| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘সংকোচ’ পাখণ্ডী শব্দটির অর্থ যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়েছে : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ লাইন অব প্যাসেজ — সংগ্রামী জীবনের দর্পণ : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার কেন উত্তম মহানায়ক : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ হড়পা বানের হাড়হিম করা দৃশ্য : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উত্তম কুমার : বাঙালির সমাজভাষ্য, মূল্যবোধ ও মনস্তাত্ত্বিক উত্তরাধিকার : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় গৈরিক নয়, ‘গৈরেয়’ শব্দটি থেকেই এসেছে ‘গেরুয়া’ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাঙালিয়ানা ও উত্তম কুমার: সংস্কৃতির দর্পণে এক অনন্য মহাকাব্য : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় বিচিত্র লোক সংস্কৃতি — নন্দোৎসবে নারকেল কাড়াকাড়ি : সুব্রত দত্ত গড়িয়াহাট কি ছিল অলস, অকর্মণ্য বলদের হাট : অসিত দাস চলচ্চিত্র অভিনয়ের সংজ্ঞা ছিলেন উত্তম : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আমার প্রিয় গল্পগুলো : নুসরাত সুলতানা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার কবিদের লেখনীতে শরৎ ঋতু : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নিঝুম রাতের পাড়ি : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ জলবায়ূ দুর্যোগ কোনো সীমান্ত মানে না : নিকোলাস বিশ্বাস জিয়াউর রহমানের বিএনপি গঠন ও ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ : অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ্বাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ রাখি পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘সংকোচ’

Reporter
বিশ্বজিৎ মণ্ডল / ১৮৫ Views জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

যে রিক্ত ছেলেটি দাঁড়িয়েছিল একা

রমেশ প্রতিদিন একই রাস্তা দিয়ে স্কুলে যায়। অমৃতকুণ্ড থেকে মেহেদীপুর রোড হয়ে তার নিজস্ব স্কুলে।

সকালটা যতই ব্যস্ত হোক, দফরপুর মোড়ে এসে তার চোখ দুটো আপনিই রাস্তার বাঁদিকে চলে যায়। সেখানে একটা বিদ্যুতের খুঁটির পাশে প্রায়ই দাঁড়িয়ে থাকে একটি ছেলে। স্কুল ইউনিফর্ম পরে  কাঁধে ব্যাগ নিয়ে অপেক্ষা করছে। চোখে খেলা করে পরের প্রতিদিন।

রমেশ প্রথম দিন ছেলেটিকে দেখেছিল কেবল একজন ছাত্র হিসেবে। দ্বিতীয় দিনেও তাই। তৃতীয় দিন থেকে ছেলেটি তার সকালের দৃশ্যের একটা অংশ হয়ে গেল।

রমেশ রামকৃষ্ণ মিশনের বাংলা বিভাগের শিক্ষক। জেলার খ্যাতনামা স্কুলে চাকরি পাওয়াকে সে এখনও নিজের জীবনের এক ধরনের সৌভাগ্য মনে করে। অমৃতকুণ্ড গ্রামের ছেলে সে। বাবা চাষবাস করতেন, মা সংসার সামলাতেন। কলকাতায় পড়াশোনা করার সময় কত রাত যে সে মেসের ছোট্ট ঘরে বসে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেছে, তার হিসাব নেই।

চাকরি পাওয়ার পর জীবন যেন একটু সহজ হয়েছিল।

কিন্তু শিক্ষক হওয়ার পর সে বুঝেছিল, মানুষের জীবন কখনও পুরোপুরি সহজ হয় না। শুধু সমস্যাগুলোর চেহারা বদলে যায়।

সেদিন ছেলেটি হঠাৎ হাত তুলল। যেন সাহায্য চাইছে।

রমেশ ব্রেক কষল।

“বলরামপুর যাবেন?” ছেলেটি জানতে চায়ল।

“ওঠ।”

ছেলেটি মোটরবাইকের পিছনে উঠে বসল। বসার সময় তার শরীরটা এতটা সঙ্কুচিত হয়ে গেল যে রমেশের মনে হল, সে যেন সিটের একটা সামান্য অংশ দখল করতেও অপরাধবোধ করছে।

রমেশ হেসে বলল, “আর একটু সামনে বস। পড়ে যাবি।”

“ঠিক আছি, স্যার।”

“আমাকে চিনিস?”

“আপনাকে রামকৃষ্ণ মিশনে দেখেছি। একটা অনুষ্ঠানে আপনাদের স্কুলে গিয়েছিলাম।”

“তুই কোন স্কুলে?”

“বলরামপুর হাই স্কুল।”

“ক্লাস?”

“ইলেভেন।”

“নাম?”

“তপন দাস।”

তারপর থেকে পরিচয়টা ধীরে ধীরে বাড়ল।

কখনও রমেশ নিজে দাঁড়িয়ে তপনকে ডাকত। কখনও তপন হাত তুলত। কখনও দুজনের দেখা হলেও তপন দাঁড়াত না — সম্ভবত সেদিন সে নিজের মতো করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

রমেশ এসব নিয়ে ভাবত না। তবু একদিন হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছিল, “ভবিষ্যতে কী হতে চাস?”

তপন একটু হেসে বলেছিল, “জানি না।”

“জানিস না কেন?”

“আগে এই ক্লাসটা পাশ করি।”

“তারপর?”

তপন উত্তর দেয়নি।

রমেশ আয়নায় তার মুখটা দেখেছিল। ছেলেটা রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। মুখে কোন অভিব্যক্তি নেই।

তখন রমেশ বুঝতে পারেনি, সেই নীরবতার ভিতরে আসলে কত বড় একটা অন্ধকার জমে আছে।

হঠাৎ বদলে যাওয়া

দু-মাস পরের কোন এক সকাল।

আকাশে মেঘ ছিল। বৃষ্টির সম্ভাবনা। দফরপুর মোড়ে এসে রমেশ আবার ব্রেক কষল।

তপন দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু আজ সে স্কুলের পোশাকে নেই। গায়ে ফ্যাকাশে একটা শার্ট। প্যান্টটাও পুরোনো। কাঁধে কোন ব্যাগ নেই।

রমেশ কয়েক সেকেন্ড ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল।

“তুই স্কুলে যাচ্ছিস না?”

তপন মাথা নাড়ল। “না।”

“কেন?”

“এমনিই।”

“এমনিই?”

রমেশের গলায় এবার শিক্ষকসুলভ দৃঢ়তা।

তপন মাথা নিচু করল।

রমেশ বলল, “ওঠ।”

তপন কোন উক্তি না করে উঠে বসল।

মোটরবাইক চলল। কয়েকশো মিটার যাওয়ার পর রমেশ বলল, “আমাকে কিছু বলবি?”

চুপ। আরও কিছুটা পথ।

তারপর পেছন থেকে খুব নিচু গলায় এল, “বাবা মারা গেছে, স্যার।”

রমেশের হাত হ্যান্ডেলের উপর থেমে গেল না, কিন্তু তার ভিতরটা থেমে গেল।

“কীভাবে?”

“ট্রেন থেকে পড়ে।”

“রেলে কাজ করত?”

“হকারি করত। ট্রেনে চা বিক্রি করত।”

তপনের গলায় কোন কান্না নেই। এমনকি দুঃখও যেন নেই।

রমেশ জানে, সব কান্না চোখ দিয়ে বেরোয় না। কিছু কান্না মানুষের স্বর থেকে মুছে যায়।

“কবে?”

“গত মাসে।”

“তোরা বাড়িতে কয়জন?”

“মা, আমি, ছোট বোন।”

“সংসার?”

তপন একটু থেমে বলল, “চালাতে হবে তো।”

“তাই স্কুল ছেড়ে দিয়েছিস?”

“হ্যাঁ।”

“কাজ করছিস?”

“একটা ট্রান্সফরমার কারখানায়।”

“কীভাবে পেলি?”

“মেসোমশাই করে দিয়েছে।”

মোটরবাইক তখন ফ্লাইওভারের উপর উঠেছে।

নিচে ছড়িয়ে থাকা রাস্তা, দোকান, মানুষ — সব ছোট হয়ে গেছে।

রমেশের মনে হল, তপনের জীবনটাও যেন হঠাৎ নিচে পড়ে গেছে, আর সে উপরে উঠে এসেছে — কিন্তু এই উচ্চতায় দাঁড়িয়েও ছেলেটিকে উদ্ধার করার কোন উপায় তার হাতে নেই।

তপন বলল, “আপনাকে একটা কথা বলতে পারিনি, স্যার।”

“কী?”

“বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই মনে হচ্ছিল, আর পড়ব। কিন্তু কাউকে বলতে পারিনি।”

“আমাকেও না?”

“আপনাকে কী করে বলি?”

“কেন?”

“আপনি তো মাস্টারমশাই। আমি আপনার সামনে দাঁড়িয়ে বলব যে আমি স্কুল ছেড়ে দিয়েছি? মনে হত, আপনি হয়তো ভাববেন আমি পড়াশোনায় মন দিতে পারিনি।”

রমেশ কিছু বলল না।

এই কথাটাই তার ভিতরে কোথাও গিয়ে লাগল।

একজন শিক্ষক হিসেবে সে কত ছাত্রকে বলে — “কোন সমস্যা হলে আমাকে বলবে।”

কিন্তু সত্যিই কি ছাত্ররা বলতে পারে?

নাকি শিক্ষককে ঘিরে তৈরি হওয়া সম্মান, দূরত্ব এবং নিজের আত্মসম্মান — সব মিলে তাদের মুখ বন্ধ করে দেয়?

যে দায়িত্ব বয়স মানে না

কারখানার সামনে তপন নেমে গেল।

রমেশ বলল, “আজ কাজ করিস না।”

তপন অবাক হয়ে তাকাল।

“কেন?”

“আমার সঙ্গে একটু চল।”

“কোথায়?”

“তোর বাড়ি।”

তপন কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।

সেদিন প্রথমবার রমেশ তপনের বাড়িতে গেল। সে আজ ঠিক করেছে স্কুলে যাবে না। তার গন্তব্য আলাদা।

ছোট্ট উঠোন। টিনের চাল। দরজার পাশে একটা পুরোনো চায়ের কেটলি। দেওয়ালে বাবার ছবি।

ছবিটা দেখে রমেশের বুকের মধ্যে অদ্ভুত একটা শূন্যতা তৈরি হল।

একজন মানুষ ট্রেনে চা বিক্রি করতে করতে সংসার চালাতেন।

তারপর একদিন তিনি নেই। কিন্তু তার সংসারটা রয়ে গেছে। মা রয়ে গেছে। মেয়েটা রয়ে গেছে। তপন রয়ে গেছে।

মৃত্যু একজনকে নিয়ে যায়, কিন্তু তার দায়িত্বগুলোকে সঙ্গে নিয়ে যায় না। সেগুলো পড়ে থাকে জীবিতদের ঘাড়ে।

তপনের মা প্রথমে কিছুই বলতে চাইছিলেন না।

রমেশ ধীরে ধীরে বলল, “আপনাদের কিছু প্রাপ্য থাকলে সেটা যেন নষ্ট না হয়। কিছু কাগজপত্র দেখতে হবে।”

কাগজপত্র বেরোল। মৃত্যুসনদ। পরিচয়পত্র। রেলের কিছু নথি। ব্যাংকের কাগজ।

কত সহজে একজন মানুষ মারা যায়, অথচ তার মৃত্যুকে প্রমাণ করতে কত কাগজ লাগে!

রমেশ সেই কাগজগুলো গুছিয়ে দিল।

কোথায় যোগাযোগ করতে হবে, কীভাবে আবেদন করতে হবে, কোন নথির প্রয়োজন — সব খোঁজ নিল।

কয়েক সপ্তাহ ধরে সে দৌড়ঝাঁপ করল।

কেউ তাকে বলেনি এটা তার কর্তব্য। তবু সে করল।

কারণ কিছু কাজের জন্য কোন সরকারি নির্দেশের প্রয়োজন হয় না।

একদিন তপনের মা বললেন, “আপনি, এত কিছু করছেন কেন?”

রমেশ হেসে বলেছিল, “কারণ তপন এখনও ছাত্র।”

“ও আর পড়বে না।” তপনের মা বলল।

“কে বলেছে?”

মা চুপ।

রমেশ তপনের দিকে তাকাল।

“তুই বলেছিস?”

তপনও চুপ।

রমেশ বলল, “সংসারের দায়িত্ব এসেছে, ঠিক। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তোর নিজের জীবনটার দরজা বন্ধ হয়ে যাবে।”

তপন মাথা নিচু করে বসেছিল।

তার চোখে তখন লজ্জা নয় — দ্বিধা।

ফিরে আসার পথ

কয়েক মাসের চেষ্টা শেষে রেল দুর্ঘটনার সূত্রে পরিবারের প্রাপ্য অর্থ পাওয়ার ব্যবস্থা হল।

সব সমস্যা মিটে গেল না। কিন্তু কিছুটা সময় সামলানো গেল। সেই সময়টাই দরকার ছিল তপনের।

একদিন রমেশ বলল, “কাল আমার সঙ্গে স্কুলে চল।”

তপন অবাক, “কোন স্কুলে?”

