| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নিম্নচাপের বৃষ্টিতে নষ্ট সবজি, আকাশ ছোঁয়া দামে নাজেহাল মানুষ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় রামযাত্রার মাঠ ফাঁকা : অয়ন মুখোপাধ্যায় যাদবপুরের যাদবদের গোপালনের ইতিহাস : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাম নামে কাম নাই, আমিই তো রাম : দিলীপ মজুমদার তৃষিত মাঠের খসড়া : বিশ্বজিৎ মণ্ডল ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মাঠের মাছ ও একটি ঢ়োড়া সাপের গল্প : সুব্রত দত্ত রোহিঙ্গা সংকটের নয় বছর — সমস্যা সমাধানে চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ যাদবপুর নামটি এল কোথা থেকে : অসিত দাস ইতিহাস গড়ে নারী, ইতিহাস ধরা থাকে অক্ষরে : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিজেপির দুর্ধর্ষ আই টি সেল থেকে মালব্য বিদায় : দিলীপ মজুমদার বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শপথ গ্রহণ : নিকোলাস বিশ্বাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বার্ধক্যের নিঃসঙ্গ ছায়া: একাকীত্ব, বিচ্ছিন্নতা ও অবসাদ : যশোবন্ত রায় মনসার ঢেলাফেলা পার্বণ মনসাভক্তদের একচক্ষু দেবীকে নিবেদনের লোকাচার : অসিত দাস সংকট সমাধান ও সহযোগিতা বাড়াতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্ক উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার এখন বারাণসী যেতে মন চায় না : বিজয় চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার কারানল : সসীমকুমার বাড়ৈ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দৃশ্যমান দুর্যোগের বাইরে জলবায়ু পরিবর্তনের গভীর সংকট : নিকোলাস বিশ্বাস রামবাগানের ইন্দুবালা : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

রামযাত্রার মাঠ ফাঁকা : অয়ন মুখোপাধ্যায়

Reporter
অয়ন মুখোপাধ্যায় / ১৮৫ Views জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬

আমাদের গ্রামে রামযাত্রা শুরু হয় দুর্গাপুজোর পরে। তারও আগে শুরু হয় বাঁশ জোগাড়। কারও বাগান থেকে ছয়টা, কারও উঠোনের ধারে দাঁড়ানো ঝাড় থেকে চারটে, কারও পুকুরপাড় থেকে আরও দশটা। সেই বাঁশে মঞ্চ ওঠে, রাজপ্রাসাদ হয়, বন হয়, অশোকবন হয়, লঙ্কার দরজাও হয়। একই বাঁশে লাল কাপড় জড়ালে রাবণের রাজসভা, গেরুয়া কাপড় টাঙালে অযোধ্যা, দুটো কৃত্রিম ফুল আর লতা ঝুলিয়ে দিলেই পঞ্চবটি। তাই ছোটবেলা থেকেই আমার মনে হত, মহাকাব্য বোধহয় অনেকখানি বাঁশ, কিছু রঙিন কাপড় আর মানুষের বিশ্বাস দিয়ে তৈরি।

আগে আমাদের রামযাত্রা টানা পনেরো-ষোলো রাত চলত। এখন এত রাত জেগে গল্প শোনার ধৈর্য কারও নেই; সাত-আট রাতেই রামকে বনবাসে যেতে হয়, সীতাকে হরণ করতে হয়, রাবণকে মরতে হয়, আবার অযোধ্যাতেও ফিরতে হয়। প্রথমে দশরথের রাজসভা, তারপর বিশ্বামিত্র, তাড়কা, সীতার স্বয়ম্বর, কৈকেয়ীর বর, বনবাস, শূর্পণখা, সীতাহরণ, সুগ্রীব, সেতুবন্ধন, রাবণবধ — শেষে প্রত্যাবর্তন।

এই কয়েকটা রাত গ্রামের সময়সূচিও একটু বদলে দেয়। সন্ধ্যার পর চায়ের দোকানের রাজনীতি তাড়াতাড়ি গুটিয়ে আসে, তাসের আড্ডা ছোট হয়, বাড়ির রান্না এগিয়ে যায়। শিশির পড়ে বলে বুড়োরা হালকা চাদর গায়ে মাঠে আসে। ছোটরা বিকেল থেকেই শতরঞ্চিতে জায়গা দখল করে রাখে। গ্রামের পুরনো লোকজনের যেসব ছেলেমেয়ে এখন শহরে থাকে, তারাও হোয়াটসঅ্যাপে জানতে চায় — আজ কোন পালা?

এখন আমাদের রামযাত্রার ফেসবুক পেজও আছে। দুই বছর আগে পলাশ খুলেছে — ‘শ্রীশ্রী রামযাত্রা কমিটি, দক্ষিণপাড়া’। সীতাহরণের রাতে ছেলেরা লাইভ করে, রাবণবধের পর রিল তোলে। একবার হনুমান লাফ দিতে গিয়ে বাঁশের পাটাতন ভেঙে পড়েছিল। মাঠে যত লোক ছিল, ভিডিওটি দেখেছিল তার বহু গুণ মানুষ।

সেই দেখে নিবারণ মাস্টার বলেছিলেন, “রামের বনবাসের চেয়ে হনুমানের পড়ে যাওয়া বেশি ভাইরাল হল। নতুন যুগে মহাকাব্যেরও ভাগ্য বদলেছে।”

নিবারণ মাস্টার আমাদের স্কুলে বাংলা পড়াতেন। এখন অবসর নিয়েছেন। প্রতি বছর রামযাত্রার সংলাপ তিনিই ঘষেমেজে দেন। বাল্মীকি, কৃত্তিবাস, পুরনো যাত্রাপালা আর নিজের মাথা — সব মিলিয়ে কিছু না কিছু পাল্টান।

একদিন আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “এত পাল্টান কেন?”

তিনি বলেছিলেন, “রামায়ণ কোনও দিন এক জায়গায় এক রকম ছিল নাকি? অঞ্চল বদলেছে, যুগ বদলেছে, গল্পও বদলেছে। মানুষ নিজের সময়ের প্রশ্ন ঢুকিয়েছে বলেই এতকাল ধরে তাকে পড়েছে, শুনেছে, আবার বলেছে।”

সেই বছর রামযাত্রা শুরু হওয়ার তিন দিন আগে হরেন মণ্ডলের বাড়িতে একটা সাদা গাড়ি এসে থামল।

চারজন লোক নামল। দুজন জমির মালিকের উত্তরাধিকারী, একজন উকিলের লোক, আর একজনকে গ্রামের সবাই চেনে — বাপ্পা ঘোষ।

বাপ্পা নিজেকে প্রোমোটার বলে না। বলে, “ডেভেলপার।”

শব্দ বদলালে কাজের চরিত্রও যেন একটু ভদ্র শোনায়।

হরেনের বাড়ি গ্রামের পশ্চিম মাথায়। সামনে পুরনো বটগাছ, পিছনে ডোবা, পাশে সরু রাস্তা। এতদিন ওই রাস্তার তেমন দাম ছিল না। এখন সরকার বাজার থেকে স্টেশন পর্যন্ত রাস্তা চওড়া করার ম্যাপ বার করেছে। তিন মাসের মধ্যে যে জমি একসময় কেউ কিনতে চাইত না, তার দাম কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।

সেখান থেকেই হরেনের বিপদ শুরু।

হরেনের ঠাকুরদা রায়বাড়ির জমিতে ঘর তুলেছিলেন। হরেনের বাবা সেখানেই থেকেছেন। হরেন ওই ঘরেই জন্মেছে, তার ছেলেরাও। কিন্তু দলিলে জমি রায়দের।

হরেন বলল, “আমরা সত্তর বছর আছি।”

বাপ্পা বলল, “সত্তর বছর থাকলেই জমি নিজের হয়ে যায়?”

“তা বলিনি।”

“তাহলে?”

হরেন একটু চুপ করে বলল, “আমাকেও হিসেবের মধ্যে রাখুন।”

বাপ্পা মোবাইলের স্ক্রিনে জমির ম্যাপ বড় করতে করতে বলল, “হিসেব তো কাগজে হয় রে, হরেন।”

পাশে দাঁড়ানো নিবারণ মাস্টার বললেন, “সব হিসেব কাগজে হয় না।”

বাপ্পা হেসে জিজ্ঞেস করল, “আর কোথায় হয়, মাস্টারমশাই?”

“ইতিহাসে।”

বাপ্পা আর কথা বাড়াল না।

তার হাতে দলিল ছিল। হরেনের হাতে তিন পুরুষের বসবাস। কিন্তু জমির হিসেব যখন কাগজে ওঠে, তখন স্মৃতির সাক্ষ্য খুব আস্তে কথা বলে।

সেই সন্ধ্যাতেই রামযাত্রার মহড়া। এ বছর পলাশ রাম। তার বাবা বিশ্বজিৎ পঞ্চায়েতের সদস্য। পলাশ কলকাতার একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করে, গ্রাম থেকে যাতায়াত করে। সপ্তাহে দু-তিন দিন মহড়া দেয়। রাম বেশ ভালোই দেখায় তাকে — লম্বা, ছিপছিপে, পরিষ্কার মুখ।

দশরথ বললেন, “রাম, তোমাকে চোদ্দো বছরের জন্য বনবাসে যেতে হবে।”

পলাশ বুক সোজা করে সংলাপ বলল, “পিতার সত্য রক্ষার্থে অযোধ্যা ত্যাগ করতেও আমি প্রস্তুত।”

নিবারণ মাস্টার সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “হচ্ছে না।”

পলাশ বিরক্ত হল। “কোথায় হচ্ছে না?”

“তুই অযোধ্যা ছাড়ছিস, মুখ দেখে মনে হচ্ছে অফিসের পিকনিকে যাচ্ছিস।”

সবাই হাসল। পলাশও।

নিবারণ মাস্টার হাসলেন না।

বললেন, “যার সত্যিই বাড়ি ছাড়তে হয়, তার মুখ একবার দেখে আয়।”

পলাশ আর কিছু বলল না।

মাঠের ওপারে তখন হরেনের বাড়িতে আলো জ্বলছিল।

দুই

প্রথম রাতেই বনবাস হয় না। প্রথম দুদিন দশরথের রাজসভা, বিশ্বামিত্র, তাড়কা, সীতার স্বয়ম্বর। গ্রামের লোক নিশ্চিন্তে গল্প দেখে। ততদিনে সবাই হরেনের জমির কথা জানে, কিন্তু ঘটনাটা তখনও ‘হরেনের সমস্যা’। গ্রামের এই ক্ষমতাটা অদ্ভুত — বিপদ নিজের উঠোনে না ঢোকা পর্যন্ত আমরা তাকে অন্যের গল্প হিসেবেই আলোচনা করতে ভালোবাসি।

দ্বিতীয় রাতে সীতার স্বয়ম্বর। হরেন মাঠের একেবারে পিছনে দাঁড়িয়েছিল। পলাশ ধনুক ভাঙতেই হাততালি উঠল।

হরেন হাততালি দিল না।

তার ছোট ছেলে শুভ জিজ্ঞেস করল, “বাবা, ধনুকটা কি পলাশকাকা সত্যি ভাঙল?”

হরেন বলল, “না।”

“তাহলে সবাই হাততালি দিচ্ছে কেন?”

হরেন একটু ভেবে বলল, “সব সত্যি জিনিসে হাততালি পড়ে না। আবার সব হাততালির জিনিসও সত্যি হয় না।”

শুভ বুঝেছিল কি না জানি না। আমি বুঝেছিলাম।

সেদিন দুপুরেই গ্রামের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে একটা মেসেজ ঘুরেছে — ‘অবৈধ দখলদারদের জন্য এলাকার উন্নয়ন আটকে দেওয়া যাবে না।’

নাম নেই। কিন্তু সবাই জানে, কথাটা কাকে নিয়ে।

কেউ হাততালির ইমোজি দিয়েছে। কেউ লিখেছে — ‘Right decision.’ আর একজন লিখেছে — ‘Development must go on.’

