
আজ থেকে ঠিক ৫০/৬০ বছর আগের কথা। ধরা যাক ১৯৬৯-৭০ সাল। কলকাতার বড়ো পুজো বলতে ছিল ১ নম্বরে নাম করতে হয় ফায়ার ব্রিগেডের পুজো, মহম্মদ আলি পার্কের পাশেই হত। রমেশ পাল এই একটি মাত্র ঠাকুর গড়তেন। তখন কলকাতা ও আশেপাশে লোকসংখ্যা কম ছিল। সারারাত সুবার্বন ট্রেন চলতো না, মেট্রোরেল ছিলই না। তবুও বাসে, ট্রামে চেপে সন্ধ্যে থেকে ভোর পর্যন্ত পায়ে হেঁটে মন্ডপ ও প্রতিমা দর্শনে প্রবল আগ্রহ ছিল। উত্তর কলকাতায় বড়ো পুজো বলতে বাগবাজার সার্বজনীন, রবীন্দ্রকানন, সিমলা ব্যায়াম সমিতি, ফায়ার ব্রিগেড, কলেজ স্কোয়ার, সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার। দক্ষিণে ম্যাডক্স স্কোয়ার, ২৩ পল্লী, সমাজসেবী, সঙ্ঘশ্রী। পূর্বে ছিল পার্ক সার্কাস, পশ্চিমে খিদিরপুরের ২৫ পল্লী। অর্থাৎ একটা বাঁশ বাগবাজারে একটা বাঁশ কবিতীর্থে তৃতীয়টা কালীঘাটের সঙ্ঘশ্রী, চতুর্থটা পার্ক সার্কাস। এই ছিল কলকাতার দুর্গাপুজোর ক্ষেত্রফল। লম্বায় ১০ কিমি চওড়ায় ৭/৮ কিমি। ৭০/৮০ বর্গ কিমি।
বর্তমানে কলকাতার পুজোর ক্ষেত্রফল বেড়ে গেছে। উত্তর-পূর্ব কোনে শ্রীভূমি, উত্তরে টালা প্রত্যয়, দক্ষিণ-পশ্চিমে বরিষা, হরিদেবপুর, দক্ষিণ-পূর্বে নাকতলা উদয়ন সংঘ, পূর্বে বোসপুকুর শীতলা মন্দির, রাজডাঙা এমন আর কতো পুজো। টালা থেকে বরিষা ২৩/২৪ কিমি। ২৫ পল্লী থেকে রাজডাঙা ১০ কিমি অর্থাৎ ক্ষেত্রফল দাঁড়াল ২৫০ কিমি। সেই সময় কলকাতার বড়ো পুজো বলতে ছিল হাতে গোনা ১০/১২টা। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর পরিকল্পনায় বিসর্জনের যে কার্নিভাল হত তাতে হাওড়া বাদে কলকাতারই ১০০টা ঠাকুরকে নিয়ে যাওয়া হতো। এ বচর আর কার্নিভাল হবে না। নতুন সরকারের নতুন মুখ্যমন্ত্র বলেছেন ও সব ব্যাক ডেটেড। সত্যি এখন কলকাতার বুকে কতো বড়ো বড়ো পুজোরে বাবা! গুনে শেষ করা যাব না।
বিধাননগরের বড়ো পুজোগুলো ছেড়েই দিলাম। শ্রীভূমি থেকে শুরু করে উল্টোডাঙা হয়ে তেলেঙ্গাবাগান, টালাপার্ক, গৌরীবাড়ি, বাগবাজার, দর্পনারায়ণ স্ট্রীট, সিমলা, কাশীবোস লেন, হাকিবাগান সার্বজনীন, কুমারটুলি, মহম্মদ আলি পার্ক, কলেজ স্কোয়ার, শিয়ালদহ, সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার, পার্ক সার্কাস, একডালিয়া, রাজডাঙা, বোসপুকুর শীতলা মন্দির, বোসপুকুর তালবাগান, বাবুবাগান, যোধপুরপার্ক, সন্তোষপুর লেক, গড়িয়া মিতালী সংঘ, নাকতলা উদয়ন সংঘ, হরিদেবপুর স্পোর্টিং ক্লাব, অজেয় সংহতি, ৪২ পল্লী, বরিষা স্পোর্টিং, নিউ আলিপুরের সুরুচি সংঘ, চেতলা অগ্রণী, মুদিয়ালি, শিবমন্দির, ৬৬ পল্লী, বাদামতলা আষাঢ় সংঘ, ম্যাডক্স স্কোয়ার, ২৩ পল্লী, ২৫ পল্লী এমন আরও বডো বড়ো পুজো মন্ডপ আছে।
তখন পুজোর প্যান্ডেল শুরু হতো ১ মাস আগে। প্যান্ডেলের বৈশিষ্ট্য বলতে ছিল কাপড়ের কুঁচির কাজ। পঞ্চমির রাত থেকে মন্ডপে প্রতিমা আনা হতো। ষষ্ঠির সন্ধ্যায় বোধন হতো। পাড়ার প্রবীণ নাগরিক জ্যেঠু অথবা মেশোমশাই, উদ্বোধন করতেন। দশমিতেই ঠাকুর বিসর্জন হতো। দশমি মঙ্গলবার পরলে একাদশিতে ভাসান হতো। ৫০ বছর আগে যে চালের দাম ছিল ১টাকা কিলো সেটা এখন হয়েছে ৫০ টাকা, অর্থাৎ ৫০ গুণ বেড়েছে। তখন বড়ো পুজোর বাজেট ছিল, ৭০/৮০ হাজার কিংবা খুব বেশি হলে ১ লাখ টাকা। এখন বড়ো পুজোর বাজেট ৩/৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ বাজেট বেড়েছে কম করে ২০০ গুণ। শুনেছি তাতেও নাকি কুলিয়ে ওঠা যায় না।
টাকার দাম যতই কমুক, পুজোর বাজেট এখন অনেক বেশি বেড়েছে। শুধু তাই নয়, ৫০ বছর আগে কলকাতার দক্ষিণ ও পূর্ব প্রান্তে যেখানে শেয়াল ডাকতো, উদ্বাস্তুদের ছিটেবেড়ার ঘরের সংখ্যা বেশি ছিল, সেখানেই এখন রমরমিয়ে পুজো হচ্ছে। কলকাতার উত্তর-পূর্ব প্রান্তের পুজো কমিটি দর্শক টানতে ঘোষণা করলো তাঁদের মূর্তি সোনায় মোড়া। সেই সোনার ঠাকুর দেখতে লোক ভিড় করলো। ভিড়ের ইতিহাসে তামিলনাড়ুর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এম জি রামচন্দ্রনের শেষ যাত্রাকে টেক্কা দিল সন্তোষ মিত্র স্কয়ারের দুর্গা।

তখন বাইপাস হয় নি। জোড়ামন্দিরের পর ৩৫নং বাস স্ট্যান্ড। এখন বাস স্ট্যান্ড নেই তবে নামটা রয়েগছে। ওইখান পর্যন্ত কলকাতার শেষ পিঁচের রাস্তা ছিল। এখন যেখানে স্টেডিয়াম ওখানটা ছিল বালির চর। এই বালিরচরের মানুষেরাই বর্তমানে সিআইটি বিল্ডিং-এর বাসিন্দা। আমরা খালের (এই খালের নাম বিদ্যেধরী নদী) ওপর বাঁশের সাঁকো পার হয়ে দলবদ্ধ হয়ে হাঁটতে হাঁটতে যেতাম ঘুঘুর বাড়িতে ঠাকুর দেখতে। কলকাতার সবচেয়ে বড়ো জলাভূমি তখন সমুদ্রের মতো। এপার ওপার দেখা যেত না। অন্ধকার ঘুটঘুটে রাস্তায় শেয়াল চরে-বেরাত। এখন সেই ঘুঘুর বাড়ি আছে কিনা জানিনা। হয়তো প্রমোটাররা নিয়ে মাল্টি স্টোরেড বিল্ডিং বানিয়ে ফেলেছে।
সেকালের পুজোয় উদ্যোক্তাদের টার্গেট ছিল নিষ্ঠার সঙ্গে পুজো করবো। আর ৪ দিন প্রানভরে আনন্দ করবো। তখন আবাসনের পুজো বলতে কিছুই ছিলো না। এত আবাসনও ছিল না। রিয়েল এস্টেট ব্যবসাও ছিল না। তবে কলকাতার ৫০/৬০টা বনেদি বাড়িতে পুজো হতো। একালের পুজো উদ্যোক্তাদের টার্গেট হলো — ১. নাম করবো, ২. টিভিতে লাইভ দেখালে ভালো হয়, ৩. গোটা ১৫/১৬ বিভিন্ন কোম্পানীর তোরণ থাকবে, ৪. বিভিন্ন কমিটির বিচারকদের দ্বারা পুরস্কৃত হবো, যাতে পরের বছর আরও বড়ো স্পনসর পাওয়া যায়। টাকা এবং পাবলিসিটি হাত ধরাধরি করে চলে। সেকালে খুঁটিপুজো বলে কোনও জিনিস ছিল না। একালে টালিগঞ্জ পাড়ার অভিনেতা অভিনেত্রীকে ডেকে এনে খুঁটি পুজোর দিন থেকে শুরু হয় পাবলিসিটি। সেকালেও চন্দননগরে আলোক শিল্পীরা ছিলেন। তাঁরা দেখাতেন ডিউক পিনাকির আন্দামান যাত্রা, একালের আলোক শিল্পীরা দেখাতে চান ‘সকালে জমা বিকেলে খরচ’।
সেকালের বড়ো পুজোর বাজেটে ৩০ শতাংশ আসতো পাড়ার লোকের চাঁদা থেকে। আর ৭০ শতাংশ পাওয়া যেত সুভেনিরে বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করে, আর কিছু হাতেগোনা কোম্পানির হোর্ডিং। এই বাটা, বোরোলিন, ডানলপ এমন হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানি। এখন যে পুজোর বাজেট ২ কোটি টাকা তার ২ শতাংশ অর্থাৎ ৪ লাখ টাকাও পাড়ার মানুষের চাঁদা থেকে সংগৃহীত হয় না। এখন সুভেনির মানে হলো, পুরনো দিনের টেলিফোন ডিরেক্টরির মতো বিরাট বই, আর মহালয়া থেকে কোজাগরী পূর্ণিমা পর্যন্ত তোরণ হোর্ডিং থেকে সংগৃহীত অর্থ। সেকালে পাড়ায় ২/৪টি উচ্চবিত্ত পরিবার ছিল। তাদের পরিবারের কেউ কেউ বড়ো কোম্পানিতে উচ্চপদে চাকরি করতেন। তাঁরাই কিছু বিজ্ঞাপন ও হোর্ডিং-এর ব্যবস্থা করে দিতেন। তারাই কিন্তু পাড়ার পুজোর বড়ো, মেজো, সেজো, ছোট কর্মকত্তা হতন।
একালে কি হয় — রাজনৈতিক দাদার সহচর বিভিন্ন কোম্পানিতে ফোন লাগিয়ে বলেন, বছরের এই সময়টাতেই তো দেখেন, ভুলে যাচ্ছেন। আবার এটাও ঠিক বিগত ২০ বছরে বোসপুকুর, রাজডাঙা থেকে শুরু করে বরিষা ওদিকে শ্রীভূমি বহু উচ্চপদস্থ, উচ্চবিত্ত ব্যবসায়ীর আবাসস্থল হয়েছে। পয়সাওয়ালা লোক, এখন আর শুধু বাগবাজার থেকে বালিগঞ্জের মধ্যেই থাকেন না, অনেক বেশি পয়সাওয়ালা লোক থাকছেন দক্ষিণদাঁড়ি লেকটাউনে। এখন উদ্বোধন থেকে সিঁদুর খেলা সংবাদপত্র তো বটেই, টিভিতে একঝলক না দেখাতে পারলে মন সন্তুষ্ট হয় না। আমার বেশ মনে আছে, মানিকতলার কাছাকাছি একটা পুজোতে ২০১৯ সালে বিজয়া দশমীর দিন সিঁদুর খেলায় ১০ জন সেলিব্রিটি অভিনেত্রী এসেছিলেন সিঁদুর খেলতে, প্রত্যেককে ৫০,০০০ হাজার টাকা করে দিতে হয়েছে। মা শ্বশুর বাড়ি যাবেন তাঁকে সিঁদুর পরিয়ে দেওয়ার পর, ঠোঁটে সন্দেশ ঘষার জন্য এগিয়ে আসছেন নামকরা সন্দেশ কোম্পানি। কোম্পানি ও ঠিকেদারের কাছে একালের দুর্গাপুজো হলো বিজ্ঞাপনের মাধ্যম তো বটেই আবার যাকে খুশি করলে কাজ হবে, তেমন মানুষদের সন্তুষ্ট করারও সুযোগ বটে। সে ক্ষেত্রে ৫/১০ লাখ টাকা দিয়ে ৫/১০ কোটি টাকার কাজ পাওয়া যাবে।
তবে হ্যাঁ কলকাতার দুর্গাপুজো এখন একটা ইন্ডাস্ট্রি। এই সময় বাজারে ৮০ হাজার থেকে ১ লক্ষ কোটি টাকার টার্নওভার হয়। এর জিএসটি কত হয় একবার হিসেব করলে মাথা ঘুরে যাবে। এই জিএসটির ৫০/৬০ শতাংশ কিন্তু সরকারের আয়। সেটাও কিন্তু খুব একটা ছোটখাটো ব্যাপার নয়। তাছাড়া সমাজের সর্বস্তরের মানুষ তাদের বিভিন্ন পেশা নিয়ে পুজোয় অংশগ্রহন করে কিছু বারতি রোজগারও করে থাকে। সবশেষে বলা যেতে পারে উৎসবকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়।