটা অংশ সবসময়ই স্বৈরতান্ত্রিক গ্রাস থেকে রক্ষা পেয়ে মুক্ত সমাজের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী ব্যক্তিগত উত্তরাধিকারীদের হাতে পৌঁছায় বলে মোটামুটিভাবে ধরে নেওয়া যেতে পারে। যেহেতু সার্বভৌম শাসকের প্রাপ্য অংশ আদায়ের ক্ষেত্রে সর্বদা এক বা একাধিক মধ্যস্বত্বভোগী বা প্রতিনিধির প্রয়োজন হয় — যাদের নীতি-নৈতিকতা জনকল্যাণমূলক আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা থাকে ঠিক সেই অনুপাতে, যে হারে শাসনব্যবস্থা প্রজাতন্ত্রের আদর্শ থেকে সরে আসে — তাই আমরা নিজেদের সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ যৌক্তিক বলে মনে করি। একদা মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলগুলোতে প্রচলিত প্রায় সর্বজনীন নিয়মের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই আমরা অর্থের অঙ্কে নিরূপিত যেকোনো সম্পত্তির ক্ষেত্রে শাসকের প্রাপ্য অংশকে মূল প্রাপ্তি বা সম্পদের এক-চতুর্থাংশে নামিয়ে এনেছি। সুজা খানের শ্বশুর-সংক্রান্ত সম্পত্তির বিষয়ে খালসা শরিফার (রাজকোষের) সাথে তাঁর হিসাবের তথ্যের ভিত্তিতে এই হিসাব করা হয়েছে; এর ফলে তাঁর আইনানুগ উত্তরাধিকারী, সম্পত্তি ব্যবস্থাপক এবং পদাধিকারবলে উত্তরসূরির হাতে নগদ অর্থ বা রত্নালঙ্কার মিলিয়ে এক কোটি সত্তর লক্ষের এক বিশাল সম্পদ অবশিষ্ট ছিল। একইভাবে, আনুষঙ্গিক হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে আমরা তাঁর পুত্র সরফরাজ খানের সুবাদারির পদে আরোহণের সময় তাঁর জন্য সমপরিমাণ অতিরিক্ত উত্তরাধিকার বা সম্পদের হিসাব ধরতে পারি; অথচ ব্যক্তিগত সম্পদের এই পুঞ্জীভূত ভাণ্ডার — একজন প্রাদেশিক প্রতিনিধির আত্মসাৎকরা অর্থ হিসেবে যতই বিশাল মনে হোক না কেন — স্বাধীনতার সুপ্রতিষ্ঠিত অবস্থায় সেই একই দেশের সাধারণ ও আকস্মিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য ছিল নিতান্তই অপর্যাপ্ত। অস্থিতিশীল ও অবৈধ ক্ষমতার দখল ধরে রাখার অতিরিক্ত ব্যয়ভার বহনের কথা তো বলাই বাহুল্য — যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তিদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার আক্রমণ এবং বৈধ শাসকের সংগ্রামের ফলে সৃষ্ট আঘাতের আশঙ্কা সর্বদা বিদ্যমান থাকে। যে প্রাচ্যদেশীয় শাসক — স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নতুন করে সাধারণ অর্থপ্রবাহে ফিরে এলে শান্তির দশ বছরে এমন কোনো তহবিল গড়ে তোলেন না যা — সম-সময়ের কোনো যুদ্ধের অস্বাভাবিক ব্যয় নির্বাহে সক্ষম হবে, তিনি নিঃসন্দেহে অদূরদর্শী রাজনীতিবিদ। তিনি যদি নিজের বিশেষ পরিস্থিতি বা প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর অবস্থার ওপর নির্ভর করে যুগ-যুগান্তরের অভিজ্ঞতালব্ধ এই হিতকর নীতি উপেক্ষা করেন, তবে তাঁর শাসনক্ষমতা অত্যন্ত অনিশ্চিত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সমগ্র হিন্দুস্তানের ক্ষেত্রেও এই পর্যবেক্ষণটি প্রযোজ্য যে, শান্তির সময়ে যে ভূখণ্ড তার বার্ষিক আয়ের অন্তত এক-পঞ্চমাংশ সাশ্রয় করার সুযোগ দেয় না, তা অধিকার করে রাখার মতো বিশেষ কোনো মূল্য রাখে না।
