
টিকা-২
গ্রান্টের এই বিশ্লেষণ সংক্ষেপে আবার উল্লেখ করা গেল —
১. কাসিম আলীর কর ব্যবস্থার হওয়া ভিত্তি ছিল আকবরের হস্তবুদ ও তুমার জমা প্রথার অনুসরণ। কিন্তু কাসিম আলী সেই ব্যবস্থার মূল চেতনা বজায় রাখতে পারেননি।
২. গ্রান্টের মতে কাসিম আলী আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রাথমিক জ্ঞানটুকুও রাখতেন না; তবে তাঁর সাধারণ বুদ্ধিমত্তার অভাব ছিল না।
৩. গ্রান্ট বলছেন মুসলমান শাসকদের ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা, আলস্য, স্বভাবজাত দুর্নীতি ও ব্যাপক অজ্ঞতা — এসবই তাঁদের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণ।
৪. গ্রান্ট উল্লেখ করেছেন — আমেরিকার সোনা-রূপোর প্রবাহে মুদ্রার মান কমছিল, তাই রাজস্ব বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই বৃদ্ধি ন্যায্যভাবে বণ্টিত হয়নি। গ্রান্টের মতে — কাসিম আলীর নামে প্রবর্তিত অতিরিক্ত করের কৃতিত্ব তাঁর আর্থিক দক্ষতা বা নিঃস্বার্থপরতাকে দেওয়া যায় না; বরং তা ছিল পরিস্থিতির চাপে গৃহীত পদক্ষেপ।
৫. কেফায়েত হস্তবুদ নামক আবওয়াব মূলত বীরভূম ও দিনাজপুরে সীমাবদ্ধ ছিল। এটি রাজস্বের প্রাচীন ও বর্তমান উৎসের তদন্তের মাধ্যমে পাওয়া অতিরিক্ত আয় — যা হস্তবুদ জরিপের ফল।
৬. ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের সময় দেশীয় প্রশাসন এই প্রকৃত হিসাব গোপন করে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে রাজস্বের পরিমাণ কমিয়ে দেখায়। কাসিম আলীর আমলেই আবওয়াব স্থায়ী রূপ পায় — যা পরবর্তীতে জমিদারদের অতিরিক্ত আদায় ও কৃষক শোষণের মূল উৎস হয়ে ওঠে।
টিকা-২
ফিরে দেখা — “মীর কাসিম এবং তাঁর পূর্ববর্তী অধিকাংশ মুসলমান শাসকই আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রাথমিক জ্ঞানটুকুও রাখতেন না”
“মীর কাসিম এবং তাঁর পূর্ববর্তী অধিকাংশ মুসলমান শাসকই আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রাথমিক জ্ঞানটুকুও রাখতেন না বলে মনে হয়; এমনকি স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে রাজস্ব তদারককারীদের মধ্যে যে ধরনের আপেক্ষিক সততা বা ন্যায়পরায়ণতার দাবি দেখা যায়, তাঁদের ক্ষেত্রে তার কোনো আভাসও পাওয়া যায়নি। তবে এর অর্থ এই নয় যে, ভারতীয় প্রশাসনের অত্যন্ত সরল, সহজ অথচ গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সাধারণ বুদ্ধিমত্তা বা স্বাভাবিক প্রতিভার তাঁদের অভাব ছিল। বরং, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চায় অগ্রসর ও আলোকিত বিশ্বের বাসিন্দা হিসেবে শিক্ষা ও বিবেচনার যে উন্নত সুযোগ বর্তমান যুগের মানুষের রয়েছে, তার তুলনায় মীর কাসিম বা তাঁর পূর্বসূরিদের রাজনৈতিক বিচক্ষণতার অভাবের জন্য বিশেষভাবে দোষারোপ করাটা হয়তো খুব ন্যায়সংগত হবে না। মুঘল সাম্রাজ্যের সেই ন্যায়ভিত্তিক ও সুষম শাসনব্যবস্থার মূল চেতনা ও উৎকর্ষ অনুধাবন করে তা বজায় রাখার পরিবর্তে তাঁরা সেগুলোকে অনেকাংশে অকার্যকর হতে দিয়েছেন”; — জেমস গ্রান্ট, রাজস্ব প্রতিবেদন
গ্রান্টের মুঘল পূর্ব সময়ের ঐতিহাসিক বাস্তবতা
অমিয় কুমার বাগচীর ভাষায় স্টাকচারাল এডজাস্টমেন্টের প্রতিভূ কর্পোরেট বডি নির্মাণ করে প্রথমে আমেরিকায় পরে বাংলায় বিশ্বের প্রথম এম্পায়ার ফর প্রফিট, প্রফিট ফর এম্পায়ার তৈরি করা পশ্চিম ইওরোপিয় লুঠ গণহত্যাকারী সম্রাজ্যর অন্যতম প্রতিভূ গ্রান্ট [এবং স্বয়ং সম্পাদক ফার্মিঙ্গার, হেস্টিংস, ফিলিপ ফ্রান্সিস, শোর এবং উপনিবেশ শুরুর আমল এবং তার পরের আরও প্রভূত সাম্রাজ্য তাত্ত্বিক এবং তাদের অনুগামী নবজাগরণী এবং গোটা ফিফথ রিপোর্ট জুড়ে] যখন ওপরে উল্লিখিত উক্তি করেন — তখন আমরা পাঠকদের মনে করিয়ে দিতে চাই তৎকালীন বিশ্ববাস্তনতা। আমরা তিন অর্থনীতিবিদের কাজ দেখব, এঙ্গাস ম্যাডিসন, অমিয় কুমার বাগচী আর উৎসা পট্টনায়েক। যদিও আমরা অমিয় বাগচীসূত্রে মনে করি এঙ্গাস ম্যাডিসন কাজ নিয়ে প্রশ্ন আছে এবং তার কাজ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্বয়ং অমিয় কুমার বাগচী – কিন্তু এঙ্গাস যেহেতু প্রথম দিককার উপনিবেশের প্রভাব কোয়ান্টিফাই করে বোঝার তাত্ত্বিক এবং তার তৈরি হিসেব খুবই পপুলার, তাই তাঁকে দিয়ে কাজটা শুরু করা গেল।
খণ্ডনপর্ব শুরু করি অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ অ্যাঙ্গাস ম্যাডিসন-এর গবেষণা সূত্রে — ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে, যখন ভারতের বড় অংশ মুঘল শাসনের অধীনে, ভারতের জিডিপি ছিল বিশ্বের মোট উৎপাদনের ২৪.৪ শতাংশ — যা সমগ্র ইওরোপের (২৩.৩ শতাংশ) চেয়েও বেশি। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের জিডিপি ছিল বিশ্বের মোট উৎপাদনের মাত্র ২.৮৮ শতাংশ। ম্যাডিসনের হিসাব অনুযায়ী — যে ১৭০০-র দশকে সম্রাট আওরঙ্গজেব প্রয়াত হবেন দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিকে চিনের অর্থনীতির আগে স্থাপিত করে, সেই দশকে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি ছিল ৫৫০ ডলার (১৯৯০ সালের আন্তর্জাতিক গোরি খামিস ডলারে) এবং মোট জিডিপি ছিল ৯০,৭৫০,০০০,০০০ ডলার । আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো — প্রথম শতাব্দী থেকে ১৫০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারত ছিল বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি — যার জিডিপি বিশ্বের মোট উৎপাদনের ২২ থেকে ৩৩ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করত। ম্যাডিসন বলছেন — ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে ভারত ও চীন প্রত্যেকে বিশ্ব জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশ নিয়ে গঠিত ছিল, কিন্তু ১৯৫০ সালের মধ্যে তাদের অংশ ৫ শতাংশের নিচে নেমে আসে । তাহলে প্রশ্ন হলো — যে সভ্যতা বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ সম্পদ উৎপাদন করছিল, সেই সভ্যতার শাসকদের “আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রাথমিক জ্ঞানটুকুও নেই” বলে অভিহিত করা কতটা যুক্তিসঙ্গত?
এবারে অমিয় কুমার বাগচীর (১৯৩৬–২০২৪) কাজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি ছিলেন ভারতের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ। তিনি উপনিবেশিক শাসনের অধীনে ভারতের দীর্ঘমেয়াদী অবশিল্পায়ন (deindustrialization) ও সম্পদ লুঠের (drain of wealth) প্রকৃতি নিয়ে মৌলিক গবেষণা করে বলেছেন উপনিবেশি স্ট্রাকচারাল এডজাস্টমেন্ট। তাঁর গবেষণা অনুযায়ী — ১৮৭০ থেকে ১৯১৩-১৪-র মধ্যে ব্রিটিশ উপনিবেশিকরা দক্ষিণ এশিয়া থেকে যে উদ্বৃত্ত সম্পদ লুঠ করেছে, তার পরিমাণ ছিল ৩.২ থেকে ৩.৮ বিলিয়ন পাউন্ড — যা সেই সময়ে ব্রিটিশদের বিশ্বব্যাপী মোট বিদেশি বিনিয়োগের ৭৫ থেকে ৯৫ শতাংশ ছিল। অমিয় বাগচীর ভাষায় — এই বিদেশি বিনিয়োগ ছিল ইওরোপীয় অভিবাসনকে অর্থায়ন এবং বিশেষত ইংরেজিভাষী বিদেশি বসতি — যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড — এর সমৃদ্ধি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একেবারে অপরিহার্য । অর্থাৎ — ব্রিটিশ শিল্পবিপ্লব ও সাম্রাজ্য বিস্তারের যে অর্থনৈতিক ভিত্তি, তার বড় অংশ এসেছিল দক্ষিণ এশিয়ার লুঠ হওয়া সম্পদ থেকে। Merchants and Colonialism- Freedom, Resistance, and Statelessness in Upland Northeast India অকেশনাল পেপারে অমিয় কুমার বাগচী দেখান — উপনিবেশিক শাসন কীভাবে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও উৎপাদকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাদের ঐতিহ্যবাহী উৎপাদন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয় — যার দীর্ঘমেয়াদী পরিণতি ছিল ভারতের অবশিল্পায়ন।
গ্রান্ট যখন মুঘল শাসকদের “আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রাথমিক জ্ঞানটুকুও নেই” বলে অভিযুক্ত করছেন, তখন উৎসা পট্টনায়েকের গবেষণা সেই অভিযোগের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র উপস্থাপন করে। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির প্রফেসর এমেরিটা পট্টনায়েক তার “Revisiting the ‘Drain’“ (২০১৯) প্রবন্ধে দেখান — ১৭৬৫ থেকে ১৯৩৮ সালের মধ্যে ব্রিটেন ভারত থেকে প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার (বর্তমান মূল্যে) নিষ্কাশন করেছে । পট্টনায়েকের হিসাব অনুযায়ী — ভারতের রপ্তানি উদ্বৃত্ত থেকে পাওয়া এই বিপুল অর্থ ভারতকে কখনোই ফেরত দেওয়া হয়নি। বরং ব্রিটিশরা ভারতীয় করদাতাদের টাকা দিয়ে ভারতীয় পণ্য কিনত — একটি “অস্বাভাবিক budgetary practice” যা কোনো সার্বভৌম দেশে দেখা যায় না। তার ভাষায় — “ব্রিটেন স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত রুপি কর রাজস্ব ব্যবহার করত তার নিজস্ব নিট পণ্য আমদানির মূল্য পরিশোধ করতে — একটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক budgetary ব্যবহার, যা কোনো সার্বভৌম দেশে দেখা যায় না।” পট্টনায়েক দেখান — ১৭৮০ থেকে ১৮২০ সালের ব্রিটেনের শিল্পায়নের সময়কালে এশিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে নিষ্কাশনের পরিমাণ ছিল ব্রিটেনের জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশ — যা ব্রিটেনের নিজস্ব সঞ্চয়ের হারের প্রায় সমান। অর্থাৎ — ব্রিটেনের শিল্পবিপ্লবের একটি বড় অংশের অর্থায়ন এসেছিল ভারতের সম্পদ থেকে।
গ্রান্টের এই ধরনের মন্তব্য আসলে উপনিবেশিক জ্ঞানচর্চার একটি ক্লাসিক উদাহরণ। এডওয়ার্ড সাঈদের “Orientalism” বা বার্নার্ড কোহনের “Colonialism and Its Forms of Knowledge” গ্রন্থে দেখানো হয়েছে — কীভাবে ব্রিটিশ উপনিবেশিক প্রশাসকরা স্থানীয় শাসকদের “অদক্ষ”, “অলস”, “দুর্নীতিপরায়ণ” ও “অজ্ঞ” বলে চিত্রিত করতেন — যাতে উপনিবেশিক শাসনকে বৈধতা দেওয়া যায় এবং স্থানীয় শাসনব্যবস্থার প্রকৃত কৃতিত্বকে মুছে ফেলা যায়। গ্রান্টের মিনিটও সেই ঐতিহ্যেরই অংশ — যেখানে তিনি মুঘল শাসকদের আর্থিক অদক্ষতার গল্প তৈরি করে ব্রিটিশদের রাজস্ব সংস্কারকে “উন্নয়ন” হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্য সাক্ষ্য দেয় — গ্রান্ট যখন এই গল্প লিখছেন, তখন ইংল্যান্ডের জিডিপি বিশ্বের মাত্র ২-৩ শতাংশ, আর ভারতের জিডিপি ছিল বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ । গ্রান্টের মিনিট পড়ার সময় এই মিথ্যে প্রেক্ষাপটটি মনে রাখা অত্যন্ত জরুরি — কারণ তাঁর বর্ণনা কেবল নিরপেক্ষ ইতিহাস নয়; বরং উপনিবেশিক শক্তির স্বার্থরক্ষার একটি হাতিয়ারও।
২০২৫-এর ২০ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সভায় প্রকাশিত অক্সফামের রিপোর্ট Takers, Not Makers- The Unjust Poverty and Unearned Wealth of Colonialism বলছে ১৭৫০ সালে ভারতের শিল্প উৎপাদন ছিল বিশ্বের প্রায় ২৫ শতাংশ, কিন্তু ১৯০০ সালে তা নেমে আসে মাত্র ২ শতাংশে । এই পতনের মূল কারণ ছিল ব্রিটেনের এশীয় বস্ত্রের বিরুদ্ধে কঠোর সুরক্ষাবাদী নীতি, যা ভারতের শিল্পায়ন সম্ভাবনাকে পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করে দেয় – In 1750, the Indian subcontinent accounted for approximately 25 per cent of global industrial output. However, by 1900 this figure had precipitously declined to a mere 2 per cent. This dramatic reduction can be attributed to Britain’s implementation of stringent protectionist policies against Asian textiles, which systematically undermined India’s industrial growth potential.
গ্রান্টের “মুঘল শাসকরা আর্থিক জ্ঞান রাখতেন না” কথাটি কেবল ঐতিহাসিকভাবেই ভুল নয় — এটি ছিল একটি উপনিবেশিক জ্ঞানচর্চার হাতিয়ার, যা স্থানীয় শাসনব্যবস্থার প্রকৃত কৃতিত্বকে মুছে ফেলে ব্রিটিশ শাসনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। ম্যাডিসন, পট্টনায়েক ও বাগচীর গবেষণা সাক্ষ্য দেয় — গ্রান্ট যখন এই গল্প লিখছেন, তখন ভারতের জিডিপি ছিল ব্রিটেনের প্রায় দশ গুণ, আর ব্রিটেনের শিল্পবিপ্লবের অর্থায়নই এসেছিল ভারত থেকে নিষ্কাশিত সম্পদ থেকে।
উপনিবেশের পতন হোক — জ্ঞানের মুক্তিতে, ইতিহাস উদ্ধারের পুনর্দাবিতে, মানুষের নিজের গল্প, নিজের বলার অধিকারে।
টিকা-৩
“বস্তুত, মীর কাসিম এবং তাঁর পূর্ববর্তী অধিকাংশ মুসলমান শাসকই আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রাথমিক জ্ঞানটুকুও রাখতেন না”… থেকে “…যা বাস্তব বা কাল্পনিক প্রয়োজনে গৃহীত কঠোর নীতিরই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হতো” অনুচ্ছেদের হালনাগাদ
এটা জেমস গ্রান্টের এবং সে সময়ের ঔপনিবেশিক কর্মকর্তাদের চরম বর্ণবাদী, প্রাচ্যবাদী, পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির নিখুঁত দলিল, যা দিয়ে তারা ব্রিটিশ শাসনের লুটপাটকে আড়াল করতে এবং পূর্ববর্তী মুসলিম ও দেশীয় শাসকদের “অযোগ্য ও বর্বর” হিসেবে প্রমাণ করতে চেয়েছিল। এই অনুচ্ছেদে ব্রিটিশপূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা নিয়ে যে চরম মিথ্যাচার, ঐতিহাসিক বিকৃতি এবং ঔপনিবেশিক প্রোপাগান্ডা চালানো হয়েছে, তা আলোচনা করা হলো –
অর্থনৈতিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার “অজ্ঞতা” সংক্রান্ত মিথ্যাচার – অনুধাবনে মিথ্যাচার: অনুচ্ছেদে দাবি করা হয়েছে যে, মীর কাসিম বা তাঁর পূর্ববর্তী মুসলিম শাসকরা “আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রাথমিক জ্ঞানটুকুও রাখতেন না।” ঐতিহাসিক বাস্তবতা : এটি একটি চরম অসত্য দাবি। নবাব মুর্শিদকুলি খান, সুজা খান বা মীর কাসিমের মতো শাসকরা অত্যন্ত জটিল ও দক্ষ একটি রাজস্ব কাঠামো পরিচালনা করতেন। মুর্শিদকুলি খানের মাল জমিনি (Mal Jasmini) ব্যবস্থা এবং হিসাবরক্ষণে হিন্দুদের (যেমন- রাজবল্লভ, জগৎশেঠ) অন্তর্ভুক্তকরণ অত্যন্ত আধুনিক ছিল। মীর কাসিম যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন কোম্পানির কর্মচারীদের দস্তক (বিনা শুল্কে বাণিজ্য) অপব্যবহারের কারণে বাংলার অর্থনীতি ধসে পড়ছিল। মীর কাসিম দেশীয় বণিকদের বাঁচাতে এবং দেশীয় শিল্প রক্ষা করতে সব ধরনের অভ্যন্তরীণ শুল্ক তুলে দিয়েছিলেন — যা ছিল একটি অত্যন্ত দূরদর্শী ও যুগান্তকারী অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, কোনো অজ্ঞ শাসকের কাজ নয়।
টোডরমলের “আদর্শ” বনাম মুসলিম শাসকদের “খেয়ালখুশি”র তত্ত্ব — অনুধাবনে মিথ্যাচার: এখানে বলা হয়েছে যে, মুসলিম শাসকরা রাজা তোডরমলের “ন্যায়সংগত” মানদণ্ড ভেঙে খেয়ালখুশিমতো নিপীড়নমূলক কর আদায় করতেন এবং এর পেছনে ছিল তাঁদের “আলস্য, স্বভাবজাত দুর্নীতি ও অজ্ঞতা।” ঐতিহাসিক বাস্তবতা: ঔপনিবেশিক লেখকরা ইচ্ছাকৃতভাবে মোগল যুগের ‘আসল জমা’ বা তোডরমলের করের হারকে একটি ধ্রুবক হিসেবে দেখাতেন, যাতে প্রমাণ করা যায় যে পরবর্তী শাসকরা অন্যায়ভাবে কর বাড়িয়েছেন। কিন্তু ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব দেখিয়েছেন, ১৬ শতক থেকে ১৮ শতকের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কারণে বাংলায় বিপুল পরিমাণ রূপা ও নগদ অর্থের আগমন ঘটে, যার ফলে মুদ্রাস্ফীতি হয় এবং পণ্যের দাম বাড়ে। পরিবর্তিত এই বাস্তবতায় করের পরিমাণ কিছুটা পুনর্বিন্যাস করা (আবওয়াব আরোপ) কোনো “দুর্নীতি বা আলস্য” ছিল না, বরং অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক ছিল।
মীর কাসিমের সংস্কারকে “স্বার্থপর উচ্চাকাঙ্ক্ষা” হিসেবে দেখানো – অনুধাবনে মিথ্যাচার: অনুচ্ছেদে দাবি করা হয়েছে যে, মীর কাসিম রাজস্ব তছরুপকারী কর্মচারীদের যে বিচার করেছিলেন, তা কোনো নৈতিকতা থেকে নয়, বরং কোম্পানির হাত থেকে মুক্ত হওয়ার “বেপরোয়া ও অকরাজ্ঞ উচ্চাকাঙ্ক্ষা” (Rebellious Ambition) থেকে করেছিলেন। ঐতিহাসিক বাস্তবতা: মীর কাসিম ছিলেন স্বাধীনচেতা নবাব। ব্রিটিশরা তাঁকে পুতুল শাসক বানাতে চেয়েছিল, কিন্তু তিনি দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। কোম্পানির সীমাহীন লোভ এবং মীর জাফরের রেখে যাওয়া শূন্য রাজকোষের কারণে তিনি রাজস্ব সংস্কার করতে বাধ্য হন। আমলাদের দুর্নীতি দমন করা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের বৈধ অধিকার, একে “খ্রিস্টীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে আতঙ্ক ও ঘৃণা” হিসেবে চিত্রায়িত করা আসলে ব্রিটিশদের নিজেদের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও আগ্রাসনকে আড়াল করার অপচেষ্টা মাত্র।
ব্রিটিশপূর্ব মুসলিম শাসন বনাম ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক বাস্তবতা (তুলনামূলক বিশ্লেষণ)
গ্রান্ট বা ঔপনিবেশিক লেখকদের এই বর্ণবাদী বিবরণ কতটা মিথ্যা, তা নিচের টেবিলটি দেখলেই স্পষ্ট হবে:
ঔপনিবেশিকদের দাবি (অনুচ্ছেদ অনুযায়ী) প্রকৃত ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা
মুসলিম শাসকরা আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অজ্ঞ ও অযোগ্য ছিলেন।
মোগল আমল ও নবাবী আমলে বাংলা ছিল সমগ্র বিশ্বের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র (Granary of the East)। এই অঞ্চলের সুসংগঠিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা (যেমন: জগৎশেঠদের হাউস) ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর চেয়েও শক্তিশালী ছিল।
মুসলিম শাসকদের কর আদায় ছিল নিপীড়নমূলক ও সুনির্দিষ্ট নিয়মহীন।
মুসলিম শাসকরা কর আদায় করলেও সেই টাকা দেশের ভেতরেই থাকত, ফলে অর্থনীতি সচল ছিল। অথচ ব্রিটিশরা দেওয়ানি লাভের পর মাত্র কয়েক বছরে (১৭৬৫-১৭৭০) এত নির্মমভাবে কর আদায় করে যে, বাংলায় ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ বা ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয় এবং এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়।
প্রাচ্যের মুসলমানদের ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষা ও স্বভাবজাত দুর্নীতিই পতনের কারণ।
বাংলার অর্থনীতি মুসলিমদের “শিক্ষা বা দুর্নীতির” কারণে ধ্বংস হয়নি; বরং কোম্পানির কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত বাণিজ্য, দস্তকের অপব্যবহার এবং বিপুল পরিমাণ সম্পদ ব্রিটেনে পাচার (Drain of Wealth) করার কারণে ধ্বংস হয়েছিল।
মীর কাসিমের কঠোর বিচারব্যবস্থা বর্বর ও স্বৈরাচারী।
মীর কাসিম শুধু রাষ্ট্রীয় কোষাগার লুণ্ঠনকারী ও বিশ্বাসঘাতকদের কঠোর শাস্তি দিয়েছিলেন, যা তৎকালীন যেকোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য স্বাভাবিক ছিল। অথচ ব্রিটিশরা ক্ষমতা নিয়ে সাধারণ কৃষকদের ওপর চাবুক মারা এবং ফাঁসি দেওয়ার যে রাজত্ব কায়েম করেছিল, তা ছিল নজিরবিহীন বর্বরতা।
এই মিথ্যাচারের মূল উদ্দেশ্য — জেমস গ্রান্ট বা তার মতো ঔপনিবেশিক কর্মকর্তারা এই ধরনের মনগড়া তাত্ত্বিক আক্রমণ করেছিলেন প্রধানত দুটি কারণে :
১। শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্ব বা ‘White Man’s Burden’ তত্ত্বের বৈধতা দেওয়া: তাঁরা দেখাতে চেয়েছিলেন যে ভারতীয়রা বা মুসলিম শাসকরা নিজেরা দেশ চালাতে জানত না, তারা দুর্নীতিপরায়ণ ও অজ্ঞ ছিল; সুতরাং ব্রিটিশদের এই দেশ শাসন করাটা এক ধরণের “ঐশ্বরিক দায়িত্ব” বা আশীবার্দ।
২। লুটপাটের বৈধতা: প্লাসি ও বক্সারের যুদ্ধের পর কোম্পানি যেভাবে বাংলাকে শোষণ করছিল, তা ঢাকতে পূর্ববর্তী নবাবদের ভিলেন বা অত্যাচারী হিসেবে উপস্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি ছিল। একে ইতিহাসে “ঔপনিবেশিক ইতিহাস লিখন পদ্ধতি” বা Colonial Historiography বলা হয়, যা মূলত মিথ্যাচার।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