
মুর্শিদাবাদ।
৪২০. কালেক্টর জমির হার এবং রায়তদের স্থায়ী বা সাময়িক বসবাসের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের পাট্টার প্রস্তাব করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, মফস্বলের হিসাবপত্র, রায়তদের পাট্টা এবং প্রতিটি পরগনার অন্তত একটা গ্রামের জমি পরিমাপের বিস্তারিত পর্যালোচনার মাধ্যমে এই হারগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে রায়তরা এসে হিসাবপত্র যাচাই করেছেন এবং এই কাঠামো অনুমোদন করেছেন; আপত্তি জানানোর জন্য সময় দেওয়া হলেও কেউ কোনো আপত্তি তোলেননি।
চট্টগ্রাম।
৪২১. এই জেলায় খাজনা আদায়ের হার নির্ধারিত হয় ১১৭৪ বঙ্গাব্দে সম্পন্ন জমি পরিমাপ ও ‘জুম্মাবন্দী’ (রাজস্ব নির্ধারণ তালিকা)-র ভিত্তিতে। নির্দিষ্ট জুম্মাবন্দীভুক্ত রায়তদের ‘পাট্টা’ (জমিস্বত্ব বা খাজনার শর্তাবলি সম্বলিত দলিল) প্রদানের প্রথা কখনোই ছিল না; বরং তারা তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাতেন এই আশঙ্কায় যে, পাট্টা দেওয়া হলে জমিদাররা হয়তো তাদের ইচ্ছামতো অন্য কাউকে পাট্টা দিয়ে দিতে পারেন। এখানে কর বা খাজনার হার ও নির্ধারণের নিয়ম অপরিবর্তিত থাকে এবং জুম্মাবন্দী ব্যবস্থা থাকায় রায়তদের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত কর বা অন্যায্য দাবি সহজেই শনাক্ত ও প্রতিকার করা সম্ভব হয়।
নদীয়া।
৪২২. এই জেলায় রায়তদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের বিষয়টি গত বছর ও তার আগের বছরে প্রদত্ত অর্থের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। জমি পরিমাপ ও জুম্মাবন্দী ছাড়া পাট্টা প্রদান ও তার ভিত্তিতে খাজনা আদায়ের প্রথা চালু করা সম্ভব ছিল না; কারণ সুষম কর নির্ধারণের জন্য জমির পরিমাণ ও গুণমান — উভয়ই ভিত্তি হিসেবে কাজ করে এবং পাট্টায় এই বিষয়গুলোর পাশাপাশি করের হারও স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। নদীয়া কালেক্টরেটের অন্তর্ভুক্ত ‘মহম্মদ আমিনপুর’ এলাকাতেও একই ধরনের আদায়-পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে; তবে ১১৭৮ বঙ্গাব্দে মিস্টার লুশিংটন মফস্বল নথিপত্রের ভিত্তিতে একটা ‘হস্তবুদ’ (জমির প্রকৃত আয় ও উৎপাদন ক্ষমতার বিবরণী) প্রস্তুত করেছিলেন। এরপর থেকে কোনো নিপীড়নমূলক কর আরোপ করা হয়নি এবং রায়তরা এলাকা ছেড়ে চলে যাননি; তাদের অবস্থাও মোটামুটি সন্তোষজনক বলে মনে হয়। একই কর্তৃপক্ষের আওতাধীন ‘সাতসিকা’ ও অন্যান্য স্থানেও একই প্রথা প্রচলিত।
যশোর।
৪২৩. কর নির্ধারণের হারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নানাবিধ অসামঞ্জস্য ও অনিয়মের কথা কালেক্টর উল্লেখ করেছেন এবং বর্তমান পাট্টা ব্যবস্থা বাতিল করে নতুন পাট্টা প্রদানের সুপারিশ করেছেন। তিনি একটা পাট্টার খসড়া প্রস্তাব করেছেন, যা কানুনগোদের সম্মতিক্রমে প্রস্তুত করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো নির্দিষ্ট হার নির্ধারণ করা — যার ভিত্তিতে ‘আসল জুম্মা’ বা মূল রাজস্বের অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি করযোগ্য অংশের খাজনা আদায় করা হবে — না কি নির্দিষ্ট পরিমাণ জমির জন্য কোনো নির্দিষ্ট অর্থ বা টাকার অঙ্ক নির্ধারণ করা; কারণ জমির সামগ্রিক পরিমাপ ও নতুন করে মূল্যমান নির্ধারণের অনুমোদন ছাড়া পরবর্তী বিষয়টি বাস্তবায়ন করা অসম্ভব। প্রস্তাবটি আমি ঠিকমতো বুঝতে পেরেছি কি না, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই।
৪২৪. কালেক্টর ‘পাট্টা’ প্রদানের বিষয়টি এবং তা সম্পাদনের পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন; তাঁর যুক্তিগুলো অবশ্যই বিবেচনার দাবি রাখে। তবে আমি এখানে কেবল একটা নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিষয়ের সাথে প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ অংশটুকুই তুলে ধরেছি। অবশ্য যশোর অঞ্চলে প্রচলিত একটা প্রথার কথা উল্লেখ করাও হয়তো সমীচীন হবে — সেখানে জমির নামমাত্র হার প্রতি বিঘাতে তিন টাকা হলেও প্রকৃত হার আসলে এক টাকা; কারণ কৃষকদের দখলে পট্টায় উল্লিখিত পাঁচ বিঘার পরিবর্তে পনেরো বিঘা জমি থাকে এবং ওই শেষোক্ত পরিমাণ জমির (অর্থাৎ পট্টায় উল্লিখিত পাঁচ বিঘার) ওপরই প্রতি বিঘাতে তিন টাকা হারে কর বা রাজস্ব ধার্য করা হয়।
রাজশাহী।
৪২৫. আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল যে এই বিশাল জেলাটি সম্পর্কে পাওয়া তথ্য আরও বিশদ হতো; তবে বর্তমান বিষয়টির সাথে সম্পর্কিত এর মূল অংশটি নিম্নরূপ :
একজন দক্ষ মোহরিরের পক্ষে রায়তের ওপর কোনো নিপীড়ন শনাক্ত করা কঠিন নয় — যতক্ষণ না বিষয়টি ‘পাট্টা’র (জমির বন্দোবস্ত-দলিল) ওপর নির্ভর করে — তবে ‘বাট্টা’ বা অতিরিক্ত মাশুল সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। নতুন ধরনের পাট্টা প্রবর্তনের কথা শুনলে রায়তদের মনে এমন এক ভীতি বা আশঙ্কা জাগে যা কোনো ব্যাখ্যা দিয়েই দূর করা সম্ভব নয়; ফলে জমিদার ও ইজারাদারদের দ্বারা সম্পাদিত পাট্টার নমুনা রায়তদের কাছে পাঠানোও কঠিন হয়ে পড়ে। জমির হার বা খাজনার পরিমাণ জানা সম্ভব হলেও, জমির প্রকৃত আয়তন বা পরিমাণ নির্ণয় করাটা জমিদার ছাড়া অন্য কারও পক্ষে অত্যন্ত কঠিন ও প্রায় অসম্ভব একটা কাজ।
দিনাজপুর।
৪২৬. বর্ণিত অনিয়মগুলো রায়তদের ওপর আরোপিত দাবি বা খাজনা কোনো নির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। সেই অনুযায়ী কালেক্টর পাট্টা প্রবর্তনের প্রস্তাব করেন, তবে তা প্রচলিত অন্যান্য পদ্ধতির চেয়ে ভিন্ন। তিনি জমিদারদের ওপর সরকারের দাবির পরিমাণকে ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেন; এই দাবি প্রথমে পরগনা ও গ্রামগুলোর মধ্যে ভাগ করা হবে এবং সেখান থেকে নির্দিষ্ট নিয়মের মাধ্যমে তা রায়তদের পর্যায়ে বিন্যস্ত করা হবে। এই বিন্যাস প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে জমির ওপর প্রতি বিঘা হিসেবে একটা নির্দিষ্ট হারে খাজনা ধার্য করা হবে। তিনি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য অসুবিধা ও তা মোকাবিলার উপায়গুলো উল্লেখ করেন এবং মন্তব্য করেন যে, বিজ্ঞজনদের মতে পাট্টা প্রবর্তনের জন্য এর চেয়ে ভালো কোনো পদ্ধতি হতে পারে না। তিনি প্রস্তাব করেন যে, কালেক্টরের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো পাট্টাই বৈধ বলে গণ্য হবে না।
সিলেট।
৪২৭. এই জেলার বিষয়ে খুব বেশি কিছু বলার প্রয়োজন নেই; এখানকার অত্যন্ত বিশেষ পরিস্থিতির কারণে বোর্ড জমি পরিমাপের নির্দেশ দিয়েছে এবং বর্তমানে সেই কাজ চলছে।
রামগড়।
৪২৮. এই কালেক্টরেটের আওতাধীন বিভিন্ন জেলায় প্রচলিত রীতিনীতির ভিন্নতার কারণে অনিয়ম রোধে কোনো সাধারণ নিয়ম প্রণয়ন করা কঠিন; একমাত্র কালেক্টরই এই অনিয়মগুলো প্রতিরোধ করতে পারেন। বছরের শুরুতে জমিদারদের ‘টিক্কা পাট্টা’ (নির্দিষ্ট মেয়াদী ইজারা) দেওয়ার প্রচলন রয়েছে, কিন্তু শস্যের দাম বেড়ে গেলে তারা নগদ অর্থের পরিবর্তে শস্যের মাধ্যমেই খাজনা আদায়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। এই ধরনের নিপীড়ন বা অনিয়মের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই এর একমাত্র প্রতিকার। জেলদিয়া (Jeldia) এলাকার জমির কোনো পরিমাপ কখনোই করা হয়নি। একটা বিশেষ ধরনের ‘পাট্টা’ (জমির বন্দোবস্ত বা ইজারাপত্র)-র খসড়া প্রস্তাব করা হয়েছে, যা তাঁর মতে ‘পাচেট’ (Pacheat) এলাকায় বিশেষ কার্যকর হবে। [২০৮]
রংপুর।
৪২৯. কালেক্টর বহু আগে, অর্থাৎ ১৭৮৭ সালের মার্চ মাসে, ‘কারজিহাট’ (Carjeehaut)-এর জন্য একটা পাট্টার খসড়া প্রস্তাব করেছিলেন, যা এখনও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি এখন তাঁর আওতাধীন জেলাগুলোর জন্য একই নীতির ওপর ভিত্তি করে একটা সাধারণ বা আদর্শ খসড়া সুপারিশ করছেন।
পূর্ণিয়া।
৪৩০. এই কালেক্টরেট বা রাজস্ব এলাকার পরিস্থিতির বিস্তারিত বিবরণ অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ। কালেক্টর প্রস্তাব করেছেন যে, তাঁকে কাছারির সিলমোহরযুক্ত পাট্টা প্রদানের অনুমতি দেওয়া হোক, যেখানে খাজনা ও করসহ একটা নির্দিষ্ট অর্থের উল্লেখ থাকবে; এই পদ্ধতির মাধ্যমে মণ্ডল ও পাটোয়ারিদের দ্বারা পাট্টা সংক্রান্ত যে বার্ষিক কারবার বা অনিয়ম চলে তা রোধ করা যাবে; জমিদারদের দাবি সীমিত রাখা সম্ভব হবে; এবং রায়তরাও সরকারি পাওনা কমিয়ে দিতে পারবে না।
২৪ পরগনা।
৪৩১. এই বিভাগের অন্তর্গত জমিগুলোর জন্য ইতিমধ্যেই একটা পাট্টার খসড়া গ্রহণ করা হয়েছে এবং কালেক্টর আমাদের জানিয়েছেন যে, সেই খসড়া অনুযায়ীই পাট্টা প্রদান করা হচ্ছে এবং সেগুলোর একটা সাধারণ রেজিস্টার বা তালিকা সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
৪৩২. অপ্রয়োজনে বিস্তারিত আলোচনা না বাড়িয়ে বলা যায়, এই বিবরণটি সাধারণ নিয়মাবলী অবিলম্বে প্রবর্তনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আপত্তি এবং প্রতিটি জেলার স্থানীয় পরিস্থিতির সাথে সেগুলোকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। প্রচলিত প্রথা থেকে সরে আসার ক্ষেত্রে এমন কোনো ব্যবস্থা প্রবর্তনের ঝুঁকি থাকে যা হয়তো আরও বেশি ক্ষতিকর হতে পারে। সরকারের এমন কোনো আদেশ জারি করা উচিত নয় যা কার্যকর করা সম্ভব নয়; যেসব রায়ত তাদের বর্তমান ভূমি-স্বত্ব বা দখলি স্বত্বের ধরন এবং খাজনা প্রদানের প্রচলিত রীতিতে সন্তুষ্ট, তাদের জোর করে পাট্টা নিতে বাধ্য করা হলে তা অহেতুক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে; আবার এমন পরিস্থিতিতে — অথবা যেখানে কর বা রাজস্ব নির্ধারণের নিয়মাবলী আগে থেকে সুনির্দিষ্ট নয় — সেখানে জমিদারদের পাট্টা প্রদানে বাধ্য করাটা আমার মতে অর্থহীন হবে। মিস্টার ফ্রান্সিস যখন প্রস্তাব করেছিলেন যে জমিদারদের একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রায়তদের পাট্টা প্রদানে বাধ্য করা উচিত, তখন সম্ভবত তিনি বড় জমিদার ও রায়তদের মধ্যে বিদ্যমান সীমিত যোগাযোগের বিষয়টি জানতেন না; এমনকি তিনি হয়তো জানতেন না যে, সাধারণত গ্রামের ইজারাদার, গোমস্তা ও মণ্ডলরাই পাট্টা প্রদান করে থাকেন। কিছু কালেক্টরের প্রস্তাব অনুযায়ী নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ‘পাট্টা’ প্রদানের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হলে, তা রায়তদের ‘দখলস্বত্ব’ (right of occupancy) প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকেই দুর্বল করে দেবে। কোনো কোনো এলাকায় — যেমন যশোরে — বর্তমানে পাট্টা প্রদানের বিষয়টি বিদ্যমান অনিয়ম ও অপব্যবহারকেই স্থায়ী রূপ দিতে পারে; কারণ পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, রায়তদের ওপর নানাবিধ করের বোঝা চাপানো সত্ত্বেও প্রকৃতপক্ষে জমিদাররাই এখানে অধিকতর বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভলিউম-২, ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড বেঙ্গল এপেন্ডিক্স।

বিশ্বেন্দু নন্দ