| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘টেবিলের নিচে একটি দেশ’ বানভাসি এলাকায় মানুষ ও সাপের সহাবস্থান, দংশনে বাড়ছে মৃত্যু : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘সংকোচ’ পাখণ্ডী শব্দটির অর্থ যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়েছে : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ লাইন অব প্যাসেজ — সংগ্রামী জীবনের দর্পণ : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার কেন উত্তম মহানায়ক : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ হড়পা বানের হাড়হিম করা দৃশ্য : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উত্তম কুমার : বাঙালির সমাজভাষ্য, মূল্যবোধ ও মনস্তাত্ত্বিক উত্তরাধিকার : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় গৈরিক নয়, ‘গৈরেয়’ শব্দটি থেকেই এসেছে ‘গেরুয়া’ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাঙালিয়ানা ও উত্তম কুমার: সংস্কৃতির দর্পণে এক অনন্য মহাকাব্য : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় বিচিত্র লোক সংস্কৃতি — নন্দোৎসবে নারকেল কাড়াকাড়ি : সুব্রত দত্ত গড়িয়াহাট কি ছিল অলস, অকর্মণ্য বলদের হাট : অসিত দাস চলচ্চিত্র অভিনয়ের সংজ্ঞা ছিলেন উত্তম : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আমার প্রিয় গল্পগুলো : নুসরাত সুলতানা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার কবিদের লেখনীতে শরৎ ঋতু : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নিঝুম রাতের পাড়ি : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ রাখি পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘টেবিলের নিচে একটি দেশ’

Reporter
অয়ন মুখোপাধ্যায় / ১৪৬ Views জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

লোকটা প্রথমে টেবিলটার দিকে তাকাল। তারপর আমার দিকে। আবার টেবিলটার দিকে।

যেন যাচাই করছে — আমি আসল, না টেবিলটা আসল।

তারপর চা-ওয়ালাকে বলল, “এটা কোথা থেকে পেলেন?”

চা-ওয়ালা তখন কেটলির মুখে কাপ বসিয়ে চা ছাঁকছিল। প্রশ্নটা শুনে বিরক্ত হল। কলকাতায় চায়ের দোকানে মানুষ সাধারণত চায়ের দাম, সিগারেট আছে কি না, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ফুটবল ক্রিকেট এইসব নিয়ে প্রশ্ন করে টেবিলের বংশপরিচয় জানতে চায় না।

সে বলল, “কোনটা?”

“এই টেবিল।”

“পুরনো মাল।”

“কোথা থেকে?”

চা-ওয়ালা এবার লোকটার দিকে তাকাল।

“কেন? আপনার?”

লোকটা উত্তর দিল না।

আমি তখন কলেজ স্ট্রিটের ওই গলির দোকানে বসে একটা বইয়ের প্রুফ দেখছিলাম। গলিটা এমনই সরু যে রোদ ঢুকলে তাকে আগে দুটো মোটরবাইক কে, তিনটে বইয়ের বস্তা  ক আর এক বেকার যুবককে পাশ কাটাতে হয়।

টেবিলটা সত্যিই পুরনো। মোটা কাঠ। একদিকে পোড়া দাগ। ডান দিকের ড্রয়ারটা নেই। পায়ের কাছে সাদা রঙের। একসময় কোনও নম্বর লেখা ছিল, এখন শুধু ‘১৭’ দেখা যায়।

লোকটা হাত দিয়ে সেই সংখ্যাটার উপর আঙুল বোলাল।

তারপর আমার উল্টো দিকে বসে পড়ল।

আমি বললাম, “চেনা লাগছে?”

সে বলল, “খুব।”

“আপনার অফিসের?”

লোকটা চমকে আমার দিকে তাকাল।

“আপনি জানলেন কী করে?”

আমি বললাম, “অনুমান। প্রাক্তন প্রেমিকার টেবিল হলে এইভাবে পায়ের নম্বর দেখতেন না।”

লোকটা প্রথমবার হাসল।

বয়স পঞ্চাশের একটু বেশি। শার্টটা পরিষ্কার, কিন্তু ইস্ত্রি বহুদিনের। বুকপকেটে একটা কালো রঙের পেন। যে-পেন দিয়ে সম্ভবত আজ আর কিছু লিখতে হয় না। কিন্তু বুক পকেটে পেনটা থাকলে এখনো মানুষ তাকে চাকরিজীবী বলে মনে করে।

সে বলল, “আমি অমল।”

আমি নিজের নাম বললাম না। লেখকরা মাঝে মাঝে এই সুবিধেটুকু নেয়।

অমলবাবু আবার টেবিলের নিচে তাকালেন।

চা-ওয়ালা দূর থেকে বলল, “কিছু পড়ে গেছে?”

“না।”

“তা হলে?”

অমলবাবু বললেন, “এখানে একটা দেশ ছিল।”

চা-ওয়ালা আর কোনও প্রশ্ন করল না। তার দোকানে নিশ্চয়ই এর চাইতে  বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে সে চুপ করে রইল।

আমি প্রুফ বন্ধ করলাম।

“দেশ?”

“হ্যাঁ।”

“টেবিলের নিচে?”

“হ্যাঁ।”

আমি চায়ে চুমুক দিলাম। কলকাতায় অপরিচিত কেউ যদি বলে তার টেবিলের নিচে দেশ ছিল, তাকে সঙ্গে সঙ্গে পাগল ভাবা উচিত নয়। কারণ কলকাতা এইসব আপনার জন্য বিখ্যাত আর এখানে বহু সুস্থ মানুষ ও এই  অদ্ভুত জিনিস নিয়ে বিশ্বাস করে।

অমলবাবু বললেন, “আপনি হাসছেন না কেন?”

“দেশ হারানো নিয়ে হাসা ঠিক হবে না।”

তিনি একটু নিশ্চিন্ত হলেন।

“বসতে দেবেন?”

আমি বললাম, “বসে তো আছেন।”

“নিচে।”

আমি ভেবেছিলাম ভুল শুনেছি।

অমলবাবু চেয়ার সরালেন। তারপর সত্যিই টেবিলের নিচে ঢুকে পড়লেন।

চা-ওয়ালা এবার হাঁ করে তাকিয়ে রইল।

দোকানের অন্য টেবিলে বসে থাকা দুজন ছাত্র মোবাইল নামিয়ে দিল। একজন সম্ভবত ছবি তুলতে যাচ্ছিল। আমি চোখের ইশারায় বারণ করলাম।

অমলবাবু হাঁটু গুটিয়ে মিনিটখানেক বসে রইলেন।

কোনও কথা নেই।

শুধু তাঁর জুতোর সামনের অংশ দেখা যাচ্ছে।

বাইরে ট্রামের ঘণ্টা বাজল। একটা ঠেলাগাড়ি বই নিয়ে গেল। পাশের দোকান থেকে কেউ চেঁচাল, “বাংলা ব্যাকরণের দ্বিতীয় খণ্ড আছে?”

অমলবাবু নিচ থেকেই বললেন, “না। নেই।”

আমি বললাম, “কী নেই?”

“দেশটা।”

তারপর তিনি বেরিয়ে এলেন।

শার্টের কাঁধে ধুলো।

মুখটা আগের চেয়ে অনেক বয়স্ক।

চা-ওয়ালা এবার নিজেই এক গ্লাস জল দিল।

অমলবাবু জল খেলেন। তারপর বললেন, “টেবিলটা ওইটাই। কিন্তু দেশটা নেই।”

আমি বললাম, “টেবিল নিশ্চিত?”

“সতেরো নম্বর। ডানদিকে সিগারেটের পোড়া দাগ। ড্রয়ারের হাতল ভাঙা ছিল। আমি নিজেই সুতো দিয়ে বেঁধেছিলাম।”

তিনি পোড়া জায়গাটা দেখালেন।

“আমাদের অফিসে ছিল। তেত্রিশ বছর চাকরি করেছি। শেষ এগারো বছর এই টেবিলে।”

আমি বললাম, “কীসের অফিস ছিল?”

তিনি প্রতিষ্ঠানের নাম বললেন। নামটা শুনে বুঝলাম, সরকারি নয়, বেসরকারিও নয়; কলকাতায় এমন কিছু অফিস থাকে যাদের প্রধান কাজ হল মানুষকে একটি ঘর থেকে আরেকটি ঘরে পাঠানো।

“দুপুরে আমি মাঝে মাঝে এর নিচে বসতাম।”

“কেন?”

“প্রথমে কোমর ব্যথার জন্য।”

আমি হেসে ফেললাম।

অমলবাবুও হাসলেন।

“আপনি ভেবেছিলেন খুব দার্শনিক কারণ?”

“একটু।”

“না। প্রথম দিন ফাইল তুলতে গিয়ে নিচে ঢুকেছিলাম। তারপর দেখি জায়গাটা খারাপ নয়।”

এরপর তিনি বলতে শুরু করলেন।

বস তাঁকে দেখতে পেত না। ফোনের রিং একটু দূরের মনে হত। সহকর্মীরা কার বেতন বাড়ল, কার বদলি হল, কে কার নামে কী বলল — এই সব শব্দ টেবিলের কাঠে এসে আটকে যেত।

“তারপর অভ্যাস হয়ে গেল। দুপুরে পাঁচ মিনিট। কখনও দশ।”

“কেউ জানত?”

অমলবাবু একটু থামলেন।

“একজন জানত।”

“কে?”

তিনি উত্তর দেওয়ার আগেই ফোন বেজে উঠল।

স্ক্রিনে তাকিয়ে ফোনটা কেটে দিলেন।

আবার বাজল।

আবার কাটলেন।

আমি বললাম, “ধরুন। জরুরি হতে পারে।”

“বাড়ি থেকে।”

“বাড়ির ফোন কখনো জরুরি হয় না?”

তিনি আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন, “আপনি বিবাহিত?”

আমি বললাম, “এই প্রশ্নের সঙ্গে ফোনের কী সম্পর্ক?”

“থাকলে বুঝতেন।”

আমি আর চাপ দিলাম না।

চা এল।

তিনি বললেন, “আমার স্ত্রী ভাবে আমি বাইরে বেরোলেই কোনও পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাই। ছেলে ভাবে আমার মাথার সমস্যা হয়েছে।”

“আপনার কী মনে হয়?”

“আমারও তাই মনে হয়। তবে মাথার সমস্যাটা শুধু আপনার কিনা , সেটা বুঝতে পারছি না।”

দোকানের ছেলেটা পাশে বিস্কুট রেখে গেল।

অমলবাবু একটা তুলে অনেকক্ষণ দেখলেন। তারপর রেখে দিলেন।

“চাকরি ছাড়লেন কবে?”

“দুই বছর।”

“অবসর?”

“আমার অনেকদিন চাকরি ছিল কিন্তু আমি স্বেচ্ছা অবসর নিয়েছিলাম।”

“তফাত?”

“খুব।”

এই প্রথম তাঁর গলায় একটু রাগ এল।

“অফিসটা বদলাল। নতুন মালিক, নতুন ম্যানেজমেন্ট, নতুন শব্দ। ‘ওয়ার্কস্টেশন’, ‘টিম স্পেস’, ‘ট্রান্সপারেন্সি’। পুরনো টেবিল সরিয়ে কাঁচের টেবিল আনল।”

তিনি কাঁচ শব্দটা এমনভাবে বললেন যেন সেটা কোনও রোগ।

“ওই কাঁচের টেবিলে নিচে বসার উপায় নেই। সবাই সব দেখতে পায়।”

আমি বললাম, “অফিসের মতে সেটাই তো স্বচ্ছতা।”

অমলবাবু হেসে উঠলেন।

“স্বচ্ছতা খুব নিষ্ঠুর জিনিস। সব দেখা যায়। কিন্তু কিছুই বোঝা যায় না।”

এই কথাগুলো বলে তিনি আর কোনো কথা বললেন না।

আমি খেয়াল করলাম, তাঁর ফোন আবার জ্বলছে। এবার একটা মেসেজ এসেছে।

স্ক্রিনে শুধু দুটো শব্দ চোখে পড়ল —

বাবা তুমি কোথায়?

অমলবাবু ফোন উল্টে রাখলেন।

আমি কিছু বললাম না।

কিছুক্ষণ পরে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার কি কোনও জায়গা আছে?”

“কীসের?”

“যেখানে গেলে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করবে না।”

আমি উত্তর দিতে পারলাম না।

তিনি বললেন, “ছিল?”

আমি বললাম, “হয়তো।”

“এখন নেই?”

“সম্ভবত ফোন এসে গেছে।”

অমলবাবু এইবার বেশ জোরে হাসলেন।

চা-ওয়ালা তাকাল।

তিনি বললেন, “ঠিক বলেছেন। ফোন আসার পর পৃথিবীতে নির্জনতা উঠে গেছে।”

তারপর হঠাৎ টেবিলের বাঁ দিকে ঝুঁকে কিছু দেখতে লাগলেন।

“কী হল?”

“এখানে আঁচড়টা নেই।”

“কীসের আঁচড়?”

তিনি নখ দিয়ে কাঠের তলায় হাত চালালেন।

“একটা নাম লেখা ছিল।”

“কার?”

অমলবাবু এবার আর উত্তর দিলেন না।

ঠিক তখন দোকানের সামনে একটি ছেলে এসে দাঁড়াল।

বয়স বাইশ-তেইশ। ভিজে চুল। শ্বাস দ্রুত। হাতে হেলমেট।

দোকানের ভিতর তাকিয়ে অমলবাবুকে দেখে থমকে গেল।

“কাকু!”

অমলবাবু মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।

ছেলেটা কাছে এল।

“ফোন ধরছেন না কেন?”

“তুই এখানে কী করছিস?”

“আমরা সব জায়গায় আপনাকে খুঁজছি।”

“এই আমরা টা কারা?”

ছেলেটা এবার আমার দিকে তাকাল। অচেনা লোকের সামনে পারিবারিক খবর বলতে ইতস্তত করছে।

অমলবাবু বললেন, “বল।”

“অর্ণবকে পাওয়া যাচ্ছে না।”

অমলবাবুর মুখ বদলাল না।

শুধু তাঁর ডান হাতটা কাপের হাতলে শক্ত হয়ে রইল।

ছেলেটা বলল, “সকাল থেকে ফোন বন্ধ। আন্টি বলল কাল রাতে আপনাদের মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল।”

অমলবাবু খুব ধীরে বললেন, “ঝগড়া হয়নি।”

ছেলেটা চুপ।

“কথা হয়েছিল।”

ছেলেটা এবার মাথা নিচু করল।

“ও একটা চিঠি রেখে গেছে।”

অমলবাবু প্রথমবার উঠে দাঁড়ালেন।

“কী লিখেছে?”

“আমি নিয়ে এসেছি।”

ছেলেটা পকেট থেকে ভাঁজ করা কাগজ বার করল।

অমলবাবু হাত বাড়িয়ে আবার হাত নামিয়ে নিলেন।

“তুই পড়েছিস?”

ছেলেটা মাথা নাড়ল।

“পড়।”

“কাকু — ”

“পড়।”

ছেলেটা কাগজ খুলল।

“বাবা, তুমি বলো আমি সারাদিন দরজা বন্ধ করে থাকি। তুমি জানো না, দরজা বন্ধ করেও এখন একা থাকা যায় না। সবাই ফোন করে, সবাই জানতে চায় কী করছি, কী হতে চাই, তাছাড়া চাকরি কবে পাবো মাইনে কত হবে, তবে আমি চাকরিতে জয়েন করতে পারব। তোমরাও আমার ভালোর জন্য এত কথা বলো এত কিছু করেছো যে আমি আর আমার নিজের কথাটা  শুনতে পাই না। আমি দুদিনের জন্য বাইরে যাচ্ছি। আমাকে খুঁজো না।”

ছেলেটা থামল।

অমলবাবু বললেন, “আর?”

ছেলেটা পড়ল —

“তুমি হয়তো আমার অবস্থানটা  বুঝবে। কারণ ছোটবেলায় তুমি একদিন আমাকে তোমার অফিসের টেবিলের নিচে বসিয়েছিলে। বলেছিলে, এখানে কেউ কাউকে বিরক্ত করে না।”

অমলবাবু চেয়ার ধরে ফেললেন।

আমি দেখলাম তাঁর ঠোঁট কাঁপছে।

ছেলেটা শেষ লাইনটা পড়ল —

“তোমার দেশটা যদি এখনও থাকে, একটু আমার জন্য রেখো।”

দোকানে কেউ কোনো কথা বলল না।

এমনকি চা-ওয়ালাও না।

অমলবাবু ধপ করে বসে পড়লেন।

অনেকক্ষণ পরে তিনি বললেন, “আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী?”

“ওকে এখানে এনেছিলাম।”

তিনি কাঠের নিচের দিকে তাকালেন।

“একদিন স্কুলে মার খেয়েছিল। ক্লাস সিক্স। আমার অফিসে এসে কাঁদছিল। আমি ওকে নিচে বসিয়ে বলেছিলাম — চুপ করে থাক, এখানে কেউ কিছু বলবে না।”

তিনি হঠাৎ উঠে আবার টেবিলের নিচে ঢুকলেন।

এবার কেউ হাসল না।

হাত দিয়ে কাঠের তলা খুঁজতে লাগলেন।

“আছে।”

তাঁর গলা বদলে গেল।

“কী?”

“নামটা।”

আমিও নিচু হয়ে দেখলাম।

কাঠের তলায় ক্ষীণ পেন্সিলের আঁচড়।

অর্ণব।

তার পাশে খুব ছোট করে —

বাবা।

দুটোর চারপাশে একটা বেঁকা গোল দাগ।

অমলবাবু আঙুল দিয়ে সেই দাগ টাকে ছুঁলেন।

তারপর খুব অদ্ভুত ভাবে একটা কাজ করলেন।

মোবাইল বার করে ছেলেকে ফোন করলেন।

ফোন বন্ধ।

আবার করলেন।

বন্ধ।

তারপর একটা মেসেজ লিখলেন।

আমি পড়িনি।

শুধু দেখলাম পাঠিয়ে দিয়ে তিনি ফোনটা টেবিলে রেখে দিলেন।

ছেলেটা জিজ্ঞেস করল, “কী লিখলেন?”

অমলবাবু বললেন, “লিখলাম — দেশটা পাওয়া গেছে। তুই যখন ইচ্ছে ফিরে আসিস আমি অপেক্ষা করব।”

তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার লিখলেন।

এবার নিজেই পড়ে শোনালেন।

“আর লিখলাম — আমি ঢুকব না। তোর জন্য খালি রাখলাম।”

বৃষ্টি তখন জোরে নেমেছে।

অমলবাবু ছেলেটাকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। যাওয়ার আগে চা-ওয়ালাকে বললেন, “টেবিলটা বিক্রি করবেন?”

চা-ওয়ালা বলল, “না।”

অমলবাবু একটু থামলেন।

“কেন?”

চা-ওয়ালা কাপ ধুতে ধুতে বলল, “আমারও মাঝে মাঝে দরকার হয়।”

অমলবাবু তাকিয়ে রইলেন।

তারপর হাসলেন।

“তা হলে রাখুন।”

তাঁরা চলে গেলেন।

আমি আবার প্রুফ দেখা শুরু করলাম। দুটো লাইন পড়েও কিছু বুঝতে পারলাম না।

টেবিলের নিচে দুটো নাম আছে — এই কথাটা মাথা থেকে কিছুতেই সরাতে পারছিলাম না।

কিছুক্ষণ পরে চা-ওয়ালা বলল, “দাদা, পাটা সরান তো।”

“কেন?”

সে টেবিলের নিচে হাত ঢুকিয়ে একটা কুঁচকে যাওয়া কাগজ বার করল।

“এটা পড়ে ছিল।”

কাগজে একটা মাত্র লাইন।

পেন্সিলে লেখা।

বাবা, তুমি সত্যিই এলে?

আমি বললাম, “এটা অমলবাবুকে দেওয়া দরকার।”

চা-ওয়ালা বাইরে তাকাল।

বৃষ্টির মধ্যে মানুষটা আর তখন দেখা যাচ্ছে  না।

সে কাগজটা ভাঁজ করে টেবিলের ড্রয়ার-না-থাকা ফাঁকে গুঁজে দিল।

“থাক।”

“কেন?”

চা-ওয়ালা বলল, “ছেলেটা আবার আসতেও তো পারে।”

আমি আর কিছু বললাম না।

বাইরে কলেজ স্ট্রিট নিজের কাজে ব্যস্ত। বই বাঁচাতে পলিথিন পড়ছে, ছাত্ররা ছুটছে, বাস হর্ন দিচ্ছে, কেউ ছাতা কিনছে, কেউ প্রেমিকাকে ফোন করে বলছে পাঁচ মিনিটে পৌঁছবে — যদিও পৌঁছতে অন্তত কুড়ি মিনিট লাগবে।

আমি বিল দিয়ে উঠলাম।

দরজা পর্যন্ত গিয়ে আবার ফিরে এলাম।

একবার টেবিলটার নিচে তাকালাম।

সেখানে আমার কোনও দেশ চোখে পড়ল না।

শুধু ধুলো, দুটো জুতোর দাগ, কাঠের তলায় পাশাপাশি দুটো নাম।

অর্ণব।

বাবা।

বাইরে তখন একটি লোক তার ছেলেকে বৃষ্টির জল থেকে বাঁচাতে নিজের ছাতাটা কাত করে ধরেছে। ফলে লোকটার নিজের অর্ধেক কাঁধ ভিজে যাচ্ছে।

ছেলেটা সেটা খেয়াল করছে না।

লোকটাও তাকে বলছে না।

আমি রাস্তায় নেমে বুঝলাম, কিছু কিছু দেশ মানচিত্রে থাকে না।

তাদের শুধু দুজন মানুষ মিলে একদিন একটা টেবিলের নিচে বানিয়ে ফেলে।

তারপর একজন ভুলে যায়।

আর একজন বড় হয়ে সেটাই খুঁজতে বেরোয়।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev