
ষড় ঋতুর আবর্ত্তে শরৎ তৃতীয়। শরৎ মানেই নীলাভ আকাশে পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘ ভাসছে, হাওয়ায় হিমেল পরশ, সকাল বেলা ঘাসের ডগায় শিশির বিন্দু, নদীর তীরে কাশফুল। এই দৃশ্য দেখেই বোধহয় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, —
‘এসেছে শরৎ, হিমের পরশ
লেগেছে হাওয়ার পরে
সকাল বেলায় ঘাসের আগায়
শিশিরের রেখা ধরে।’
শৈশবে দেখা শরতের এই ছবি যেন কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতির ভারসাম্য হীনতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শৈশবের সেই চেনা শরৎকে আর দেখা যায় না। তবে শরতে প্রকৃতির সেই সৌন্দর্য না থাকলেও নদীর তীরে কাশফুল, শিউলির সুবাস শরতের আগমন বার্তা ঘোষনা করে আর তার সঙ্গে নিয়ে আসে উৎসবের আমেজ। আমাদের হৃদয়ে জাগায় এক অনন্য অনুভুতি। আর সেই অনুভূতিতে অবগাহন করে কবিরা রচনা করেছেন অসংখ্য কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ। শরতকে নিয়ে চর্যাপদের পদকর্তা থেকে শুরু করে আজকের প্রজন্মের কবিরাও রচনা করেছেন অনেক কবিতা। বৈষ্ণব সাহিত্যেও তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
বৈষ্ণব সাহিত্যে শরতের সৌন্দর্য, বিরহের রূপ প্রতিটি মানুষের মনকে উদ্বেল করে তোলে। বৈষ্ণব পদাবলীর অন্যতম কবি বিদ্যাপতি রাধা বিরহের যে চিত্র অঙ্কন করেছেন তা শুনে প্রতিটি বিরহ কাতর হৃদয়ই হাহাকার করে উঠে।
‘এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর
ভরা বাদর মহা ভাদর
শূন্য মন্দির মোর’।
আবার ‘মেঘদূত’ কাব্যের রচয়িতা মহাকবি কালিদাস শরতের স্নিগ্ধতা চোখে জড়িয়ে বলে ওঠেন : —
‘প্রিয়তম আমার ঐ চেয়ে দেখ
নব বধূর ন্যায় সুসজ্জিত শরৎকাল সমাগত।’
কালিদাসের দৃষ্টিতে শরৎকাল নববধূর মতো, এ যেন কবির আরেক প্রিয়া। কবি কালিদাস “ঋতুসংহার” কাব্যে শরতকে নারী দেহের সাথে তুলনা করে যে বর্ণনা দিয়েছেন তা অসাধারণ। এই বর্ণনা শুনে সবার মনই নারী কামনায় কাতর হয়ে উঠে। কবি লিখেছেন —
‘কাশফুলের মতো যার পরিধান, প্রফুল পদ্মের মতো যার মুখ, উন্মত্ত হাঁসের ডাকের মতো রমনীয় যার নুপুরের শব্দ, পাকা শালি ধানের মতো সুন্দর যার ক্ষীণ দেহলতা, অপরূপ যার আকৃতি সেই নববধুর মতো শরৎকাল আসে।’
বাংলা সাহিত্যের আদি মধ্যযুগের কবি চন্ডীদাস কবিতায় শরৎকে তুলে ধরেছেন এভাবে —
‘ভাদর মাঁসে অহোনিশি অন্ধকারে
শিখি ভেক ডাহুক করে কোলাহল।
তাত না দেখিবোঁ যঁবে কাহ্নাঁঞির মুখ
চিনিতে মোর ফুট জায়িবে বুক।’
মধ্যযুগের ধারাবাহিকতা শেষে আধুনিক যুগের কবিদের কবিতায় শরতের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের কাব্যে ও গানে শরতের বন্দনা লক্ষণীয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শরৎকে ঘিরে প্রচুর কবিতা ও গান লিখে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ ও সুবাসিত করে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলার প্রকৃতির রূপে মুগ্ধ হয়ে সকল ঋতুকে নিয়েই তাঁর সৃষ্টি ভান্ডার পরিপূর্ণ করেছেন। কিন্তু তাঁর সৃষ্টিতে শরতের বর্ণনা ও বন্দনা এসেছে অন্যরকম রূপ মাধুর্য্য নিয়ে । এই শরতের মাঝে তিনি যেন বিশ্বমাতার পরিপূর্ণ রূপ দর্শন করেছেন।
শরতের সকালের মোহনীয় রূপ কবিগুরুকে করেছে বিমুগ্ধ। নীল আকাশ আর শুভ্রতায় জগজ্জননীর প্রতি মুগ্ধ হয়ে তিনি গেয়ে ওঠেন : —
“আজি কি তোমার মধুর মুরতি হেরিনু শারদ প্রভাতে!
হে মাত বঙ্গ, শ্যামল অঙ্গ
বলিছে অমল প্রভাতে।”
বর্ষার মহা-আড়ম্বর, মেঘ গর্জন, গুরুগম্ভীরতা এবং বর্ষণমুখরতার পরেই শরৎ ঋতু যখন নির্মল আকাশ আর শুভ্রতার সাথে মিতালী করে রূপের ডালি নিয়ে আসে তখন বাংলার প্রকৃতি নতুন রূপে সাজতে থাকে। সমস্ত প্রকৃতি জুড়েই যেন অন্যরকম এক আনন্দ। কবিগুরু প্রকৃতির এই সাজে আকুলিত হয়ে গেয়ে ওঠেন —
“আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা।
নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা আজ ভ্রমর ভোলে মধু খেতে উড়ে বেড়ায় আলোয় মেতে।
আজ কিসের তরে নদীর চরে চখা-চখির মেলা।”
শরতের শিশির ভেজা সবুজ পথে নানা ফুল ঝরে পড়ে। যা কবি-মনে অনাবিল আনন্দের সঞ্চার করে। সেজন্য ভোরের আলোতে কবির হৃদয় হয়ে ওঠে সতেজ ও প্রাণবন্ত। কবি নজরুল ইসলাম তাই পথিককে শরতের শিউলি বিছানো পথে হাঁটতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তার আমন্ত্রণ : —
‘এসো শারদ প্রাতের পথিক এসো শিউলি বিছানো পথে।
এসো ধুইয়া চরণ শিশিরে এসো অরুণ কিরণ রথে।
দলি, শাপলা শালুক শতদল এসো রাঙায়ে তোমার পদতল
নীল লাবনি ঝরায়ে চলচল এসো অরণ্য পর্বতে’।
নজরুল তাঁর অন্য এক কবিতায় প্রেয়সীর কাছে শরৎ উপস্থাপনা করেছেন এভাবে : —
‘সই পাতালো কি শরতে আজিকে স্নিগ্ধ আকাশ ধরণী
নীলিমা বাহিয়া সওগাত নিয়া নামিছে মেঘের তরণী
অলকার পানে বলাকা ছুটিছে মেঘদূত মনমোহিয়া
চক্ষু রাঙা কলমীর কুড়ি মরতের ভেট বহিয়া
সখীর গাঁয়ে সেউতি বোটার ফিরোজায় রেঙে পেশোয়াজ
আসমানি আর মৃন্ময়ী সুখি মিশিয়াছে মেঠোপথ মাজ।’
কবি বিনয় মজুমদার শরতের একটি চিত্র এঁকেছেন—
‘শরতের দ্বিপ্রহরে, সুধীর সমীর-পরে
জল-ঝরা শাদা শাদা মেঘ উড়ে যায়;
ভাবি, একদৃষ্টে চেয়ে—যদি ঊর্ধ্ব পথ বেয়ে
শুভ্র অনাসক্ত প্রাণ অভ্রভেদি ধায়!’
কবি এখানে শুধু আকাশের দৃশ্য আঁকেননি, বরং মানবমনের এক আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষাও যুক্ত করেছেন।
পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের কাছে শরৎ বিরহের কাল। এ ঋতুতে প্রিয় কাছে না থাকায় প্রেয়সীর যে বিরহরূপ তা তিনি কাছ থেকে অবলোকন করেছেন যেন। সে জন্যে তিনি বলতে পারেন : —
‘গণিতে গণিতে শ্রাবণ কাটিল
আসিল ভাদ্রমাস
বিরহী নারীর নয়নের জল
ভিজিল বুকের বাস।’
নির্জনতার কবি জীবনানন্দ দাশ। বাংলার প্রকৃতি ও শরতের সার্থক চিত্র তুলে ধরেছেন তাঁর কবিতায়। ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যের ‘এখানে আকাশ নীল’ কবিতায় তিনি লিখেছেন —
‘এখানে আকাশ নীল—নীলাভ আকাশ জুড়ে সজিনার ফুল
ফুটে থাকে হিম শাদা—রং তার আশ্বিনের আলোর মতন;’
কবি শামসুর রাহমান তাঁর কবিতার শব্দমালায় গেঁথেছেন শিউলি ফুলের মালা। ‘শরত আলোর কমল বনে’ কবিতায় তিনি লিখেছেন —
‘কোথায় শিউলিতলা, সেই কবেকার ভোরবেলা—
যখন কুড়িয়ে ফুল, পেরিয়ে শিশিরভেজা পথ
বসতে পুকুরঘাটে, দৃষ্টি মেলে দিতে তুমি দূর
বহুদূর বনানীর দিকে অথবা সাঁতার কেটে
কাটত তোমার বেলা কারো কথা ভেবে নিরালায়?’
এখানে কবি শিউলি ফুল কুড়ানো, শিশিরভেজা পথ পেরিয়ে পুকুরঘাটে বসা, দূরের বনানীর দিকে তাকিয়ে থাকা বা সাঁতার কাটার মাধ্যমে একাকী সময় কাটানোর স্মৃতিচারণ করেছেন।
শরতে প্রিয়ার রূপ-বন্দনায় ব্রতী হয়েছেন কবি নিমের্লন্দু গুণ। তার অনুভবে : —
‘সবে তো এই বর্ষা গেল
শরৎ এলো মাত্র
এরই মধ্যে শুভ্রকাশে
ভরলো তোমার গাত্র।
শেষের আলে মুখ নামিয়ে
পুকুরের এ পাড়টায়
হঠাৎ দেখি কাশ ফুটেছে
বাঁশবনের ওই ধারটায়।’
শরতের পরিচয় মেলে কাশফুল আর শিউলির যৌথ উপস্থিতিতে। ‘আসছে শরৎ’ কবিতায় কবি ত্রিপর্ণা পতি লিখেছেন, —
‘কালো মেঘের ঘোমটা থেকে বেরিয়ে এলো নীলাকাশ।
কাশের বনের আন্দোলনে ছুটছে মাঠে হিম বাতাস।
খিলখিলিয়ে হাসছে ওঁরা শিউলি ফুলের গাছে।
শিশিরকনা আলপনা দেয় সবুজ ঘাসের মাঝে’।
কবি চন্দ্রকান্ত দত্ত লিখছেন, —
‘আগমনীর সুর বেজে উঠেছে,
সাদা কাশফুল উড়ছে আকাশে
মনটা খোঁজে তোমার ছোঁয়া,
এই শরৎ এর আশ্বিন মাসে’।
কারও কাছে শরৎ হলো আধুনিক জীবনের ব্যস্ততার ভেতরে একটুখানি শান্তি খুঁজে নেওয়ার সময়; আবার কারও কাছে তা হলো অতীতের স্মৃতিজাগানো এক আবহ, যা মানুষকে ফেলে আসা সময়ের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঋতুর পরিবতর্ন হয়। পরিবতর্ন হয় ঋতুর বৈচিত্র্যও। এর প্রভাব পড়ে সাহিত্যেও। নাগরিক জীবনের শরতের রূপ ও গ্রামীণ জীবনের শরতের রূপ ভিন্ন। তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ষড়ঋতুর বৈচিত্র্যও আর সেভাবে চোখে পড়ে না। সে যাই হোক, শরৎ প্রতি বছর বাঙালির জীবনে নিয়ে আসে নতুন আবেদন ও আবহ এবং উৎসবের আমেজ। শরতে মুগ্ধ হয়ে কবিদের কবিতা রচনা এভাবেই চলে এসেছে হাজার বছর ধরে এবং আগামীতেও যে তা চলবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।