| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৫/৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ফ্রানস বালথাজার সলভিনস ও উত্তর কলকাতার ঘোড়ার সহিস : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৫/২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার জনসংযোগের বিপণনে দুর্গোৎসব : পান্নালাল রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৫/১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আকাশ প্রদীপ — পুরাণ, ভক্তি ও বিশ্বাস : যশোবন্ত রায় ৮১ বছরে জাতিসংঘ: সবার প্রত্যাশা পূরণে কতটা সক্ষম? : নিকোলাস বিশ্বাস বোধিসত্ত্ব সঞ্জয়-এর ছোটগল্প ‘স্যার’ কুমারটুলির সহিসমহল্লা ও দেবী দুর্গার বাহন ঘোটকমুখী সিংহ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বিজয়াদশমীর ভাঙ-সিদ্ধি : অসিত দাস কলকাতায় এমন দুর্গাপুজো দেখিনি তো আগে : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ওঝা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘নিখোঁজের দর্শক সংখ্যা’ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘সর্বংসহা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯১/২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাজারাজড়া ও বণিকের দুর্গাপূজায় নিম্নবর্গ ছিল রবাহূত : অসিত দাস প্রজনন অধিকার নিশ্চিত হলেই সুস্থ্য বাংলাদেশ গড়া সম্ভব : নিকোলাস বিশ্বাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯১/১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘জলের অক্ষর’ কতো বড়ো বড়ো পুজোরে বাবা… : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নবপত্রিকা: দুর্গাপূজার অন্তরালে শস্যদেবী ও প্রকৃতির আরাধনা : যশোবন্ত রায় মন্ত্র ভুল বললেও কোনও অসুবিধে নেই… নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমার আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com, আমাদের পোর্টালের কিছু ছবি বাদে প্রায় সব ছবিই অন্তর্জাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। কারুর যদি কপিরাইট থাকে জানাবেন। আমরা সেই ছবি পোর্টাল থেকে ডিলিট করে দেব।

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৫/৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গা / ৯৯ Views জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬

টিকা-৪

“সম্ভবত তৎকালীন কার্যকর প্রতিনিধিত্বমূলক প্রশাসনের ব্যক্তিদের দেওয়া সামান্য কিছু অর্থ-উপহার (১৭৭৩ ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পেশ করা তৃতীয় কমিটির প্রতিবেদনে যার পরিমাণ প্রায় ২৫ লক্ষ টাকা বলা হয়েছে)”

১৭৭৩ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পেশ করা ‘থার্ড রিপোর্ট অব দ্য সিলেক্ট কমিটি’ (Third Report of the Select Committee)-তে যে প্রায় ২৫ লক্ষ পাউন্ডের (তৎকালীন হিসাবে প্রায় ২ কোটি ৪৫ লক্ষ টাকা) বিবরণ দেওয়া হয়েছে, তা কোনো “সামান্য উপহার” ছিল না। এটি ছিল ১৭৫৭ থেকে ১৭৬৬ সালের মধ্যে বাংলায় ক্ষমতার পটপরিবর্তন ও পুতুল নবাবদের বসানোর বিনিময়ে রবার্ট ক্লাইভসহ কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের পকেটে যাওয়া প্রকাশ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক ঘুষ এবং লুণ্ঠনের অংক। পার্লামেন্টের সেই তদন্ত রিপোর্টে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ মূলত তিনটি বড় ঐতিহাসিক ঘটনার (বিপ্লব) মাধ্যমে ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়।

পলাশীর চক্রান্ত (১৭৫৭) – নবাব: মীর জাফর   

£১,২৬৯,৬৬৫ (১ কোটি ২৬ লক্ষ টাকার বেশি) – মীর জাফরকে মসনদে বসানোর পুরস্কার হিসেবে এই অর্থ কোম্পানি এবং তার কাউন্সিল সদস্যদের মধ্যে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে একাই রবার্ট ক্লাইভ পেয়েছিলেন £২৩৪,০০০ (যা তাঁকে রাতারাতি ইংল্যান্ডের অন্যতম শীর্ষ ধনীতে পরিণত করে)। এ ছাড়া উইলিয়াম ওয়াটস পান £১১৪,০০০ এবং ফ্রাঙ্কল্যান্ড, ড্রেক ও অন্যান্য সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারা পদের গুরুত্ব অনুযায়ী বড় বড় ভাগ পান।

প্রথম ক্যু বা ক্ষমতার বদল (১৭৬০) – নবাব: মীর কাশিম £২০০,২৫০ (প্রায় ২০ লক্ষ টাকা)       

মীর জাফরকে হটিয়ে তাঁর জামাতা মীর কাশিমকে বাংলার নবাব করার বিনিময়ে এই অর্থ আদায় করা হয়। এর মধ্যে গভর্নর হেনরি ভ্যান্সিটার্ট একাই নেন £৫৮,৩৩৩। কাউন্সিলের সদস্য হলওয়েল পান £৩০,৯৩৭, সমনার পান £২৮,০০০ এবং ম্যাকগুইর ও অন্যান্য সিলেক্টিভ কর্মকর্তারা বাকি অংশ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন।

দ্বিতীয় ক্যু ও পুনঃস্থাপন (১৭৬৩-৬৫) –

নবাব: মীর জাফর ও নজম-উদ-দৌলা  

£৬৭৫,৪৮১ (প্রায় ৬৮ লক্ষ টাকা)   

মীর কাশিমের সাথে যুদ্ধ বাঁধার পর মীর জাফরকে পুনরায় নবাব বানাতে (১৭৬৩) এবং তাঁর মৃত্যুর পর তরুণ পুত্র নজম-উদ-দৌলাকে বসাতে (১৭৬৫) এই অর্থ নেওয়া হয়। এই দফায় গভর্নর জন স্পেন্সার পান £২৩,৩৩৩। কাউন্সিলের শীর্ষ ৮ জন সদস্য প্রত্যেকে প্রায় £১৩,০০০ করে ভাগ পান। এ ছাড়া লর্ড ক্লাইভ দ্বিতীয় মেয়াদে ভারতে ফিরে আসার পর ‘জায়গির’ বাবদ আরও বিপুল অর্থ তাঁর ব্যক্তিগত তহবিলে যুক্ত করেন।

ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক ক্ষতিপূরণ (১৭৫৭-১৭৬৬) — £৩১৯,৩০০ (প্রায় ৩২ লক্ষ টাকা) — কোম্পানি দাবি করে যে নবাবদের সাথে দ্বন্দ্বের কারণে তাদের কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যে ক্ষতি হয়েছে, সেই ‘ক্ষতিপূরণ’ বা জরিমানা হিসেবে এই বিপুল অর্থ নবাবদের কোষাগার থেকে বলপূর্বক আদায় করে শীর্ষ কর্মকর্তারা পকেটস্থ করেন।

সর্বমোট সরকারি হিসাব £২,৪৬৪,৬৯৬ (প্রায় ২৫ লক্ষ পাউন্ড) — এটি ছিল কেবল কাগজে-কলমে প্রমাণিত অর্থের হিসাব। এর বাইরে কোম্পানি ও তার কর্মচারীরা ব্যক্তিগত ব্যবসার দস্তখত বা দস্তক অপব্যবহার করে এবং স্থানীয় সোনা-জহরত লুট করে যে কত কোটি টাকা নিয়েছিল, তার প্রকৃত হিসাব এই রিপোর্টেও পুরোপুরি আসেনি।

প্রসঙ্গক্রমে আলোচনা করা যাক প্রতি বছর বাংলায় কারিগরি কেনার জন্য কত টাকা/পাউন্ডের দামি ধাতু ট্রেজার শিপ করে আনত জন কোম্পানি। ইউরোপে ভারতের মসলিন, রেশম বা সুতি কাপড়ের বিপুল চাহিদা থাকলেও, ইংল্যান্ডের তৈরি কোনো পণ্য এ দেশের মানুষের প্রয়োজন ছিল না। ফলে বাধ্য হয়ে কোম্পানিকে প্রতি বছর ব্রিটেন থেকে সোনা ও রূপার বার (Bullion বা Specie) জাহাজ বোঝাই করে এনে এ দেশের কারিগরি পণ্য কিনতে হতো। একে বলা হতো “Investments”। পলাশীর পূর্ব ও পরবর্তী অর্থপ্রবাহের তুলনা করা যাক

পলাশী-পূর্ব যুগ (১৭০৬-১৭৫৬) — (স্বাভাবিক বাণিজ্যিক আমল) বছরে গড়ে £৩,০০,০০০-£৪,০০,০০০ (তৎকালীন হিসাবে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লক্ষ টাকা) – ১৭০৬ থেকে ১৭৫৬ সালের মধ্যে কোম্পানি বাংলায় পণ্য কেনার জন্য মোট প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকার সোনা-রূপা আমদানি করে। মসলিন ও তাঁত শিল্পের বিনিময়ে এই বিপুল পরিমাণ বিদেশী ধাতু বাংলায় আসায় এ দেশের অর্থনীতি অত্যন্ত শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ ছিল।

পলাশী-উত্তর লুণ্ঠন (১৭৫৭-১৭৬৬) (সরাসরি ঘুষ ও রাজনৈতিক লুটপাট) – আমদানি : শূন্য (£০) — লুটপাটের পরিমাণ : £২,৪৬৪,৬৯৬ (প্রায় ২ কোটি ৪৫ লক্ষ টাকা) — পলাশী যুদ্ধের পর মাত্র ৯ বছরে পুতুল নবাবদের কাছ থেকে কোম্পানি ও তার আমলারা প্রায় ২৫ লক্ষ পাউন্ড ব্যক্তিগত ঘুষ ও ক্ষতিপূরণ বাবদ আদায় করে। অর্থাৎ, ৫০ বছর ধরে তারা বৈধ বাণিজ্যে যে পরিমাণ ধাতু এ দেশে এনেছিল, তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি সম্পদ মাত্র ৯ বছরে এ দেশ থেকে বের করে নিয়ে যায়।

দেওয়ানি লাভ (১৭৬৫-এর পর) (প্রাতিষ্ঠানিক লুঠ) — বুলিয়ন আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ, উল্টো বাংলা থেকে সোনা-রূপা চীন ও ইংল্যান্ডে পাচার শুরু — ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি পাওয়ার পর কোম্পানির ডিরেক্টররা লন্ডন থেকে সোনা-রূপা পাঠানো চিরতরে বন্ধের নির্দেশ দেন। তারা বাংলার কৃষকদের থেকে জোরপূর্বক আদায় করা খাজনার টাকা দিয়েই বাংলার তাঁতিদের কাপড় কেনা শুরু করে। ফলে, বাংলার মানুষের রক্ত পানি করা ট্যাক্সের টাকায় কেনা পণ্য বিনামূল্যে ইংল্যান্ডে চলে যেতে থাকে, যাকে অর্থনীতিবিদরা ‘ড্রেন অব ওয়েলথ’ (Drain of Wealth) বলেছেন।

দ্বিচারিতার চূড়ান্ত রূপ — লুঠের অংকের সাথে আমদানির তুলনা করে বোঝা যায় তাদের “বাণিজ্য” আসলে একটি ছদ্মবেশ মাত্র ছিল —

১। ১৭৬৫ সালের পর কোম্পানি ব্রিটেনের সরকারকে গর্ব করে জানায় যে, এখন থেকে ভারতের পণ্য কিনতে ব্রিটিশদের পকেট থেকে একটি কাণাকড়িও খরচ করতে হবে না। বাংলার মানুষের কাছ থেকে নেওয়া করের টাকা দিয়েই বাংলার পণ্য কিনে তারা বিশ্ববাজারে বিক্রি করে ১০০% লাভ করছিল।

২। যে বাংলা প্রতি বছর লাখ লাখ টাকার সোনা-রূপা আমদানি করত, কোম্পানির করাল গ্রাসে ১৭৬৬ সালের মধ্যে সেখানে তীব্র মুদ্রা সংকট (Specie Scarcity) দেখা দেয়। বাজার থেকে টাকা উধাও হয়ে যায়, ব্যবসা-বাণিজ্য ধসে পড়ে এবং কৃষকদের সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়। এর সরাসরি পরিণতি ছিল ১৭৭০ সালের ছিয়াত্তরের মন্বন্তর, যাতে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ (প্রায় ১ কোটি) না খেতে পেয়ে মারা যায়।

জেমস গ্রান্টের মতো আমলারা যখন বাংলার নবাবদের শাসনকে “রাজস্ব আত্মসাৎকারী” বা “ত্রুটিপূর্ণ” বলেন, তখন তারা আসলে এই সত্যটি লুকিয়ে রাখতে চান যে — যে দেশ শত বছর ধরে সারা পৃথিবীর সোনা-রূপা নিজের দিকে টেনে এনেছে, তাকে মাত্র কয়েক দশকে একটি ভিখারি ও দুর্ভিক্ষপীড়িত দেশে পরিণত করেছিল তাদের এই জন কোম্পানি।

দেওয়ানি লাভের (১৭৬৫) পর প্রথম পাঁচ বছরে (১৭৬৫-১৭৭০) ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার ওপর যে চরম অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক এক্সপেরিমেন্ট চালিয়েছিল, তার ফলেই বাংলার মুদ্রা ব্যবস্থা পুরোপুরি ধসে পড়ে এবং কৃষকদের ওপর খাজনা আদায়ের অত্যাচার ইতিহাসের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়।

পলাশীর যুদ্ধের আগে যেখানে বাংলা ছিল সারা বিশ্বের সোনা ও রূপা আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু, দেওয়ানি লাভের মাত্র ৫ বছরের মধ্যে সেখানে তীব্র মুদ্রা সংকট (Specie Scarcity) তৈরি হয়। ১৭৬৫ সালের পর কোম্পানি ইংল্যান্ড থেকে সোনা-রূপা আনা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। এর আগে প্রতি বছর যে লাখ লাখ টাকার রূপা বাংলার বাজারে ঢুকত এবং মুদ্রা তৈরিতে ব্যবহৃত হতো, তা রাতারাতি বন্ধ হয়ে যায়। উলটে কোম্পানি বাংলা থেকে সংগৃহীত রূপার মুদ্রা গলিয়ে সরাসরি চীনে পাচার করতে শুরু করে। চীনের চা, রেশম ও পোর্সেলিন কেনার জন্য এবং লন্ডনের ডিরেক্টরদের ডিভিডেন্ড দেওয়ার জন্য বাংলার মুদ্রা বাইরে চলে যেতে থাকে, কিন্তু বিনিময়ে বাংলায় কিছুই আসত না। বাজারে রূপার তীব্র সংকট দেখা দিলে লর্ড ক্লাইভ ও গভর্নর ভ্যারেলেস্ট সোনা ও রূপার দ্বৈত মুদ্রা ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা সোনার মুদ্রার কৃত্রিম বাজারমূল্য অনেক বেশি বাড়িয়ে দেন। ফলে মানুষ রূপার মুদ্রা লুকিয়ে বা গলিয়ে ফেলতে শুরু করে এবং বাজার থেকে রূপার সিক্কা টাকা সম্পূর্ণ গায়েব হয়ে যায়। বাজারে কেনাবেচার জন্য কোনো নগদ ছড় বা মুদ্রা অবশিষ্ট ছিল না। মুদ্রা সংকটের কারণে বাংলার স্থানীয় মহাজন, ব্যবসায়ী এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থা (যেমন জগৎ শেঠদের হাউস) ঋণ দেওয়া বন্ধ করে দেয়, যা গ্রামীণ ও শহরের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যকে সম্পূর্ণ অচল করে ফেলে।

দেওয়ানি লাভের পর প্রথম ৫ বছরে কৃষকদের ওপর খাজনা আদায়ের অত্যাচার। দেওয়ানি পাওয়ার পর কোম্পানির একমাত্র লক্ষ্য ছিল যেকোনো মূল্যে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায় করা। ১৭৬৫ থেকে ১৭৭০ সালের মধ্যে কৃষকদের জীবন নরকে পরিণত হল – নবাবী আমলের শেষ দিকে (১৭৬৪-৬৫) যেখানে মোট আদায়কৃত রাজস্ব ছিল প্রায় ৮ লক্ষ পাউন্ড, কোম্পানি দেওয়ানি পাওয়ার প্রথম বছরেই (১৭৬৫-৬৬) তা বাড়িয়ে ১৪ লক্ষ ৭০ হাজার পাউন্ড (প্রায় দ্বিগুণ) করে। ১৭৬৮-৬৯ সালের মধ্যে তা প্রায় ২৭ লক্ষ পাউন্ডে গিয়ে ঠেকে। কোম্পানি রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেয় রেজা খান এবং ‘আমিলদার’ নামক একদল নির্মম ইজারাদারের ওপর। এই আমিলদাররা জানত তারা মাত্র এক বা দুই বছরের জন্য এই দায়িত্ব পেয়েছে। তাই দীর্ঘমেয়াদি কৃষির উন্নতির কথা না ভেবে, তারা কৃষকদের চাবুক মেরে, ঘরবাড়িতে আগুন দিয়ে এবং জিম্মি করে শেষ কড়িটি পর্যন্ত কেড়ে নিত। ১৭৬৯ সালে বাংলায় তীব্র অনাবৃষ্টি ও খরা দেখা দেয়, যা পরবর্তীকালে ১৭৭০ সালের মহা দুর্ভিক্ষ বা ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের রূপ নেয়। ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও কোম্পানি বা তাদের আমিলদাররা এক আনা খাজনাও মওকুফ করেনি। বরং যারা মারা গিয়েছিল বা গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছিল, তাদের বকেয়া খাজনা পাশের জীবিত কৃষকদের ওপর ‘নজায়’ (Najay) নামক কর হিসেবে চাপিয়ে জোর করে আদায় করা হয়। যখন বাজারে চালের তীব্র আকাল, তখন কোম্পানির গোমস্তা ও একচেটিয়া ব্যবসায়ীরা চাল মজুত করে দাম বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। কৃষকরা নিজেদের উৎপাদিত ধান নিজেদের খাওয়ার জন্য রাখতে পারত না; তা খাজনা মেটাতে সস্তায় কোম্পানির দালালের কাছে বিক্রি করতে হতো এবং পরে সেই চালই চড়া দামে কিনতে গিয়ে তারা সর্বস্বান্ত হতো।

মুদ্রা ব্যবস্থার এই সম্পূর্ণ ধ্বংস এবং কৃষকদের ওপর এই নজিরবিহীন অত্যাচারের সরাসরি চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ১৭৭০ সালের (বাংলা ১১৭৬ সন) ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। এই কৃত্রিম ও মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ — প্রায় ১ কোটি প্রাণ — না খেতে পেয়ে মারা যায়। অথচ, লর্ড কর্নওয়ালিস নিজেই পরে স্বীকার করেছিলেন যে, এই সময় কোম্পানির ডিরেক্টররা লন্ডনে বসে রিপোর্ট করছিল যে — দুর্ভিক্ষ সত্ত্বেও বাংলায় রাজস্ব আদায় কমেনি, বরং আগের বছরের চেয়ে বেশি হয়েছে! জেমস গ্রান্ট যখন তাঁর রিপোর্টে দেশীয় কর্মচারীদের “লুটেরা” বলছিলেন, তখন তিনি আসলে এই প্রাতিষ্ঠানিক গণহত্যার ইতিহাসকেই আড়াল করতে চাচ্ছিলেন।

চলবে

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ-এর নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev