
আষাঢ়ের দুপুরে শুকনো ফাঁকা মাঠের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে ছিল বচ্চন রাজওয়ার।
আকাশের দিকে তাকালে মনে হয়েছিল, মেঘ আছে — বৃষ্টি নেই। সাদা-ধূসর মেঘের দল যেন আকাশের এক প্রান্ত থেকে আর-এক প্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু সন্ন্যাসীতলার মাঠের দিকে তাকানোর সময় তাদের নেই। ভরা আষাঢ়েও মাঠের বুক ফেটে চৌচির। কোথাও কোথাও এত গভীর ফাটল যে তার ভিতর অন্ধকার জমে আছে। শুকনো ঘাসগুলো বাতাসে নড়ছে, কিন্তু সেই নড়াচড়াতেও প্রাণ নেই।
বচ্চনের সারা গা রাগে রি রি করছিল।
তার হাতে একটা কোদাল। মাঝে মাঝে কোদালটা মাটিতে বসিয়ে আবার তুলে নিচ্ছিল সে। মাটি এত শক্ত হয়ে গেছে যে কোদালের ফলায় টং করে শব্দ উঠছে।
“বৃষ্টি হবেক লাই ?”
পাশ থেকে বুড়ো রামচরণ বলল।
বচ্চন উত্তর দিল না।
সন্ন্যাসীতলার এই মাঠকে সে জন্মের পর থেকেই চেনে। তার শৈশব ভেঙে কৈশোর গড়িয়েছে এই মাঠের আল ধরে। বর্ষায় এখানে হাঁটুসমান জল জমত। কচুরিপানার ফাঁকে ছোট মাছ দেখা যেত। ছেলেবেলায় সে আর তার বন্ধুরা গামছা দিয়ে মাছ ধরত। শীতের সকালে মাঠের উপর কুয়াশা পড়ে থাকত। দূরের তালগাছগুলোকে মনে হত কুয়াশার ভিতর দাঁড়ানো মানুষের মতো।
তার বাবা-মা দুজনেই ছিল জনমুনিষ। কখনও ধান কাটত, কখনও মাটি কাটত, কখনও দূরের ইটভাটায় গিয়ে কাজ করত। সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু বচ্চনের বাবা একটা জিনিস নিয়ে খুব গর্ব করতেন — তাঁদের ভিটে।
ছেলের জন্মের সময় বাবা শখ করে নাম রেখেছিলেন বচ্চন। অমিতাভ বচ্চনের সিনেমার ভক্ত ছিলেন তিনি। ছেলে জন্ম নিলে বচ্চন নামের সঙ্গে নিজের একটা দুর্বলতার ইতিহাস জুড়ে দিয়েছিল।
সে মুর্শিদাবাদ জেলার সন্ন্যাসীতলার মুসাহার সম্প্রদায়ের মানুষ। এই পাড়ায় একসময় মুসাহার পরিবারই ছিল বেশি। মাটির ঘর, খড়ের চাল, উঠোনে শুকোতে দেওয়া ধান, পাশে হাঁস-মুরগি — অভাবের মধ্যেও জীবন ছিল।
কিন্তু সেই জীবন আর নেই।
কেউ নেশায় ডুবে গেছে। কেউ অসুখে মারা গেছে। কেউ কাজের খোঁজে শহরে গিয়ে আর ফেরেনি। কারও ঘর ভেঙে তার জায়গায় উঠেছে পাকা দেওয়াল। কারও জমি এখন অন্যের নামে।
রামচরণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আমাদের পাড়াটো আর কোতোদিন থাকবেক রে?”
বচ্চন এবার তাকাল।
“যেতদিন হামরা থাকবোক ।”
“হামরা তো আর বেশি লাই।”
“তাই বুলে মাটি ছেড়ে দিব?”
রামচরণ হেসে বলল, “মাটি কি হামাদের ছাড়ে? মানুষই তো মাটি ছেড়ে দেয়।”
বচ্চন চুপ করে গেল।
তার নিজেরও সামান্য জমি আছে। নামুবিলের ধারে তিন বিঘে জলা। বর্ষায় সেখানে জল দাঁড়ায়। জল নামলে ধান হয়। সে জমিকে নিয়ে বচ্চনের অনেক স্বপ্ন।
তার ছেলে যেন আর জনমুনিষ না হয়।
তার ছেলেমেয়ে যেন স্কুলে পড়ে।
তার ঘরের চাল যেন আর বর্ষায় চুঁইয়ে না পড়ে।
এইটুকুই।
হঠাৎ দূরে একটা মোটরগাড়ির শব্দ হল।
ধুলো উড়িয়ে একটা সাদা গাড়ি এসে থামল মাঠের ধারে।
বচ্চন তাকিয়ে রইল।
গাড়ি থেকে দুজন লোক নামল। একজন মোবাইল কানে নিয়ে চারদিকে দেখল। তারপর মাটির দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই দিকটা খুব ভালো হবে। রাস্তা হয়ে গেলে দাম আরও বাড়বে।”
বচ্চনের বুকের ভিতর কেমন একটা অস্বস্তি হল।
সে জানত না, শুকনো মাঠের এই নীরবতার ভিতরেই তার জন্য অন্য এক ঝড় তৈরি হচ্ছে।
এরা জমি কেনা বেচার দালাল সেটা টের পেল বচ্চন। ওদের সাথে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। ওরা শুধু মোটা টাকার খরিদ্দার খোঁজে।
দুই
এর আগেও বেশ কয়েকবার কিছু লোক কিনতে এসেছিল সন্ন্যাসী তলার এই মাঠের জমি। চিন্তাভাবনা ছিল অন্য ধরনের।
বচ্চনকে অনেক বোঝানো হয়েছে জমিটা বিক্রি করে দেওয়ার বিষয়ে। জমি বিক্রি করতে নারাজ বচ্চন রাজওয়ার।
তার একটাই বক্তব্য, “হেই মাটি হামাদের। স্বাধীনতার আগেও হামরা ইখানে ছিলম।”
বচ্চনের এই জমি নিয়ে বেশ কয়েকবার বিবাদের মধ্যে জড়িয়ে পড়তে হয়েছিল তাকে। পঞ্চায়েতেও ডেকে পাঠানো হয়েছিল জমির মালিককে।
বচ্চনের গলায় এমন দৃঢ়তা ছিল যে পঞ্চায়েতের ঘরে বসে থাকা সবাই তার দিকে তাকিয়ে গেল।
সেদিন পঞ্চায়েত অফিসে বেশ ভিড়। কেউ বিধবার ভাতা নিয়ে এসেছে, কেউ রেশন কার্ডের সমস্যা নিয়ে, কেউ জমির কাগজ নিয়ে।
বচ্চন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলছিল, “হামাদের দাদার দাদা ইখানে থাকতোক। তখুন এই সন্ন্যাসীতলায় পাকা রাস্তা ছিল না, কারেন্ট ছিল না। শহরের লোকজনও আসতোক না। এই মাঠ, এই পুকুর, এই ভিটে — সোব হামাদের ছিল।”
ঝন্টু মুসাহার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “হামার বাবার জমিটা চার হাজার টাকায় লিয়েছিল শহরের লোক। বুলেছিল, পোরে কাগজ করে দিবে। আজ সিখানে বাড়ি উঠেছে।”
আর একজন বলল, “হামাদের ঘরটাও কিনেছিল। টাকা হাতে দিয়েছিল। হামরা ভেবেছিলাম ওনেক টাকা। দু-বছর পর বুঝলম, সি টাকায় শোহরে এক কামরা ঘোরও পাওয়া যায় না।”
বচ্চনের কথাও শুনছিল পঞ্চায়েতের লোক ।
এইভাবে এক এক করে সন্ন্যাসীতলা ফাঁকা হয়েছে।
লোভ শুধু শহুরে লোকেদের ছিল না। অভাবও মানুষকে লোভী করে তোলে। অসুখ হলে টাকা লাগে। বিয়ে হলে টাকা লাগে। নেশা ধরলে টাকা লাগে। সেই টাকার জন্য একসময় মানুষ নিজের ভিটের কাগজে আঙুলের ছাপ দিয়ে দিয়েছে।
তারপর আর জমি ফেরেনি। নষ্ট হয়ে গেছে মুসাহারপাড়ার ইতিহাস।
বচ্চন বলল, “হামি জমি বিক্রি করবোক লাই ।”
পঞ্চায়েতের একজন বলল, “কেউ তো জোর করছে না।”
বচ্চন হেসে বলল, “জোর সবসময় হাতে লাঠি লিয়ে আসে না। কখুনোও টাকা লিয়ে আসে।”
কথাটা ঘরে একটা অস্বস্তিকর নীরবতা তৈরি করল।
কয়েকদিন পর প্রসাদ ঘোষের লোকেরা সত্যিই বচ্চনের বাড়িতে এল।
তখন সন্ধ্যা। বচ্চনের স্ত্রী উঠোনে ধান বাছছিল। ছেলে বই খুলে বসেছিল। মেয়েটা কুপি জ্বালছিল।
সাদা গাড়ি থেকে নামা লোকটি বলল,
“বচ্চনদা, আপনার জমির খুব ভালো দাম দেব।”
বচ্চন মাটির চৌকিতে বসেছিল।
“কোতো?”
লোকটি একটা অঙ্ক বলল।
বচ্চন মৃদু হেসে বলল, “ই টাকায় হামার বাবার ভিটা কিনবেন?”
“ভিটে তো আর থাকবে না, দাদা। শহর বাড়ছে।” “আপনিও একটু সুবিধা লিয়ে লিন।”
বচ্চন আরও বলল, “শহর বাড়ুক। হামার জমি হামার থাকবেক।”
লোকটি এবার গলা নামিয়ে বলল, “সবাই কিন্তু জমি ছেড়ে দিচ্ছে।”
“হামি সোবাই লই।”
“পরে আফসোস করবেন।”
বচ্চন উঠে দাঁড়াল।
“আফসোস করবোক যদি বেচে দিতে হোবে বাপের ভিটা?”
লোকগুলো চলে গেল।
রাতে বচ্চন বাবার পুরনো টিনের বাক্স খুলল। ভিতরে কয়েকটি হলদে কাগজ। সে সব পড়তে পারে না। কিছু অক্ষর চিনতে পারে, বাকিগুলো তার কাছে আঁকাবাঁকা দাগ।
বাবার কথা মনে পড়ল —
‘অক্ষর চিলাস না, তাতে কী হয়েছে? মাটি চিলিস তো?’
সেই রাতেই বচ্চন ঠিক করল, অক্ষর না জানার জন্য সে নিজের মাটি হারাবে না।
পরদিন সকাল সকাল সে পঞ্চায়েতের দিকে হাঁটা দিল। জমিনের বিবাদের জের মেটাতে।
তিন
পঞ্চায়েতে গিয়েই বচ্চন শুনল, নামুবিলের তিন বিঘে জমি তার নামে নেই।
“কী বুললেন?”
কর্মচারী রেকর্ডের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই জমির মালিক প্রসাদ ঘোষ।”
বচ্চন যেন কিছুক্ষণ নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না।
“প্রসাদ ঘোষ? কিন্তু জমি তো হামার!”
“কাগজে আপনার নাম নেই।”
বচ্চন ব্যাগ থেকে বাবার পুরনো কাগজ বের করল।
“এই দেখুন। আমার বাবার নামে আছে।”
কর্মচারী কাগজটা দেখে বলল, “এটা পুরনো দলিলের কপি। আপনাকে বি এল আর ও অফিসে যেতে হবে। নতুন কপি বের করতে হবে।”
বচ্চনের বুক ধড়ফড় করছিল।
সেদিনই সে অফিসে গেল।
দীর্ঘ করিডর। দেওয়ালে পুরনো নোটিশ। এক কোণে লোকজন বসে। কেউ কাগজ পড়ছে, কেউ অন্যের কাছে কাগজ বুঝিয়ে নিচ্ছে।
বচ্চন এক কোণে বসে রইল।
তার মনে হচ্ছিল, এই অক্ষরগুলোর জঙ্গলেই বুঝি তার তিন বিঘে জমি হারিয়ে গেছে।
অনেকক্ষণ পরে তার ডাক পড়ল।
অফিসার অনিরুদ্ধ সেন কাগজগুলো হাতে নিলেন।
“আপনি বচ্চন রাজওয়ার?”
“জি।”
“জমিটা আপনার বাবা চাষ করতেন?”
“জি সার। বাবার আগে দাদাও করতোক ।”
“বিক্রি করেছিলেন?”
“না।”
“কোনও দলিল করেছেন?”
“না সার।”
অফিসার কম্পিউটারে পুরনো রেকর্ড খুললেন। তারপর একের পর এক কাগজ দেখতে লাগলেন।
বচ্চন চুপ করে বসে রইল।
কিছুক্ষণ পর অফিসার বললেন, “আপনার বাবার স্বাক্ষর আপনি চেনেন?”
“চিনি না সার। বাবা তো নাম লিখত লাই, টিপসই দিত।”
অফিসার এবার প্রসাদ ঘোষের নামে থাকা দলিলটা দেখালেন।
“এখানে আপনার বাবার স্বাক্ষর দেখানো হয়েছে।”
বচ্চন অবাক হয়ে তাকাল।
“বাবা তো সহি করতোক না। কুনো পড়হা যানত না।”
অনিরুদ্ধ সেন ভুরু কুঁচকে বললেন, “এই কথাটাই গুরুত্বপূর্ণ।”
তদন্ত শুরু হল।
পুরনো রেকর্ড বেরোল। জমির খতিয়ান মিলল। দলিলের তারিখ নিয়ে অসঙ্গতি পাওয়া গেল। জমির সীমানার বিবরণও মেলেনি।
অনিরুদ্ধ সেন বললেন, “বচ্চন, আপনার জমির দলিল জাল হওয়ার যথেষ্ট প্রমাণ আছে। আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।”
বচ্চনের চোখ ভিজে এল।
“সার, আমি গরিব মানুষ। মামলা কোরার টাকা লাই।”
“আপনাকে একা লড়তে হবে না। সরকারি আইনি সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা আছে।”
“আমি বেশি পড়াশোনা জানি না সার।”
“সেটা আপনার অপরাধ নয়।”
বচ্চন মাথা নিচু করে বসে রইল।
অনিরুদ্ধ সেন আবার বললেন, “আপনার মতো মানুষ কাগজ না বোঝার কারণে জমি হারালে সেটা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়। একটা পরিবার তার ইতিহাস হারায়।”
কথাটা বচ্চনের মনে গভীরভাবে ঢুকে গেল।
কয়েক মাস ধরে দৌড়ঝাঁপ চলল। কাগজ যাচাই হল। জমি মাপা হল। পুরনো নথি মিলল। সাক্ষীদের বক্তব্য নেওয়া হল।
শেষে প্রমাণ হল, প্রসাদ ঘোষের নামে তৈরি দলিলটি জাল।
বচ্চন খবরটা শুনে অফিসের বারান্দায় বসে পড়ল।
তার মুখে কোনও বিজয়ের হাসি ছিল না। প্রসাদ ঘোষের আর্থিক শাস্তি জরিমানা হল।
বচ্চন শুধু বলল, “তাহলে আমার বাপের মাটি ইখনও হামার?”
অনিরুদ্ধ সেন বললেন, “আইনের নথিতে আবার আপনার পরিবারের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।”
বচ্চন কাগজটা দুই হাতে ধরল।
তার কাছে সেটি শুধু কাগজ ছিল না। এ যেন বাবার কণ্ঠস্বর।
দাদার পায়ের ছাপ। মায়ের কাঁধে ধানভরা ঝুড়ি। সব ফিরে আসার কাগজ।
চার
বর্ষা এল দেরিতে।
কিন্তু যখন এল, একটানা তিন দিন বৃষ্টি হল।
সন্ন্যাসীতলার মাঠে জল জমল। শুকনো ফাটলগুলো ভরে গেল। ধুলোর গন্ধ বদলে গিয়ে উঠল ভেজা মাটির গন্ধ।
বচ্চন ভোরে মাঠে দাঁড়িয়ে ছিল।
তার পাশে রামচরণ।
বুড়ো বলল, “দেখলি? তিষ্ণা একদিন শেষ হোয়।”
বচ্চন বলল, “সব তিষ্ণা লয় গ কাকা।”
“কুনটা বাকি?”
“মাটির তিষ্ণা মিটেছে। মানুষের তিষ্ণা ইখনও আছে।”
রামচরণ বুঝতে পারল না।
বচ্চন বলল, “যারা উন্যের জমি চাহায়, তাহাদের তিষ্ণা তো শেষ হোয় না।”
সন্ন্যাসীতলার অনেক বাড়ি এখন আর নেই। কোথাও নতুন দালান উঠেছে। কোথাও জমির চারদিকে টিনের বেড়া। পুরনো পুকুরের একাংশ ভরাট হয়েছে।
বচ্চন মাঝে মাঝে সেসবের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তার মনে হয়, মানুষ শুধু ঘর হারায় না — একদিন নিজের ইতিহাসও হারিয়ে ফেলে।
তার সম্প্রদায়ের কত মানুষ চলে গেল!
কেউ নেশায়। কেউ অসুখে। কেউ ঋণে। কেউ অশিক্ষায়। আর কেউ কেবল বিশ্বাস করে কাগজে আঙুলের ছাপ দিয়েছিল বলে।
বচ্চন নিজের ছেলে-মেয়েকে তাই পড়তে বলে।
“অক্ষর চিনবে। কাগজ পড়বে। কারও কোথায় শুধু বিশ্বাস করবেক না।”
ছেলে জিজ্ঞেস করে, “বাবা, জমি ইত বড় জিনিস?”
বচ্চন মাঠের দিকে তাকিয়ে বলে, “জমি বড় লয় রে। মানুষ তার সঙ্গে যে জীবন বেঁধে রাখে, সিটা বড়।”
কয়েকদিন পর বচ্চন নিজের জমিতে ধানের চারা লাগাল।
কাদায় পা ডুবিয়ে সে একবার আকাশের দিকে তাকাল। মেঘের ফাঁক দিয়ে রোদ বেরিয়েছে।
তার মনে পড়ল সেই আষাঢ়ের দুপুর। ফেটে যাওয়া মাঠ। শুকনো মাটি। কোদালের আঘাতে ওঠা টং শব্দ।
আর মনে পড়ল সেই কাগজের কথা, যে কাগজ তাকে প্রায় মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।
সে জানে, লড়াই এখানেই শেষ নয়। আবার কেউ আসবে। আবার জমির দাম বাড়বে। আবার কেউ বলবে, ‘এই টাকাটা নিন, শহরে গিয়ে থাকুন।’
কিন্তু এবার বচ্চন প্রস্তুত। নির্ভয়ে চাষ করবে। তার হাতে কাগজ আছে। তার পাশে কিছু মানুষ আছে।
আর সবচেয়ে বড় কথা — নিজের মাটির প্রতি তার বিশ্বাস আছে।
সন্ধ্যায় মাঠের আল ধরে বাড়ি ফেরার সময় সে থামল।
পেছনে তাকিয়ে দেখল, সন্ন্যাসীতলার মাঠে নতুন ধানের চারা বাতাসে দুলছে।
তার মনে হল, শুকনো মাঠের বুকের উপর এতদিন যে রেখাগুলো ছিল, সেগুলো শুধু ফাটল নয়।
সেগুলো ছিল একটি খসড়া।
হারিয়ে যাওয়া মানুষের নামের খসড়া।
উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া ঘরের খসড়া।
অধিকার হারানো মানুষের ইতিহাসের খসড়া।
আর আজ সেই খসড়ার উপর নতুন করে সবুজ অক্ষরে লেখা হচ্ছে একটি নাম — বচ্চন রাজওয়ার।
সে নিজের বুকের ভিতর হাত রেখে মনে মনে শপথ করল, ‘মৃত্যু পর্যন্ত এই মাটি ছাড়ব না। মরতে হলে এখানেই মরব।’
দূরে মেঘ ডাকল। বচ্চন হাঁটতে শুরু করল। তার পায়ের নিচে ভেজা মাটি।
সামনে অন্ধকার নামছে।
আর পিছনে, তৃষিত মাঠের উপর, বৃষ্টির জলে ধুয়ে যেতে যেতে এক নতুন জীবনের খসড়া স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
‘তৃষিত মাঠের খসড়া’ গল্পটি পড়ে সত্যিই ভালো লাগল। খুব সাধারণ মানুষের জীবন, মাটির প্রতি টান আর নিজের অধিকার রক্ষার লড়াইটা লেখক খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। বচ্চন চরিত্রটির মধ্যে একদিকে যেমন অসহায়তা আছে, অন্যদিকে তেমনই আছে নিজের মাটি না ছাড়ার দৃঢ়তা। গল্পের শেষটা বিশেষভাবে মনে দাগ কেটেছে—শুকনো মাঠে বৃষ্টি, নতুন ধানের চারা আর নতুন জীবনের আশার ছবি যেন পুরো গল্পটাকে অর্থবহ করে তুলেছে। সহজ ভাষায় লেখা, কিন্তু ভাবনাটা অনেক গভীর। মাটি যে শুধু জমি নয়, মানুষের শিকড় ও পরিচয়ের অংশ—গল্পটি সেটাই মনে করিয়ে দিল। বিশ্বজিৎ মণ্ডলকে এমন একটি মানবিক গল্পের জন্য অভিনন্দন।