
গৈরিক নয়, গেরুয়া শব্দটি এসেছে ‘গৈরেয়’ তৎসম শব্দ থেকে। কিন্তু সমস্ত অভিধানে গেরুয়া-র মূলশব্দ হিসেবে গৈরিক-ই উল্লিখিত হয়েছে।
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ অভিধান-এ পাই,
গৈরিক-বিণ [গিরি+ইক (ঠঞ্); স্ত্রী -কী] গিরিভব, পর্ব্বতস্থিত, গিরিজ।]। গৈরিক শব্দটি বিশেষ্য অর্থে গিরিমাটি (গেরিমাটি) ও স্বর্ণও বোঝায়।
গৈরেয়- বিণ[গিরি+এয়(ঢক্; স্ত্রী -য়ী]। অর্থ, গিরিভব, গিরিজাত। তবে বিশেষ্যে গিরিমাটি বোঝালেও, স্বর্ণ বোঝায় না এক্ষেত্রে।
বামন শিবরাম আপ্তের ‘The Practical Sanskrit-English Dictionary’-তে
গৈরিক-এর বিশেষণ অর্থ Mountain-born।
বিশেষ্য অর্থ, Red Chalk, Gold।
গৈরেয়-র বিশেষণ অর্থ Mountain-born,
বিশেষ্য অর্থ, Bitumen, Red Chalk।
গৈরেয় > গইরেয় (প্রাকৃত) > গেরেঅ > গেরুয়া। এভাবেই হয়ত বাংলায় গেরুয়া শব্দের আগমন হয়েছে।
গেরুয়া মানে যেমন গৈরিক বা গৈরিক রঙে রঞ্জিত, তেমনি গেরুয়া-র বিশেষ্য অর্থ গেরিমাটি বা গিরিমৃত্তিকা। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালা ভাষার অভিধান ও সুবলচন্দ্র মিত্রর আদর্শ বাঙ্গালা অভিধানে গেরুয়ার এই বিশেষ্য অর্থটিও দেওয়া হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায় বারবার ‘গেরুয়া’ শব্দটি এসেছে।
ঘরে-বাইরে উপন্যাসে ‘বিমলার আত্মকথা’ পর্বে আছে, — ‘‘এমন সময়ে সন্দীপবাবু স্বদেশী প্রচার করবার জন্যে তাঁর দলবল নিয়ে আমাদের ওখানে এসে উপস্থিত হলেন। বিকেলবেলায় আমাদের নাটমন্দিরে সভা হবে। আমরা মেয়েরা দালানের একদিকে চিক ফেলে বসে আছি। ‘বন্দেমাতরম্’ শব্দের সিংহনাদ ক্রমে ক্রমে কাছে আসছে, আমার বুকের ভিতরটা গুরগুর ক’রে কেঁপে উঠছে। হঠাৎ পাগড়ি-বাঁধা গেরুয়াপরা যুবক ও বালকের দল খালি পায়ে আমাদের প্রকাণ্ড আঙিনার মধ্যে, মরা নদীতে প্রথম বর্ষার গেরুয়া বন্যার ধারার মতো, হুড়হুড় করে ঢুকে পড়ল। লোকে লোকে ভরে গেল। সেই ভিড়ের মধ্য দিয়ে একটা বড়ো চৌকির উপর বসিয়ে দশ-বারো জন ছেলে সন্দীপবাবুকে কাঁধে করে নিয়ে এল। বন্দেমাতরম্, বন্দেমাতরম্, বন্দেমাতরম্! আকাশটা যেন ফেটে টুকরো টুকরো হয়ে ছিঁড়ে পড়বে মনে হল।”
‘সাহিত্যের স্বরূপ’-এ ‘কাব্য ও ছন্দ’ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, — ‘‘গদ্যকাব্য নিয়ে সন্দিগ্ধ পাঠকের মনে তর্ক চলছে। এতে আশ্চর্যের বিষয় নেই।
ছন্দের মধ্যে যে বেগ আছে সেই বেগের অভিঘাতে রসগর্ভ বাক্য সহজে হৃদয়ের মধ্যে প্রবেশ করে, মনকে দুলিয়ে তোলে — এ কথা স্বীকার করতে হবে।
শুধু তাই নয়। যে সংসারের ব্যবহারে গদ্য নানা বিভাগে নানা কাজে খেটে মরছে কাব্যের জগৎ তার থেকে পৃথক্। পদ্যের ভাষাবিশিষ্টতা এই কথাটাকে স্পষ্ট করে; স্পষ্ট হলেই মনটা তাকে স্বক্ষেত্রে অভ্যর্থনা করবার জন্যে প্রস্তুত হতে পারে। গেরুয়াবেশে সন্ন্যাসী জানান দেয়, সে গৃহীর থেকে পৃথক্; ভক্তের মন সেই মুহূর্তেই তার পায়ের কাছে এগিয়ে আসে — নইলে সন্ন্যাসীর ভক্তির ব্যবসায়ে ক্ষতি হবার কথা।
কিন্তু বলা বাহুল্য, সন্ন্যাসধর্মের মুখ্য তত্ত্বটা তার গেরুয়া কাপড়ে নয়, সেটা আছে তার সাধনার সত্যতায়। এই কথাটা যে বোঝে, গেরুয়া কাপড়ের অভাবেই তার মন আরো বেশি করে আকৃষ্ট হয়। সে বলে, আমার বোধশক্তির দ্বারাই সত্যকে চিনব, সেই গেরুয়া কাপড়ের দ্বারা নয়— যে কাপড়ে বহু অসত্যকে চাপা দিয়ে রাখে।
ছন্দটাই যে ঐকান্তিকভাবে কাব্য তা নয়। কাব্যের মূল কথাটা আছে রসে; ছন্দটা এই রসের পরিচয় দেয় আনুষঙ্গিক হয়ে।”
‘মুক্তির উপায়’ নাটকের প্রথম দৃশ্যে গেরুয়া নিয়ে বেশ তাত্ত্বিক আলোচনা শোনা যায় নাটকের কুশীলবদের মুখে, — “পুষ্প। ফকিরদা, তপস্যা যখন ভেঙেছিল শিব এসেছিলেন তাঁর বরদাত্রীর কাছে — তোমার তপস্যা এবার গুটিয়ে নাও; এই দেখো, বরদাত্রী অপেক্ষা করে আছেন লালপেড়ে শাড়িখানি পরে।
হৈমবতী। পুষ্পদিদি, বরদাত্রীর জন্যে ভাবনা নেই; পাড় দেখা দিচ্ছে রঙ-বেরঙের।
পুষ্প। বুঝেছি, গেরুয়া রঙের ছটা বুঝি ঘরের দেয়াল পেরিয়ে বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে?
হৈমবতী। এরই মধ্যে আসতে আরম্ভ করেছেন দুটি একটি করে বরদাত্রী। গেরুয়া রঙের নেশা মেয়েরা সামলাতে পারে না। পোড়াকপালীদের মরণদশা আর কি! সেদিন এসেছিল একজন বেহায়া মেয়ে ওঁর কাছে মুক্তিমন্ত্র নেবে ব’লে। হবি তো হ, আমারই ঘরে এসে পড়েছিল— দুটো-একটা খাঁটি কথা শুনিয়েছিলুম, মুক্তিমন্ত্রেরই কাজ করেছিল, গেল মাথা ঝাঁকানি দিয়ে বেরিয়ে।
ফকির। দেখো, আমার মাণ্ডূক্যটা দাও।
পুষ্প। কী করবে।
ফকির। নারীর হাত লেগেছে, গঙ্গাজল দিয়ে ধুয়ে আনিগে।
পুষ্প। সেই ভালো, বুদ্ধি দিয়ে ধোওয়াটা তো হল না এ জন্মে।
ফকির। শুনে যাও, হৈম। আজকে গুরুগৃহে নবরত্নদান ব্রত। আমি তাঁকে দেব সোনা, একটা গিনি চাই।
হৈমবতী। দিতে পারব না, শ্বশুরমশায় পা ছুঁইয়ে বারণ করেছেন।
পুষ্প। তোমার গুরুজির বুঝি কাঞ্চনে অরুচি নেই!
ফকির। তাঁর মহিমা কী বুঝবে তোমরা! কাঞ্চন পড়তে থাকে তাঁর ঝুলির মধ্যে আর তিনি চোখ বুজে বলেন— হুং ফট্। বাস্, একেবারে ছাই হয়ে যায়। যারা তাঁর ভক্ত তাদের এ স্বচক্ষে দেখা।
পুষ্প। ঝুলিতে যদি ছাই ভরবারই দরকার থাকে, কাঠের ছাই আছে, কয়লার ছাই আছে, সোনার ছাই দিয়ে বোকামি কর কেন।
ফকির। হায় রে, এইটেই বুঝলে না! গুরুজি বলেছেন, মহাদেবের তৃতীয় নেত্রে দগ্ধ হয়েছিলেন কন্দর্প, সোনার আসক্তি ছাই করতেই গুরুজির আবির্ভাব ধরাধামে। স্থূল সোনার কামনা ভস্ম করে কানে দেবেন সূক্ষ্ম সোনা, গুরুমন্ত্র।
পুষ্প। আর সহ্য হচ্ছে না, চল্ ভাই হৈমি, তোর পড়া বাকি আছে।
ফকির। সোহং ব্রহ্ম, সোহং ব্রহ্ম, সোহং ব্রহ্ম।
পুষ্প। (খানিক দূরে গিয়ে ফিরে এসে) রোসো ভাই, একটা কথা আছে, বলে যাই। ফকিরদা, শুনেছি তোমার গুরু আমার সঙ্গে একবার দেখা করবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।
ফকির। হাঁ, তিনি শুনেছেন, তুমি বেদান্ত পাস করেছ। তিনি আমাকে বলে রেখেছেন, নিশ্চয় তোমাকে তাঁর পায়ে এসে পড়তে হবে, বেদান্ত যাবে কোথায় ভেসে! সময় প্রায় হয়ে এল।
পুষ্প। বুঝতে পারছি। ক’দিন ধরে কেবলই বাঁ চোখ নাচছে।
ফকির। নাচছে? বটে! ঐ দেখো, অব্যর্থ তাঁর বাক্য। টান ধরেছে।
পুষ্প। কিন্তু আগে থাকতে বলে রাখছি, ছাই করে দেবার মতো মালমসলা আমার মধ্যে বেশি পাবেন না। যা ছিল সব পাস করতে করতে য়ুনিভার্সিটির আঁস্তাকুড়ে ভর্তি করে দিয়েছি।
হৈমবতী। কী বলছ ভাই, পুষ্পদিদি! কোন্ ভূতে আবার তোমাকে পেল।
পুষ্প। কী জানি ভাই, দেশের হাওয়ায় এটা ঘটায়। বুদ্ধিতে কাঁপন দিয়ে হঠাৎ আসে যেন ম্যালেরিয়ার গুরুগুরুনি। মনে হচ্ছে, রবি ঠাকুরের একটা গান শুনেছিলুম —
গেরুয়া ফাঁদ পাতা ভুবনে,
কে কোথা ধরা পড়ে কে জানে!
ফকির। পুষ্পদি, তুমি যে এতদূর এগিয়েছ তা আমি জানতুম না। পূর্বজন্মের কর্মফল আর কি!
পুষ্প। নিশ্চয়ই, অনেক জন্মের অবুদ্ধিকে দম দিতে দিতে এমন অদ্ভুত বুদ্ধি হঠাৎ পাক খেয়ে ওঠে — তার পরে আর রক্ষে নেই।
ফকির। উঃ, আশ্চর্য! ধন্য তুমি! সংসারে কেউ কেউ থাকে যারা একেবারেই — কী বলব!
পুষ্প। একেবারে শেষের দিক থেকেই শুরু করে। রবি ঠাকুর বলেছেন—
যখনি জাগিলে বিশ্বে পূর্ণপ্রস্ফুটিতা
ফকির। বা বা, বেশ বলেছেন রবি ঠাকুর — আমি তো কখনো পড়ি নি!
পুষ্প। ভালো করেছ, পড়লে বিপদেই পড়তে। ভাই হৈমি, তোর সেই মটরদানার দুনলী হারটা আমাকে দে দেখি। মহাপুরুষদের দর্শনে খালি হাতে যেতে নেই।”
গোলাম মুর্শিদ সম্পাদিত ‘বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধানে’-ও যথারীতি সংস্কৃত গৈরিক থেকে গেরুয়া আসার কথা বলা হয়েছে।
১৮৭৪-এ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, “গেরুয়া-বস্ত্র পরিয়া কোথায় চলিয়া গেল’।
১৮৮৭তে গিরিশচন্দ্র ঘোষের লেখায় পাই, ‘আমার গেরুয়াখানা দাও’।
বনফুল ১৯৩৬-এ লিখছেন, ‘গেরুয়াধারী সন্ন্যাসীর দল’।
গেরুয়ার চক্করে যে লেখক পড়েছেন, সকলেই বস্ত্র বা বসনকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তবে গেরুয়ার গেরোয় একবার আটকে গেলে দগ্ধানির শেষ নেই।
আর একটা কথা, এখনও পর্যন্ত কোনও লেখকের লেখায় গেরিমাটি অর্থে গেরুয়া শব্দের প্রয়োগের উদাহরণ চোখে পড়েনি। অথচ অভিধান অনুসারে গেরুয়ার অর্থ গেরিমাটিও হয়।