পূর্ববর্তী নথিপত্র থেকে যে পরোক্ষ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তটি উঠে আসে, আমরা এখানে তার কেবল ইঙ্গিত দেব, বিস্তারিত আলোচনা করব না — যদিও বিষয়টি স্বভাবতই মনোযোগ আকর্ষণ করে। করদ-নির্ভরতার মাত্র ২৫ বছরের ধারাবাহিকতায় বাংলা সুবা থেকে দিল্লিতে প্রেরিত অর্থের পরিমানের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, এর জন্য স্বাভাবিকভাবেই বাংলার নিজস্ব বাণিজ্য-ভারসাম্য থেকে প্রতি বছর নগদ এক মিলিয়ন স্টার্লিং পাউন্ডের উদ্বৃত্ত আয় হওয়া আবশ্যক ছিল। সারকার (Circars) অঞ্চল নিয়ে আমাদের রাজনৈতিক সমীক্ষায়, অর্থের ক্ষেত্রে পূর্বের ভারসাম্য বজায় রাখার লক্ষ্যে ভূমির ওপর কর বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে, সমগ্র হিন্দুস্তানের বাণিজ্যের বার্ষিক মুনাফা বাবদ অর্থের এই সম্ভাব্য প্রবাহের হিসাব দেখানো হয়েছিল। তবে মনে রাখতে হবে যে, সেই হিসাব ছিল দুই শতাব্দীর গড় আয়ের অনুমান ভিত্তি। বিজয়পুরের বিশাল মুসলিম সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপের ওপর মালাবার উপকূলে বর্বর মারাঠা অভিজাততন্ত্রের উত্থানের পরই কেবল কোনো প্রদেশের উৎপাদিত পণ্য বা শিল্পজাত সামগ্রীর রপ্তানি এত বিপুলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, তা মুঘল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিদেশ থেকে আসা বিপুল পরিমাণ সম্পদের প্রবাহকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে নিজের দিকে টেনে নিয়েছিল। তবুও, দেশপ্রেমিক বা প্রকৃত জাতীয় সমৃদ্ধির হিতাকাঙ্ক্ষী মানুষের দৃষ্টিতে বাংলার সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী যুগটি তখনও আসাই বাকি ছিল — সেই যুগ, যখন এর নিজস্ব সম্পদের ভাণ্ডার এর সীমানার ভেতরেই আবর্তিত হতো। অথচ আমাদের আলোচ্য সময়ে ও পরিস্থিতিতে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখা হতো — এমনকি দাসত্বে অভ্যস্ত এবং স্বৈরাচারী সাম্রাজ্যের শৃঙ্খলা, সরলতা ও মহিমাকে শ্রদ্ধা করতে বা অধীনতাকে গৌরবের বিষয় বলে মনে করতে শেখা জাতির সবচেয়ে কর্মচঞ্চল ও অস্থিরচিত্ত মানুষেরাও একে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখত। এর প্রমাণ মেলে সুজা খানের প্রশাসনের অধীনতা-কালকে স্মরণ করার পদ্ধতিতে; প্রাচ্যের রীতি অনুযায়ী কোনো মহান ব্যক্তির মৃত্যু ও তাঁর জীবনের কোনো বিশেষ ঘটনাকে একটা গাণিতিক অর্থবহ বাক্যাংশের মাধ্যমে স্মরণ করা হতো। সুজা খানের প্রস্থান বা মৃত্যুর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছিল রৌনেশ আজ বেঙ্গলেহ রফত (Rounech az Bengaleh ruft) — যার অর্থ বাংলা থেকে দীপ্তি বা জৌলুস হারিয়ে গেল; ফারসি বর্ণমালার অক্ষরগুলোর মান যোগ করলে হিজরি ১১৫২ সাল পাওয়া যায়, যা ছিল তাঁর মৃত্যুর বছর।
টীকা ১
১. রিভার্সনারি রাইট (Reversionary Right) — প্রাচ্যের রাষ্ট্রনীতির নীতি — যেখানে সরকারি কর্মকর্তার মৃত্যুর পর তাঁর সম্পত্তির ওপর রাজকীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হতো।
২. খাসনভিসি (Khasnoveessy) — জমিদারদের বার্ষিক ইজারা নবায়নের সময় আদায়কৃত রসুম — একমাত্র স্বীকৃত স্থায়ী অতিরিক্ত কর।
৩. জাগির-ই-আলি — সুবাদারের বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনের ব্যয় নির্বাহের জন্য বরাদ্দকৃত জায়গির।
৪. হারেম-অন্তঃপুর — যেখানে সম্পদ গচ্ছিত রাখা হতো; এর পবিত্রতার কারণে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা কঠিন ছিল।
৫. সরফরাজ খান-সুজা-উদ-দৌলার পুত্র — যিনি ১৭৩৯ সালে আলিবর্দি খানের হাতে পরাজিত ও নিহত হন।
৬. দশমিক অর্থবোধক বাক্যাংশ-প্রাচ্যের রীতি — কোনো মহান ব্যক্তির মৃত্যুকে ফারসি বাক্যাংশের অক্ষরমূল্যের মাধ্যমে স্মরণ করা হতো।
৭. রৌনেশ আজ বেঙ্গলেহ রফত-ফারসি বাক্যাংশ — অর্থ “বাংলা থেকে দীপ্তি বা জৌলুস হারিয়ে গেল”; অক্ষরমূল্য হিজরি ১১৫২ (সুজা খানের মৃত্যু বছর)।
৮. মিলিয়ন স্টার্লিং পাউন্ড — ২৫ বছরে বাংলা থেকে দিল্লিতে প্রেরিত অর্থের বার্ষিক গড় — যা বাংলার বাণিজ্য-ভারসাম্য থেকে উদ্বৃত্ত আয় প্রয়োজন ছিল।
৯. মারাঠা অভিজাততন্ত্র — বিজয়পুরের মুসলিম সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপের ওপর মালাবার উপকূলে মারাঠাদের উত্থান — যা ভারতের বাণিজ্য ভারসাম্য পরিবর্তন করে।
১০. করদ-নির্ভরতা — সুবাদারদের দ্বারা দিল্লিতে রাজস্ব প্রেরণের ২৫ বছরের ধারাবাহিকতা।
১১. নাজিম — সুবাদার বা প্রাদেশিক শাসনকর্তা।
১২. জায়গিরদার — সামরিক বা প্রশাসনিক কর্মকর্তা — যিনি বেতনের বিনিময়ে জমি ভোগ করতেন।
১৩. রত্নালঙ্কার-মূল্যবান রত্ন ও অলঙ্কার — যা সম্পদের অংশ হিসেবে গণ্য হতো।
১৪. সামন্ততান্ত্রিক ভূসম্পত্তি-সামরিক জায়গির — যা নিকটাত্মীয় বা বিশ্বস্ত অনুচরদের হাতে ন্যস্ত করা হতো।
১৫. ঘুষ প্রদান-এশিয়ায় পদোন্নতির সাধারণ পথ — যেখানে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হতো।
টিকা ২
গ্রান্টের এই বিশ্লেষণ বাংলার রাজস্ব ইতিহাসের একটি গভীর স্তর উন্মোচন করে —
