
খানাকুল ও আরামবাগের বানভাসি এলাকায় মানুষ ও সাপের সহাবস্থান। দংশন বাড়ছে। মৃত্যু হচ্ছে একের পর এক। আতঙ্ক দিন কাটাচ্ছেন এলাকার মানুষ।
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি ডিভিসির ছাড়া জলে খানাকুল ও আরামবাগের নিচু এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। উঁচু ভিটেতে ঠাঁই হয়েছে এখানকার বাসিন্দাদের। পাশাপাশি নিচু এলাকার বিষধর সাপগুলি বাঁচার তাগিদে উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিচ্ছে। ফলে মানুষ ও সাপের সহাবস্থান গড়ে উঠেছে। একের পর এক সাপের দংশনে প্রাণ হারাচ্ছে। সন্ত্রস্ত বানভাসি এলাকার মানুষ।
খানাকুলের মাড়োখানা, নতীবপুর, চিংড়া, কিশোর পুর, বন্দর এলাকায় বন্যার জলে নিচু এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। এখানকার বিষধর সাপগুলোর উঁচু জায়গায় ঠাঁই হয়েছে। আরামবাগের ঘোষপুর, ময়াল, রামচন্দ্রপুর, ডোঙ্গল এলাকায় বিষধর সাপের উপদ্রব বেড়েছে। এরমধ্যে কালাচ, চন্দ্রবোড়া, গোখরো বিষধর সাপ বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই গোঘাট, আরামবাগ ও খানাকুলে বেশ কয়েকজনের সাপের দংশনে প্রাণ গেছে।
খবরে প্রকাশ, গোঘাটে সাপের কামড়ে এক যুবতীর মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, মৃতার নাম অম্বিকা পাকড়ে (২৫)। তাঁর বাড়ি গোঘাটের বেঙ্গাই এলাকায়। বৃহস্পতিবার ভোরে বাড়িতে ঘুমানোর সময় অম্বিকাকে সাপে কামড়ায়। অসুস্থ বোধ করলে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে কামারপুকুর হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে তাঁর মৃত্যু হয়।

প্রসঙ্গত, বর্ষা এলেই বেশি সাপের উপদ্রব। অন্য সময়েও উপদ্রব থাকে, তবে এই সময়টার মতো নয়। বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে। সংবাদপত্রের পাতায় কিংবা টেলভিশনে চোখ রাখলেই দেখা যাবে সাপের কামড়ে কেউ না কেউ মারা যাচ্ছে। এর বেশিরভাগ খোঁজ নিলেই দেখা যাচ্ছে দক্ষিণ বঙ্গের জেলাগুলিতে। দক্ষিণ ২৪ পরগণা, হগলি, হাওড়া ও পূর্ব মেদনিপুর জেলায় সাপের কামড় নিত্য ঘটনা। ইদানীং লক্ষ্য করা যাচ্ছে শিশুদের মধ্যে সাপের কামড়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগে চাষিরা মাঠে যেতেন, কাজ করতে গিয়ে সাপের হাত থেকে নিস্তার ছিল না। কিন্তু এখন রেহাই মিলছে না শিশুদেরও। তাও বেশিরভাগ কামড় খেতে হচ্ছে বাড়িতে থাকাকালীন। এছাড়া যেটা হচ্ছে চাষিদের সঙ্গে মাঠে যাচ্ছে যে সমস্ত শিশু তাদেরকেও রেহাই দিচ্ছে না বিষধর সাপগুলি।
মনে আতঙ্ক বাড়ছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে। উল্লেখ্য, সম্প্রতি একটি ঘটনা মানুষকে অবাক করে দিয়েছে। আরামবাগের এক প্রাথমিক স্কুল পড়ুয়া রাতে খাওয়া-দাওয়া করে মায়ের সঙ্গে ঘুমোতে গেছে। হঠাৎ মা দেখেন কোলের শিশু কাঁদছে। বুঝতে পারছে না শিশুর কী হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে আরামবাগ হাসপাতালে নিয়ে গেছে। ডাক্তার বুঝতে পেরেছেন যে এটা সাপের কামড়। চিকিৎসা চলছে। এরই মধ্যে বাড়ি থেকে বাচ্ছার জন্য ব্যাগে করে জামাকাপড় নিয়ে হাসপাতালে দিতে যাবেন, এসময় হঠাৎ সেই ব্যাগ থেকে বিষধর সাপ বের হয়ে বাবাকেও দংশন করল। সঙ্গে সঙ্গে সেও হাসপাতালে মেয়ের পাশের বেডেই ভর্তি হল। দু-জনেরই চিকিৎসা চলছে। আশঙ্কাজনক অবস্থা। কদিন আগেই এক স্কুল ছাত্রী বাড়িতে পড়তে বসেছে, দংশন করল সাপ। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, সব বিষধর সাপই দংশন করলে দ্রুত সঠিকভাবে চিকিৎসা না হলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এখনও গ্রামের কিছু অজ মানুষ আছেন যাঁরা সাপে দংশন করলে আগে ওঝা কিংবা গুনিনের কাছে ছুটে যান। এটা মারাত্মক ভুল। ফলে মারা যাওয়ার সংখ্যাটা বেড়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে জেলাগুলিতে বিশেষ করে হগলি ও দক্ষিণ ২৪ পরগণায় কালাচ সাপের উপদ্রব বেড়েছে। এই ধরনের প্রজাতির সাপ কামড়ালে শিশুরা তো বটেই, বড়োরাও বুঝতে পারেন না। কিন্তু চন্দ্রবোড়া বা গোখরো কামড়ালে সহজেই বুঝতে পারেন। অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হয়। রোগিদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলি বন্যাকবলিত কিংবা বেশি বৃষ্টি হলে নিচু এলাকাগুলি জলমগ্ন হয়ে পড়ে। তখন ওই সমস্ত জায়গা থেকে বাঁচার তাগিদে উঁচু জায়গায় নিরাপদ আশ্রয়ে চলে আসতে চায় সাপেরা। খাবারের টানও পড়ে তখন এদের। ব্যাঙ, ইঁদুর, টিকটিকি ও পতঙ্গদের খোঁজে বাড়িতেও হানা দেয়। তাই বাড়ির শিশুদেরও মুক্তি নেই সাপেদের হাত থেকে। আর একটা কারণ হল বর্ষার সময় সাপেদের ডিম পাড়ার সময়। ডিম পাড়ার জন্য মাটির ঢিপি, পুরনো বাড়ি, কিংবা বাড়িতে যেখানে চাষের শস্য, মালপত্র রাখা থাকে সেই জায়গাগুলি তাদের নিরাপদ বলে মনে হয়। আর শিশুদের গোপন খেলাগুলি এই জায়গাগুলি বেশি হয়ে থাকে। ফলে তাদের দংশনে পড়ে বেশিরভার শিশু।

সাপ এমনিতে নিরীহ প্রাণী। কিন্তু খাবারের জ্বালা একদম সহ্য করতে পারে না। মাঠেঘাটে রাসায়নিক সার ও ওষুষ প্রয়োগের ফলে তাদের প্রধান খাবার ব্যাঙ ও ইঁদুর মারা যাচ্ছে। তারফলে সাপেরাও মাঠ ছেড়ে খাবারের খোঁজে বাড়িতে হানা দিচ্ছে। রোষের শিকার হচ্ছে বাড়ির সবুজ অবুঝ শিশুরা। যত দিন যাচ্ছে তত বাড়ছে রোষের শিকার। এখানেই শিশুদের নিয়ে আতঙ্কে অভিভাবকেরা। প্রসঙ্গত, যেভাবে কালাচ, চিতি, চন্দ্রবোড়া ও গোখরো সাপের উপদ্রব বাড়ছে তাতে প্রত্যেক অভিভাবকদের অবশ্যই সচেতন হতে হবে। বাড়িতে নোংরা অঞ্চল রাখা যাবে না। শিশুকে সব সময় খেয়াল রাখা দরকার সে ঠিক জায়গায় খেলছে কিনা। আর কখনও সাপে দংশন করলে সঙ্গে সঙ্গে ওঝা বা গুণিনের কাছে না গিয়ে সরাসরি দ্রুত হাসপাতাল কিংবা কাছাকাছি চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। তবেই সাপের কামড়ে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা কমবে। মনে রাখতে হবে বিশ্বে প্রতি বছর সাপের কামড়ে লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু। এর মধ্যে শিশুমৃত্যু প্রায় অর্ধেক। যা উদ্বেগের। আর যেখানে এ রাজ্যে প্রতি বছর সাড়ে তিন হাজার সাপের কামড়ে মারা যাচ্ছে। এ সংখ্যাটাও কম নয়।
উল্লেখ করা যেতে পারে, ভারতেই ১৫টি প্রজাতির সাপ বসবাস করে। শিশুর কোলবালিশের পাশে একইসঙ্গে সাপের সহবাস এ চিত্রও রাজ্যবাসী দেখেছেন। তাই সাবধানতা অবলম্বন মানুষকেই নিতে হবে। ঘরে ঘরে মন্দির ও মননবেদিতে ফুল দিতে যাবার আগে নিজের বাড়ি ও পরিবেশটা পরিচ্ছন্ন রাখাই হবে প্রধান কাজ। তবেই আপনার শিশু সুস্থ থাকবে। এমনটাই মত বিশেষজ্ঞদের।