
একটা নারকেল নিয়ে কাড়াকাড়ি। যেন যুদ্ধ চলছে। ড্যাং ড্যাং করে ঢাক বাজছে। অসংখ্য মানুষ হাজির যুদ্ধক্ষেত্রে। মাঝখানে চলছে লড়াই। যোদ্ধারা ধুলো কাদা মেখে ভূত। কে কাকে চেনে! এক ঝাঁক মৌমাছির মত নারকেলটাকে অনুসরণ করছে। ঠেলাঠেলিতে দলটা স্থির নয়। পায়ের তলায় কি আছে কে দেখে! ইঁট পাটকেল কাঁটা ঝোপঝাড় দলছে।
কখনও ধানের জমি চটকে সমান করছে। পূর্ব ডোম পাড়ার রাস্তার ধারের গন’দের জমিটা ও ধর্মরাজ তলার কাছে আমাদের একটি জমির ধান নষ্ট হত প্রায় প্রতি বছর। কখনও পুকুরে হাবুডুবু খেত দলটা। পূর্ব পাড়ার গন’দের একটি মজা ডোবা ছিল। পচা দুর্গন্ধ জল, নোংরা আবর্জনা ভর্তি। গলা পর্যন্ত পাঁক। সেখানে ভাঙা কাঁচে পা কেটেছে কতজনের, কিন্ত যুদ্ধের সময়ে সে কথা কে খেয়াল রাখে! যেমন করেই হোক নারকেলটা চাই। কতই বা দাম! কিন্ত দামে কি সব বিচার হয়! মান সম্মান প্রশংসা করতালিই এখন আসল। অসংখ্য প্রতিদ্বন্দীর হাত থেকে নারকেলটা কেড়ে দু হাতে মাথার উপর তোলা যে কত গর্বের কে বুঝবে! তবে কখনও কখনও সুযোগ সন্ধানী বা ভাগ্যবানের কপালেও উঠত জয়টীকা। ঠ্যালাঠেলিতে সবার হাত ফসকে হয়ত নারকেলটা মাটিতে পড়ল। কোন বাচ্ছা সেটা তুলে ধরল মাথার উপর। ব্যাস, তখন সেটা তার। কিন্ত কেন এই অনুষ্ঠান?
জন্মাষ্টমী, হিন্দুর পরমারাধ্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন। ৫০০০ বছর আগে এমনই এক ভাদ্র মাসের অষ্টমী তিথিতে ধরাধামে আগমন তার। তিনি ভগবান। মহাভারতের কুরুক্ষেত্রে অর্জুনকে বিশ্বরূপ দেখিয়ে গীতার মহাজ্ঞানে তিনি ঘোষণা করেছিলেন ধরণীকে অধর্ম অনাচার মুক্ত করে ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি আসেন বারবার। সেবারও এসেছিলেন।
“যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।
অভ্যুত্থানম অধর্মস্য তদাত্মানম সৃজাম্যহম।।
পরিত্রাণায় হি সাধুনাং বিনাশায় চ দুঃস্কৃতাম।
ধর্ম সংস্থাপানার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।।”
মথুরার রাজা তখন কংস। পিতা উগ্রসেন’কে ক্ষমতাচ্যুত করে সিংহাসন দখল করেছেন। তার অত্যাচারের সীমা নাই। মানুষের মুক্তির প্রার্থনা এক দিন পৌঁছালো বিষ্ণু লোকে। সেখানেই লেখা হল কংসের ধ্বংস লিপি।
কংস তার বোন দেবকীর বিবাহ দিলেন শুর বংশের রাজা বসুদেবের সঙ্গে। মহা ধুমধাম, আনন্দ উৎসব। কনে কনক রথে যাচ্ছেন শশুর গৃহে। রথের সারথী স্বয়ং রাজা কংস। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত তখনই নেমে এল দৈববাণী। ওরে নির্বোধ, যাকে তুই রথে নিয়ে যাচ্ছিস, সেই দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তান তোর প্রাণ হরণ করবে। মুহূর্তে বদলে গেল কংসের রূপ। খড়্গ হাতে বোন দেবকীকে হত্যা করতে গেলেন। বাসুদেব সবিনয়ে প্রাণ ভিক্ষা চাইলেন,ওকে হত্যা করবেন না। ওর গর্ভের সব সন্তানকে তুলে দেব আপনার হাতে। আপনি তাদের হত্যা করবেন।

বাসুদেব দেবকীকে পাষান কারায় রুদ্ধ করলেন কংস। একে একে দেবকীর ছয় সন্তানকে হত্যা করলেন। সপ্তম সন্তানের সন্ধান মিলল না। এল অষ্টম গর্ভ। সেদিন ভাদ্র মাসের কৃষ্ণ পক্ষের অষ্টমী তিথি। গভীর রাত্রি। মহা দুর্যোগ মথুরার আকাশে। প্রবল ঝড় বৃষ্টি। তখনই ভূমিষ্ট হলেন কৃষ্ণ। যোগ মায়ার প্রভাবে অচেতন হল রক্ষীর দল। দৈব নির্দেশে সদ্যোজাত পুত্রকে নিয়ে বসুদেব কারাগার থেকে গেলেন গোকুলে নন্দ ঘোষের ঘর।সেখানে তার পত্নী যশোদার পাশে রাখলেন নিজের পুত্রকে আর যশোদার সদ্যজাত কন্যাকে নিয়ে এসে রাখলেন দেবকীর কোলে। সেই কন্যার ক্রন্দনে জেগে উঠল কারাকক্ষ। দেবকীর সন্তান প্রসবের সংবাদ পেয়েই ছুটে এল কংস। শিশুটিকে তুলে আছাড় মারলেন কারার পাষান প্রাচীরে। কিন্ত স্বয়ং মহামায়া সেই কন্যা। কারা ভেদ করে আকাশে বিলীন হবার আগে ঘোষণা করলেন,
“তোমারে বধিবে যে,
গোকুলে বাড়িছে সে।”
একদিন তার নিয়তির হাতেই মৃত্যু হল কংসের। তারপর একে একে অধার্মিক অত্যাচারী জরাসন্ধ, শিশুপাল হত হলেন, দুর্যোধন দুঃশাসনের দুঃসহ শাসন অবসান হল। যুধিষ্ঠিরের ন্যায় ও ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠিত হল মহাভারতে।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম ছিল মানবতার মুক্তির জন্য। তার আবির্ভাবের উদাত্ত ঘোষণা ও ভাগবত গীতার বাণী ভারতের উজ্জীবন মন্ত্র। ইসকনের সৌজন্যে আজ বিশ্বেও বন্দিত। তার জন্মদিনে ভারত ও বিশ্বের মন্দিরে মন্দিরে হয় পূজা, নাম গান নানান অনুষ্ঠান। ভারতে এই জন্ম দিন পালিত হয় চিরাচরিত প্রথা মেনেই। নানান এলাকার অনুষ্ঠানে নানান বৈচিত্র্য। যেমন বাংলার গ্রামে গ্রামে পূজা নাম সংকীর্তনের সাথে অপরাহ্নে হয় তাল,নারকেল নিয়ে কাড়াকাড়ির লড়াই ও নানান খেলার অনুষ্ঠান।
স্মৃতির পাতায় গ্রামের জন্মাষ্টমীর ঢাক বাজে এখনও। গ্রামে তখন সাজো সাজো রব উঠত। জন্মাষ্টমীর দিন নারকেল কাড়া কাড়ি হবে। গ্রামে নারকেল গাছ নেই। পাশের সুদপুর গোঁড়াপাড়া বীজনগর থেকে নারকেল এনে রাখতেন গ্রামের লোক। আমার বাবা প্রতিদিন বেড়াতে যেতেন গোঁড়াপাড়া, সেখানে একটা ডাঙায় আমাদের কটা নারকেল গাছ ছিল। পূজা পার্বণে নারকেল পেড়ে আনা হত। জন্মাষ্টমীর জন্যে একটা বড় নারকেল বেছে তেল মাখিয়ে রাখতাম আমরা। তেল মাখানোর উদ্দেশ্য নারকেলটা পিছোল করা। যেন সহজেই কেউ দখল নিতে না পারে। কাড়াকাড়ি’র দিন ঢাক বাজলেই নারকেল নিয়ে অপেক্ষা করতাম বাংলা বাড়ির উঠানে। পাড়ার বিভিন্ন বাড়ি থেকে তিন চারটে নারকেল দেওয়া হত কাড়াকাড়ি’র জন্য। প্রথম শুরু করত ছোটরা। আসলেই হয়ত এই কাড়াকাড়ির খেলা ছিল ছোটদের। পরে দখল নিয়েছিল বড়রা। এ ছিল এক উৎসব,নাম ‘নন্দোৎসব’। ছোট বেলায় শুনতাম একটা ছড়া, ‘তালের বড়া খেয়ে নন্দ নাচেরে’। নন্দ ঘোষের পুত্র জন্মের আনন্দে গোকুলে সেদিন উৎসব। ছেলে বুড়োরা মেতেছিল নানান খেলায়। তার মধ্যে ছিল নানান শক্তি পরীক্ষার খেলা। হয়ত সেদিন তাল বা নারকেল নিয়েও কাড়াকাড়ি হয়েছিল। সেই ঐতিহ্যের ঢেউ এসেছিল এই বাংলার গ্রামে। তখন টিভি, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ছিল না। এই সব অনুষ্ঠান নিয়ে সজীব থাকত মানুষ। গ্রামের বদ্ধ জীবন হাসি কলতানে ভরে উঠত। আজ বিশ্ব উন্মুক্ত। নতুন বিনোদনে ভরা জীবনের পশরা। তবুও কোথাও কোথাও অতীত স্মৃতি চিহ্ন হয়ে টিকে আছে এই সব অনুষ্ঠান।
একটু বড় হতেই আমরাও যোগ দিলাম নারকেল কাড়াতে। তখন গ্রামের নবীন সঙ্ঘের হাতে উৎসব অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্ব। নারকেল পাওয়ার চূড়ান্ত ঘোষণার জন্য একজন রেফারি নিযুক্ত করা হত। সে বাঁশি দিলে লড়াই শুরু বা শেষ হত। এ সময়ে বন্ধুদের নিয়ে দলবদ্ধ ভাবে নারকেল কাড়া প্রচলন হয়েছিল। আমাদের দলের প্রধান লড়াকু যোদ্ধা ছিল উত্তম মণ্ডল, বিভাস ঘোষ, বিধান ঘোষ, সান্ত্বনা ঘোষ, তুষার দাস, টুলু কানু সমর সমীর দত্ত প্রমুখ। যারা যুদ্ধের যোগ্য নয় তাদের দায়িত্ব ছিল নারকেল ধরা। উপানন্দ আশীস আমি ছিলাম সেই দলে। লড়াই না করেও মিলত সমান আনন্দ। বন্ধুত্ব এমনই জিনিস। তা পাঁচ সাতটা নারকেল জুটতো কপালে। সন্ধ্যা বেলা ঐ নারকেল নিয়ে কোন ফাঁকা বাড়িতে সমবেত হতাম সবাই। বসত নারকেল শাঁস আর মুড়ি খাওয়ার আসর। এভাবেই প্রত্যেকটা দল আনন্দ করত নিজেদের আসরে। এভাবেই নন্দোৎসব উদযাপন করেছি আমরা। আমাদের আশপাশের গ্রামেও এমন অনুষ্ঠান হত তখন। এখন হয় কিনা জানি না!
যাই হোক, নানান বিভেদ বিভ্রান্তিতে এক দিন দুর্বল হল নবীন সঙ্ঘ। গ্রামটা ভাগ হল পাড়ায় পাড়ায়। সঙ্ঘের মুঠি দুর্বল হতেই একে একে বন্ধ হল গ্রামের নানান অনুষ্ঠান। সেই উচ্ছাস আনন্দ কলতান আর নেই গ্রামে। তখন অভাব ছিল, কিন্ত ভাবের অভাব ছিল না।আজ অন্তর অন্ধকার মানুষের। একা উপভোগে উৎসুক সবাই। পূজা পার্বণে বাড়ি বাড়ি ধূম, কিন্ত গ্রামে অনুষ্ঠান নেই। অনুষ্ঠান হলেও ভীড় নেই। মাত্র ত্রিশ চল্লিশ বছরেই যেন বদলে গেছে সব। দেখি আর ভাবি আমরা যেমন পেয়েছি অনেক, তেমন হারিয়েছি অনেক কিছুই। এই হারানোর শেষ কোথা জানি না!
অসাধারণ স্মৃতিচারণ। নন্দোৎসবের নারকেল কাড়াকাড়ির মতো একটি লোকাচারকে কেন্দ্র করে আপনি শুধু শৈশবের স্মৃতিই তুলে ধরেননি, আমাদের গ্রামীণ সমাজজীবনের এক হারিয়ে যেতে বসা আনন্দ, সম্প্রীতি ও সমবেত সংস্কৃতির ছবিও এঁকেছেন। “অভাব ছিল, কিন্ত ভাবের অভাব ছিল না”—এই উপলব্ধিটি লেখাটির সবচেয়ে মর্মস্পর্শী জায়গাগুলোর একটি। সময়ের সঙ্গে বিনোদন ও জীবনযাত্রা বদলেছে, কিন্তু তার সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে যে পারস্পরিকতা ও সম্মিলিত আনন্দ, সেই আক্ষেপও লেখাটিকে গভীরতা দিয়েছে। এমন লোকসংস্কৃতির স্মৃতি ও ঐতিহ্য লিখে রাখা সত্যিই জরুরি। লেখককে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।