| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার পার্থ সারথি পাত্র-র ছোটগল্প ‘টাইম-ব্যাঙ্ক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সার্ধশতবর্ষে কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও শতবর্ষে সুরসম্রাট ভূপেন হাজারিকার স্মরণে : যশোবন্ত রায় মাটির নিচের ইন্টারনেট — অণুজীব ও উদ্ভিদের এক অদৃশ্য নেটওয়ার্ক : অন্বেষা গাঙ্গুলী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ব্রম্পটনে জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুরের সমাধি : অসিত দাস শৌনক দত্ত-র ছোটগল্প ‘হোয়েন আই ওয়াজ ডেড’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ডোকরা শিল্পীদের কাহিনি : স্বর্ণাভা কাঁড়ার পীযূষ কান্তি দাস-এর ছোটগল্প ‘ছমছম পায়েল বাজে’ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শাশ্বত বোস-এর বড়োগল্প এক বসন্ত স্বাধীনতার জন্যে নন্দিনী অধিকারী-র বড়োগল্প ‘দুর্গাদালান’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নকশালবাড়ি স্থাননামের নকশাল শব্দটির উৎসের সন্ধান : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিনয় মজুমদারের কবিতা — বিজ্ঞান ও দর্শনের রসায়নজাত স্বতন্ত্র নির্মাণ : আনন্দগোপাল হালদার উৎসবে মানুষ নতুন হয়ে ওঠে : হাসান আজিজুল হক ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-র ছোটগল্প ‘চার্বাক দর্শন’ দুর্গা যখন মাঠংমা : শ্যামলী কর ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার গিরমিটিয়া ভারতীয়দের ইতিহাস — কলকাতা বন্দর থেকে বিশ্বজুড়ে এক সংগ্রামের কাহিনী : কমল ব্যানার্জী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com, আমাদের পোর্টালের কিছু ছবি বাদে প্রায় সব ছবিই অন্তর্জাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। কারুর যদি কপিরাইট থাকে জানাবেন। আমরা সেই ছবি পোর্টাল থেকে ডিলিট করে দেব।

কেন উত্তম মহানায়ক : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয়

Reporter
বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় / ২৮৯ Views জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বাঙালি জনমানসে মহানায়ক উত্তম কুমার একাধারে চিরন্তন মিথ ও নস্টালজিয়া। তাঁর চলে যাওয়ার চার দশক পরেও রূপালি পর্দায় তাঁর উপস্থিতি সমানে উজ্জ্বল। শুধু তারকাদ্যুতি (Stardom) বা দুরন্ত রোমান্টিকতা দিয়ে উত্তম কুমারের অবিস্মরণীয় জনপ্রিয়তাকে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। আসলে উত্তম যেন কোনো রক্ত মাংসের অভিনেতা নন, বাঙালির আবেগ ও অনুভূতির কালজয়ী চিত্ররূপ। চলচ্চিত্র পাঠ বা ‘ফিল্ম স্টাডিজ’ (Film Studies)-এর আঙ্গিক থেকে বিশ্লেষণ করলে বলা যায়, উত্তম কুমার ছিলেন স্থান কালের সীমা পেরোনো চলচ্চিত্র অভিনয়ের সংজ্ঞা। হলিউডের দুবার অস্কার জয়ী চিরস্মরণীয় অভিনেতা পল লুকাসের অভিনয় দেখতে দেখতে মনে পড়ে যায় উত্তমের কথা,দুজনেই নাটকের চড়া মেজাজকে নিয়ন্ত্রণ করে সিনেমায় তাঁর রূপান্তর ঘটিয়েছিলেন মৃদু স্বর ক্ষেপণে। দুজনেই রোমান্টিক মেদুরতা ভেঙে অনায়াসে জীবন্ত করে তুলতেন জটিল চরিত্রের মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্ব। শুধু লুকাস নন, হলিউডের কেরি গ্রান্টের চার্ম, গ্রেগরি পেকের আভিজাত্য এবং মার্লন ব্র্যান্ডোর মতো কালজয়ী অভিনেতাদের অভিনয় দেখার পর যদি কেউ উত্তম কুমারের অভিনয় দেখে তাহলে সত্যজিৎ রায়ের কথাটাই মনে হবে, “উত্তম খাঁটি হলিউডি অর্থে একজন সত্যিকারের তারকা ছিলেন”।স্বাভাবিক অভিনয়ের এক অপূর্ব বাঙালি সংস্করণ ছিলেন উত্তম কুমার। নিশিপদ্মে যাঁর অভিনয় ২১ বার দেখেও রাজেশ খান্না বলেছিলেন, “আমি পারব না। দাদা, আপনি এক চোখে কান্না আর এক চোখে কি করে হাসি একসাথে করলেন, একটু দেখিয়ে দিন না! দুঃখের কথা শুধু বাংলা সিনেমা বলেই উত্তম থেকে গেলেন বাঙালির ম্যাটিনি আইডল হয়ে।

ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম আধুনিক ও ঘরোয়া ঘরানার (Naturalistic and Method-influenced) অভিনেতা উত্তম কুমার, যিনি মেলোড্রামার যুগ থেকে টলিউডকে এক লাফে বাস্তবসম্মত অভিনয়ের যুগে নিয়ে গিয়েছিলেন। যে বৈশিষ্ট্যগুলি দিয়ে তিনি বাংলা সিনেমার অভিনয়কে মৌলিক স্বাক্ষর দিয়ে বদলে দিয়ে যান সেগুলিই আজ তাঁর শতবর্ষে ফিল্মের ছাত্রদের কাছে শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে থাকবে। সেই যুগের বাংলা সিনেমার প্রচলিত অভিনয়ের প্রেক্ষিতে তাঁর অভিনয় কিভাবে বদলে দিয়েছিল পরবর্তী প্রজন্মের অভিনয়শৈলী আজ তা গবেষণার বিষয় হতে পারে। সবিস্তারে আলোচনা করলে বোঝা যাবে কেন তিনি অভিনয়ের ক্ষেত্রে বাংলা সিনেমায় নব যুগের স্রষ্টা।

১. থিয়েট্রিকাল মেলোড্রামা থেকে বাস্তববাদী অভিনয়ের উত্তরণ

উত্তম কুমারের আবির্ভাবের আগে বাংলা চলচ্চিত্রে মূলত নাট্যমঞ্চ বা থিয়েটারের প্রভাব ছিল প্রবল। অভিনেতারা চড়া গলায় সংলাপ বলতেন এবং অতি-নাটকীয় অঙ্গভঙ্গি করতেন। উত্তম কুমার এই ধারার আমূল পরিবর্তন ঘটান। তিনি পর্দায় নিয়ে আসেন ‘আন্ডার স্টেটমেন্ট’ বা সংযত অভিনয়।তার স্মরণীয় উদাহরণ বসু পরিবার (১৯৫২) ও সাড়ে চুয়াত্তর (১৯৫৩)।

বসু পরিবার চলচ্চিত্রে তিনি প্রথম প্রমাণ করেন যে, সাধারণ মধ্যবিত্ত যুবকের প্রাত্যহিক সুখ-দুঃখকে কোনো বাড়তি আতিশয্য ছাড়াই পর্দায় ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। তাঁর সংলাপ বলার ধরন ছিল ভীষণ স্বাভাবিক, যেন পাশের বাড়ির কোনো ছেলে কথা বলছে। আর সাড়ে চুয়াত্তর ছবিতে কমেডির মোড়কে তাঁর সাবলীল রোমান্টিক অভিব্যক্তি তৎকালীন চড়া অভিনয়ের যুগে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল। ফিল্ম স্টাডিজের ভাষায়, একে বলা হয় ‘ন্যাচারালিজম’ (Naturalism), যেখানে অভিনেতা তাঁর বাস্তব চরিত্রকে হুবহু পর্দায় ফুটিয়ে তোলেন।

২. অভিব্যক্তির মাইক্রো-এক্সপ্রেশন (Micro-Expressions)

উত্তম কুমারের অভিনয়ের একটি বড় শক্তি ছিল তাঁর চোখের ব্যবহার এবং মুখের সূক্ষ্ম পেশির সঞ্চালন। দীর্ঘ সংলাপ না বলেও কেবল চোখের ইশারা বা ঠোঁটের কোণের মৃদু হাসিতে তিনি একটি সম্পূর্ণ দৃশ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। ক্যামেরার ক্লোজ-আপ (Close-up Shot) শটকে কীভাবে নিজের পক্ষে ব্যবহার করতে হয়, তা তাঁর চেয়ে ভালো খুব কম অভিনেতাই জানতেন। পাঠক মনে করে দেখুন, হারানো সুর (১৯৫৭) ও সপ্তপদী (১৯৬১)।

হারানো সুর ছবিতে স্মৃতিভ্রষ্ট অলক মুখোপাধ্যায়ের চরিত্রে তাঁর শূন্য দৃষ্টি এবং পরবর্তীতে স্মৃতি ফিরে পাওয়ার পর মানসিক দ্বন্দ্বের প্রকাশ এক অনবদ্য সৃষ্টি। ক্লোজ-আপ শটে তাঁর চোখের মণি কেঁপে ওঠা বা কপালে ভাঁজ পড়া অবলীলায় ফ্রেমের ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনকে (Psychological conflict) তুলে ধরে।আবার সপ্তপদী ছবিতে কৃষ্ণেন্দু চরিত্রে যখন তিনি ওথেলোর সংলাপ বলছেন, তখন তাঁর শারীরিক ভাষা এবং কণ্ঠস্বরের মড্যুলেশন (Voice Modulation) থিয়েটার এবং সিনেমার এক অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটায়। রীনা ব্রাউনের (সুচিত্রা সেন) সামনে তাঁর প্রেম ও অভিমানে ভরা চাহনি সিনেমার ফ্রেমিংয়ের ব্যাকরণকে নতুন মাত্রা দিয়ে গেছে।

৩. ‘স্টার ইমেজ’ ভেঙে চরিত্রের ভেতরে প্রবেশ (Method Acting)

অনেকেই মনে করেন উত্তম কুমার শুধু রোমান্টিক ছবিতেই সেরা ছিলেন। কিন্তু চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, নিজের তৈরি ‘রোমান্টিক হিরো’র ইমেজ বা ছাঁচ ভেঙে বার বার নিজেকে ভেঙেছেন তিনি। চরিত্রের প্রয়োজনে নিজের গ্ল্যামারকে সম্পূর্ণ বিসর্জন দেওয়ার এক বিরল ক্ষমতা তাঁর ছিলএবং তার পরেও সেই সব ক্যারেক্টার রোলে তিনি এমন অনবদ্য অভিনয় করে গেছেন যা আজও অবিস্মরণীয় হয়ে রয়েছে।এর শাশ্বত দৃষ্টান্ত খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন ছবিতে ভৃত্যের ভূমিকায় বা বাঘিনী ছবিতে সম্পূর্ণ বিপরীত ঘরানার চরিত্রে অনন্য অভিনয়।

খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পে একজন অনুগত গ্রামীণ ভৃত্যের চরিত্রে অভিনয় করেন উত্তম। একজন গ্ল্যামারাস মহানায়ক কীভাবে ধুতি ও ফতুয়া পরে, পিঠ কুঁজো করে, সম্পূর্ণ গ্রামীণ বাচনভঙ্গিতে একজন ভৃত্যের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন, তা আজও অভিনয় শিক্ষার ক্লাসে উদাহরণ হিসেবে দেখানো হয়। এখানে তিনি স্তানিস্লাভস্কির ‘মেথড অ্যাক্টিং’ (Method Acting)-এর মতো চরিত্রের মনস্তত্ত্ব নিজের মধ্যে ধারণ করেছিলেন।

একইভাবে বাঘিনী ছবিতে একজন মদ্যপ, রুক্ষ ও ক্রূর চোলাই মদ ব্যবসায়ীর চরিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল তাঁর চেনা চকোলেট-বয় ইমেজের সম্পূর্ণ বিপরীত।

৪. নায়ক থেকে মহানায়ক: মনস্তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ

উত্তম কুমারের অবিস্মরণীয় ধারাবাহিক অভিনয় সাফল্য উত্তমকে নায়ক থেকে মহা নায়কে উত্তরণ ঘটায় । জীবনের এভারেস্ট যদি কোনো ছবিকে বলা হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে সত্যজিৎ রায়ের নায়ক (১৯৬৬)। এই চলচ্চিত্রটি মূলত একটি ক্যারেক্টার স্টাডি (Character Study) বা চরিত্র বিশ্লেষণ। সত্যজিৎ রায় উত্তম কুমারের বাস্তব জীবনের তারকা সত্তাকেই সিনেমার পর্দায় অরিন্দম চ্যাটার্জি চরিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।

চলচ্চিত্র পাঠের দিক থেকে নায়ক ছবিতে উত্তম কুমারের অভিনয় একটি টেক্সটবুক। ট্রেনের কামরায় শর্মিলা ঠাকুরের মুখোমুখি বসে নিজের অতীতকে রোমন্থন করার সময় উত্তমের মুখে যে ক্লান্তি, একাকীত্ব, অপরাধবোধ এবং একই সাথে অহংকার ফুটে উঠেছিল, তা ভারতীয় চলচ্চিত্রে বিরল।

বিশেষ করে মদ্যপ অবস্থায় ট্রেনের করিডোরে হেঁটে যাওয়ার পরাবাস্তব বা ড্রিম সিকোয়েন্স (Dream Sequence) এবং বিবেকের দংশনে ছটফট করার দৃশ্যগুলোতে তাঁর অভিনয় ছিল লাকাঁ-র (Lacan) মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্বের মতো — যেখানে একজন মানুষের বাইরের জাঁকজমকপূর্ণ খোলসটার ভেতরে লুকিয়ে থাকা নিঃসঙ্গতার রূপটি নগ্ন হয়ে পড়ে। সত্যজিৎ রায় নিজেই স্বীকার করেছিলেন, উত্তম কুমার না থাকলে নায়ক ছবি তৈরিই হতো না।

৫. অ্যান্টি-হিরো এবং ধূসর চরিত্র রূপায়ণ

নায়ক মানেই সে সবসময় সৎ বা আদর্শবাদী হবে — এই ধারণাকে উত্তম কুমার আশির দশকের অনেক আগেই ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিলেন। নেতিবাচক বা ধূসর (Grey Shade) চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মনে ভয়ের চেয়ে তাঁর অভিনয় দক্ষতার প্রতি সমীহ বাড়িয়ে দিয়েছিল।বাঘবন্দী খেলা (১৯৭৫) ও স্ত্রী (১৯৭২) এর সম্যক উদাহরণ।

বাঘবন্দী খেলা ছবিতে তিনি একজন নীতিহীন, দুর্নীতিপরায়ণ স্মাগলার ও লম্পট মানুষের চরিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর খলনায়কোচিত হাসি, চতুর চোখের চাউনি এবং ক্রূর শারীরিক ভাষা দর্শকদের শিউরে উঠিয়েছিল।আবার স্ত্রী ছবিতে চলচ্চিত্রে মদ্যপ, লম্পট জমিদারের চরিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল অসাধারণ। “হরিচরণ, এক গ্লাস জল দাও তো” সংলাপটি তিনি যেভাবে অবক্ষয়িত সামন্ততান্ত্রিক অহংকার ও ভেতরের শূন্যতা মিশিয়ে উচ্চারণ করেছিলেন, তা খলনায়কের চরিত্রকেও এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। ফিল্ম স্টাডিজে একে বলা হয় ‘অ্যান্টি-হিরো আর্কেটাইপ’ (Anti-hero Archetype), যা হিন্দি সিনেমায় অনেক পরে অমিতাভ বচ্চন বা শাহরুখ খানের হাত ধরে জনপ্রিয় হয়েছিল।

৬. কমেডি বা কমিক টাইমিং-এর মাস্টারক্লাস

রোমান্স এবং ট্র্যাজেডির পাশাপাশি উত্তম কুমার কমেডি বা হাস্যকৌতুক অভিনয়েও ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কমেডি অভিনয়ের মূল চাবিকাঠি হলো ‘টাইমিং’ (Timing) — অর্থাৎ কখন কোন সংলাপের পর কতটা বিরতি (Pause) দিতে হবে। উত্তম কুমার এই পরিমিতিবোধে ছিলেন সিদ্ধহস্ত।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের গল্প অবলম্বনে তৈরি ভ্রান্তিবিলাস ছবিতে যমজ ভাইয়ের চরিত্রে তাঁর বিভ্রান্তি, ভয় এবং কমিক এক্সপ্রেশন আজও দর্শকদের হাসায়। এখানে কোনো ভাঁড়ামো বা স্লাপস্টিক কমেডি (Slapstick Comedy) ছিল না, ছিল নিখাদ পরিস্থিতিজনিত রসিকতা (Situational Comedy)।

ধন্যি মেয়ে ছবিতে ফুটবল পাগল বগলাচরণের দাদার চরিত্রে তাঁর চিৎকার, মেজাজ হারানো এবং একই সাথে স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা — সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত মধ্যবিত্ত কমেডি উপাদান তৈরি করেছিলেন, যা চরিত্রটিকে অত্যন্ত মানবিক করে তোলে।

আজকের আধুনিক চলচ্চিত্রে যাকে ‘রিয়েলিস্টিক অ্যাক্টিং’ (Realistic Acting) বলা হয়, উত্তম কুমার আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগেই বাংলা সিনেমায় তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। তিনি জানতেন ক্যামেরার ফ্রেমিংয়ের সীমাবদ্ধতা এবং লেন্সের শক্তি। অতিরিক্ত হাত-পা না নাড়িয়ে, মেদহীন সংলাপে এবং নিখুঁত অভিব্যক্তি দিয়ে কীভাবে একটি দৃশ্যকে জয় করা যায় — তা তাঁর এই অসাধারণ পরিমিতিবোধের কারণেই সম্ভব হয়েছিল। উত্তমের অভিনয়ের অন্যতম সম্পদ ছিল তাঁর পরিমিতিবোধ। কোথায় কতটুকু উচ্চারণ কতটা শরীরের সঞ্চালন আর তার সঙ্গে ক্যামেরাকে কীভাবে কন্ট্রোল করতে হবে এ ব্যাপারে তিনি চলচ্চিত্র অভিনয়ের সংজ্ঞা হয়ে রয়ে গেছেন। আর এই কারণেই তাঁর অভিনয় আন্তর্জাতিক মানের , অভিনয় শিক্ষার এক অনন্য টেক্সটবুক।

পরিমিতি আনতে গেলে কিভাবে কণ্ঠ স্বরকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় উত্তম যেন তাকে হাতে ধরে শেখানোর জন্য প্রতিটি চরিত্রে দেখিয়ে গেছেন।কণ্ঠস্বরের পরিমিতিবোধ এবং শব্দের সূক্ষ্মতম মডিউলশনের (Voice Modulation) ক্ষেত্রে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রে আধুনিকতার জন্ম দিয়েছিলেন।অভিনয়ের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘ভোকাল ডায়নামিজম’ (Vocal Dynamism)। উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার নয়। শুধু কণ্ঠের গভীরতা, টেক্সচার বদল এবং স্বর ক্ষেপনে কম্পনের মাধ্যমে চরিত্রের ভেতরের না বলা কথাকেও দর্শকদের সামনে উন্মোচিত করা যায়। কণ্ঠের শৈলীতে এবং সংলাপের কালজয়ী উচ্চারণে তাঁর অভিনয় অন্য মাত্রা পেয়ে যেত।

১. ফিসফিসানি বা নিচু স্বরের জাদু (The Art of Whispering)

থিয়েটারের যুগে অভিনেতারা মনে করতেন রাগ বা তীব্র দুঃখ প্রকাশ করতে হলে গলার আওয়াজ উঁচুতে (High Pitch) নিয়ে যেতে হবে। উত্তম কুমার এই ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দেন। তিনি প্রথম দেখান যে, মাইক্রোফোনের সামনে এসে গলার স্বর একেবারে নিচে নামিয়ে এনেও তীব্রতম মানসিক টানাপোড়েন বা রোমান্টিক গভীরতা তৈরি করা যায়।চৌরঙ্গী ছবিতে ‘স্যাটা বোস’ যখন জীবনের চরম ক্লান্তি ও একাকীত্ব প্রকাশ করছেন, তখন তাঁর কণ্ঠের কাজ লক্ষ্য করার মতো। ছবির ক্লাইম্যাক্সের দিকে শঙ্করকে (শুভেন্দু চ্যাটার্জি) উদ্দেশ্য করে যখন তিনি তাঁর জীবনের শেষ সত্যগুলো বলছেন, তখন তাঁর গলা ছিল সম্পূর্ণ নিচু পর্দায় (Low Pitch)। যেন তিনি সংলাপ বলছেন না, নিজের ভেতরের শূন্যতাকে নিংড়ে দিচ্ছেন। গলার স্বরের মধ্যে এক ধরণের শুষ্কতা এবং হালকা খসখসে ভাব (Husky Texture) এনেছিলেন, যা দর্শককে চোখের জলের চেয়েও বেশি এক বুক ভারী করা কান্না উপহার দেয়।

২. রোমান্টিক সংলাপে ‘ব্রিদিং টেকনিক’ (Breathing Technique)

রোমান্টিক ছবির সংলাপে উত্তম কুমারের গলার স্বরে এক অদ্ভুত মায়াজাল থাকত। তিনি সংলাপ বলার সময় তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাসের গতিকে (Breathing Control) অভিনয়ের অংশ করে তুলেছিলেন। অগ্নিপরীক্ষা (১৯৫৪): ছবিতে সুচিত্রা সেনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যখন তিনি রোমান্টিক সংলাপ বলছেন, তখন শব্দের উচ্চারণের মাঝে হালকা নিঃশ্বাস ছাড়ার শব্দ বা একটা ছোট্ট বিরতি (Pause) সংলাপের গভীরতা বাড়িয়ে দিত।

হারানো সুর (১৯৫৭) সিনেমায় স্মৃতি ফিরে পাওয়ার পর ছবিতে সুচিত্রা সেনকে দেখে যখন তিনি জিজ্ঞেস করেন, “আপনি কে?” — সেই দুটি শব্দের উচ্চারণে কোনো নাটকীয়তা ছিল না। ছিল এক অদ্ভুত দ্বিধা ও অচেনা মানুষের প্রতি সামান্য কৌতূহল। গলার স্বরের এই পরিমিতিই দৃশ্যটিকে কালজয়ী করে তুলেছিল।

৩. চরিত্রের সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী বাচনভঙ্গি বদল

উত্তম কুমারের কণ্ঠের আরেকটি বড় মৌলিকত্ব ছিল, তিনি চরিত্রের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী নিজের আসল কণ্ঠস্বরকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলতে পারতেন। একে ফিল্ম স্টাডিজে ‘সোশিও-লিঙ্গুইস্টিক অ্যাক্টিং’ (Socio-linguistic Acting) বলা হয়।

খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন (১৯৬০) ছবিতে গ্রামীণ ও অশিক্ষিত ভৃত্য ‘রাইচরণ’-এর চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে উত্তম কুমার তাঁর চেনা শহুরে আভিজাত্য মেশানো গম্ভীর কণ্ঠস্বরকে এক ঝটকায় বিদায় দিয়েছিলেন। সংলাপ বলছিলেন কিছুটা গ্রাম্য টানে, গলার স্বর ছিল ভাঙা এবং সংলাপের গতি ছিল মন্থর। বৃদ্ধ বয়সের দৃশ্যে তাঁর গলার স্বরে যে মৃদু কম্পন ছিল, তা কোনো কৃত্রিম মেকআপ ছাড়াই চরিত্রটিকে জীবন্ত করে তুলেছিল।

অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি (১৯৬৭) ছবিতে উত্তম পর্তুগিজ সাহেব যিনি বাঙালি সংস্কৃতি ও ভাষার প্রেমে পড়ে ধীরে ধীরে বাংলায় সাবলীল হয়ে ওঠেন,শেষে কবিয়াল হয়ে উঠছেন। ছবির এমন একটি চরিত্রের বিবর্তন ফুটিয়ে তুলতে উত্তম শুরুতে বাংলা ভাষার উচ্চারণ করেছেন ফিরিঙ্গীদের মতোই। তাঁর উচ্চারণের স্টাইল বিদেশি ছাঁচের। কিন্তু ছবি যত এগিয়েছে তত সাহেব হয়ে উঠেছে খাঁটি বাঙালির মতোই। তাই গান ও কবিগানের লড়াইয়ের সময় সেই উত্তমের কণ্ঠস্বরেই বাঙালি লোকসংস্কৃতির মাটির টান। সংলাপ উচ্চারণে এই সূক্ষ্ম রূপান্তর তিনি ঘটিয়েছিলেন নিখুঁত কণ্ঠ মডিউলসনের মাধ্যমে যা চিরস্মরণীয়।

৪. খল বা ধূসর চরিত্রে কণ্ঠের ক্রূরতা (Chilling Restraint)

খলনায়ক বা অ্যান্টি-হিরোর চরিত্রে অভিনয় করার সময় উত্তম কুমার কখনো চড়া হাসির বা চেনা খলনায়কদের মতো গলার আওয়াজ মোটা করে কথা বলতেন না। তিনি কণ্ঠের মধ্যে এক ধরণের শীতলতা (Chilling Restraint) নিয়ে আসতেন, যা দর্শকদের মনে ভয়ের সঞ্চার করত।

বাঘবন্দী খেলা (১৯৭৫) ছবিতে একজন ঠান্ডা মাথার অপরাধীর চরিত্রে তাঁর সংলাপ বলার ধরন ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক ও মিষ্টি, কিন্তু সেই মিষ্টি কথার আড়ালেই লুকিয়ে থাকত তীব্র বিষ। তিনি যখন হাসতেন বা কোনো চক্রান্তের কথা বলতেন, তাঁর গলার টোন থাকত অত্যন্ত শান্ত এবং হিসেবী — যা চরিত্রটিকে আরও বেশি বিপজ্জনক করে তুলেছিল।

উত্তম কুমারের সংলাপ বলার ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি শব্দকে কেবল উচ্চারণ করতেন না, শব্দের ভেতরে থাকা ভাব বা সাবটেক্সটকে (Subtext) কণ্ঠের কম্পাঙ্ক দিয়ে দর্শকদের কান থেকে সোজা হৃদয়ে পৌঁছে দিতেন। কণ্ঠের এই জাদুকরী ও আধুনিক ব্যবহারের কারণেই তাঁর বলা সংলাপগুলো চার দশক পরেও নস্টালজিয়া হয়ে বেঁচে রয়েছে।উত্তমের সব ছবির দৃষ্টান্ত দিয়ে এই লেখা সম্পূর্ণ করা যাবে না।তারমধ্যে কয়েকটি মাত্র উল্লেখ করে আলোচনা হল।

হারানো সুর (১৯৫৭) ছবির কথা না বললে অনেক কথা বলা হবে না। নানা দিক থেকে এই ছবি উত্তমের জীবনের সিগনেচার ফিল্ম। এই ছবির ক্লাইম্যাক্স দৃশ্যে প্রবল মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব অনবদ্য অভিনয়ে ফুটিয়ে তোলেন। ছবিতে যখন উত্তম কুমার (এখানে অলক মুখোপাধ্যায়) পুরনো স্মৃতি ফিরে পেয়েছেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত গ্রামীণ পরিবেশের ‘পলাশপুর’, স্ত্রী রমা-র (সুচিত্রা সেন) স্মৃতি সম্পূর্ণ ভুলে গেছেন, সুচিত্রা সেন যখন তাঁর নিজের অধিকার দাবি করতে না পেরে অলকের বাড়িতে তাঁরই ভাইয়ের মেয়ে ‘মালা’-র গভর্নেস (শিক্ষিকা) হিসেবে চাকরি নিয়ে আসেন, তখন উত্তম কুমার তাঁকে দেখে বলেন সেই অসামান্য সংলাপ। আপনি? মালার গভর্নেস!” — কণ্ঠের মডিউলশন কোন মাত্রায় করে অভিনয়কে কোন উচ্চতায় তুলে নিয়ে যাওয়া যায় তার অসামান্য উদাহরণ রেখে গেছেন উত্তম কুমার। তাঁর গলার স্বরে কোনো উচ্চকিত নাটকীয়তা বা মেলোড্রামা ছিল না। শুধু ছিল এক অদ্ভুত মিশ্রণ — সামান্য বিস্ময়, চেনা চেনা লেগেও চিনতে না পারার এক অবচেতনের আকুলতা এবং চরম নাগরিক আভিজাত্য। তিনি “আপনি?” শব্দটির পর যে এক সেকেন্ডের একটি নীরবতা (Pause) নিয়েছিলেন, তা চলচ্চিত্রে অভিনয় শিক্ষার্থীদের কাছে অনুকরণীয় অবশ্য শিক্ষা। উত্তম কুমার এখানে স্তানিস্লাভস্কির ‘মেথড অ্যাক্টিং’-এর মতো নিজের চরিত্রটির মানসিক অবস্থা (যে একজন স্মৃতিভ্রষ্ট মানুষ) সম্পূর্ণ ধারণ করেছিলেন। উত্তমের সেই নীরবতাই দর্শকদের মনে তীব্র এক হাহাকার ও শিহরণ তৈরি করে, কারণ দর্শক জানে এই নারীটি আসলে তাঁরই স্ত্রী! কত না বলা সংলাপ এভাবেই তিনি বলে গেছেন শুধু ক্ষণিকের নীরবতায়, অভিনয়ে নীরবতাও যে ‘সংলাপ’, সেটা বারবার তাঁর অভিনয়ে ফুটে উঠত উজ্জ্বল অলঙ্কার হয়ে।

অভিনয়ের এই অপূর্ব পরিমিতি তাঁকে অনবদ্য করে তুলেছিল। হারানো সুর ছবিতে সুচিত্রা সেনের দিকে তাকানোর সময় উত্তম চোখ দুটো সামান্য কুঁচকে নেন, যেন তিনি তাঁর অবচেতনে লুকিয়ে থাকা কোনো স্মৃতিকে হাতড়ে বেড়ানোর চেষ্টা করছেন। আর তাঁর গলার স্বরটি ছিল অত্যন্ত নিচু পর্দায় (Low Pitch) এবং শান্ত। একজন অভিনেতার গলার এই শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ টোনই দর্শকের অবচেতনে গিয়ে আঘাত করে। আর এই কারণেই আপনি? মালার গভর্নেস! সংলাপটি শোনার সাথে সাথে দর্শকদের মেরুদণ্ড দিয়ে অদৃশ্য শিহরণ বয়ে যায়।

এই ছিলেন উত্তম যাঁর অভিনয় শৈলী নিয়ে লক্ষ শব্দ লিখেও শেষ করা যাবে না। সিনেমার অভিনয়ের তিনি এক জীবন্ত টেক্সট বুক। প্রতিভায় অনন্ত বিস্ময়! রুপোলি পর্দায় তাই আজও তিনি অবিনশ্বর প্রজ্বলিত নক্ষত্র।

সহ-অভিনয়েও কালজয়ী

একজন মহান অভিনেতার লক্ষণ হলো তিনি নিজে যেমন ভালো অভিনয় করেন, তেমনি সহ-অভিনেতার অভিনয়কেও ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করেন (Reacting is Acting)। উত্তম কুমার ছিলেন তেমনই একজন অভিনেতা যিনি কখনও একা ফ্রেম বা স্ক্রিন স্পেস দখল করার চেষ্টা করেননি, সহ অভিনেতাকে জীবন্ত করে তোলার দায়ও যেন কাঁধ বাড়িয়ে অনেক খানি তিনিই নিয়ে নিতেন। উদাহরণ অজস্র।সত্যজিৎ রায়ের চিড়িয়াখানা ছবিতে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশ বক্সীর চরিত্রে অভিনয় করেন উত্তম। এই ছবিতে তিনি যখন ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বা অন্যান্য সন্দেহভাজনদের জেরা করছেন, তখন তাঁর ফোকাস ছিল সম্পূর্ণ উল্টোদিকের চরিত্রের ওপর।

সুচিত্রা সেন, সুপ্রিয়া দেবী, বা মাধবী মুখোপাধ্যায়ের মতো প্রবল শক্তিশালী অভিনেত্রীদের সাথে গড়েছেন অনস্ক্রিন রসায়ন, তা কেবল প্রেমের সংলাপে নয়, বরং একে অপরের দিকে তাকানো এবং ফ্রেমের মধ্যে নিজেদের শারীরিক দূরত্বের (Proxemics) সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে সেটা তৈরি করেছিলেন নিখুঁত হিসেব কোষেই।

সহ-অভিনেতাদের সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রেও উত্তম কুমারের ক্ষমতা ছিল আশ্চর্যরকম, যাকে থিয়েটার ও ফিল্ম স্টাডিজের ভাষায় বলা যায় ‘কো-অ্যাক্টর সিনার্জি’ (Co-actor Synergy) বা ‘ইন্টারপার্সোনাল ডায়নামিক্স’ (Interpersonal Dynamics) । একজন প্রকৃত মহান অভিনেতার পরিচয় কেবল তাঁর নিজের অভিনয়ে থাকে না, বরং তাঁর সামনের অভিনেতা যাতে ফ্রেমে সেরা পারফর্ম করতে পারেন, সেই ‘স্পেস’ বা সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার মানসিকতার মধ্যে থাকে।

উত্তম কুমার কখনোই ফ্রেমের সব আলো একা কেড়ে নেওয়া বিশ্বাস করতেন না (Scene Stealing)। বরং তিনি বিশ্বাস করতেন, সিনেমা একটি যৌথ শিল্প এবং তাঁর সঙ্গে সহ অভিনেতা ভালো না করলে দৃশ্যটি কখনোই পূর্ণতা পাবে না।তাই দুই ভাই বা দুই পৃথিবী ছবিতে কখনও তিনি সহ অভিনেতাকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন নি , নিজেকে স্বতন্ত্র করে রাখতে চান নি।সারাক্ষণ একই তালে তাল দিয়ে সমানে সমানে অভিনয় করেছেন, কিন্তু কখনও মনে হয় নি দুজনে টক্কর দিচ্ছেন।এটাই সহ অভিনেতার প্রতি শ্রদ্ধা যা ছিল তাঁর মজ্জাগত।

চলচ্চিত্র বিশ্লেষণের আঙ্গিক থেকে সহ-অভিনেতাদের সাথে তাঁর এই জাদুকরী রসায়নের পিছনে ছিল তাঁর নিজের মূল্যবোধ —

১. ‘অ্যাক্টিং ইজ লিসেনিং’: শোনার মাধ্যমে সহ-অভিনেতাকে উজ্জীবিত করা

চলচ্চিত্রে সংলাপ বলার চেয়েও কঠিন হলো সামনের মানুষের সংলাপ মনোযোগ দিয়ে শোনা। অনেক বড় তারকা অভিনেতা সামনের জনের সংলাপের সময় নিজের লুক বা পরবর্তী লাইনের কথা ভাবেন। কিন্তু উত্তম কুমার ছিলেন একজন অসাধারণ শ্রোতা । অভিনয়ে ‘লিসেনার’ (Listener) ভূমিকাটি কত গুরুত্বপূর্ণ সেটা উত্তমকে দেখলে বোঝা যায়।

সত্যজিৎ রায়ের চিড়িয়াখানা (১৯৬৭) ছবিতে ব্যোমকেশ রূপী উত্তম কুমার যখন কলোনির বিভিন্ন সন্দেহভাজন চরিত্রদের (যেমন জহর রায় বা অন্যান্য অভিনেতারা) জেরা করছেন, তখন ক্যামেরা মোশন এবং উত্তমের অভিব্যক্তি লক্ষ্য করার মতো। তারকা ইমেজকে সম্পূর্ণ আড়ালে রেখে একজন শান্ত শ্রোতার মতো বসতেন। তাঁর এই গভীর মনোযোগ সামনের অভিনেতাকে এতটাই স্বস্তি দিত যে, তাঁরা অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে নিজেদের চরিত্রের জটিলতা ক্যামেরার সামনে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন।

নায়ক (১৯৬৬) ছবিতে ট্রেনের কামরায় নবাগতা ও জুনিয়র অভিনেতাদের সাথে দৃশ্যে (যেমন ট্রেনের অন্যান্য সহযাত্রী) উত্তম কুমারের প্রতিক্রিয়া ছিল ভীষণ বিনয়ী ও চরিত্রানুযায়ী। তিনি এমনভাবে তাঁদের দিকে তাকাতেন এবং সংলাপের প্রত্যুত্তর দিতেন, যাতে সেই সাধারণ অভিনেতাদের পারফরম্যান্সও এক ধাক্কায় অনেক উঁচুতে উঠে যেত।

২. ছায়া হয়ে আলো ছড়ানো: সুচিত্রা সেনের সাথে দ্বৈত মহিমা

উত্তম-সুচিত্রা বাংলা সিনেমার ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক জুটি কী করে হলেন? চলচ্চিত্র পাঠের ছাত্র হিসেবে এই জুটির অভিনয়ের টেক্সচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, উত্তম কুমার এখানে সুচিত্রা সেনের স্টারডম এবং ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তুলতে নিজের অভিনয়ের পরিমিতিকে নিখুঁতভাবে ব্যবহার করতেন। সচেতনভাবে সুচিত্রার সঙ্গে এমন একটা মাত্রায় অভিনয়কে ধরে রাখতেন যেখানে তিনি কখনোই সুচিত্রাকে ছাপিয়ে যেতেন না, আবার নিজেও ওভার প্লে বা আন্ডার প্লে কোনোটাই করতেন না। সব সময় অসাধারণ ভারসাম্য রাখতে গভীর অভিনয় বোধকে কাজে লাগাতেন।

সপ্তপদী (১৯৬১) ছবির বিখ্যাত বাইক চালুর দৃশ্য বা ওথেলো রিহার্সালের দৃশ্যে সুচিত্রা সেন যখন তীব্র আবেগে ফেটে পড়ছেন, উত্তম কুমার তখন নিজেকে শান্ত রেখে সুচিত্রার চড়া বা লাউড মেলোড্রামাকে নিয়ন্ত্রণ করছেন । বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে এই টেক্সট বুক ব্যাকরণের অভিনয় কণ্ঠস্বর ও শারীরিক অভিব্যক্তিতে ফুটিয়ে তোলা যে কী অসীম ক্ষমতা দাবি করে সেটা যারা ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছেন তাঁরা জানেন।

আলো আমার আলো (১৯৭২) ছবিতে সুচিত্রা সেনের চরিত্রটি ছিল মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও জটিল। উত্তম কুমার সেখানে অত্যন্ত শান্ত, ধৈর্যশীল এক চিকিৎসকের মতো অবয়ব ধারণ করেছিলেন। তিনি যদি সেখানে নিজের ‘হিরোইজম’ দেখাতে যেতেন, তবে সুচিত্রার চরিত্রটির ট্র্যাজেডি ম্লান হয়ে যেত। সহ-অভিনেত্রীকে ফ্রেমের কেন্দ্রবিন্দু হতে দিয়ে নিজে ব্যাকগ্রাউন্ডে থেকে দৃশ্যকে নিয়ন্ত্রণ করার এই ক্ষমতা কেবল উত্তম কুমারেরই ছিল।

৩. কৌতুকাভিনেতাদের সাথে নিখুঁত ‘টাইমিং’ ও স্পেস ভাগ করা

কমেডি ছবির ক্ষেত্রে উত্তম কুমার তুলসী চক্রবর্তী, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায় বা রবি ঘোষের মতো কিংবদন্তি কৌতুকাভিনেতাদের পূর্ণ স্বাধীনতা দিতেন। তিনি জানতেন, কমেডির আসল রস লুকিয়ে আছে সহ-অভিনেতার কমিক পাঞ্চের ওপর।

সাড়ে চুয়াত্তর (১৯৫৩) ছবিতে মেসের ম্যানেজার রজনীবাবুর (তুলসী চক্রবর্তী) সাথে উত্তমের প্রতিটি দৃশ্যই যেন এক একটি রসায়নের পাঠশালা। তুলসী চক্রবর্তী যখন তাঁর নিজস্ব কায়দায় চোখ গোল গোল করে সংলাপ বলছেন, উত্তম কুমার তখন অতি-অভিনয় না করে একজন সাধারণ মেসের যুবকের মতো মৃদু হাসছেন বা ভয় পাওয়ার ভঙ্গি করছেন। এই পরিমিতিই তুলসী চক্রবর্তীর কমিক টাইমিং-কে দর্শকের কাছে আরও বেশি হাস্যরসাত্মক করে তুলেছিল।

ভ্রান্তিবিলাস (১৯৬৩) ছবিতে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে তাঁর যমজ মালিক ও ভৃত্যের যে রসায়ন, সেখানে ভানুর চটজলদি সংলাপের পিঠে উত্তমের বিভ্রান্ত মুখের এক্সপ্রেশন ছিল ছবির আসল ইউএসপি (USP)। তিনি কখনো ভানুর সংলাপের ওপর নিজের সংলাপ চাপিয়ে দেননি, বরং ভানুকে তাঁর কমিক স্পেস তৈরি করে দিয়েছিলেন।

৪. সমসাময়িক শক্তিশালী অভিনেতাদের সাথে দ্বৈরথ (Acting Duel)

অনেকেই মনে করেন তৎকালীন সময়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বা বিকাশ রায়ের মতো শক্তিশালী অভিনেতাদের সাথে স্ক্রিন শেয়ার করার সময় এক ধরণের অদৃশ্য প্রতিযোগিতা হতো। কিন্তু উত্তম কুমার এই প্রতিযোগিতাকে সুস্থ অভিনয়ে রূপান্তর করতেন।

তপন সিংহের ঝিন্দের বন্দী (১৯৬১) ছবিতে উত্তম কুমার (রুদ্ররূপ/শঙ্কর সিংহ) এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (ময়ূরবাহন) — দুজন মুখোমুখি হয়েছিলেন। ময়ূরবাহন চরিত্রটি ছিল ভীষণ চটকদার, নিষ্ঠুর ও নেতিবাচক। উত্তম কুমার সেখানে রাজার চরিত্রে এক ধরণের ক্লাসিক্যাল শান্ত ও গাম্ভীর্যপূর্ণ ভাব বজায় রেখেছিলেন। সৌমিত্রের চঞ্চল ও ক্রূর অভিব্যক্তির বিপরীতে উত্তমের এই শান্ত ও স্থিতধী রূপই ফ্রেমের ভেতরে শুভ ও অশুভের দ্বন্দ্বকে তীব্র করে তুলেছিল।

মরুতীর্থ হিংলাজ (১৯৫৯ ছবিতে বিকাশ রায়ের মতো দাপুটে অভিনেতার সামনেও উত্তম কুমার নিজের স্বাভাবিক, ঘরোয়া অভিনয়শৈলী বজায় রেখেছিলেন, যার ফলে দুজনের অভিনয়ের ভিন্ন ধারার এক চমৎকার মেলবন্ধন ঘটেছিল পর্দায়।

ফিল্ম স্টাডিজের ভাষায়, একজন অভিনেতার অভিনয় তখনই সফল হয় যখন তা সহ-অভিনেতার মুখের অভিব্যক্তিতে প্রতিফলিত বা ‘রিফ্লেক্ট’ (Reflect) করে। উত্তম কুমার ছিলেন সেই জাদুকরী দর্পণ, যার সামনে দাঁড়ালে যেকোনো মাঝারি মানের অভিনেতাও তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা অভিনয়টি করে ফেলতেন। নিজের অভিনয়কে জাহির না করে, পুরো দৃশ্যটিকে নিখুঁত ও বাস্তবসম্মত করে তোলার এই নিঃস্বার্থ শিল্পীসত্তাই উত্তম কুমারকে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অতুলনীয় ও অবিস্মরণীয় প্রতিষ্ঠান করে তুলেছে।

উত্তম কুমারের এই সহ-অভিনেতাদের সমৃদ্ধ করার ক্ষমতা এবং ছবির সামগ্রিক ব্যাকরণ বোঝার দক্ষতা সত্যিই সিনেমার ইতিহাসে বিরল।

চোখের জল এবং ভেতরের কান্না চেপে রাখার যে তীব্র আর্তি (Reacting), তা উত্তমের অভিনয়ে বাঙ্ময় হয়ে উঠত। সংলাপে শূন্যতাকে এক ধাক্কায় কানায় কানায় পূর্ণ করে দিতেন। কীভাবে কোনো চড়া বা আতিশয্যপূর্ণ অভিনয় ছাড়া, কেবল গলার স্বরের সামান্য ওঠানামা এবং নিখুঁত টাইমিং দিয়ে একটি দৃশ্যকে অমর করে রাখা যায়, তার অসংখ্য অবিস্মরণীয় উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন উত্তম কুমার শব্দের ভেতরের শূন্যতা ও ট্র্যাজেডিকে কণ্ঠের মডিউলশন দিয়ে জীবন্ত করে তুলতেন।

“এই পথ যদি না শেষ হয়…” সেই গানের মতোই উত্তমের অভিনয়ের অভিযাত্রা শেষ হয়নি। ধ্রুপদী স্রষ্টা কোনোদিন রাংতায় মুড়ে বিক্রি হলেও সস্তা হয়ে যায় না, বরং তারাই ভাগ্যবান যাঁরা সেই সৃষ্টি উপভোগ করেন। বাঙালির অন্তরে উত্তম কুমার তাই বেঁচে আছেন, থাকবেন চিরকাল অক্ষয় অভিনয়ে, শুধু রিলে নয়, সহ অভিনেতাকে সঙ্গে নিয়েই একক অভিনয়ে তিনি রুপোলি পর্দায় চির ভাস্বর রোমান্টিক হাসিতে, বুক চাপা কান্নায়, অস্ফুট আবেগে, তীব্র থর থর অনুভূতিতে, এক আকাশ অনন্ত অনুভবে। উত্তমের তুলনা শুধু উত্তমই।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev