
একটি বাংলা প্রবাদ আছে, ‘গাঁয়ের গুণে গ’ড়ে গরুও বিকোয়’।
‘বাংলা প্রবাদ’ বইটিতে সুশীল কুমার দে গ’ড়ের অর্থ দিয়েছেন, অলস, অকর্মণ্য গরু।
গড়িয়া মানে বলদ, খড়িয়া মানে চালদ, — আরেকটি প্রবাদ।
সুবলচন্দ্র মিত্র তাঁর আদর্শ বাঙ্গালা অভিধানে ‘গড়িয়া’ শব্দের প্রধান অর্থ দিয়েছেন, যে পড়িলে আর উঠিতে চায় না, আলস্যপ্রবণ পশু।
বঙ্গীয় শব্দকোষ-এ গড়িয়ার অর্থ পাই, যে গড়াইতে (শুইতে) ভালোবাসে, অলস, কুঁড়ে। উদাহরণ, ‘গড়িয়া বলদ হেন শুইয়া নিদ্রা যায়’।
মানো এল ১৭৪৩-এ লিখেছেন ‘গড়িয়া’ মানে অলস।
তাহলে কি বাংলাভাষায় কোনওকালে গড়িয়া মানে বয়স্ক, অলস, বলদ বা ষাঁড়কে বোঝাত? তারই বিকিকিনি চলত গড়িয়াহাটে? নাকি হাটটি সাধারণ হাটের মতই ছিল, কিন্তু কাশীর গলির মতো অলস ষাঁড় ও বলদের বিচরণভূমি ছিল এই হাটটি?
গড়িয়াহাট হল দক্ষিণ কলকাতার হৃদস্পন্দন ও চিরায়ত ঐতিহ্যের মেলবন্ধন।
কলকাতার নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ট্রাম, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, হাওড়া ব্রিজ আর কল্লোলিনী তিলোত্তমার নিজস্ব কিছু মেজাজ। তবে কলকাতার সত্যিকারের প্রাণস্পন্দন কোথায় স্পন্দিত হয়, তা জানতে হলে চলে আসতে হবে গড়িয়াহাটে। দক্ষিণ কলকাতার হৃদপিণ্ড বলা চলে এই এলাকাটিকে। কেনাকাটা, রাজনীতি, সাহিত্য চর্চা, সান্ধ্যকালীন আড্ডা থেকে শুরু করে রসনাবিলাস — বাঙালিয়ানা যেখানে নিজের পূর্ণ রূপ নিয়ে উপস্থিত, সেটাই গড়িয়াহাট। এটি শুধু একটি চারমাথার মোড় বা ব্যস্ত বাজার নয়, এটি কলকাতার এক অমলিন সংস্কৃতি ও চেতনার প্রতীক। প্রচলিত মতে নামটির উদ্ভবের পেছনে রয়েছে গভীর ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক গুরুত্ব। এলাকাটির নামকরণকে প্রধানত দুটি অংশে বিশ্লেষণ করা যায় : ‘গড়িয়া’ এবং ‘হাট’।
‘গড়িয়া’ শব্দের উৎপত্তি : ইতিহাসবিদ ও ভাষাবিদদের মতে, ‘গড়িয়া’ শব্দটি এসেছে একটি বিশেষ প্রাচীন জনপদ থেকে। বর্তমান গড়িয়া এলাকাটি প্রাচীনকাল থেকেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার একটি অন্যতম বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল। আবার অন্য একটি মতে, এই অঞ্চলে একসময় নদীপথ বা খালের মাধ্যমে গঙ্গাসাগরের দিকে যাওয়া এবং সুন্দরবনের ব্যবসায়ীদের যাতায়াত ছিল। অতীতে গড়িয়া অঞ্চল ও তার সংলগ্ন এলাকায় বৈষ্ণব ও কাষ্ঠশিল্পীদের একটি বড় বসতি গড়ে উঠেছিল।
‘হাট’ শব্দের সংযোগ: ‘হাট’ একটি খাঁটি বাংলা শব্দ, যার অর্থ সাময়িক বা নিয়মিত গ্রামীণ বাজার। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে যখন আধুনিক কলকাতা আজকের রূপ নেয়নি, তখন দক্ষিণ কলকাতার এই অঞ্চলটি ছিল বেশ কিছুটা গ্রামীণ এবং জঙ্গলকীর্ণ। সেই সময়ে গড়িয়া অভিমুখে যাওয়া-আসার মূল রাস্তায় (বর্তমান গড়িয়াহাট রোড) স্থানীয় চাষী, কারিগর ও ব্যবসায়ীরা একটি সাপ্তাহিক বা দৈনিক বাজার বা ‘হাট’ বসাতেন। গড়িয়ার দিকে যাওয়ার রাস্তার ওপর অবস্থিত এই বিখ্যাত হাটটি থেকেই কালক্রমে জায়গাটির নাম হয় ‘গড়িয়াহাট’।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যখন কলকাতা শহর দক্ষিণ দিকে সম্প্রসারিত হতে শুরু করে, তখন এই গ্রামীণ ‘হাট’ ধীরে ধীরে একটি স্থায়ী এবং আধুনিক শহুরে বাণিজ্যিক কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়।
বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও ফুটপাতের সংস্কৃতি
গড়িয়াহাট বলতেই প্রথম যে দৃশ্যটি ভেসে ওঠে, তা হল রঙিন কাপড়ের দোকান, পসরা সাজানো ফুটপাত এবং কেনাকাটার গমগমে পরিবেশ। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উন্মুক্ত বাজার বা ‘ওপেন-এয়ার মার্কেট’।
শাড়ির স্বর্গরাজ্য: গড়িয়াহাটকে কলকাতার শাড়ির রাজধানী বললে ভুল হবে না। তাঁত, বালুচরি, কাঁথা স্টিচ, বেনারসি থেকে শুরু করে আধুনিক ডিজাইনার শাড়ি — এখানে পাওয়া যায় না এমন শাড়ি মেলা ভার। ‘প্রিয় গোপাল বিষয়ী’, ‘মৌচাক’ সংলগ্ন শাড়ির দোকান বা ‘একডালিয়া কমেন্স’-এর মতো নামী শাপিং হাবগুলো বছরের পর বছর ধরে বাঙালি নারীর সাজগোজের মূল ঠিকানা।
ফুটপাতের অর্থনীতি : গড়িয়াহাটের আসল মজা লুকিয়ে আছে এর ফুটপাতে। গড়িয়াহাট ফ্লাইওভারের নিচে ও দু’পাশের ফুটপাতে সারিবদ্ধভাবে বসে থাকা হকারদের দোকান যেন এক জাদুনগরী। পোশাক, জুতো, ব্যাগ, প্রসাধন সামগ্রী, মাটির ঘর সাজানোর জিনিস থেকে শুরু করে রান্নার বাসনপত্র — একই ছাদের (বা বলা ভালো আকাশের) নিচে সব মেলে।
দরদামের শিল্প : গড়িয়াহাটে কেনাকাটা করা কেবল টাকা খরচের বিষয় নয়, এটি একটি শিল্প। ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যকার সেই চিরপরিচিত দরদামের মধুর লড়াই গড়িয়াহাটের কেনাকাটাকে এক অন্যমাত্রায় নিয়ে যায়।
উৎসবে গড়িয়াহাট : দুর্গাপূজার মহোৎসব বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে গড়িয়াহাট এক মায়াবী রূপ ধারণ করে। মহালয়ার অনেক আগে থেকেই এখানে শুরু হয়ে যায় কেনাকাটার ঢল। প্যান্ডেল তৈরির কোলাহল, হকারদের হাঁকডাক এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের ভিড়ে গোটা এলাকাটি এক উৎসবে পরিণত হয়।
এছাড়া, গড়িয়াহাট মোড়ের আশেপাশের দুর্গাপূজাগুলো ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক অনন্য মিশ্রণ। ‘একডালিয়া পার্ক’, ‘সিংহী পার্ক’, ‘সাজাহান রোড’ বা ‘ত্রিধারা সন্মিলনী’র মতো বিশ্ববিখ্যাত পূজা মণ্ডপগুলো এই গড়িয়াহাট এলাকাতেই অবস্থিত। পূজার দিনগুলোতে আলোয় ঝলমল করে ওঠে গোটা গড়িয়াহাট মোড়, যেখানে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক অপূর্ব সমাবেশ ঘটে।
রসনাবিলাস ও আড্ডার চেনা ঠেক বাঙালি খাবার ভালোবাসে, আর গড়িয়াহাট সেই রসনাবিলাসের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দোকান থেকে শুরু করে আধুনিক ক্যাফে বা স্ট্রিট ফুড — সবকিছুর সেরা সম্ভার এখানে উপস্থিত।
ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি ও খাবার : গড়িয়াহাট মোড়ের ‘মিষ্টি মুখ’ মানেই ‘মৌচাক’ কিংবা ‘গাঙ্গুরাম’। এছাড়া কাছেই রয়েছে ‘দ্যা ডাবল ডেকোর’ বা স্থানীয় কেবিনগুলো, যেখানে এখনো মেলে শহরের সেরা কবিরাজি, চপ ও কাটলেট।
স্ট্রিট ফুডের আবেদন : গড়িয়াহাটের মোড়ে দাঁড়িয়ে গরম রোল, ফুচকা, বা মোমো খাওয়ার আনন্দই আলাদা। এখানকার ফুটপাতের ফুচকা বা রোলের দোকানগুলোর সামনে প্রতিদিন সন্ধ্যায় ভিড় জমায় হাজারো খাদ্যরসিক।
চা ও আড্ডা : ‘আড্ডা’ ছাড়া বাঙালির জীবন অসম্পূর্ণ। গড়িয়াহাটের বিভিন্ন মোড়, গোলপার্কের চা-এর দোকান বা পুরনো কেবিনগুলোতে আজও রাজনীতি, খেলাধুলা, সিনেমা ও সাহিত্য নিয়ে গভীর আলোচনা বা আড্ডা জমে ওঠে।
গড়িয়াহাট কেবল বাজারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর চারপাশ জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে দক্ষিণ কলকাতার কালচারাল হাব বা সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্রসমূহ।
গোলপার্ক ও রামকৃষ্ণ মিশন : গড়িয়াহাটের পাশেই গোলপার্ক এবং ঐতিহ্যবাহী ‘রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচার’। এটি শিক্ষা, দর্শন ও গবেষণার এক আন্তর্জাতিক কেন্দ্র।
গোলপার্কের দিকে এগোলেই দেখা মেলে অসংখ্য পুরনো বইয়ের দোকান। ধর্মতলা বা কলেজ স্ট্রিটের মতো অত বিশাল না হলেও, বিরল বই ও পত্রিকার জন্য গড়িয়াহাট-গোলপার্ক অঞ্চলের নিজস্ব একটি পরিচিতি রয়েছে।
গড়িয়াহাট মোড়টি দক্ষিণ কলকাতার যোগাযোগের অন্যতম প্রধান ধমনী। রাসবিহারী অ্যাভিনিউ এবং গড়িয়াহাট রোডের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই মোড়টি দিয়ে টালিগঞ্জ, যাদবপুর, শিয়ালদহ, ধর্মতলা বা বাইপাসের দিকে সহজে যাতায়াত করা যায়। এর ওপর নির্মিত ফ্লাইওভারটি ব্যস্ত শহরের যানজট কমাতে যেমন সাহায্য করেছে, তেমনি এই অঞ্চলকে দিয়েছে এক আধুনিক রূপ।
সময়ের সাথে সাথে গড়িয়াহাটের রূপ বদলেছে। পুরোনো একতলা বা দোতলা বাড়ির জায়গায় উঠেছে বিশাল বিশাল শপিং মল ও বহুতল ভবন। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের শোরুমগুলো জায়গা করে নিয়েছে ঐতিহ্যবাহী বাঙালি দোকানগুলোর পাশাপাশি। কিন্তু তবুও গড়িয়াহাট তার নিজস্ব আত্মাটিকে হারিয়ে ফেলেনি। আধুনিক শপিং মলের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের পাশে আজও সমান সগৌরবে টিকে রয়েছে ফুটপাতের দরদামের কেনাকাটা।
গড়িয়াহাট কোনো স্থির চিত্র প্রদর্শনীর নাম নয়; এটি এক জীবন্ত, গতিশীল ক্যানভাস। এটি শহরের এমন একটি অংশ, যেখানে অতীত ও বর্তমান একে অপরের হাত ধরে হাঁটে। ইট-কাঠ-পাথরের এই ব্যস্ত মোড়টির ভেতরে স্পন্দিত হয় আস্ত একটা কলকাতার হৃদয়। এখানকার কোলাহল, আলো, মানুষের হাসি, দরদামের হট্টগোল আর সোনালী বিকেলের চায়ের কাপে ওঠা তুফান — সব মিলিয়ে গড়িয়াহাট কেবল দক্ষিণ কলকাতার কেন্দ্রস্থল নয়, বরং প্রতিটি তিলোত্তমাপ্রেমী বাঙালির আবেগের এক চিরন্তন ঠিকানা। তবে গৌড়ীয় হাট থেকেই আসুক, বা গ’ড়ে মালার হাট থেকেই আসুক, বা গুড়িয়া কাঠের বাজারের নাম থেকেই গড়িয়াহাট নামটি আসুক, কোনওদিন হয়তো গড়িয়া বা অলস বলদের বিকিকিনি হত এখানে।