হরেন ইংরেজি পড়তে পারে না। বড় ছেলে সুমন তাকে পড়ে শুনিয়েছে। তারপর জিজ্ঞেস করেছে, “বাবা, আমরা কি অবৈধ?”

হরেন উত্তর দেয়নি।

তৃতীয় দিনের সকালে লোক এল মাপজোক করতে। মালতী উঠোনে বসে পুরনো কাঁথায় সেলাই দিচ্ছিল। দুজন লোক তার পায়ের পাশ দিয়ে ফিতে টেনে নিল।

একজন বলল, “এখান থেকে সতেরো ফুট।”

অন্যজন একটা খুঁটি পুঁতে দিল।

মালতী জিজ্ঞেস করল, “এই খুঁটির এদিকে আমরা, না ওদিকে?”

কেউ উত্তর দিল না।

সেই রাতেই কৈকেয়ীর দুই বর। দশরথ মাটিতে পড়ে কাঁদছেন। কৈকেয়ী অনড়। রামকে বনবাসে যেতেই হবে।

পলাশ মঞ্চে এসে মুকুট খুলল।

ঠিক তখন মাঠের পিছনে একটা টর্চের আলো নড়ল। হরেন মাঠে ঢুকল না। বাড়ি ফিরছিল।

পরদিন তাকে বাড়ি ছাড়তে হবে।

পলাশ একবার তার দিকে তাকাল। তারপর বলল, “পিতার সত্য রক্ষার্থে — ”

হঠাৎ থেমে গেল।

মাঠ চুপ।

পর্দার আড়াল থেকে নিবারণ মাস্টার ফিসফিস করে বললেন, “বল।”

পলাশ এবার খুব নিচু গলায় বলল, “অযোধ্যা ত্যাগ করব।”

মাত্র চারটি শব্দ।

কিন্তু মহড়ার সেই ভারী সংলাপের চেয়ে ওই চারটি শব্দ অনেক বেশি সত্যি শোনাল।

পরদিন সকাল আটটার মধ্যে হরেনরা ঘর ছাড়ল। বুলডোজার এল না। পুলিশ লাঠি চালাল না। কেউ চিৎকারও করল না। বাস্তবের উচ্ছেদ অনেক সময় সিনেমার মতো নাটকীয় হয় না। সেটাই তার নিষ্ঠুরতা।

মালতী প্রথমে হাঁড়ি বার করল, তারপর চালের ড্রাম। সুমন খাট খুলল। শুভ স্কুলের বই প্লাস্টিকের বস্তায় ভরল। সবশেষে হরেন ঘর থেকে একটা কাঠের বাক্স নিয়ে বেরোল।

আমি ভেবেছিলাম জমির কাগজ।

খুলে দেখলাম — তার বাবার একটা সাদা-কালো ছবি, মায়ের পুরনো ভোটার কার্ড, মেয়ের মাধ্যমিকের মার্কশিট, কয়েকটা প্রেসক্রিপশন।

হরেন মৃদু হেসে বলল, “মানুষের কাছে জমির কাগজ না থাকলেও মানুষ থাকার কাগজ অনেক জমে যায়।”

তারপর দরজায় তালা দিল।

যে ঘরে আর কোনও দিন ঢুকবে না, সেই ঘরেও মানুষ তালা দেয়।

হরেনরা খালের ধারে ত্রিপল টাঙিয়ে উঠল।

সেই রাতে মঞ্চে রাম, সীতা আর লক্ষ্মণ বনে ঢুকল। মাঠের লোক বাঁশের গায়ে ঝোলানো প্লাস্টিকের পাতা, থার্মোকলের পাথর আর রঙিন আলোয় পঞ্চবটি দেখল।

আধ কিলোমিটার দূরে মালতী সত্যিকারের আকাশের নিচে ভাত বসাল।

সেখানে কোনও দর্শক ছিল না।

তিন

পঞ্চম রাতে সীতাহরণ হওয়ার কথা। তার আগের দিন টানা বৃষ্টি নামল। খাল ফুলে উঠল। সন্ধ্যার মধ্যে পশ্চিমপাড়ার কাঠের সাঁকো ভেসে গেল।

এই সাঁকো দিয়ে প্রায় দুশো পরিবার বাজারে যায়। বাচ্চারা স্কুলে যায়। রোগী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যায়। দুধ আসে, ওষুধ আসে, সাইকেল আসে।

পরদিন পঞ্চায়েতের লোক ছবি তুলল। বিশ্বজিৎও এল।

বলল, “ব্লকে জানিয়েছি।”

একজন জিজ্ঞেস করল, “কবে হবে?”

“প্রসেসে আছে।”

নিবারণ মাস্টার পাশ থেকে বললেন, “রামচন্দ্রের সমুদ্র পার হওয়ারও একটা প্রসেস ছিল।”

বিশ্বজিৎ বিরক্ত হল। “আবার রামায়ণ!”

মাস্টারমশাই হেসে বললেন, “এখন তো রামায়ণের মরসুম।”

সেদিন বিকেলেই হরেন বাঁশ জোগাড় করতে শুরু করল। নিজের বাঁশঝাড় নেই। মদন দুটো দিল। রহিম চারটে। রতন ঘোষ দড়ি দিল। সুমন বাজার থেকে পেরেক আনল। বাপি, যে রাতে লক্ষ্মণ সাজে, হাতুড়ি নিয়ে এল। শেষে পলাশও এল।

বিশ্বজিৎ ছেলেকে ফোন করল।

“কোথায়?”

“সাঁকো বানাচ্ছি।”

“পঞ্চায়েতের অনুমতি নিয়েছিস?”

পলাশ একটু হেসে বলল, “বানরসেনাও কি অনুমতি নিয়েছিল?”

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড চুপ।

তারপর ফোন কেটে গেল।

দুদিন ধরে সবাই বাঁশ বেঁধে সাঁকো তুলল। কোনও কমিটি হল না, ব্যানার লাগল না, উদ্বোধনের দিনও কেউ ঠিক করল না। হরেন শুধু কাজ ভাগ করে দিল।

“এই বাঁশটা নিচে দাও। ওই দিকের দড়িটা টানটান রাখো। শুভ, তুই জলে নামবি না।”

মঞ্চে এরা কেউ রাম, কেউ লক্ষ্মণ, কেউ বানরসেনা। খালের ধারে সবাই শুধু মানুষ।

আমি নিবারণ মাস্টারকে বললাম, “এ তো একেবারে রামসেতু।”

তিনি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লেন।

“না।”

“কেন?”

“সবকিছুতেই পুরাণ টানবি না।”

আমি চুপ করলাম।

তিনি সাঁকোটার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওখানে গল্পের দরকার ছিল নায়ক। এখানে কাল সকালে তিনটে মেয়েকে স্কুলে যেতে হবে। এইটুকুই যথেষ্ট।”

সাঁকো শেষ হওয়ার পর প্রথমে তিনজন স্কুলছাত্রী পার হল। একজন সাইকেল ঠেলে নিয়ে গেল। তারপর রহিমের স্ত্রী। তারপর দুধওয়ালা।

কেউ ফিতে কাটল না, শাঁখ বাজাল না, নারকেলও ফাটাল না।

সেদিন প্রথম মনে হল, গ্রামের সবচেয়ে জরুরি উদ্বোধনগুলো বোধহয় এমনই — যেখানে কোনও উদ্বোধক থাকে না।

সেই রাতে সীতাহরণ। মৌসুমি সীতা সেজেছে। শহরের কলেজে ইতিহাস পড়ে, রাতে গ্রামে ফিরে যাত্রা করে। রাবণ সাধুর বেশে এসে দাঁড়াতেই সামনের সারির বাচ্চারা চেঁচিয়ে উঠল —

“যেও না! যেও না!”

ওরা গল্পের শেষ জানে। তবু সীতাকে সাবধান করে।

মানুষের এই অভ্যাসটাই আশ্চর্য। গল্পে বিপদ আসবে জেনেও আমরা চরিত্রটিকে বাঁচাতে চাই। বাস্তবে পাশের বাড়ির মানুষ বিপদে পড়লে অনেক সময় চুপ করে থাকি।

মঞ্চে সীতা লক্ষ্মণরেখা পার করল।

শুভ আমার পাশে বসেছিল।

সে জিজ্ঞেস করল, “লক্ষ্মণরেখা পার হলেই কি বিপদ?”

আমি বললাম, “রামায়ণে হয়।”

শুভ একটু চুপ করে থেকে বলল, “আমাদের বাড়ির চারপাশেও তো ওরা একটা রেখা টেনেছিল।”

আমি তার দিকে তাকালাম।

সে আবার বলল, “ওটাও তো একটা রেখা।”

আমার মুখে উত্তর এল না।

মঞ্চে তখন রাবণ সীতাকে নিয়ে যাচ্ছে।

শুভর প্রশ্নটা মাথায় থেকে গেল।

লক্ষ্মণরেখা কে টানে, সেটাই বোধহয় আসল প্রশ্ন। রেখার এপারে কে নিরাপদ থাকবে আর ওপারে কে পড়ে যাবে — যুগ বদলালেও সেই হিসেব খুব একটা বদলায় না।

চার

সপ্তম দিনের সকালে অগ্নিপরীক্ষার মহড়া নিয়ে গোলমাল বাঁধল।

মৌসুমি হঠাৎ বলল, “আমি অগ্নিপরীক্ষার দৃশ্য করব না।”

ক্লাবঘরের সবাই প্রথমে ভেবেছিল, সে মজা করছে।

সম্পাদক বললেন, “মানে?”

“আগুনের মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজের চরিত্র প্রমাণ করার দৃশ্য আমি করব না।”

“এটা রামায়ণ।”

“জানি।”

“তাহলে?”

মৌসুমি বলল, “রামায়ণ বলেই তো প্রশ্নটা থাকবে।”

পিছন থেকে একজন বলল, “আজ রাতে শো, আর এখন তুমি ফেমিনিজমের কথা বলছ?”

কেউ হেসে উঠল।

মৌসুমি তার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার মেয়েকে যদি তার স্বামী বলে — চরিত্র প্রমাণ করো, তখনও হাসবেন?”

হাসিটা থেমে গেল।

নিবারণ মাস্টার এতক্ষণ জানলার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

তিনি বললেন, “দৃশ্যটা থাকবে।”

মৌসুমি বলল, “আমি করব না।”

মাস্টারমশাই বললেন, “আগে আমার কথাটা শুনে নে। ঘটনা বদলাব না। প্রশ্নটা যোগ করব।”

সেই রাতে মাঠ উপচে পড়ল। খবর ছড়িয়েছে — সীতার দৃশ্যে নাকি নতুন কিছু হবে। এখন গ্রামের খবর মুখে মুখে যত না ছড়ায়, হোয়াটসঅ্যাপে তার চেয়ে দ্রুত ছড়ায়।

যুদ্ধ শেষ হল। রাবণ মরল। আলো নিভল, আবার জ্বলল।

সীতা এল।

সামনে রাম।

পলাশ সংলাপ বলল, “লোকমুখে সন্দেহ উঠেছে। তোমাকে নিজের পবিত্রতা প্রমাণ করতে হবে।”

মৌসুমি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়াল।

তারপর বলল, “সন্দেহ যদি আপনার হয়, আমাকে পরীক্ষা দিতে হবে কেন? সমস্যাটা তো আপনার।”

মাঠ নিস্তব্ধ।

সংলাপটা কোনও রামায়ণে ছিল কি না জানি না, কিন্তু প্রশ্নটা বহু শতাব্দী ধরে গল্পটার ভিতরে নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছিল।

পলাশের পরের সংলাপ নিবারণ মাস্টার লিখে দিয়েছিলেন। কিন্তু পলাশ কয়েক মুহূর্ত মৌসুমির দিকে তাকিয়ে নিজের থেকেই বলল —

“কারণ আমার হাতে ক্ষমতা আছে।”

মাঠ আরও চুপ।

মৌসুমি জিজ্ঞেস করল, “ক্ষমতা কি সত্যের প্রমাণ?”

পলাশ উত্তর দিল না।

এই নীরবতা মহড়ায় ছিল না।

পিছন থেকে একটা শিশু তার মাকে জিজ্ঞেস করল, “মা, রাম কথা বলছে না কেন?”

মা বলল, “চুপ করে দেখ।”

আমরাও দেখলাম।

একজন পৌরাণিক রাজা মঞ্চের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নতুন সময়ের একটা প্রশ্নের সামনে কথা হারিয়ে ফেলেছে।

পুরনো গল্পটা সেই মুহূর্তে আর শুধু পুরনো রইল না।

পরের রাতে রামযাত্রা শেষ হল। অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন। আলো, বাজি, মুকুট, সিংহাসন।

কিন্তু হরেন তার অযোধ্যায় ফিরতে পারল না।

ফেরার মতো বাড়িই তখন নেই।

বাপ্পার লোকেরা মাটি সমান করেছে। সামনে টিনের বোর্ড —

COMING SOON

RIVER VIEW RESIDENCY

সেখানে নদী নেই। খাল আছে।

কিন্তু ‘খাল ভিউ রেসিডেন্সি’ লিখলে বোধহয় ফ্ল্যাটের দাম ওঠে না।

শেষ পর্যন্ত গ্রামের চাপেই পঞ্চায়েত খালের ওপারে হরেনকে এক টুকরো খাসজমি দিল। কাজটা সহজে হয়নি। মহিলারা পঞ্চায়েত অফিসে গেল। মৌসুমি আবেদন লিখল। রহিম পুরনো ভোটার তালিকা বার করল। নিবারণ মাস্টার হরেনের বাবার নাম খুঁজে দিলেন। পলাশ নিজের বাবার সঙ্গেই ঝগড়া করল।

এখানেও কোনও একক নায়ক ছিল না।

বাস্তবে আমাদের হনুমান একা পাহাড় তুলে আনে না।

দশজন মিলে একটা বাঁশ তোলে।

রামযাত্রা শেষ হওয়ার পর মাঠটা আশ্চর্য ফাঁকা দেখায়। সাত-আট রাত ধরে যেখানে অযোধ্যা, পঞ্চবটি, লঙ্কা আর যুদ্ধ চলছিল, সকালে সেখানে পড়ে থাকে ছেঁড়া দড়ি, খড়, রঙিন কাগজ আর কয়েকটা বাঁশ। রাবণের দশটা মাথা উঠে যায় ক্লাবঘরের চালে। ধনুক ঢুকে পড়ে বাসের ভিতর। মুকুট খবরের কাগজে মুড়ে পরের বছরের অপেক্ষায় থাকে।

আর মানুষ নিজের নিজের নাম ফিরে পায়।

রাম আবার পলাশ।

সীতা আবার মৌসুমি।

লক্ষ্মণ আবার বাপি।

সেই বছর মঞ্চ খোলার দিন হরেন মাঠে এল।

মাটিতে পড়ে থাকা কয়েকটা বাঁশ দেখিয়ে একটু ইতস্তত করে বলল, “বাঁশগুলো যদি নিয়ে যাই?”

ক্লাবের ছেলেরা বলল, “নিয়ে যাও।”

হরেন একটা ভ্যান এনে বাঁশগুলো তুলে নিয়ে গেল।

কয়েক দিন পরে তার নতুন বাড়িতে গিয়ে দেখি, দুটো বাঁশ টিনের চালের নিচে আড় হয়ে বসেছে। একটার গায়ে এখনও লাল রং লেগে আছে — সম্ভবত লঙ্কার দরজায় ছিল। অন্যটার গায়ে গেরুয়া কাপড় বাঁধার দাগ — হয়তো অযোধ্যার রাজপ্রাসাদ ধরে রেখেছিল।

মালতী উঠোনে তুলসী পুঁতেছে। শুভ দেওয়ালে স্কুলের রুটিন আটকে দিয়েছে।

হরেন চালের দিকে তাকিয়ে বলল, “এবার বৃষ্টি আটকাবে।”

আমি উপরে তাকালাম।

কয়েক দিন আগে যে বাঁশ রাজপ্রাসাদ ধরে রেখেছিল, এখন সেই বাঁশ এক উচ্ছেদ হওয়া মানুষের টিনের চাল ধরে আছে।

আমি হরেনের কাঁধে হাত রেখে বললাম, “তাহলে বনবাস শেষ?”

হরেন একটু হাসল।

“রামচন্দ্রের বনবাস ছিল চোদ্দো বছর। আমার তিন মাস। কিন্তু একটা তফাত আছে।”

“কী?”

“রামের একটা অযোধ্যা ছিল। তাই সে ফিরতে পেয়েছিল।”

একটু থেমে সে নতুন ঘরটার দিকে তাকাল।

“আমার তো আর অযোধ্যা নেই।”

তারপর হেসে বলল, “তাই নতুন করে অযোধ্যা বানিয়ে নিতে হচ্ছে।”

ফেরার পথে নিবারণ মাস্টারের বাড়িতে ঢুকলাম। তিনি মোবাইলে রামযাত্রার ভিডিও দেখছিলেন। অগ্নিপরীক্ষার দৃশ্যটা কেউ রিল বানিয়েছে। নিচে হাজার হাজার মন্তব্য।

কেউ লিখেছে — ‘রামায়ণের বিকৃতি।’

কেউ — ‘সাহসী উপস্থাপনা।’

কেউ — ‘সংস্কৃতির অপমান।’

কেউ আবার — ‘নারীবাদী প্রোপাগান্ডা।’

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আমরা কি তাহলে রামায়ণটা বদলে দিলাম?”

নিবারণ মাস্টার মোবাইল থেকে চোখ না তুলেই বললেন, “যে গল্প বদলায় না, সে গল্প বাঁচেও না।”

বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমেছে। দূরে হরেনের নতুন ঘরে আলো জ্বলছে। আর একটু দূরে বাঁশের সাঁকোর ওপর দিয়ে মানুষ বাড়ি ফিরছে।

রামযাত্রার মাঠ ফাঁকা।

অযোধ্যা খুলে ফেলা হয়েছে।

লঙ্কাও।

রাম মুকুট খুলে আবার পলাশ হয়েছে, সীতা মুখের রং মুছে মৌসুমি, রাবণ মোটরবাইকে চেপে পাশের গ্রামে ফিরে গেছে।

শুধু কয়েকটা বাঁশ আর মঞ্চে ফেরেনি।

কয়েকটা বাঁশ খালের ওপর শুয়ে দুই পাড়কে জুড়েছে। কয়েকটা হরেনের নতুন ঘরের টিনের চাল ধরে রেখেছে। একটার গায়ে এখনও লঙ্কার লাল রং, আরেকটার গায়ে অযোধ্যার গেরুয়া কাপড়ের দাগ।

ছোটবেলায় ভাবতাম, মহাকাব্য বোধহয় কয়েকটা বাঁশ, কিছু রঙিন কাপড় আর মানুষের বিশ্বাস দিয়ে তৈরি।

এতদিন পরে বুঝলাম, কথাটা পুরো ভুল ছিল না।

শুধু একটা জিনিস তখন বুঝিনি — মঞ্চ ভেঙে গেলে মহাকাব্যের সবচেয়ে দরকারি অংশটুকু দেবতা বা রাজাদের কাজে লাগেনা। শেষ পর্যন্ত মানুষের কাজেই লাগে।

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “রামযাত্রার মাঠ ফাঁকা : অয়ন মুখোপাধ্যায়”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev