| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নিঝুম রাতের পাড়ি : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ জলবায়ূ দুর্যোগ কোনো সীমান্ত মানে না : নিকোলাস বিশ্বাস জিয়াউর রহমানের বিএনপি গঠন ও ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ : অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ্বাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্গপুঙ্গবের রাখী : অসিত দাস কবরের মানুষ : সোহেল আর রানা (তরু) আজ রাখী বন্ধন…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নিম্নচাপের বৃষ্টিতে নষ্ট সবজি, আকাশ ছোঁয়া দামে নাজেহাল মানুষ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় রামযাত্রার মাঠ ফাঁকা : অয়ন মুখোপাধ্যায় যাদবপুরের যাদবদের গোপালনের ইতিহাস : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাম নামে কাম নাই, আমিই তো রাম : দিলীপ মজুমদার তৃষিত মাঠের খসড়া : বিশ্বজিৎ মণ্ডল ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মাঠের মাছ ও একটি ঢ়োড়া সাপের গল্প : সুব্রত দত্ত রোহিঙ্গা সংকটের নয় বছর — সমস্যা সমাধানে চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ যাদবপুর নামটি এল কোথা থেকে : অসিত দাস ইতিহাস গড়ে নারী, ইতিহাস ধরা থাকে অক্ষরে : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিজেপির দুর্ধর্ষ আই টি সেল থেকে মালব্য বিদায় : দিলীপ মজুমদার বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শপথ গ্রহণ : নিকোলাস বিশ্বাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বার্ধক্যের নিঃসঙ্গ ছায়া: একাকীত্ব, বিচ্ছিন্নতা ও অবসাদ : যশোবন্ত রায়
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ রাখি পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

নিঝুম রাতের পাড়ি : সুব্রত দত্ত

Reporter
সুব্রত দত্ত / ৫৯ Views জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬

ঘুটঘুটে অন্ধকার। সুমন কটা আরও ক’জন মিশে আছে পাকা রাস্তার পাশে ঝোঁপ-ঝাড়ের আড়ালে। কারো হাতে পাইপগান, কারো বোমা ছুরি। শিকার এলেই ঝাপিয়ে পড়তে হবে। কেড়ে নিতে হবে সব। সমান সমান হিস্যা। কটা বলেছে আর কোন কষ্ট থাকবে না। দিদির বিয়ে, বাবার চিকিৎসা, মাথার উপর ছাদ হবে তাদের। বাবাকে ভুল বুঝেছিল সুমন। বাবা তাদের সত্যিই ভালবাসে। মা’কে ডুবিয়ে মারেনি। বিক্রিও করেনি। ঐ রাক্কুসীর জন্যই হয়ত মা রাগ করে পালিয়ে গেছে কোথাও। মা’কে খুঁজে আনবে সে। আগে পায়ের তলায় মাটি চই। তাই বাধ্য হয়ে কটার পিছু নিয়েছে। ঐ রাক্কুসীর হাত থেকে আগে নিস্তার চাই।

“ঐ তো কারা আসছে”। কটা চাপা গলায় দলকে এলার্ট করে।সবাই রেড়ি। সুমনের হৃৎপিণ্ড লাফাচ্ছে। সে হাতের ছুরিটা আরও জোরে চেপে ধরে।লোক গুলো কাছে আসতেই কটা চীৎকার করে, “ধর শালাদের।” দলটা ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্ত এ কি! সব মুখ চেনা! দোকান মালিক গোপেশ্বর, তার নতুন মা, এলাকার পঞ্চায়েত প্রধান, সদস্য! কটা বলে, সুমন গুলি কর। ওরা আমাদের চিনে ফেলেছে। ফিরে গেলে আর বাঁচতে দেবে না। সুমন নতুন মা’কে বলে, রাক্কুসী তুই আগে মর। আমার সব কেড়েছিস। সুমন ছুরি তুলে ধরে। নতুন মা চীৎকার করে, বাঁচাও বাঁচাও। সুমন উল্লাসে অট্ট হাসে। হঠাৎই কে বলে, পুলিশ, পুলিশ —। কটা বলে, “সুমন পালা।” সুমন দেখে সেই পুলিশ গুলো। হাতে বন্দুক। ও ছুটতে যায়। কিন্ত পারে না। মাটিতে পা আটকে গেছে। চারদিক থেকে জনতা ছুটে আসছে, “ডাকাত ডাকাত। ধর ধর মার মার।” ওদের হাতে টাঙ্গি বল্লম।

সুমনকে ওরা ঘিরে ধরেছে। সুমন কাঁদছে, “আমাকে মেরো না। আমার বাবা অসুস্থ, দিদির কি হবে!”

“— কি হল সুমন, তুই কাদচিস ক্যানে?”

সুমনের ঘুম ভেঙে গেল। তাকিয়ে দেখে অনেক গুলো উদ্বিগ্ন মুখ তাকে ঘিরে। নীলু ঘোঁতন রবি সোম।

“সুমন, তোর বাড়ির জন্যে মন খারাপ করছে?

ঘটাং ঘট ঘটাং ঘট—ট্রেন ছুটছে। যেন গাজনের ঢাক বাজছে। ভিতরে আধো অন্ধকার। ওরা জড়াজড়ি করে মেঝেয় শুয়ে। ভীষণ গরম। গলা শুকিয়ে কাঠ। দুঃস্বপ্নের ঘোর কাটে সুমনের। মনে পড়ে সব।

দুই

“সুমন — সুমো — চা খেয়ে যা। কই গো ওঠো, ওকে একটু চা করে দাও।” বাবার গলায় এই নরম সুরে সুমন থমকে দাঁড়ায়। হঠাৎ কি এমন হল! বরাবর সে কাজের দোকানে গিয়েই চা খায়। নতুন মা ভোরে ওঠে না। বাবারও বলার সাহস নেই। আজ বাবার গলা অন্য। স্নেহ ভালবাসায় আর্দ্র। কি ব্যাপার কে জানে! “না থাক”, বলে সুমন হনহন করে হাঁটা দিল গন্তব্যে।

দুর্গাগ্রাম থেকে যে রাস্তাটা কাটোয়া কড়ুই পাকা সড়কে উঠেছে সেখানেই একটা বড় গঞ্জ গড়ে উঠেছে। বছর পনের আগেও জায়গাটা ছিল নির্জন। একটা হাইস্কুল, কটা চায়ের দোকান আর নির্জন নদীর ধারে বাবা পঞ্চানন ঠাকুরের ঠাঁই। মাঘ মাসে পূজা আর মেলা। তার পর সারা বছর একা। কিন্ত পাশের রাস্তাটা পাকা হতেই বদলে গেল গেল সব। দু’পাশে গড়ে উঠল পাকা দোকান, বাড়ি ঘর। এখন খরার (গ্রীষ্মের) ধান চাষ করে চাষিদের হাল ফিরেছে। তাদের ঘরের বেকার ছেলেরা দোকান খুলে বাণিজ্যে মন দিয়েছে। আশপাশে অনেক গুলো গ্রাম, বাণিজ্য কেন্দ্র হিসাবে জায়গাটা মন্দ না।

গোপালপুরের গোপেশ্বর ঘোষও ওরফে গুপী ঘোষ ওরফে গুপীযন্ত্র পঞ্চাননতলার বাসস্ট্যান্ডের সামনেই দোতলা বাড়ি তুলে নিচে খাবারের দোকান খুলেছে। সুমন সেই দোকানের পেটভাতা বয়। অর্থাৎ কাজের বিনিময়ে মালিক খেতে দেয়।

ভোর বেলা এসেই চায়ের উঁনুন ধরায় সে। এখনই ফার্স্ট বাসের প্যাসেঞ্জার এসে পড়বে। তারা কেউ কাটোয়া কেউ কলকাতা,কেউ বর্ধমান যাবে। বাস আসার আগে অনেকেই একটু গরম চা খেয়ে মেজাজ চাঙ্গা করে। সুমন চা করে। চা ঠিক না হলে খরিদ্দার নালিশ করে মালিককে। গুপি খুব রগচটা। কথায় কথায় কাঁচা খিস্তি, হাত পা চালায়। খুব ভয়ে থাকে সুমন। মুখ বুজে সহ্য করতে হয়। নইলে খাবে কি! মালিক মাঝে মাঝেই হুমকি দেয়, “ভাত ছড়ালে কাগের অভাব নেই।” এই তো সেদিন কটা’র চাকরি গেল। সে ভিয়েন’এর কাঠ চেলাবে না বলেছিল। মালিক গ্যাস বাঁচাতে গাছের ডাল কিনে রাখে ডাঁই করে। কটা এখন ‘ভিয়েন কারিগর’ হয়েছে অর্থাৎ কচুরি, রসগোল্লা, সন্দেশ সব বানাতে পারে। তাই মজুরের কাজ করতে রাজি নয়। এই নিয়ে বচসা। মালিক চ্যালা কাঠ তুলে তেড়ে আসে, “বেরো শুয়োরের বাচ্চা। হাতে ধরে কাজ শেখালাম, এখন ডানা গজিয়েছে!” কটা এখন কারিগরের মজুরী দাবি করছে। এটাও মালিকের রাগ। শেষ পর্যন্ত চাকরি গেল কটা’র। কেউ এসে কটা’র কথা জিজ্ঞেস করলে সুমন বলে, ‘রিটান’ করেচে। বাড়িতে বসে ‘পেনসিল’ পাচ্ছে। পেনসিল মানে পেনশান। সবাই ওর কথা শুনে হো হো করে হাসে। সুমনের কিন্ত মন খারাপ করে। বয়সে কটা বড় হলেও দুজনে বন্ধুর মতই ছিল। এক গ্রামেই দু-পাড়ায় দুজনের বাড়ি। ভোরে একা আসতে ভয় করত সুমনের তাই কটা ওকে ডেকে নিত। তার পর দুজনে আসত। আসার পথে কত গল্প হত। কখনও গান গাইতে দুজনে —

আমরা দুটি ভাই,

শিবের গাজন গাই।

শিব গেছেন গয়া কাশী

ডুগডুগি বাজাই। —

কটা তাকে অনেক কাজ শিখিয়েছে। মালিকের মার থেকে অনেক বার বাঁচিয়েছে। তাই তার জন্য বেশ কষ্ট হয় এখন। বেশ আনন্দে ছিল দুজনে। কটা একদিন এসে বলে, “চল সুমন দুজনে ইঁট ভাটার কাজে লাগি।”

— না রে, বাবা করতে দেবে না।

— তোর বাবা ঐ হারামীকে চেনে না। এখনও তোকে পেটভাতা খাটাচ্ছে। শালা অক্ত চোষা জোঁক।

সুমনের হঠাৎই মনে হয় তবে কি মালিক এবার তাকে মাইনে দেবে! সেজন্যেই কি বাবার গলা বদলে গেছে!

তিন

সুমন এখন একাই কাজে আসে। অন্ধকারে তার ভয় পায়, কান্না আসে। নতুন মায়ের উপর রাগ হয়। তার নিজের মা হলে কি এই অন্ধকারে আসতে দিত! তাকে কাজে লাগাত! বাবারও প্রথমে আপত্তি করেছিল। বলেছিল, “পড়ুক না এখন।”

ঝাঁঝিয়ে উঠেছিল নতুন মা। “খাবে কি? তোমার তো কুটো লড়াবার খ্যামতা নাই।”

সুমনের পড়ার বই গুলো নতুন মা উঠোনে ছড়িয়ে দেয়। সেবার ক্লাস ফোরে উঠেছিল সে। খুব আনন্দ হয়েছিল তাই। কিন্ত নতুন মা যে গুপীযন্ত্রের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করেছে কে জানত! দোকানে পেট ভাতার কাজ। বছরে দুবার জামা প্যান্ট। নতুন মা ঝি’এর কাজে লাগিয়েছে দিদিকেও। কতই বা বয়স দিদির। তের চোদ্দ হবে। এভাবেই নিজের বোঝা হাল্কা করেছে নতুন মা। সুমনের বই পড়তে খুব ভাল লাগত। যেন অন্য জগত। কত বন্ধু ছিল স্কুলে। সেই কথা ভাবলে সুমনের মনটা অভিমানে ভরে ওঠে। তার নিজের মা থাকলে কি এমন হত! নতুন মায়ের নিজের ছেলেটার বেলা অন্য নিয়ম। তার কোন কিছুর অভাব নেই। কত যত্ন আদর ভালোবাসা! নিজের মা থাকলে এমনই সব কিছু পেত তারা। মায়ের মুখটা সুমনের আর মনে পড়ে না। দিদি বলে, ঠিক দুগ্গা পিতিমের মত মুখ ছিল মায়ের। দুর্গাপূজা এলেই তাই মনটা আনন্দে নেচে ওঠে সুমনের। কুমোর’রা যখন মূর্তি গড়ে। সে অপেক্ষা করে কবে ঠাকুরের মুখ বসাবে। পূজা পর্যন্ত ঐ মুখের দিকেই তাকিয়ে থাকে।মা মা বলে ডাকতে ইচ্ছে করে। তার অতি ভক্তি চোরের লক্ষন ভেবে কুমোররা ওকে সন্দেহ করে।দূর দূর করে। ও বোঝাতে পারে না কেন সে আসে। মেয়েদের দেখলেই ও থমকে দাঁড়ায়। ওর মা কি এমনই ছিল! মা কোথায় এখন? একবারও কি তার কথা মনে পড়ে না! হয়ত পড়ে! হয়ত মাও খুঁজছে তাদের! চিনতে পারে না। সুমন তাই কোন মেলা খেলায় গেলে একটা উঁচু জায়গায় উঠে দাঁড়িয়ে থাকে। মা চিনলে নিশ্চয়ই ছুটে আসবে! গত বছর শ্রীখণ্ডের ‘বড়-ডাঙার’ মেলায় এমন করেই দাঁড়িয়েছিল সে। বন্ধুরা এসে ডাকে, এই সুমো এখানে ইসটেচুর মত দাঁড়িয়ে আচিস কেনে? চল ‘ডিসকো-লাচ’ দেকবো। কি সোন্দর লাচচে মেয়ে গুলো। সুমন নেমে ওদের পিছু নেয়। লজ্জায় কিছু বলতে পারে না।

চার

রাত্রে সুমন আর তার দিদি রীতা ঘরের বাইরে শোয়। তাদের একটাই ঘর। ছিটেবেড়ার অর্থাত বাঁশ আর কঞ্চির কাঠামো। তার উপরে কাদা লেপা। মাথায় খড়ের চাল শত ছিদ্র। বর্ষার বৃষ্টি,শীতের হিমের অবাধ আসা যাওয়া। তাই দিদি তাকে বুকে আগলে রাখে। একটা পলিথিনের জন্য বাবা পঞ্চায়েত গিয়েছিল। দেয়নি অথচ নেতার ঘরে পলিথিন ডাঁই করা। বলেছিল,”আগে মিটিনে মিচিলে যেতে হবে।” তার বাবার বুকের ব্যামো। বাড়িতে বসে হাঁফায় আর কাশে। কোন কাজ করতে পারে না।তাই ঘরে বাপ মায়ের নিত্য ঝগড়া। নতুন মা বাবাকে খোঁটা দেয়, “অকম্মা মিংসে, ভাত নাই কাপড় নাই, ভাতার সেজেছে! একটাকে চালান করে আবার আমাকে —”

‘লতু’- ফোঁস করে ওঠে বাবা। সে গঙ্গার জলে ডুবে মরেছে (কাশে)

— মিথ্যা কথা। তাকে চালান করেচ তুমি আমাকে বিয়ে করবে বলে।

— বিশ্বাস কর লতু! (কাশে) বাবা যেন কাঁদে।

— না না না, তখন যদি ভাবতাম ঘরে বৌ বাচ্চা! ওদিকে আমার পেটে —

— লতু! ভুল দুজনেরই —

কাশতে কাশতে হাঁফাতে হাঁফাতে লোকটার কথা বন্ধ হয়ে যায়। বাইরে সুমন কান খাড়া করে শোনে সব। বাবাকে সে কোন দিন ক্ষমা করবে না।

দুর্গাগ্রামের রাজু দাস তখন যাত্রা দলের নাম করা ‘বিবেক’ (গায়ক)। তার গানের মায়াজালে জড়িয়েছিল ভাড়াটে অভিনেত্রী লতিকা। গ্রামে গ্রামে অ্যামেচার যাত্রা করত ওরা। ওদের মাখামাখিতে ঢি ঢি পড়েছিল এলাকায়। রাজু তখন অন্ধ। পতঙ্গের মত পুড়ে মরছিল লতার প্রেমের আগুনে। তেমনই সময়ে গ্রামের পদ্মা পূজার আগে গঙ্গা স্নানে কাটোয়া গেল রাজু আর তার বউ। তার পর গ্রামে ফিরল একা। কেঁদে কেঁদে সবাইকে বলল তার বউ গঙ্গায় ভেসে গেছে। সে তার কাপড় চোপড় নিয়ে অপেক্ষা করছিল ঘাটের মাথায়। কিন্ত কেউ সে কথা বিশ্বাস করেনি। গঙ্গায় ভেসে গেল কেউ দেখে নাই! আর বডি কই! কদিন খোঁজা খুঁজি করে কিছুই মেলে নি। আড়ালে সবাই হাসাহাসি করত। বেটা এবার নতুন বউ ঘরে আনবে। ঠিক তাই হল। কদিন পরেই ঘরে এল লতা। রাজুর বাহানা ছোট ছেলে মেয়েটাকে দেখবে কে? তার পর রাজুকে একদিন রাজ রোগে ধরল। রাতের পর রাত যাত্রায় রাত জাগা আর নেশার ফল হয়ত। লোকে বলে সতী সাদ্ধী বউটার অভিশাপ। তার গান শেষ। যাত্রার আর ডাক আসে না। এদিকে লতুর কোলে বাচ্ছা। তারও অভিনয় বন্ধ। অভাবে অচল সংসার।

এখন রাজু এখন দিন রাত কাশে আর হাঁফায়। হসপিটালের ওষুধ খায়। ডাক্তারবাবু বলেছেন কিছু ভাল মন্দ খেতে হবে। নইলে সহজে এ রোগ সারবে না।

রাজু বলে, “ভাল মন্দ কোথা পাব ডাক্তার বাবু?”

— একটু দুধ।ঘরে হাস মুরগি নেই?

দুধ নেই, তবে হাস আছে তাদের কটা। ডিম পাড়ে কিন্ত কপালে নেই। ও সব এখন লতার। ও বিক্রি করে খুঁটে বাঁধে। নিজের আর ছেলের সাধ আল্লাদ মেটায়। সংসারের বোঝা চাপিয়েছে সৎ ছেলে মেয়েটার কাঁধে। নিজেও নানান ধান্দা করে কিন্তু স্বামীর জন্য কানাকড়ি খরচ করে না। রাজু এখন বুঝেছে ওর ভালোবাসা ছিল ছলনা। চাল চুলো ছিল না। ওপার বাংলা থেকে শেওলার মত ভেসে এসেছিল কাটোয়া। তার পর তাকে ধরে শুকনো ডাঙায় উঠেছিল। এখন ভুলে গেছে সব।

পাঁচ

আজ দোকানে এসেই সুমন অবাক! লোকের ভীড়। বাইরে একটা পুলিশের গাড়ি। দোকানে চুরি হয়েছে। ভোরে মালিক গোপেশ্বর দোকানের সামনের সাটার খুলেই দেখে ভিতরে লণ্ডভণ্ড সব। স্টোর রুমের পিছনের জানলা ভাঙা। ক্যাশ বক্স সহ দামী মালপত্র লোপাট। মালিকের মাথায় হাত। বেশ ক’দিনের টাকা ছিল বাক্সে। দোকানের উপর তলায় বসবাস তাই চুরির কথা কখনো ভাবে নাই। তাছাড়া বাজারে রাত পাহারাও আছে। তারা সামনের রাস্তায় ঘোরাঘুরি করে। পিছনে এমন অরক্ষিত স্থান আছে কে জানত! পুলিশ দোকানের কাজের লোকের কথা জিজ্ঞেস করলে মালিক সুমনকে দেখায়। পুলিশ বলে এখানে চাইল্ড লেবার! ওর তো স্কুলে পড়ার কথা। কাজটা বেআইনী। গোপেশ্বর হাত কচলায়। কি করব স্যার। ওর বাবা জোর করে রেখে গেছে। বাড়িতে খেতে পায় না। পুলিশের এক জন সুমনকে নানান জেরা করে। যেন সেই চোর। সুমন কেঁদে ফেলে।একজন বলে, ওকে ছেড়ে দিন। পুলিশ ইন্সপেক্টর বলেন, এরাই ইনফর্মার হয়। ছোট বলে তুচ্ছ করবেন না। কথাটা মিথ্যে নয়। এই বাজারেও চুরি ছিনতাইয়ে কয়েক বার বাচ্ছারা ধরা পড়েছে। এখানে সমাজ বিরোধীদের একাধিক ঠেক আছে। ওরা দিনের বেলা তাস, জুয়া খেলে, আড্ডা মারে। রাতে চুরি ছিনতাই ডাকাতি করে, বাজারে তোলা তোলে। কেউ ওদের ঘাঁটায় না। কারণ ওদের পিছনে বড় মাথা আছে। ভোটের সময় দাঙ্গা হাঙ্গামা, বুথ দখল করে। তাই পুলিশ এখন ওদের সমীহ করে। তদন্ত শেষে পুলিশ উঠে দাঁড়ায়। গোপেশ্বর গোপনে পুলিশের হাতে কিছু গুঁজে দেয়। হাত কচলে বলে, একটু দেখবেন স্যার। অনেক টাকা ক্ষতি হয়ে গেল। পুলিশ বলে, অবশ্যই। যাবার আগে পুলিশ অফিসার সুমনের দিকে কেমন বাঁকা চোখে তাকায়। সুমন ভয়ে কুঁকড়ে যায়।

বাড়ি ফেরার পথে সুমন দেখে গ্রামের ডিভিসি ক্যানেলর ব্রীজে বসে আছে কটা। গায়ে ডোরা কাটা গেঞ্জি, পরনে নতুন জিন্সের প্যান্ট। মাথার চুল হিন্দী সিনেমার নায়কদের মত ছাঁটা। কটার গায়ের রঙ ফর্সা। তাই গাঁয়ে নাম হয়েছে কটা। এখন ওকে সত্যিই নায়কের মত লাগে। সুমন কথা না বলে চলে আসছিল। কটা পিছনে ডাকে,

— কি হল রে সুমো, আজ সকাল সকাল ফিরে এলি?

— মালিকের দোকানে চুরি হয়েছে।

কটা খুব খুশি হয়ে বলে, “ঠিক হয়েছে। শালা ছিঁনে জোঁক। আমার অনেক অক্ত চুষে খেয়েছে।”

— আমিও ওর দোকানের কাজ ছেড়ে দোব। তুই যে বলছিলি শহরে যাবি। আমাকে সঙ্গে নিবি?

— না রে, সব রাক্কস। তার চে অন্য কাজ করে কামাবো।

কটা’র কথার মানে বোঝে না সুমন। এখন তো কিছুই করে না। কিন্ত বেশ নবাবী চাল। এত টাকা পাচ্ছে কোথা!

— এই সুমন, এবার কাটোয়ার কার্তিক লড়াই দেখতে যাবি? সব খচ্চা আমার।

সুমন রাজি হয়। সে কখনও দেখে নাই। খুব ধুমধাম। মানুষের ঢল নামে। মা কি আসবে না সেখানে! কিন্ত খুঁজে পাবে কি! অবশ্য দিদি আর একটা চিহ্নের কথা বলেছে। মায়ের কপালে কাটা দাগ আছে। বাবা একদিন থালা ছুড়ে মেরেছিল। রাতে দিদি কত গল্প বলে, কত স্বপ্ন দেখে। দেখিস ভাই, আমাদের সব কষ্ট ঘুঁচে যাবে। শুধু তুই মা’কে খুঁজে আন। এখন দিদির স্নেহই তার সম্বল। কিন্ত দিদির কেউ নেই। যেমন করেই হোক মা’কে খুঁজে বের করতে হবে।ওর কষ্ট ঘোঁচাতে হবে।

কাটোয়ার কার্তিক লড়াই দেখতে গিয়ে সুমন কটা গোটা কাটোয়া চক্কর মারে। এত লোক, এত আলো সুমন কোনদিন দেখে নাই। নিচু বাজারের একটা সরু রাস্তায় দুটো দল ঠাকুরের থাকা নিয়ে মুখোমুখি হতেই লড়াই বেঁধে গেল। সত্যিই লড়াই। প্রান ভয়ে যে যেদিকে পারছে ছুটছে। কটা আর সুমনে ছাড়া ছাড়ি হয়ে গেল। অচেনা রাস্তায় সুমন একটু এগিয়েই দেখে গঙ্গা। এটাই কি সেই ঘাট। যেখানে তার মা ডুবে গিয়েছিল! না না, ডুবে গেলে তো মা গঙ্গা দেহটা ফিরিয়ে দিত। ঘাটের অশ্বত্থ গাছের নিচে দাঁড়িয়ে সুমন নিস্পলক নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে। ‘বল রাক্কুসী আমার মা কোথা? নিরুত্তর নদী অন্ধকারে কুলকুল বয়ে চলে। হঠাৎই উত্তরা বাতাসে অশ্বত্থ গাছের পাতা খিল খিল করে হেসে ওঠে। বলে, ও কূল ভাঙে কিন্তু হিসাব রাখে না।সুমন তুই ফিরে যা। সুমন ঘাটের মাথায় বসে কাঁদে। এখানেও কত খুঁজলাম মা তোমাকে। কোথা পাবো তোমার খোঁজ?

একটু দূরের শ্মশানের ধূ ধূ জ্বলন্ত চিতা যেন সবাইকে ডাকছে, এখানে আয় — এখানে আয়।

— সুমো তুই একানে। ওদিকে আমি ভেবে ভেবে সারা! কটা হাঁফাচ্ছে। চল এবার ফিরতে হবে।

— এত আতে?

কটা হাসে। “সঙ্গে কি আছে জানিস? আমি কাউকে ভয় করি না।”

বারো ভাঁজা খেতে খেতে দুজনে গ্রামের পথ ধরে। সুমন গান ধরে —

আমার কানের পাশা

হারিয়ে গেল,

ঐ ঘোলা জলে।

পুবের সূর্যি অঙ ছড়াল,

পচ্চিমের কোলে।

আমার কানের পাশা —

— তোর গলা তো হেব্বি রে সুমো! গান শিকলে বাপের নাম রাকতিস। কি নাম ছিল তোর বাবার! কলকাতার অপেরা পাটির লোক এসেছিল নিতে। গাঁয়ে বোলান ভাদু গান গাইত। তোকে কাঁধে নিয়ে নাচত। কত ভালো মানুষ ছিল তখন। এখন কেউ খোঁজ রাখে না। টাকা না থাকলে এই হয়। সুমন তুই আমাদের দলে আয়। কিচুই করতে হবে না। খপর লাগাবি টাকা পাবি।

— মানে, কি কাজ ?

— চুরি ডাকাতি ছিনতাই। লুটে খাও, নয় ফুটে যাও। এ দুনিয়ার সব চোর। নেতা মন্ত্রী বড়লোক সবাই। সবাই লুটে খাচ্চে।

— কিন্ত, পুলিশ!

সেজন্য তো মাথায় দাদা আছে। ভোটের সময় ওদের জন্য খাটব। পুলিশ টিকি ছুঁতেও পারবে না। ঐ গুপীর দোকানে সিঁধ কেটেচি আমরাই। ওর দোকানের ফাঁক ফোঁক সব আমার জানা।

— কটা! সুমন দু চোখে অন্ধকার দেখে।

— এবার ভোটে আমার খেলা দেখবি। এই বলে কটা পকেট থেকে চকচকে কি একটা বের করে। “দেখেছিস? মেসিন।” বলেই সে আকাশের দিকে তাক করে গুলি ছোড়ে — ‘গুরুম’

রাতের অন্ধকার ভেদ করে প্রতিধ্বণি ফিরে আসে।

— না না, আতঙ্কে সুমন ছুটতে থাকে গ্রামের দিকে।

কটা পিছন থেকে চীৎকার করে শাসায়, “কেউকে বলবি না সুমো। বিপদে পড়বি।”

ছয়

সুমনদের বাড়ি আজ লোকে লোকারণ্য। তার দিদি নতুন মায়ের একটা কাপড় পড়ে চুপ করে বসে আছে বাইরের বারান্দায়। কয়েকটা লোক এসেছে মেয়ে দেখতে সঙ্গে পাত্র। পছন্দ হলে আজই বিয়ে। ওরা হিন্দীতে কথা বলছে। ওদের দেশে নাকি মেয়ের আকাল। তাই টাকা দিয়ে বউ কিনে নিয়ে যায়। গ্রামে এমন বিয়ে আগেও হয়েছে। বিয়ের পর মেয়ে গুলো কোথা যায় কেউ জানে না। তবে মাঝে মধ্যে চিঠি লেখে হিন্দীতে। সে চিঠি কার লেখা কে জানে! শিউলি বলে একটি মেয়ে নাকি এদের গ্রামেই আছে। সে এদের দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে, এখন খুব ভাল আছে। সবটাই সন্দেহজনক কিন্ত গরীবের মেয়ের কপাল নিয়ে কে ভাবে! গ্রামে গ্রামে ওদের দালাল আছে। টাকার ভাগ তারাও পায়। লতা এ সুযোগ ছাড়তে রাজি নয়। বোঝাও কমবে টাকাও আসবে। তাই তার এত ছোটাছুটি। সাজিয়ে গুজিয়ে পাত্র পক্ষের সামনে হাজির করে মেয়ের খুব গুণ কীর্তন করছে। গ্রীষ্মের শুকনো গাছের মত রুক্ষ চেহারা রীতার। দারিদ্র অযত্ন অবহেলার মেয়েলী লাবন্যের লেশ নেই। সাজে রঙে সে অভাব ঢাকার জন্য লতা অনেক কসরৎ করেছে। গাঁটের কড়িও কিছু খসেছে। এমন শুকনো ছিল না দিদি। বেশ মিষ্টি ছিল মুখ খানা। এখন দু বেলা লোকের বাড়ি কাজ। বাড়িতেও অবসর নেই। তার পর আধপেটা খেয়ে বেচারা এই বয়সে বুড়িয়ে গেছে। তবে মনের স্বপ্ন সজীব। একদিন সব ফিরে পাবে তারা। কিন্তু রাক্ষুসীটা আজ সব স্বপ্ন কেড়ে নিতে চায়।

পরীক্ষা শেষ, এবার ফলাফলের অপেক্ষা।হতভম্ব রাজু দাওয়ার এক পাশে চুপ করে বসে আছে। বাবার উপর খুব রাগ হয় তার সুমনের। সে ছোট ছেলে। তার কিছু করার নেই। কিন্তু বাবা কেন চুপ! দিদি কি তার মেয়ে নয়? সুমন মনে মনে মা কালীকে ডাকে এ বিয়ে যেন না হয়। এমন সময় পাত্র পক্ষ ফল ঘোষণা করল। মেয়ে তাদের পছন্দ। এবার দাম দর। লতা পাত্র পক্ষের দুজনকে ঘরে নিয়ে গেল। এখন কি হবে! দিদি চলে গেলে কে তাকে দেখবে! ইতিমধ্যেই দর দাম শেষ। লতা হাসতে হাসতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে কাপড়ের খুঁট বাঁধতে বাঁধতে।এবার বিয়ের আয়োজন।

সন্ধ্যা লগ্নে বিয়ে। ঘরে কনের সাজে বসে দিদি। সুমন দিদিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে — “কাঁদিস না ভাই। সব ঠিক হয়ে যাবে। ভগবান আছেন”

— আমাদের কেউ নেই দিদি। আমি মা কালীকে কত ডেকেছি।

— আছেন রে। ঠাকুর সবার ভালো করে।

— এ কি বলছে দিদি। তবে কি দিদির এই বিয়েতে মত আছে! সুমন অবাক হয়ে যায়! কি ভালো হবে! একটু পরেই তার বলি দান! ছাদনা তলায় বামুন বাবাকে মন্ত্র পড়াচ্ছে। তার পর কন্যা দান হলেই সব শেষ। সুমন কান্নায় ভেঙে পড়ে।

হঠাৎই পাড়ায় হট্টগোল শোনা যায়। কে একজন ছুটে আসে পুলিশ পুলিশ বলে। বিয়ে বাড়ির যে যেদিকে পারে ছুটলো। নতুন মা,পাত্র পক্ষ হাওয়া। সুমনও বাড়ির ভাঙা দেওয়াল টপকে একটা গলির ভিতর লুকিয়েছে। নিশ্চয়ই তাকে ধরতে এসেছে। নির্ঘাত গুপীযন্ত্রের কাজ। শয়তান! তাকে চোর অপবাদ দিয়েও সাধ মেটে নাই। এবার জেল খাটাতে চায়। সুমন ভয়ে কাঁপছে। পুলিশ আর কয়েক জন লোক তাদের বাড়িতে ঢুকেছে। রাজুকে ঘিরে ধরেছে ওরা।

— আপনার নাম রাজু দাস?

রাজু দু হাত জোড় করে বলে, “আজ্ঞে”

— মেয়ের বয়স কত?

— আজ্ঞে, পনের ষোল হবে ছ্যার।

— অর্থাত নাবালিকা। আঠারো বছরের আগে মেয়েদের বিয়ে বেআইনী জানেন?

পিছন থেকে কটা’র গলা শোনা যায়। — ছ্যার, ওর দোষ নাই। আসল শয়তানীটা পালিয়েছে।

— কিন্ত, মেয়ের বাবা তো উনিই।

— হা ছ্যার, সব দোষ আমার। আমি জেনে শুনেও কিচু করতে পারি নাই। আমাকে ধরুন। রাজু কাঁদতে কাঁদতে হাঁফায়।

— অপরাধ স্বীকার করছেন ঠিক আছে। আপনাকে মুচলেকাতে সই করতে হবে। দ্বিতীয় বার এমন হলে জেল খাটতে হবে।

কাজ সেরে পুলিশ ও বিডিও অফিসের লোক জন বেরিয়ে যেতেই উল্কার মত উড়ে আসে লতা। টাকা হাত ছাড়া হবার সব রাগ পড়ে রাজুর উপর। তার গলা টিপে ধরে বলে,

— বল কুচুটে মিংসে পুলিশকে খপর দিল কে?

দমবন্ধ রাজু ছটফট করে।

সব দেখে সুমনের যেন কি হয়! পৌরুষে আগুন ধরে তার। গলি থেকে একটা বাঁশ নিয়ে বেরিয়ে আসে সে।

— পুলিশকে খপর দিইচি আমি। কি করবি তুই। আমার দিদিকে বিক্রি করবি। আর আমি বসে বসে দেকবো। রাক্কুসী তোকে আজ খুন করব।

সুমনের রনমূর্তি দেখে থমকে যায় লতা। হঠাৎই হাজির হয় কটা।

— “এই তো শয়তানীটা এসেছে। আমি পুলিশ ডাকতে যাচ্ছি। মেয়ে পাচারের কেসে এরেস্ট করাব। গ্রামের অনেক গুলো মেয়ে পাচার করেচিস তুই।”

পুলিশের নামে ভরকে যায় লতা। কটা’র হাতে পায়ে পড়ে বলে, “আর করব না ভাই।”

— সেই বিহারী গুলো কোথা গেল?

— পালিয়ে গেছে,বিশ্বাস কর ভাই।

— বেশ,তোর বিচার হবে গাঁয়ে। বলে কটা চলে গেল।

পুলিশকে তাহলে কটা’ই খপর দিয়েচে। কিন্ত ও জানল কি করে! দিদি জানিয়েছিল! দিদির সঙ্গে কটা’র এখনও যোগাযোগ আছে! ওদের ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল। আগে কটা মাঝে মধ্যেই আসত। দিদিকে টুকটাক কিনে দিত। নতুন মা’র নজর এড়ায় নি।সেজন্য কটা’কে বাড়ি ছাড়া করেছিল অপমান করে। দিদিকে আধমরা করেছিল মেরে। কিন্তু সম্পর্ক যে মুছে যায় নি আজ বোঝা গেল। কিন্ত দিদি কি জানে কটা এখন কি করে! না না একটা চোরের সঙ্গে দিদির এই সম্পর্ক সে মেনে নেবে না! দিদিকে বলতে হবে সব।

সাত

সুমনের মনে পড়ে গ্রামে করোনা মহামারীর জের কাটতেই সবাই আবার ভিন রাজ্যে কাজে ফিরতে শুরু করল। লক-ডাউনের যন্ত্রণা ভুলে গেছে সবাই। না ভুলে উপায় কি! এখানে কাজ নেই! সুমন রাজুকে বলে সেও এবার কেরালা যাবে। রাজমিস্ত্রীর জোগারে’র কাজ। পাঁচশো টাকা মজুরী। তার পর রাজ মিস্ত্রি হলেই হাজার। তাদের পাড়ার নীলু ঘোঁতন’রা যাচ্ছে। তাকেও সঙ্গে নিতে রাজি।

— কিন্ত, তুই কি পারবি?

— পারবো। নইলে খাবে কি?

— বেশ, বড় হয়েছিস, এবার যা বুঝিস কর।

হাওড়া থেকে আজ ওদের দলটা ট্রেন ধরেছে। ভীষন ভীড়। জেনারেল কম্পারমেন্টের মেঝেয় বসে আছে ওরা। দু রাত তিন দিন এভাবেই যেতে হবে। সুমন কখনও ট্রেনে চাপেনি।সে অবাক হয়ে দেখে সব! কত লোক,কত ভাষা,পোশাক রীতি নীতি। খুব আনন্দেই কাটল দিনটা। একটু রাত গড়াতেই চোখের পাতা ভারি। সবাই রাতের খাবার খেয়ে নিল। এবার ঘুমাতে হবে। কিন্ত এক সঙ্গে নয়। খুব চোর বাটপারের উৎপাত। তাই পালা করে ঘুমাতে হবে। সুমন ও কয়েক জন মেঝেয় শুয়ে পড়ে। দিদির কথা মনে পড়ছে খুব। খুব কাঁদছিল। কোন দিন তাকে ছেড়ে থাকে নাই। সুমনেরও কষ্ট হয়েছিল খুব। তার মা ছিল না। দিদিই মা হয়ে ছিল। সুমন কাঁদে নি। সে বড় হয়েছে। দিদিকে বলে এসেছে এবার সংসারের দায়িত্ব তার। তাকে অনেক টাকা রোজগার করতে হবে। খুব ধুমধাম করে দিদির বিয়ে দেবে সে। কিন্ত ঐ কটা’র সঙ্গে নয়। দিদিকে বলেছে সব কথা। দিদিও বলেছে চুরি ছিনতাই না ছাড়লে ওর সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে না। এবার বাবা সুস্থ হবে। আবার গান গাইবে। সেও গান শিখবে বাবার কাছে। সুমন বুঝেছে বাবা ওদের ভালোবাসে। ঐ আক্কুসীর জন্যই কিছু করতে পারে নাই। এসব ভাবতে ভাবতে কখন ঘুম নামে সুমনের চোখে। তার পরেই দুঃস্বপ্ন দেখে।

— সুমো, কি হল? কাঁদছিস কেন?

— একটা খারাপ স্বপ্ন।

— ও কিছুই নয়। প্রথম বার এমন হয়। চুপ করে ঘুমো।

সুমন আবার ঘুমায়। তারপর আবার স্বপ্ন দেখে। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে গ্রামখানা। গ্রামের মাঠ ঘাট দিঘী, মাঠের বুড়ো বটগাছটা কাঁদছে। সুমন তুই কোথা যাচ্ছিস আমাদের ছেড়ে? মায়ের মত আমরা তোকে বড় করেছি। বট গাছটা বলে, গরু চরাতে এসে তুই আমার ডালে ঘুমাতিস। আমি ছায়ার আঁচলে ঢেকে রাখতাম তোকে। দিঘি বলে, আমার ভালোবাসায় কত সাঁতার কেটেছিস তুই। পথ বলে, আমার বুকে আছিস তুই। সব ভুলে গেলি! তোরা চলে গেলে কে বোলান ভাদু গান গাইবে গ্রামে? গাঁয়ে যাত্রা করবে কারা? ফিরে আয় সুমন। সুমন দেখে মা এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। মা দুগ্গার মত মুখ। চোখে জল। সুমন আনন্দে চীৎকার করে, “মা-মা”

সুমনের ঘুম ভেঙে যায়। চারদিকে তাকিয়ে দেখে কেউ নেই কিছু নেই। ট্রেনে আধো অন্ধকারে কেউ ঘুমাচ্ছে, কেউ ঝিমোচ্ছে। সুমনের কানে তখনও মায়ের ডাক — ‘ফিরে আয় সুমন, ফিরে আয়’। গ্রাম ডাকছে আয় আয়। সে উঠে দাঁড়াল। নিজের থলিটা হাতে নিয়ে কামরার গেটে এসে দাঁড়ায়। একটু পরেই একটা স্টেশন। ট্রেন থামলেই নেমে আসে। সে ফিরে যাবে গ্রামে, মায়ের কাছে। নির্জন অন্ধকার স্টেশনে সে এখন একা। চারদিকে নিঝুম রাত। ট্রেনটা আবার পাড়ি দিল। সামনে অজানা গন্তব্য।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev