
[সংক্ষিপ্তসার — গ্রান্ট এখানে চৌথ (Chaouth) নামে পরিচিত মারাঠা করের ইতিহাস ও তা আলিবর্দি খান কীভাবে বাংলায় আবওয়াব হিসেবে প্রয়োগ করেন — সে বিষয়ে আলোচনা করেছেন। মারাঠারা মুঘল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী যুদ্ধের অংশ হিসেবে সমগ্র উপদ্বীপে রাজকোষে জমা হওয়া মোট রাজস্বের ১০ শতাংশ হারে সরদেশমুখী কর দাবি করে। সম্রাট আওরঙ্গজেব এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু ১৭১৭ সালে সম্রাট ফররুখশিয়ারের আমলে দাক্ষিণাত্যের ছয় সুবার নিজাম আনুষ্ঠানিকভাবে চৌথ (মোট আয়ের এক-চতুর্থাংশ) দিতে সম্মত হন। দাউদ খাঁ সরদেশমুখী কর দিতে রাজি হয়ে শাহুজি ভোঁসলের বন্ধুত্ব কিনে নেন। মুহাম্মদ শাহ ১৭৪০-এর দশকে মারাঠাদের চৌথ আদায়ের অনুমতি দেন — যদিও তারা অনুমতি ছাড়াই আদায় করত। আলিবর্দি খান এই অজুহাতে খালসা জমির ওপর অতিরিক্ত কর আদায় করতেন। তিনি চৌথ দেননি; এই নামে নিজের রাজ্যে কর আরোপ করেন। গ্রান্ট বলছেন মারাঠাদের দাবিকরা চৌথ (যা আলিবর্দি দেননি) এবং আলিবর্দির আরোপিত কর — এই দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। প্রথমটি ভূ-সম্পত্তি-জনিত আয়ের ওপর এক-চতুর্থাংশ; দ্বিতীয়টা খাস এলাকার মূল রাজস্বের এক-সপ্তমাংশ — সমগ্র সুবার জেলায় সমানভাবে প্রযোজ্য হয়। গ্রান্টের মতে আবওয়াবের মধ্যে সর্বাধিক বৈধ কর। এই করই সমস্ত আবওয়াবের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আইনত বৈধ; কারণ এটি স্বীকৃত শাসকের অনুমোদনপুষ্ট, এর পরিমাণ সুনির্দিষ্ট ও সর্বজনবিদিত, এবং কৃষক সহজেই তার মূল করের সঙ্গে আনুপাতিক হার হিসাব করতে পারতেন। এর একমাত্র ত্রুটি — সুনির্দিষ্ট জেলার পরিবর্তে অনির্দিষ্ট জমিদারি এলাকার এখতিয়ারভুক্ত হয়ে আদায় করা হতো। এই করের বার্ষিক নিট পরিমাণ ছিল ১৫,৩১,৮১৭ টাকা]
আবওয়াব।
৬ষ্ঠ। চৌথ মারাঠা — মারাঠারা মুঘলদের ওপর এই রাজস্ব দাবি করে। এই রাজস্বের অজুহাতে আলিবর্দি খাঁ (অন্যান্য সুবাদারদের মতোই) খালসা বা সরকারি খাস জমির ওপর অতিরিক্ত কর আদায়ের সুযোগ পেয়েছিলেন। সম্রাট ফররুখশিয়ারের রাজত্বকালে ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে দাক্ষিণাত্যের ছ’টা সুবার নিজাম বা ভাইসরয় আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর প্রদানের বিষয়টি মেনে নিয়েছিলেন। এর সূত্রপাত হয়েছিল তারও প্রায় দশ বছর আগে; তখন ক্রমবর্ধমান সমৃদ্ধির দম্ভে ও পতনোন্মুখ মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী যুদ্ধের অংশ হিসেবে মারাঠারা সমগ্র উপদ্বীপ জুড়ে রাজকোষে জমা হওয়া মোট রাজস্বের ওপর ১০ শতাংশ হারে সরদেশমুখী কর দাবি করেছিল। এই কর সরাসরি দেশমুখ বা জেলাপ্রধানদের — যারা ছিলেন হিন্দুস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর জমিদার — থেকে আদায়ের প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে মহান সম্রাট আলমগীর সাম্রাজ্যের অধিকারের ওপর এই সামান্য হস্তক্ষেপও মেনে নেননি; যদিও জীবনের শেষ পর্যায়ে অসুস্থ থাকাকালীন তিনি সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে বিবাদের ফলে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রের আসন্ন দুর্বলতা আঁচ করতে পেরেছিলেন — যে পরিস্থিতির ফলে ভবিষ্যতে হয়তো আরও বড় ছাড় দিতে হতে পারত। পরে, সম্রাটের মৃত্যু এবং অন্যান্য সংকটে বন্দিদশা থেকে মুক্তি পান বিখ্যাত শিবাজীর বংশধর ও সকল মারাঠা গোত্রের স্বীকৃত নেতা শাহুজি ভোঁসলে। তখন সমগ্র দাক্ষিণাত্যের প্রথম নিযুক্ত সুবাদার জুলফিকার খাঁর নায়েব বা প্রতিনিধি হিসেবে দাউদ খাঁ সরদেশমুখী দিতে সম্মত হন। একইসাথে, নর্মদা নদীর দক্ষিণের সমস্ত জাগির জমি থেকে নতুন করে আদায় শুরু হওয়া চৌথ (বা মোট আয়ের এক-চতুর্থাংশ) করের বিষয়টি নীরবে মেনে নিয়ে তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি করতে মুক্তিপাওয়া তরুণ হিন্দু নেতার বন্ধুত্ব কিনে নেন — এটা ছিল কার্যত বিশ্বাসঘাতকতা। তবে উল্লিখিত সময়কাল — অর্থাৎ হিজরি ১১২৯ সালের আগে পর্যন্ত এই শেষোক্ত দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত ছিল না। সম্রাট ফররুখসিয়ারের পক্ষে আমির-উল-উমরা ও সাম্রাজ্যের বাহিনীর প্রধান সেনাপতি (বখশি) — এবং তৎকালীন দাক্ষিণাত্যের ভাইসরয় — সৈয়দ হোসেন খান এই দাবি মানলেন। এটা শক্তিশালী দস্যু-সর্দারকে বশে রাখার বা ভবিষ্যতে তার সম্ভাব্য রাষ্ট্রদ্রোহীতা এড়ানোর কৌশলগত মূল্য; কারণ, সেই সর্দারকে সরকারের বিরুদ্ধে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য প্ররোচিত করা হয়েছিল এক এমন শাসকের দুর্বল ও ঈর্ষাপরায়ণ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে, যিনি নিজে স্বাধীন হওয়ার জন্য ধুঁকছিলেন অথচ নিজেরই অবাধ্য ও নামমাত্র প্রতিনিধির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার মতো ক্ষমতা ছিল না। সাম্রাজ্যের ক্রমাবনতির যুগে, সার্বভৌম শাসক তাঁর ক্ষমতা দখলকারী প্রতিনিধিদের বশ মানাতে একই বিপজ্জনক হাতিয়ার ব্যবহারের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন; বুদ্ধিহীনতার এমন সব ধারাবাহিক প্রমাণে, যে [মারাঠা] জাতি, দাপুটে মুসলিম শাসকদের শাসন-শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার গর্বে তখন স্ফীত হয়ে উঠেছিল, দিল্লির রাজকীয় ক্ষমতার প্রতি সেই বর্বর জাতির মনে চরম অবজ্ঞার সৃষ্টি হলো। এরপর কর বা রাজস্বের খালসা বা রাজকীয় অংশের ওপরও কর আদায়ের দাবি তোলা হলো। মুঘলরা বিজিত অঞ্চলের ভূমির করের এক-চতুর্থাংশ বা রেব্বা-র ওপর যেমন সার্বভৌম অধিকার দাবি করত, তার অনুকরণে — অথবা বলা ভালো, ভুল অনুকরণে — স্থানীয় এক জনগোষ্ঠী, মারাঠারাও হিন্দুস্তানের ভূস্বামী বা জমিদারদের বার্ষিক ভূমি-আয়ের সমপরিমাণ অর্থ চৌথ হিসেবে আদায়ের চেষ্টা শুরু করল।
বিখ্যাত নিজাম-উল-মুলকের বলিষ্ঠ শাসনামলে খুব গুরুত্ব না পাওয়া অথবা সহজে মিটিয়ে ফেলা এই ভিত্তিহীন দাবি মেনে নেওয়ার পেছনে দিল্লির সম্রাটের গৃহীত সেই বিপর্যয়কর শাসনব্যবস্থার ভূমিকা ছিল। সুজা খানের মৃত্যু এবং আলিবর্দির বাংলার সুবাদারির অবৈধ দখলের খবরে মুহাম্মদ শাহ সেখান থেকে আসা বার্ষিক রাজস্বের ঘাটতি তীব্রভাবে অনুভব করলেন। অথচ নাদির শাহের সাম্প্রতিক আক্রমণে সাম্রাজ্যের শক্তি প্রায় নিঃশেষিত, তাই বলপ্রয়োগে অধিকার পুনরুদ্ধারের উপায় তাঁর ছিল না। এমতাবস্থায় তিনি রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর ও সর্বনাশা পদক্ষেপ নিলেন — মারাঠাদের [বাঙলা থেকে] আনুষ্ঠানিকভাবে চৌথ আদায়ের অনুমতি দিলেন — যদিও এমন অনুমতির তোয়াক্কা না করেই তারা হয়তো নতুন বিচ্ছিন্ন হওয়া প্রদেশগুলো থেকে এই অর্থ আদায়ের পরিকল্পনা করছিল। তা সত্ত্বেও, নিজের বাহুবলে সুবাদার বনে যাওয়া আলিবর্দি, সম্রাটের প্রতি আনুগত্যের প্রহসন চালিয়ে গেলেন। দেশের রাজস্ব ব্যয় করতেন মূলত এমন সব ভিত্তিহীন দাবি মোকাবিলায় — যা মুসলিমদের আত্মসম্মানে আঘাত হানত কিংবা সম্রাটের মর্যাদাহানিকর ছিল; কিন্তু বাস্তবে তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন — সম্রাটের স্বার্থ রক্ষার ভানে, সেই উচ্চতর শাসকের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে নিজের জন্য স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা। এই সংঘাতের পরিণতির কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। ওড়িশার অধিকাংশ অঞ্চল প্রকাশ্যে শত্রুর হাতে ছেড়ে দেওয়া হলো — হয় অত্যন্ত শক্তিশালী ও অন্যায্য দাবির ক্ষতিপূরণ হিসেবে, অথবা রাজকীয় স্বীকৃত ঋণ পরিশোধের অজুহাতে। বস্তুত এটা ছিল শান্তি অর্জনের লক্ষ্যে এবং মুঘল সাম্রাজ্যের বিচ্ছিন্ন অংশগুলোর মধ্যে তখন একমাত্র শক্তিশালী ও আশঙ্কাজনক শত্রুর ভবিষ্যৎ আক্রমণ থেকে নিজের অধিকৃত অবশিষ্ট বিশাল ভূখণ্ড রক্ষা করার প্রয়োজনীয় আত্মত্যাগ। কিন্তু আধুনিক হিন্দুস্তানি আধা-কার্যকর সুবাদারি নীতিতে, আলিবর্দি ভূখণ্ড হারানোর সেই অনিবার্য ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করেননি। তিনি তাঁর শাসনে অন্যান্য প্রদেশে সমপরিমাণ কর আরোপ করেন — যার পেছনে ছিল সম্রাটের পবিত্র আদেশের মতো জোরালো অজুহাত এবং স্বভাবগতভাবে ভীতু সাধারণ মানুষের স্বস্তি আর শান্তির মতো জনপ্রিয় যুক্তি; কারণ এই মানুষগুলো তখনো নৃশংস মারাঠা যুদ্ধের অব্যাহত বিভীষিকা ও আতঙ্কে আচ্ছন্ন ছিল। একই সাথে, আদায়যোগ্য এই শুল্কের পরিমাণ সংশ্লিষ্ট ভূমির প্রকৃত উৎপাদনক্ষমতার তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য মনে হতো; অথচ স্বৈরাচারী প্রশাসনের দুর্নীতি, প্রতারণা ও কারচুপির কারণে — কৃত্রিম উপায়ে সৃষ্ট বিপুল সম্পদের অনুপাতে প্রকৃত রাজকীয় পাওনা নির্ধারণের লক্ষ্যে পরিচালিত হস্তবুদ (বাস্তব আয়-ব্যয় ও সম্পদ বিষয়ক) তদন্ত প্রক্রিয়া সর্বদা ব্যয়বহুল এবং প্রায়শই নিপীড়নমূলক হয়ে উঠত। সাধারণ পরিস্থিতিতে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার আদেশ দ্রুত বাস্তবায়িত হলেও, চরম নৈতিক অবক্ষয় রোধে প্রয়োজনীয় অসংখ্য আনুষ্ঠানিকতা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে এ ধরনের সুপরিকল্পিত আর্থিক পদক্ষেপ অনিবার্যভাবেই অত্যন্ত দীর্ঘসূত্রতার হতো; ফলে প্রাচ্যের শাসনব্যবস্থায় শাসকদের ব্যক্তিগত ক্ষমতার অনিশ্চিত ও স্বল্পস্থায়ী প্রকৃতির কারণে সৃষ্ট তাৎক্ষণিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে এটা খুব সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না বা সচরাচর এমন পদক্ষেপ নেওয়া হতো না।
তবে এখানে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, যেন আমরা মারাঠাদের দাবি করা চৌথের (যে কর আলিবর্দি শোধ করেননি বা করার ইচ্ছাও পোষণ করেননি) প্রকৃত কর আদায়কে — সেই দখলদার শাসকের (আলিবর্দির) বাংলার পূর্ববর্তী করের অতিরিক্ত হিসেবে এবং নির্দিষ্ট নাম আর অজুহাতে প্রকৃতপক্ষে আদায়করা বর্তমান করের সাথে গুলিয়ে না ফেলি। প্রথমোক্ত ব্যবস্থা যদি কার্যকর করা হতো, তবে তা — এর প্রকৃতি বা পরিমাণের বিচারে — বস্তুত হিন্দুস্তানের রাজকীয় ভূ-সম্পত্তি-জনিত আয়ের ওপর এক-চতুর্থাংশ (বা প্রচলিত হিন্দু পরিভাষা অনুযায়ী চৌথ) কর হিসেবে গণ্য হতো; আর এই আয়-নির্ধারণের ভিত্তি ছিল আকবরের শাসনামলে টোডরমলের তত্ত্বাবধানে নির্ণীত নর্মদা-উত্তরের ১২টি সুবার সেই প্রাচীন ও সর্বজনবিদিত মূল্যায়ন। পক্ষান্তরে, পরবর্তী ব্যবস্থা ছিল নিছকই অভ্যন্তরীণ আর্থিক কার্যক্রম, জমির ওপর আনুপাতিক হারে ধার্যকরা এই কর — যা কার্যত পূর্ববর্তী ভাইসরয়দের প্রবর্তিত ব্যবস্থার অনুরূপ এবং খাস (রাজকীয় নিয়ন্ত্রণাধীন) এলাকার মূল রাজস্ব বা আসল জমার মাত্র এক-সপ্তমাংশ — সমগ্র সুবা বা প্রদেশের জেলাগুলোতে একইভাবে প্রযোজ্য ছিল। সমস্ত আবওয়াবের (অতিরিক্ত কর) মধ্যে এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং আইনত বৈধ — অর্থাৎ স্বীকৃত শাসকের আইনি অনুমোদনপুষ্ট কিংবা ক্ষমতাসীন প্রশাসনের বাস্তবসম্মত নীতির আলোকে গৃহীত বলে গণ্য করা যেতে পারে। সাধারণ মানুষের ওপর এর বোঝা ছিল সর্বনিম্ন; কারণ এটা আপাত প্রয়োজনীয়তার ওপর ভিত্তি করে প্রবর্তিত হয়েছিল, এর পরিমাণ ছিল সুনির্দিষ্ট ও সর্বজনবিদিত, এবং প্রতিটি কৃষক তার মূল করের সাথে এর আনুপাতিক হার সহজেই হিসাব করতে পারতেন। এর একমাত্র ত্রুটির দিক ছিল এটা সুনির্দিষ্ট পরিমাপকৃত জেলার পরিবর্তে অনির্দিষ্ট জমিদারী এলাকায় আদায় করা হতো। অথচ সুনির্দিষ্ট জেলাভিত্তিক ব্যবস্থাই ছিল কার্যকর; যা প্রবর্তনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ক্ষুদ্রতম প্রশাসনিক একক পর্যন্ত রাজকীয় রাজস্বের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা এবং উচ্চপদস্থ ভূমিকর্তাদের (যারা অভ্যন্তরীণভাবে মোট বার্ষিক রাজস্বের অংশবিশেষ বণ্টনের সামান্যতম স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা পেলেই অধীনস্থ কৃষকদের ওপর নিপীড়ন চালাত) সেই দুর্বিনীত প্রবণতাকে যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণ করা। জমা-তুমারির (নির্ধারিত মূল রাজস্ব তালিকা) অনুপাতে নির্ধারিত এই করের বার্ষিক নিট পরিমাণ ছিল ১৫,৩১,৮১৭ টাকা।
টীকা ১
১. চৌথ (Chaouth) — মারাঠাদের দাবিকরা কর — মোট আয়ের এক-চতুর্থাংশ। মুঘল আমলে দাক্ষিণাত্যে এই কর চালু হয়।
২. সরদেশমুখী — মারাঠাদের দাবিকরা ১০ শতাংশ কর — দেশমুখ বা জেলাপ্রধানের থেকে আদায় করা হতো।
৩. দেশমুখ — হিন্দুস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর জমিদার — যারা মারাঠাদের কাছে সরদেশমুখী কর দিতেন।
৪. শাহুজি ভোঁসলে — শিবাজীর বংশধর ও মারাঠা গোত্রের স্বীকৃত নেতা — যিনি বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে মারাঠা শক্তি সংগঠিত করেন।
৫. দাউদ খাঁ — দাক্ষিণাত্যের সুবাদার জুলফিকার খাঁ-র নায়েব — যিনি সরদেশমুখী কর প্রদানে সম্মত হন।
৬. নিজাম-উল-মুলক — দাক্ষিণাত্যের শক্তিশালী ভাইসরয় — যিনি চৌথ দাবিকে গুরুত্ব দেননি।
৭. রেব্বা — মুঘল আমলে ভূমির করের এক-চতুর্থাংশ — যা সার্বভৌম শাসকের প্রাপ্য।
৮. আসল জমা — মূল নির্ধারিত রাজস্ব — যা টোডরমল ১৫৮২ সালে নির্ধারণ করেন।
৯. জমা-তুমারি — নির্ধারিত মূল রাজস্ব তালিকা।
১০. খালসা — সরাসরি সরকারি ব্যবস্থাপনাধীন ভূমি।
১১. হস্তবুদ — জমির প্রকৃত আয়-ব্যয় ও উৎপাদন ক্ষমতা সংক্রান্ত জরিপ।
১২. নাদির শাহ — পারস্যের শাসক — যিনি ১৭৩৯ সালে দিল্লি আক্রমণ করেন এবং মুঘল সাম্রাজ্য দুর্বল করে দেন।
১৩. মুহাম্মদ শাহ — মুঘল সম্রাট (১৭১৯–১৭৪৮) — যিনি চৌথ আদায়ের অনুমতি দেন।
১৪. সুবা — মুঘল প্রশাসনিক বিভাগ — প্রদেশ বা ভাইসরয়ালিটি।
১৫. পরগনা — মুঘল প্রশাসনিক উপবিভাগ — মহল বা তালুকের সমতুল্য।
১৬. ১৫,৩১,৮১৭ টাকা- চৌথের বার্ষিক নিট পরিমাণ — যা আলিবর্দি বাংলার ওপর আরোপ করেন।
গ্রান্টের এই বিশ্লেষণ বাংলার রাজস্ব ইতিহাস বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ —
১. ১৮শ শতকে মারাঠারা ছিল ভারতের দুর্ধর্ষ যোদ্ধা জাতি। মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগে চৌথ দাবি করে।
২. আলিবর্দি চৌথ পরিশোধ করেননি; বরং এই নামে নিজের রাজ্যের ওপর কর আরোপ করেন। তিনি সম্রাটের প্রতি আনুগত্যের প্রহসন চালিয়ে নিজের স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এগিয়ে যান।
৩. আলিবর্দি ওড়িশার অধিকাংশ অঞ্চল মারাঠাদের হাতে ছেড়ে দেন; এটা ছিল শান্তি অর্জন ও নিজের রাজ্য রক্ষার কৌশলগত ত্যাগ।
৪. চৌথ নামে আরোপিত করই সমস্ত আবওয়াবের মধ্যে বৈধতম; কারণ এটা স্বীকৃত শাসকের অনুমোদনপুষ্ট, সুনির্দিষ্ট ও সর্বজনবিদিত।
৫. চৌথ অনির্দিষ্ট জমিদারি এলাকার এখতিয়ারভুক্ত হয়ে আদায় করা হতো। ফলে জমিদাররা স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা পেয়ে অধীনস্থ কৃষকদের ওপর নিপীড়ন চালাত।
৬. ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের সময় দেশীয় প্রশাসন এই প্রকৃত হিসাব গোপন করে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে রাজস্বের পরিমাণ কমিয়ে দেখায়। এই বিকৃতির মাধ্যমেই বছরে প্রায় ৬০ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছিল। গ্রান্টের এই অংশ চৌথের ইতিহাস, আলিবর্দির কৌশল এবং আবওয়াব ব্যবস্থার জটিলতার গভীরতম বিশ্লেষণ। তিনি দেখান — মারাঠাদের দাবিকরা চৌথ আর আলিবর্দির আরোপিত কর — এই দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। প্রথমটা ছিল ভূ-সম্পত্তি-জনিত আয়ের এক-চতুর্থাংশ; দ্বিতীয়টি ছিল খাস এলাকার মূল রাজস্বের এক-সপ্তমাংশ। আবওয়াবের পরিমাণ বা অনিয়ম নয়; বরং জমিদারদের অতিরিক্ত আদায় ও স্বেচ্ছাচারিতা — এই দুটোই জনগণের অসন্তোষের মূল কারণ।
টিকা ২
গাণিতিক বা অনুপাতের দিক থেকে ‘রেব্বা’ এবং ‘চৌথ’ মূলত একই জিনিস — উভয়ই মোট পরিমাণের এক-চতুর্থাংশ বা ২৫%। তবে জেমস গ্রান্ট রাজস্ব বিশ্লেষণে এই দুটি শব্দ ব্যবহার করে এদের ঐতিহাসিক পটভূমি ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য টেনেছেন। এই দুটো ধারণার মূল মিল ও প্রয়োগগত পার্থক্য স্পষ্ট করা হল – আরবি শব্দ ‘রেব্বা’ (Rub’a) এবং হিন্দি/মারাঠি শব্দ ‘চৌথ’ (Chouth) — দুটো শব্দের অর্থ “চার ভাগের এক ভাগ” বা ২৫%। জেমস গ্রান্ট দেখিয়েছেন যে, সার্বভৌম শাসক বা রাষ্ট্র প্রজাদের থেকে ভূমির মোট উৎপাদনের ২৫% রাজস্ব হিসেবে দাবি করার যে প্রাচীন ঐতিহ্য, তা এই দুটি শব্দ দিয়েই প্রকাশ করা হতো।
প্রয়োগের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক পার্থক্য হল রেব্বা — মূলত মুঘল সাম্রাজ্যের একটি অভ্যন্তরীণ এবং বৈধ বা আইনি ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থা। সম্রাট আকবরের অর্থমন্ত্রী রাজা টোডরমলের বন্দোবস্তের সময় থেকেই নিয়ম ছিল, রাষ্ট্র ভূমির প্রকৃত উৎপাদনের এক-চতুর্থাংশ (রেব্বা) কর হিসেবে বা এর সমপরিমাণ নগদ টাকা আদায় করবে। অর্থাৎ, এটি ছিল রাষ্ট্রের নিজস্ব প্রজাদের ওপর ধার্য করা স্থায়ী ও নিয়মমাফিক কর। ‘চৌথ’ পরিভাষা মূলত মারাঠাদের কর ব্যবস্থার সাথে যুক্ত। মারাঠারা যখন কোনো অঞ্চল জয় করত বা কোনো বহিরাগত রাজ্যকে আক্রমণ না করার নিশ্চয়তা দিত, তখন সেই বিজিত বা অধীনস্থ অঞ্চলের কাছ থেকে মোট রাজস্বের ২৫% আদায় করত। গ্রান্টের মতে, মারাঠাদের এই চৌথ আদায়ের ধারণাটি মূলত মুঘলদের এই প্রাচীন ‘রেব্বা’ বা এক-চতুর্থাংশ রাজস্বের নিয়মটি থেকেই অনুপ্রাণিত বা ধার করা হয়েছিল।
সুতরাং, জেমস গ্রান্ট যখন ‘রেব্বা’ ও ‘চৌথ’-কে মেলাচ্ছেন, তখন তিনি বলতে চাচ্ছেন যে করের হার বা অনুপাত হিসেবে দুটিই এক (১/৪ অংশ)। কিন্তু ‘রেব্বা’ ছিল মুঘলদের নিজস্ব রাজ্যের ভেতরের নিয়মিত কর, আর ‘চৌথ’ ছিল মারাঠাদের দ্বারা বহিরাগত বা বিজিত অঞ্চল থেকে আদায় করা কর।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