“আমার স্কুলে।”

“আমি কি সেখানে পড়তে পারব?”

“কেন পারবি না?”

“আমি তো মাঝখানে পড়া ছেড়ে দিয়েছি।”

“আবার শুরু করবি।”

“কিন্তু কাজ?”

“কাজের বয়স এখনও আসেনি।”

তপন মাথা নিচু করে বলল, “সংসার?”

“সংসারের ব্যবস্থা হবে।”

“কীভাবে?”

“সব উত্তর আজ দিতে পারব না। কিন্তু একটা উত্তর আমি জানি — তুই এখনই নিজের ভবিষ্যৎটা বিক্রি করে দিতে পারিস না।”

পরদিন তপন রমেশের সঙ্গে স্কুলে গেল। ভর্তির ব্যবস্থা করে দিল।

নতুন বই হাতে নিয়ে সে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

বইগুলো যেন শুধু বই নয় — তার হারিয়ে যাওয়া সময়ের দরজা।

স্কুল ছুটির পর রমেশ তাকে নিয়ে মাঠের ধারে দাঁড়াল।

তপন বলল, “স্যার…”

“বল।”

“আমি আপনাকে সেদিন সব বলতে পারিনি।”

“কেন?”

“সংকোচে।”

“কীসের সংকোচ?”

“আপনার কাছে সাহায্য চাইতে।”

রমেশ মৃদু হেসে বলল, “সাহায্য চাওয়া লজ্জার নয়। নিজের প্রয়োজনটাকে লুকিয়ে রাখা কখনও কখনও নিজের কাছেই অন্যায়।”

তপন অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, “বাবা মারা যাওয়ার পর মনে হয়েছিল, আমি বড় হয়ে গেছি।”

“তুই বড় হয়েছিস? “

“কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সব দায়িত্ব একা কাঁধে নিলে মানুষ বড় হয় না। কখনও কখনও কাউকে পাশে দাঁড়াতেও দিতে হয়।”

রমেশ কিছু বলল না।

তপন বলল, “আপনি না এলে আমি হয়তো আর স্কুলে ফিরতাম না।”

রমেশ মাথা নাড়ল।

“আমি আসিনি। তুই নিজেই ফিরেছিস। আমি শুধু তোকে একটা রাস্তা দেখিয়েছি।”

তপন হেসে ফেলল।

তারপর হঠাৎ বলল, “স্যার, একটা কথা বলব?”

“বল।”

“দফরপুর মোড়ে সেদিন আমি ইচ্ছে করেই হাত তুলেছিলাম।”

রমেশ অবাক।

“কেন?”

তপন বলল, “জানি না। হয়তো মনে হয়েছিল, কেউ যদি একবার থামে…”

কথাটা শেষ করল না। রমেশ বুঝে গেল।

মানুষের জীবনে অনেক সময় একটা গাড়ি থেমে যাওয়াও যথেষ্ট।

একটা প্রশ্ন। একটা হাত। একটু ভরসা।

ফেরার সময় দফরপুর মোড়ে এসে রমেশ মোটরবাইক থামাল।

তপন বলল, “আজ দাঁড়াবেন?”

“কেন?”

“একটু দাঁড়ান।”

দুজনেই রাস্তার পাশে দাঁড়াল।

সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে নেমে আসছে। দূরে বাস ছুটছে। মানুষ বাড়ি ফিরছে। রাস্তার ধারে চায়ের দোকান থেকে ধোঁয়া উঠছে।

তপন হঠাৎ বলল, “আজ আর সংকোচ করছে না।”

রমেশ তার দিকে তাকাল।

তপন বলল, “কারণ বুঝেছি, মানুষের কাছে হাত বাড়ানো আর নিজের সম্মান হারানো এক কথা নয়। আর সব মানুষ সাহায্য করে দয়া দেখানোর জন্যও আসে না। কেউ কেউ আসে শুধু মনে করিয়ে দিতে — তুমি এখনও শেষ হয়ে যাওনি।”

রমেশের মুখে মৃদু হাসি ফুটল।

তারপর তারা আবার পথ ধরল।

দফরপুর মোড় পিছনে পড়ে রইল।

সামনে দীর্ঘ রাস্তা। একই রাস্তা। কিন্তু তপনের কাছে আজ তার অর্থ আলাদা।

সে জানে, পথের কোথাও না কোথাও কেউ থামতে পারে।

কখনও কখনও একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সংকোচ মোচনের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev