| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯১/২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাজারাজড়া ও বণিকের দুর্গাপূজায় নিম্নবর্গ ছিল রবাহূত : অসিত দাস প্রজনন অধিকার নিশ্চিত হলেই সুস্থ্য বাংলাদেশ গড়া সম্ভব : নিকোলাস বিশ্বাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯১/১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘জলের অক্ষর’ কতো বড়ো বড়ো পুজোরে বাবা… : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নবপত্রিকা: দুর্গাপূজার অন্তরালে শস্যদেবী ও প্রকৃতির আরাধনা : যশোবন্ত রায় মন্ত্র ভুল বললেও কোনও অসুবিধে নেই… নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সিংহবাহিনী দুর্গা মৃগবাহিনীও : শ্যামলকান্তি চক্রবর্তী দেবদেবীর পূজায় দুর্বার প্রয়োজন কেন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সাহিত্যে নোবেলজয়ী অ্যান কারসন-এর শব্দের ব্যুৎপত্তির ধারণা : অসিত দাস মিয়ানমার সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন কানাডার কবি অ্যান কারসন : অসিত দাস পেজফোরনিউজ-এর শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ প্রকাশিত হল ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ একটি অব্যক্তিগত বয়ান : তপোধীর ভট্টাচার্য মহালয়ার প্রার্থনা : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘এক টুকরো ভোর’ আশ্বিনের শারদপ্রাতে : যশোবন্ত রায় আমার ছেলেবেলার মহালয়ার সকাল : পীযূষ কান্তি দাস পর্দার দাপুটে নায়ক, বাস্তব জীবনে মানবতাবাদী — নানা পাটেকরের জীবন ও অবিনশ্বর কীর্তি : রিঙ্কি সামন্ত
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই পিতৃ পক্ষের শেষ, মাতৃপক্ষের সূচনা শুভ মহালয়ার আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com, আমাদের পোর্টালের কিছু ছবি বাদে প্রায় সব ছবিই অন্তর্জাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। কারুর যদি কপিরাইট থাকে জানাবেন। আমরা সেই ছবি পোর্টাল থেকে ডিলিট করে দেব।

অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘জলের অক্ষর’

Reporter
অয়ন মুখোপাধ্যায় / ১৫২ Views জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬

বাবার শ্রাদ্ধের দিন দুপুরে বাবার নামেই একটা চিঠি এল, খামের ওপর বাবারই হাতের লেখা।

পুরোহিত তখন পিণ্ড সাজাচ্ছেন। উঠোনে কলাপাতা, ধূপের ধোঁয়া, আত্মীয়দের চাপা গলা। পিয়ন ছেলেটা দরজায় দাঁড়িয়ে খামটা বাড়িয়ে দিল, “শ্রী হরনাথ বসাক।” তারপর আমার ধুতি, কাছা আর ন্যাড়া মাথা দেখে থতমত খেয়ে বলল, “ইয়ে… মানে কাউকে দিলেই হবে।”

খামটা পুরোনো। কাগজটা ও হলদে হয়ে গেছে, কোণগুলো নরম। কিন্তু ডাকঘরের ছাপটা এখনো বেশ টাটকা, তিন দিন আগের। আর ঠিকানাটা বাবার সেই চেনা হাতের লেখা, মনে পড়ে কতবার আমাকে হাতের লেখা শেখাতে গিয়ে  বাবা বারবার বলতো “অনি, অক্ষর হল মানুষের মুখ, বাঁকা লিখলে মুখ বাঁকা দেখায়।”

নিজের হাতে, নিজের নামে, নিজের ঠিকানায়। আর পৌঁছল নিজের শ্রাদ্ধের দিন। বিষয়টা আমার কাছে খুব আশ্চর্য লাগল।

এক

চিঠিটা খুললাম রাতে, সবাই চলে যাওয়ার পর।ভেতরে একটা ভাঁজ করা কাগজ, আর একটা ছোট খাম, গালা দিয়ে সিল করা। কাগজে মাত্র কয়েকটা লাইন:

“হরনাথ, এটা যদি তোমার ঠিকানায় পৌঁছে থাকে, তার মানে তুমি মরে গেছ, আর বলে যাওয়ার সাহস হয়নি। জানতাম হবে না।

ছেলেটাকে চরমাধবপুরে পাঠিও। শ্যামলীর কাছে।

ভেতরের খামটা যেন শ্যামলীর মুখ দেখার আগে না খোলে।

— হরনাথ, চৈত্র ১৩৯৫”

১৩৯৫। মানে উনিশশো উননব্বই। আমার বয়স তখন পাঁচ।

বাবা নিজেকে চিঠি লিখেছিলেন, আর সেই চিঠি পঁয়ত্রিশ বছর ধরে কোথাও অপেক্ষা করে ছিল।

চরমাধবপুর নামটা আমি চিনি, কিন্তু শুধু নাম হিসেবে। ওখানেই বাবার প্রথম চাকরি ছিল, ভাগীরথীর চরের একটা প্রাইমারি স্কুলে। মা মারা গিয়েছিলেন আমার জন্মের সময়, তারপর বাবা একা আমাকে নিয়ে ওখানে থাকতেন। উননব্বইয়ের শেষে বদলি হয়ে কৃষ্ণনগরে চলে আসি। ব্যস, এইটুকুই জানি। বাবা কোনোদিন ও জায়গার গল্প করেননি। জিজ্ঞেস করলেই বলতেন, “নদীর ধারে আর কী থাকে, জল আর বালি।”

আর শ্যামলী? নামটা প্রথমে কিছু মনে করাল না। তারপর হঠাৎ মনে পড়ল।প্রতি বছর দশমীর পরদিন একটা মাটির হাঁড়ি আসত। নারকেল নাড়ু, তিলের নাড়ু, কলাপাতায় মোড়া। কে পাঠাত জানতাম না। বাবা হাঁড়িটা নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকতেন, তারপর আমাকে দিয়ে বলতেন, “খা। গাঁয়ের এক মাসি পাঠায়।”হাঁড়ির গায়ে চকখড়িতে লেখা থাকত শুধু একটা অক্ষর: “শ”।

দুই

খোঁজ নিতে গিয়ে প্রথমে নিতাই কাকাকে পেলাম, চরমাধবপুরের রিটায়ার্ড পোস্টমাস্টার, বাবার পুরোনো দাবার সঙ্গী। আশি পেরিয়েছেন, চোখে ছানি, কিন্তু আমাকে দেখেই চিনলেন।

“চিঠিটা পৌঁছেছে তাহলে।”

“আপনি পাঠিয়েছেন?”

“পঁয়ত্রিশ বছর আমার দেরাজে ছিল। মাস্টারমশাই দিয়ে বলেছিলেন, ‘নিতাই, আমি মরলে এটা ডাকে ফেলে দিও। হাতে দিও না, ডাকে দিও। যেন মনে হয় আমিই পাঠিয়েছি।’ ” তিনি একটু থামলেন। “খবর পেতে তিন দিন দেরি হয়ে গেল। ক্ষমা কোরো।”

“তাতে কী হয়েছে আপনি এখন বলুন আমাকে কি করতে হবে?”

নিতাই কাকা অনেকক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর যা বললেন সেটা উত্তর নয়, প্রশ্ন।

“তুমি সাঁতার জানো, অনি?”

জানি না। নদীর দেশের ছেলে হয়েও জানি না। বাবা কোনোদিন জলে নামতে দেননি। স্কুলের সুইমিং ক্যাম্পে নাম লেখালে নিজে গিয়ে নামকেটে দিয়ে এসেছিলেন। পুকুরঘাটে দাঁড়ালেও পেছন থেকে কাঁধ চেপে ধরতেন। আমি ভাবতাম ওটা মা-হারা ছেলেকে আগলে রাখার বাড়াবাড়ি। তাই আমার আর সাঁতার শেখা হয়ে ওঠেনি

নিতাই কাকা মাথা নাড়লেন, যেন উত্তরটা আগে থেকেই জানতেন। “শ্যামলীর বাড়ি ঘাটের পাশে। নৌকো বাঁধা থাকে যেখানে। যাও।”

তিন

বাবার আলমারি খুলেছিলাম শ্যামলীর কাছে যাওয়ার আগের রাতে। কেন, জানি না। হয়তো তৈরি হতে চেয়ে ছিলাম, যদিও কীসের জন্য তৈরি হচ্ছি জানতাম না।

পুরোনো ডায়েরিগুলোর মধ্যে একটা পাতলা খাতা পেলাম, উননব্বই সালের। চৈত্র মাসের পাতাগুলো ছেঁড়া। ব্লেড দিয়ে সযত্নে কাটা, যাতে বাঁধাই না খোলে। বাবা কোনো কাজ অগোছালো করতেন না, ছিঁড়তেও না।

খাতার পেছনের মলাটে আটকানো ছিল একটা সাদাকালো ছবি। নদীর ঘাট, দুটো বাচ্চা ছেলে, প্রায় এক বয়সী, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। একজনের হাফপ্যান্ট, অন্যজনের গায়ে শুধু একটা গামছা। দুজনেই রোদে চোখ কুঁচকে হাসছে। পেছনে বাবার হাতে লেখা:

“অনি আর তপু। ফাল্গুন, ১৩৯৫।”

আমি ছবিটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম। কোনটা আমি? প্যান্ট পরা ছেলেটা নিশ্চয়ই। মাস্টারের ছেলে, তার গায়ে জামা থাকবে। গামছা পরা ছেলেটা তপু, কোনো মাঝির ছেলে হবে।

কিন্তু একটা খটকা থেকে গেল। প্যান্ট পরা ছেলেটার বাঁ ভুরুর ওপর একটা কাটা দাগ। আমার নেই। আমার দাগ বাঁ কবজিতে, একটা পুরোনো সেলাইয়ের দাগ, যেটার কথা জিজ্ঞেস করলে বাবা বলতেন, “ছোটবেলায় পড়ে গিয়েছিলি।”

ভাবলাম, ভুরুর দাগ মিলিয়ে যায়। বয়সে অনেক কিছুই মিলিয়ে যায়।

চার

শ্যামলী মাসির বয়স সত্তরের কাছাকাছি। ঘাটের পাশে মাটির দাওয়া, টিনের চাল, উঠোনে একটা শিউলি গাছ। আমি গেট ঠেলে ঢুকতেই তিনি দাওয়া থেকে উঠে দাঁড়ালেন, আর হাতের কুলোটা পড়ে গেল।

কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। এমনকি নাম নয়, পরিচয় নয়। শুধু বললেন, “মাস্টারমশাই চলে গেলেন তাহলে।”

“আপনি কী করে জানলেন?”

“নইলে তুমি আসতে না, খোকা।”

খোকা। কেউ আমাকে কখনো খোকা বলেনি।

তিনি আমাকে দাওয়ায় বসালেন। জল দিলেন, নাড়ু দিলেন। সেই নারকেল নাড়ু, সেই স্বাদ। আমি বাবার চিঠিটা দেখালাম। তিনি পড়তে পারেন না, আমি পড়ে শোনালাম। শুনতে শুনতে তাঁর ঠোঁট কাঁপছিল, কিন্তু চোখে জল আসেনি। যেন অনেক বছর আগে কাঁদা শেষ করে রেখেছেন।

তারপর ছবিটা বের করলাম। “এই তপু টা কে, মাসি?”

তিনি ছবিটা হাতে নিলেন। আঙুল দিয়ে দুটো মুখ ছুঁলেন, একটার পর একটা, খুব ধীরে, যেন অন্ধ মানুষ মুখ পড়ছে।

“আমার ছেলে,” বললেন।

“এখন কোথায়?”

শিউলি গাছ থেকে একটা ফুল খসে পড়ল। নদীর দিক থেকে একটা নৌকোর দাঁড়ের শব্দ এল।

“চৈত্রের এক বিকেলে দুটো ছেলে ঘাটে খেলছিল,” শ্যামলী মাসি বললেন, ছবির দিকে চোখ রেখে। “জল তখন নেমে গেছে, চর জেগেছে। একটা ছেলে চরের দিকে ছুটল, পায়ের নিচে বালি সরে গেল। চোরাবালি না, খাদ। নদী যেখানে নিচে নিচে মাটি খেয়ে রাখে। অন্য ছেলেটা তার হাত ধরতে গেল। দুজনেই তলিয়ে গেল।”

“আর?”

“মাস্টারমশাই ঝাঁপ দিয়েছিলেন। একজনকে তুলতে পেরেছিলেন।”

আমার কবজির দাগটা হঠাৎ জ্বালা করে উঠল। কেন, জানি না।

“তপু…” আমি বললাম, “তপু বাঁচেনি।”

শ্যামলী মাসি এবার আমার দিকে তাকালেন। সোজা, স্থির, পঁয়ত্রিশ বছরের সমস্ত ভার নিয়ে। আমাকে একটা খাম দিয়ে বললেন

“খামটা খোলো, খোকা। মাস্টারমশাই বলেছিলেন আমার মুখ দেখার পর খুলতে। দেখা তো হল।”

পাঁচ

গালার সিল ভাঙতে আঙুল কাঁপছিল। ভেতরে দুটো পাতা। সেই ছেঁড়া চৈত্রের পাতা।

“আজ ১৪ই চৈত্র। আমি দুটো হাত ধরেছিলাম জলের নিচে। একটা ছোট, শক্ত করে মুঠো করা। আরেকটা আরও ছোট, সেই মুঠোর মধ্যে আটকে আছে। টানতে গিয়ে বুঝলাম, একসঙ্গে দুজনকে তুলতে পারব না। কাদা টানছে, দম ফুরিয়ে আসছে।

একটা হাত ছাড়তে হবে।

আমি বেছে নিইনি,। ঈশ্বরের দিব্যি, বেছে নিইনি। জলের নিচে চোখ খোলা যায় না, কিছু দেখা যায় না। আমি শুধু যে হাতটা আমার হাতে ছিল সেটা টেনেছি। ওপরে উঠে দেখলাম, যাকে তুলেছি তার কবজি আমার নখে চিরে গেছে। আর সে আমার ছেলে নয়।

অনি নিচে রয়ে গেল। আমার অনি, যার বাঁ ভুরুতে কাটা দাগ, যে কোনোদিন কারও হাত ছাড়ত না। শেষ মুহূর্তেও তপুর হাত ধরে ছিল, তাই তপু ভেসে উঠেছিল আমার নাগাল পর্যন্ত। আমার ছেলে আরেকজনকে ঠেলে তুলে দিয়ে গেছে।

শ্যামলী বিধবা, ঘরে চাল নেই। সে আমার পা ধরে বলেছে, ‘মাস্টারমশাই, ওকে নিয়ে যান। আমার কাছে থাকলে ও খেতে পাবে না, পড়তে পাবে না। আপনার ছেলে ওকে প্রাণ দিয়েছে, আপনি ওকে জীবন দিন।’

পঞ্চায়েতের খাতায় মরা ছেলের নাম লেখা হবে তপন মাঝি। আমি বদলি নিয়ে চলে যাব। নতুন জায়গায় কেউ জানবে না। ছেলেটা পাঁচ বছরের, ভুলে যাবে। ছোটরা ভুলে যায়।

কিন্তু ও যেদিন বড় হবে, ওকে বলতে হবে। বলতে হবে, ওর মা ওকে ফেলে দেয়নি, ওকে বাঁচানোর জন্য দিয়ে দিয়েছিল। আর বলতে হবে, ওর বুকে যে নিঃশ্বাসটা চলছে, সেটা একটা পাঁচ বছরের ছেলে ধার দিয়ে গেছে, যার নাম ও নিজে বহন করছে।

জানি, আমি বলতে পারব না। তাই নিজে এই চিঠিটা লিখে রেখে গেলাম।

ওকে কোনোদিন জলে নামতে দেব না। আরেকটা ছেলেকে আমি কখনো নদী  দিতে পারব না।”

ছয়

চিঠি শেষ হলে অনেকক্ষণ কোনো শব্দ ছিল না। সামনে শুধু নদী।

আমি জানিনা শ্যামলী মাসি,কে , আমি কি বলে ডাকবো কি বলে ডাকা উচিত? আচমকা শ্যামলী মাসি আমার বাঁ হাতের কব্জিটা ধরলেন। দাগটার ওপর বুড়ো আঙুল বোলালেন, যেমন করে ছবির মুখগুলো ছুঁয়েছিলেন।

“প্রতি বছর নাড়ু পাঠাতাম,” তিনি বললেন। “তুই নারকেল নাড়ু ভালোবাসতিস। মাস্টারমশাইয়ের ছেলে তিলের নাড়ু খেত। দুটোই পাঠাতাম। ভাবতাম, একটা তোর জন্য, একটা ওঁর জন্য।”

আমি ছবিটা আবার তুললাম। প্যান্ট পরা ছেলেটা, ভুরুতে কাটা দাগ, সে অনি। গামছা পরা ছেলেটা, রোদে চোখ কুঁচকে হাসছে, সে…

আমি।

চৌত্রিশ বছর আমি একটা মৃত ছেলের নাম নিয়ে বেঁচেছি, তার জন্মদিনে কেক কেটেছি, তার বাবাকে বাবা ডেকেছি। আর সেই বাবা প্রতিদিন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখতেন সেই হাতটাকে, যেটা তিনি ছাড়তে পারেননি, আর সেই হাতটাকে, যেটা ছেড়ে দিয়েছিলেন।

তিনি কি আমাকে ভালোবাসতেন? না কি আমাকে দেখলেই নিজের ছেলের শেষ মুঠোটা মনে পড়ে যেত?

আর আমার ভেতরে যে ভালোবাসা, সেটা কার? আমি কি বাবার শোকটা কোনোদিন টের পাইনি, না কি টের পেয়েছিলাম বলেই সারাজীবন ভালো ছেলে হয়ে থাকতে চেয়েছি, যেন কারও জায়গা পূরণ করছি, না জেনেই?

ফেরার পথে ঘাটে নেমেছিলাম। জুতো খুলে, প্যান্ট গুটিয়ে, জীবনে প্রথমবার নদীতে পা রাখলাম। জল ঠান্ডা। পায়ের নিচে বালি সরে যাচ্ছে, খুব আস্তে, যেন নদী আমাকে কিছু মনে করিয়ে দিতে চাইছে।

পকেটে বাবার চিঠি। শ্রাদ্ধের কার্ডে আমার নাম ছাপা ছিল: “শোকসন্তপ্ত পুত্র অনির্বাণ বসাক।”

পঞ্চায়েতের খাতায় আরেকটা নাম লেখা আছে, একটা মৃত ছেলের নাম হিসেবে: তপন মাঝি।

দুটো নামই আমার। দুটো নামই আসলে কোনো একজনের নয়।

নদীর ধারে দাঁড়িয়ে, চৌত্রিশ বছরে প্রথমবার, নিজেকে নাম ধরে ডাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু

কোন নামে নিজেকে ডাকব, সেটা আজ আর ঠিক করতে পারলাম না।

আপনার মতামত লিখুন :

2 responses to “অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘জলের অক্ষর’”

  1. pijushkanti das says:

    অসাধারণ এক গল্প

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ-এর নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev