
৬২. ব্রাজিলের বিদ্রোহ দমনে বঙ্গবীর সুরেশ বিশ্বাস
বিচ্ছু ছেলে। লেখাপড়ায় মন নেই। সব সময় শয়তানি বুদ্ধি। মাত্র দু-বছর বয়েস। বিশ ফুট উঁচু মইতে উঠে বসেছে। পাখির ছানা পাড়তে উঠেছে গাছে। সেখানে ছিল সাপ। না. ভয় তার নেই। কি কৌশলে ছোবল মারতে যাওয়া সাপের ফনাকে ধরে ফেলে হাতের মুঠোয়। মাঠের মধ্যে সামনে পড়ল এক বুনো শুয়োর। হাতে ছিল বড়শির ছিপ। সেই ছিপের ঘায়ে বুনো শুয়োরকে শায়েস্তা করল অনায়াসে।
এই বিচ্ছু ছেলের নাম সুরেশ বিশ্বাস (১৮৬১-১৯০৫)। তাঁর পূর্বপুরেষেরা অংশগ্রহণ করেছিলেন নীল বিদ্রোহে। তাই ভয়হীনতা আর দুঃসাহসিকতা সুরেশের রক্তে।
নদিয়া জেলার কৃষ্ণগঞ্জ ব্লকের নাথপুরে এক মাহিষ্য পরিবারে তাঁর জন্ম। গিরিশচন্দ্র বিশ্বাসের প্রথম সন্তান সুরেশ। গিরিশচন্দ্র ছিলেন ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির সামান্য চাকুরে। ছেলের লেখাপড়ার কথা ভেবে গিরিশ চলে এলেন কলকাতায়। বালিগঞ্জে বসবাস শুরু করলেন। সুরেশকে ভর্তি করিয়ে দিলেন লণ্ডন মিশন কলেজে। ভর্তি তো হলেন, কিন্তু সুরেশের দিন কাটে তাস-পাশায়, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায়। বকাবকি করতে লাগলেন বাবা। তাতে আরও বিগড়ে গেলেন সুরেশ। মনে মনে ঠিক করে নিলেন বাড়ি ছাড়তে হবে তাঁকে। এই বন্ধন আর ভালো লাগছে না।
লণ্ডন মিশন কলেজে পড়ত খ্রিস্টান ছেলেরা। তাঁদের বাড়িতে সময় কাটাতেন সুরেশ। ফলে তাঁদের প্রভাব পড়তে লাগল। জাত-ধর্মে কমতে লাগল আস্থা। বাবার বকুনিতে বিরক্ত হয়ে বাড়ি ছাড়লেন একদিন। তারপর খ্রিস্টান হলেন। বাড়ি তো ছাড়লেন, থাকবেন কোথায়? কলেজের প্রিন্সিপাল অ্যাটসন সাহেব সদয় হয়ে কলেজ হস্টেলে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। না, তার জন্য কোন টাকা-পয়সা লাগবে না। কলেজ হস্টেলে থেকে সুরেশ চাকরির চেষ্টা করতে শুরু করলেন। স্পেন্সেস হোটেলে ট্রাভেল গাইডের চাকরি পেলেন আর এই সময় থেকে বিদেশ যাবার চিন্তা পেয়ে বসল তাঁকে।
এভাবে একদিন জাহাজে চেপে চলে এলেন রেঙ্গুনে। এখানেও টিকল না মন। চলে এলেন মাদ্রাজে। কিছুদিন সামান্য একটা চাকরি করে ফিরে এলেন কলকাতায় প্রিন্সিপাল অ্যাটসন সাহেবের আশ্রয়ে। সুরেশ এতদিনে বুঝেছেন পেটে বিদ্যা না থাকলে প্রতিকূল পৃথিবীতে টিকে থাকা মুশকিল। তাই মন দিলেন পড়াশুনোয়। আর তার ফাঁকে ফাঁকে ঘুরে বেড়ান জেটিতে জেটিতে। কবি মধুসূদন দত্তের মতো বিলেত তাঁকে টানছিল। একদিন আলাপ হল বি এস এন কোংরের ক্যাপ্টেনের সঙ্গে। তাঁরই বদান্যতায় সুরেশ জাহাজের সহকারী স্টুয়ার্ডের চাকরি পেলেন। মাত্র সতেরো বছর বয়েসে সেই জাহাজেই চেপে বসলেন বিলেতের উদ্দেশ্যে।
বিলেত তো এলেন, থাকবেন কোথায়? জাহাজের এক সহকর্মীর সাহায্যে লণ্ডনের ইস্ট এণ্ডে সস্তায় একটা ঘর ভাড়া নিলেন। জাহাজের চাকরি করে কিছু পয়সা জমিয়েছিলেন। কয়েকদিনেই তা শেষ হয়ে গেল। খবরের কাগজ বিক্রি করতে শুরু করলেন। তারপর ফেরিওয়ালার কাজ। তারপর কেন্টে এক সার্কাস দলের সঙ্গে যোগাযোগ হল। এই দলে চাকরি পেলে ভালো হয়। কিন্তু পরীক্ষা দিতে হবে। দিলেন। সার্কাসের এক বলশালী মানুষের সঙ্গে কুস্তিযুদ্ধ। জিতলেন সুরেশ। সার্কাস দলে চাকরি পেলেন। পশুবসকারী প্রফেসর জামবাখের সঙ্গে আলাপ হল। সুরেশ সার্কাসের চাকরি ছেড়ে জামবাখের পশুশালায় চাকরি নিলেন। সেখানে বছর দুয়েক থাকার পরে আবার ফিরে গেলেন সার্কাসের দলে। সেখান থেকে আবার চলে গেলেন জার্মানির পশু প্রশিক্ষক গাজেনবাখের পশুশালায়। গাজেনবাখের পশুশালা থেকে চলে আসেন জো কার্লের পশুশালায়। তারপর আবার সার্কাসে।
এইবার সুরেশের জীবনে লাগল প্রেমের স্পর্শ। প্রেম আর একবার এসেছিল জীবনে। তখন তিনি নিতান্ত কিশোর। রেঙ্গুন ছাড়ার ঠিক আগের দিন আগুন লেগেছিল এক বাড়িতে। ছুটে গিয়েছিলেন সুরেশ। বাঁচিয়েছিলেন এক মগ যুবতীকে। কৃতজ্ঞ মগ যুবতীর আহ্বানে সাড়া দেন নি। তাঁর ভবঘুরে জীবনের সঙ্গে জড়াতে চান নি যুবতীকে। এবার জার্মানিতে সার্কাস দলে এক জার্মান যুবতী নিবেদন করলেন প্রেম। কিন্তু সেই যুবতীর আত্মীয়েরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন সুরেশের বিরুদ্ধে। প্রাণ বাঁচাতে পালাতে হল সুরেশকে। মিঃ ওয়েলের সার্কাস দলে যোগ দিয়ে চলে এলেন ব্রাজিলে।
ব্রাজিলে নামডাক হল তাঁর। রাজকীয় পশুশালার প্রশিক্ষকের চাকরি পেলেন। এখানে আবার এল প্রেম। এক চিকিৎসকের মেয়ে প্রেম নিবেদন করলেন তাঁকে। সেই প্রেমিকার অনুরোধে যোগ দিলেন সম্রাটের সেনাবাহিনীতে। এরই মধ্যে সুরেশ বিচিত্র বিদ্যায় পারদর্শিতা অর্জন করেছেন। অবসর সময়ে তিনি গণিত, রসায়ন, দর্শন বিষয়ে বক্তৃতা দেন। সম্রাটের সৈন্যদলের অধিনায়কের পদ লাভ করে তিনি রিও-ডি জেনিরোর এক হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব পান। সেখানে শল্য চিকিৎসায় দক্ষ হয়ে ওঠেন।
১৮৯৩ সাল। ব্রাজিলে সূচনা হল এক রাষ্ট্রবিপ্লবের।
সাধারণতন্ত্রের নৌবাহিনী রাজধানী রিও-ডি-জেনিরোর দিকে গোলাবর্যণ শুরু করল। সুরেশ তখন স্থলবাহিনীর দায়িত্বে। তিনি দুর্গ রক্ষার কাজে নিযুক্ত। বিদ্রোহী নৌবাহিনী তখন শহরতলি নাথেরয় আক্রমণ করল। স্থলবাহিনীর মাত্র ৫০ জন সৈন্য নিয়ে সুরেশ এগিয়ে এলেন নাথেরয় রক্ষা করতে।
অপূর্ব রণকৌশলে নাথেরয়কে রক্ষা করতে ও বিদ্রোহ দমন করতে সফল হলেন বঙ্গবীর সুরেশ বিশ্বাস।