১. রিভার্সনারি রাইট — তাঁর মতে প্রাচ্যের স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার একটি মৌলিক নীতি — যেখানে সরকারি কর্মকর্তার মৃত্যুর পর তাঁর সম্পত্তি রাজকোষে যেত। কিন্তু বাস্তবে সম্পত্তির একটি বড় অংশ উত্তরাধিকারীদের হাতে থেকে যেত — কারণ হারেমের পবিত্রতা ও রাজনৈতিক উদারতা।
২. জাফর খানের সম্পদ — গ্রান্টের হিসাব অনুযায়ী — তাঁর প্রকৃত সম্পদ ছিল এক কোটি সত্তর লক্ষ; যার সিংহভাগ অর্জিত হয়েছিল গোপন আদায়ের মাধ্যমে। অথচ মৃত্যুর পর সম্রাটের কোষাগারে জমা পড়ে মাত্র ৬১ লক্ষের কিছু কম।
৩. সুজা ও সরফরাজ — সুজা-উদ-দৌলার হাতে নগদ ও রত্নালঙ্কার মিলিয়ে এক কোটি সত্তর লক্ষ সম্পদ ছিল; তাঁর পুত্র সরফরাজ খানের সময়ও সমপরিমাণ সম্পদের হিসাব ধরা যায়।
৪. শান্তির সময়ে সঞ্চয় — গ্রান্টের মতে — শান্তির সময়ে যে শাসক বার্ষিক আয়ের অন্তত এক-পঞ্চমাংশ সঞ্চয় করতে পারেন না, তাঁর শাসনক্ষমতা অনিশ্চিত। কারণ যুদ্ধের অস্বাভাবিক ব্যয় নির্বাহের জন্য এই সঞ্চয় অপরিহার্য।
৫. বাংলার বাণিজ্য-ভারসাম্য — ২৫ বছরে বাংলা থেকে দিল্লিতে প্রেরিত অর্থের সমষ্টি দেখে বোঝা যায় — বাংলার বাণিজ্য-ভারসাম্য থেকে প্রতি বছর এক মিলিয়ন স্টার্লিং পাউন্ড উদ্বৃত্ত আয় প্রয়োজন ছিল। এটি প্রমাণ করে বাংলা ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড।
৬. সুজা খানের মৃত্যু-স্মরণ — প্রাচ্যের রীতি অনুযায়ী সুজা খানের মৃত্যুকে স্মরণ করা হয় ফারসি বাক্যাংশ “রৌনেশ আজ বেঙ্গলেহ রফত” দিয়ে — যার অক্ষরমূল্য হিজরি ১১৫২। এটি প্রমাণ করে মুঘল আমলে ইতিহাস স্মরণের একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি বিদ্যমান ছিল।
৭. দেওয়ানি লাভ ও আত্মসাৎ — ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের সময় দেশীয় প্রশাসন এই প্রকৃত হিসাব গোপন করে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে রাজস্বের পরিমাণ কমিয়ে দেখায়। এই বিকৃতির মাধ্যমেই বছরে প্রায় ৬০ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছিল। গ্রান্টের এই অংশটি জাফর খান ও সুজা-উদ-দৌলার ব্যক্তিগত সম্পদ, মুঘল রাষ্ট্রনীতির রিভার্সনারি রাইট, এবং বাংলার বাণিজ্য-ভারসাম্যের একটি গভীর বিশ্লেষণ। তিনি দেখান — সরকারি কর্মকর্তারা গোপন আদায়ের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জন করতেন; কিন্তু মৃত্যুর পর সেই সম্পদের একটি বড় অংশ রাজকোষে যেত। গ্রান্টের মূল বক্তব্য হলো — আবওয়াবের পরিমাণ বা অনিয়ম নয়; বরং জমিদারদের অতিরিক্ত আদায় ও গোপন সম্পদ অর্জন — এই দুটোই ছিল জনগণের অসন্তোষের মূল কারণ। এই বিশ্লেষণই পরবর্তীতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও রাজস্ব সংস্কারের ভিত্তি তৈরি করে।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