
টিকা ২
৩০ নম্বর সূত্রে আরও একটা অচর্চিত, অজানা বিষয় বলে যাই প্যাক্স মুঘলিকা বলে কিছুই হয় না। ১৭৬৫র পর বাংলায় যথেষ্ট পরিমান বাঙলা থেকে ফারসি অনুবাদক না থাকায় বিপুল পরিমান জমিদারি রেকর্ডস অনুবাদ না করিয়েই ব্রিটিশেরা লন্ডনে নিয়ে যায়। বাংলায় যে আদতে ব্রিটিশপূর্ব সময়ে স্থানীয় সরকারি কাজকর্ম স্থানীয় ভাষায় হত।
মুঘলেরা তিন রাজধানী আর সুবার দরবারে ফারসি ব্যবহার করলেও জেলায় জেলায় তার প্রায় ২০০ বছরেও সক্রিয় সাম্রাজ্যে প্যাক্স মুঘলিকা প্রযুক্ত করেনি — গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জমিদারির কাজপত্র স্থানীয় ভাষায় হত।
অথচ ব্রিটিশ উপনিবেশের শুরুর সময় থেকেই প্যাক্স ব্রিটানিকা অনুসরণে আজ প্রশাসনের থাকবন্দীর সব থেকে নিচের আমলাও ইংরেজিতে নোট লেখে। মুঘলদের ভাষাগত উদারতা বনাম ব্রিটিশদের (এবং উত্তর-উপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্থার) ভাষাগত আধিপত্য নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
১০০০ থেকে ১৭৬৫ পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়কে রিচার্ড ঈটন পার্সিয়ানেট এজ পারসিক যুগ Persianate Age আখ্যা দিচ্ছেন। প্রায় ১০০০ বছর ধরে উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম — পুরো ভারত ভূখণ্ড নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক বলয়ে থাকলেও তৃণমূল স্তরে আঞ্চলিক ভাষাগুলো কীভাবে টিকে রইল এবং কেন ব্রিটিশদের আসার সাথে সাথেই সেই ভারসাম্য চুরমার হল, সেই তত্ত্ব বোঝা জরুরি।
মুঘলদের প্যাক্স মুঘলিকা বা বৃহত্তর কৃষ্টি চাপানোর এজেন্ডা ছিল না, স্থানীয় ভাষা, কৃষ্টির স্বাধীনতা ছিল। মুঘলরা ভারতের অধিকাংশ অঞ্চল জয় করলেও সমাজের একদম তৃণমূল স্তর পর্যন্ত পারসিক কৃষ্টি চাপিয়ে দেয়নি। সুবার দরবারে (প্রাদেশিক রাজধানী যেমন ঢাকা বা মুর্শিদাবাদ) এবং উচ্চ আদালতের ভাষা ফারসি হলেও, জেলা, পরগনা বা গ্রামের জমিদারিতে স্থানীয় ভাষায় কাজ হত। কেন্দ্রে ফারসি সংস্কৃতি চালু থাকলেও স্থানীয় স্তরে এক ধরনের স্বায়ত্তশাসন ছিল। বাংলার জমিদার, কানুনগো, পাটোয়ারী এবং মহাজনরা তাঁদের দৈনন্দিন হিসাব, চুক্তিপত্র এবং কর আদায়ের খাতা সম্পূর্ণ নিজেদের ভাষায় (বাংলায়) রাখতেন। মুঘলরা কেবল তাদের কাছ থেকে ফারসিতে অনূদিত চূড়ান্ত হিসাব বা রাজস্বের অঙ্ক বুঝে পেলে সন্তুষ্ট থাকত। তারা তৃণমূলের ভাষাগত স্বাতন্ত্র্যকে ধ্বংস করেনি।
ব্রিটিশরা আসার পর পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। ১৮৩৫-এর মেকলের শিক্ষানীতি এবং ১৮৩৭-এ দপ্তরি ভাষা ফারসির উচ্ছেদ করে ইংরেজি চালু করে। এটাই নতুন ‘প্যাক্স ব্রিটানিকা’র ভাষাগত উপনিবেশিকতাবাদ। তারা এমন এক আমলাতান্ত্রিক কাঠামো তৈরি করে, যেখানে ক্ষমতা এবং আইনি বৈধতার একমাত্র ভাষা হয় ইংরেজি। আজ প্রশাসনিক থাকবন্দীর সব থেকে নিচের আমলাও ইংরেজিতে নোট লেখে উপনিবেশিক দাসত্বের অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতায়। স্বাধীন ভারতে (বা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশে) ফাইল বা প্রশাসনিক নোট যখন একদম নিচের স্তরের কর্মচারী বা আমলাও ইংরেজিতে লেখেন, তখন তা সাধারণ মানুষের সাথে প্রশাসনের এক বিরাট দূরত্ব তৈরি হয় – যদিও জাতিরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যটাই তাই। যে ভাষার সাথে সাধারণ গ্রামীণ মানুষের বিন্দুমাত্রও সংযোগ নেই, সেই ভাষায় প্রশাসন চালানো উপনিবেশিক ‘প্যাক্স ব্রিটানিকা’র সেই পুরনো মনস্তত্ত্ব টিকিয়ে রাখা, যেখানে ভাষা জ্ঞান বা যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে নয়, ‘শাসন/শোষণে হাতিয়ার’ হিশেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তাই উপনিবেশের প্রথম যুগে বাংলার জমিদারি নথিপত্র স্থানীয় ভাষাতেই রাখা হত – রাষ্ট্রভাষা বলে কিছু ছিল না। উপনিবেশে ভাষা-সংকটের এই বিবরণ ঐতিহাসিক ও ভাষাতাত্ত্বিক উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত সত্য।
সুমিত গুহ এবং বাংলাদেশের বরেণ্য পণ্ডিত ড. আনিসুজ্জামান — দুজনেই নিজ নিজ গবেষণায় এই ঐতিহাসিক সত্য উন্মোচন করেছেন। সুমিত গুহ বলছেন বাংলায় ফারসি অনুবাদকের সংকট ও জাহাজ বোঝাই বাংলা দলিলের কথা। পলাশী চক্রান্ত, বিশেষ করে ১৭৬৫ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি রাজস্ব আদায়ের অধিকার পাওয়ার পর নজিরবিহীন প্রশাসনিক সংকটে পড়ে। মুঘল রীতি অনুযায়ী কোম্পানির কাছে রাজস্বের কেন্দ্রীয় হিসাব ফারসিতে জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু তৃণমূল স্তরের লাখ লাখ জমিদারি দলিল, পাটোয়ারী ও কানুনগোদের হিসাব (যাকে জেমস গ্রান্ট ‘হিন্দুয়াত’ বা ‘হিন্দোভিয়াত’ বলেছেন) ছিল সম্পূর্ণ বাংলায় লেখা হচ্ছে। ব্রিটিশদের ফার্সি অনুবাদক থাকলেও বাঙলা অনুবাদক ছিল না [দুবাস বা দোভাষী বাদ দিয়ে]। এত বিপুল পরিমাণ বাংলা দলিল রাতারাতি ফারসিতে রূপান্তর করার মতো বাংলা থেকে ফারসি অনুবাদক বা পেশাদার মুহুরি সে যুগে পাওয়া যায়নি। কোম্পানি যখন বাংলার প্রকৃত রাজস্বের উৎস ও জমির মালিকানা খোঁজার চেষ্টা করছিল, তখন তারা কোনো উপায় না দেখে জমিদারি সেরেস্তার বাংলা দলিলগুলোই বস্তা বোঝাই করে লন্ডনে কোম্পানির সদর দপ্তরে (ইন্ডিয়া হাউস) পাঠিয়ে দেয়। এই বিপুল পরিমাণ কাগজের একটি বড় অংশ পরবর্তী সময়ে UK National Archives এবং লন্ডনের British Library-র (সাবেক ইন্ডিয়া অফিস রেকর্ডস) আর্কাইভে জমা হয়। সুমিত গুহ বলেছেন, এই নথিপত্রের বিরাট অংশ আজও ঐতিহাসিকদের দ্বারা অবিকৃত, অসংস্কৃত এবং যথাযথভাবে ক্যাটালগ বা ক্লাসিফাই না করা অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
ড. আনিসুজ্জামান Factory Correspondence and other Bengali Documents in the India Office Library and Records (১৯৮১) বইতে এই দলিলের ওপর সুনির্দিষ্ট কাজ করেছেন। ড. আনিসুজ্জামান লন্ডনের British Library (India Office Records)-এ সংরক্ষিত বাংলা নথিপত্রগুলো পরীক্ষা করে দেখিয়েছেন যে, সেখানে ঢাকার কমার্শিয়াল রেসিডেন্টদের সাথে দেশীয় এজেন্টদের চিঠিপত্র, কাপড়ের ব্যবসার হিসাব এবং রাজস্বের অজস্র মূল বাংলা রেকর্ড রয়েছে – কিন্তু সে সব অবিন্যস্ত ও অজ্ঞাত অবস্থায় পড়ে আছে — ক্ল্যাসিফায়েড হয় নি। কোম্পানির এই বাংলা রেকর্ডের সিংহভাগ আন-ক্ল্যাসিফাইড (Unclassified) বা বিন্যস্ত ও সূচিপত্রভুক্ত নয়। আঠারো ও উনিশ শতকের বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতি, ভাষা ও সমাজের এক বিশাল প্রাথমিক উৎস (Primary Source) গবেষকদের নাগালের বাইরে থেকে গেছে।
ইতিহাসের এই সত্য কেন গুরুত্বপূর্ণ? — প্রথমত বাংলার জমিদারি নিয়ে কাজ মূলত মিথ্যেবাদী উপনিবেশিকদের সূত্রে আজও হয়ে চলেছে — আম্প্রা এখনও মূল নথিতে পৌঁছনোর গুস্তাখি করি নি। দ্বিতীয়ত মনে করা হয় মুঘল আমলের দপ্তরি থাকবন্দীর সব কাজ ফারসিতে রাখা হত। সুমিত গুহ, আনিসুজ্জামান বলছেন, ব্রিটিশ উপনিবেশের ভিত্ত দাঁড়িয়ে ছিল অর্থনৈতিক শোষণে। লন্ডনের আর্কাইভে বাংলায় লেখা সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের এক খনি এখনও অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে।
সুমিত গুহ Empires, Languages, and Scripts in the Perso-Indian World প্রবন্ধ আর আনিসুজ্জামান Factory Correspondence and other Bengali Documents সূত্রে।
টিকা ৩
ওজুহাত — অর্থাৎ রাজস্বের বিভিন্ন খাত বা অনুচ্ছেদ। ওজুহাত’ (Wujuhat) আরবি ‘ওয়াজাহ’-র (Wajah) বহুবচন ‘উজুহ’-রও (Wujuh) বহুবচন (جمع الجمع বা double plural – বহুবচনের বহুবচন)। সাধারণ অভিধানে এর অর্থ “কারণ”, “দালিলি যুক্তি” বা “কৈফিয়ত”। মুঘল আমলে ভূমি আর রাজস্ব ব্যবস্থায় ‘ওজুহাত’ (Wujuhat) বলতে ভূমি রাজস্বের (Land Revenue) বাইরে আদায় করা নানা ধরণের কর, উপকর, শুল্ক, অনুচ্ছেদ বোঝাত। অনেক ক্ষেত্রে গৃহপালিত পশুর ওপর ধার্য কর (Cattle Tax) বোঝাত। মুঘল আমলে মোট রাজস্ব বা ‘জমা’র (Jama) প্রধান অংশ আসত ভূমি থেকে, আর বাকি অংশ আসত বাণিজ্যিক শুল্ক ও বিভিন্ন বিবিধ কর থেকে, যা নথিপত্রে সামগ্রিকভাবে ‘ওজুহাত’ বা ‘সায়ের-জিহাত’ (Sair-jihat) নামে লিপিবদ্ধ থাকত। সূত্র -Bashir Ahmad Qureshi, Standard Twentieth Century Dictionary (Urdu into English)
টিকা ৪
কোলা পূষণ (Kola Pooshan)-এর প্রকৃত রূপ “কোলাপোষ” বা “টুপি পরিহিত ইওরোপীয়” — এবং গ্রান্টের রাজস্ব প্রস্তাবে এটি মূলত ইওরোপীয় কারখানা বা বাণিজ্যকুঠি-কে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে এর সঙ্গে তিন বা চারটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি — এই বিষয়টি একটু স্পষ্ট করা দরকার। “কোলাপোষ” হল ফারসি “কুলাহ” (টুপি) এবং “পোষ” (পরিধান)। মুঘল ও উপনিবেশিক বাংলায় এই শব্দ দিয়ে সেই সব ইওরোপীয়কে বোঝানো হতো — যারা পাগড়ি বা দেশীয় পোশাকের বদলে ইওরোপীয় ধাঁচের টুপি পরতেন। ভারতচন্দ্র রায় গুণাকরের লেখায় “কোলাপোষের নিবাস ইঙ্গরেজ ওলন্দাজ ফিরিঙ্গি ফরাস” বলে এই ইওরোপীয়দের কথাই বোঝানো হয়েছে।
গ্রান্টের রাজস্ব তালিকায় “কোলা পূষণ — ইওরোপীয় কারখানা” খাতটি ছিল ইওরোপীয় বণিকদের বাণিজ্যকুঠি বা কারখানা-এর ওপর ধার্যকৃত শুল্ক বা কর। এই কারখানাগুলো ছিল মূলত — ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি-র কুঠি (কলকাতা, কাশিমবাজার, হুগলি, চট্টগ্রাম ইত্যাদি); ওলন্দাজ কুঠি (চুঁচুড়া, হুগলি); ফরাসি কুঠি (চন্দননগর); পর্তুগিজ বসতি (হুগলি, সপ্তগ্রাম)।
তবে গ্রান্টের হিসাবে এই খাতের পরিমাণ ছিল ৫,৬৫,০০০ টাকা — যা মূলত এই ইওরোপীয় কারখানাগুলোর বাণিজ্য, শুল্ক ও আবগারি থেকে আদায় করা এরা হল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (১৬০০); ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (VOC, ১৬০২); ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (১৬৬৪); ড্যানিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (১৬১৬) — তবে এরা বাংলায় সেভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি, তবে ত্রাঙ্কুবার ও শ্রীরামপুরে তাদের বসতি ছিল। এই চার কোম্পানির মধ্যে ব্রিটিশ, ওলন্দাজ ও ফরাসি — এই তিনটিই বাংলায় সবচেয়ে সক্রিয় ছিল। গ্রান্টের “কোলা পূষণ” খাতটি মূলত এই তিন বা চার কোম্পানির বাণিজ্যকুঠি থেকে আদায়কৃত রাজস্বকে বোঝায়।
করের প্রকৃতি ছিল সায়ের — অর্থাৎ বাণিজ্য, শুল্ক ও আবগারি থেকে পাওয়া রাজস্ব। গ্রান্ট একে “ইওরোপীয় কারখানার ওপর কর” বলে অভিহিত করেছেন। তবে এটি কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির ওপর সরাসরি কর ছিল না; বরং কারখানাগুলোর রপ্তানি-আমদানি, গুদাম, শুল্ক ও লাইসেন্স-এর ওপর ধার্যকৃত বিভিন্ন করের সমষ্টি ছিল।
গ্রান্ট এই খাতটি উল্লেখ করেছেন মূলত প্রমাণ করার জন্য — ইওরোপীয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। ব্রিটিশরা যখন দেওয়ানি লাভ করে, তখন এই ইওরোপীয় কারখানাগুলোর ওপর ধার্যকৃত করও কোম্পানির আয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু গ্রান্টের মূল অভিযোগ — দেশীয় প্রশাসন এই খাতের প্রকৃত পরিমাণ গোপন করেছিল এবং ইচ্ছাকৃতভাবে তা কমিয়ে দেখিয়েছিল।
এই ছোট্ট কথা গ্রান্টের মিনিটের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও উপনিবেশিক প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক খুলে ধরে — এই বাংলায় ইংরেজ, ওলন্দাজ, ফরাসি ও পর্তুগিজ — সবাই বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত ছিল।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