Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রথ নিয়ে বাংলা প্রবাদ ও তার সামাজিক তাৎপর্য : অসিত দাস মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-র ছোটগল্প ‘গোধূলির চিতায়’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ এনকাউন্টার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ফুলমনির মাঠ’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শুনুন নেতাজি সুভাষ, শুনছেন — : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলতলার ঝগড়ার ‘কলতলা’ ছিল জলের কল আসার অনেক আগেই : অসিত দাস মাড়ির অসুখ থেকে সাবধান সুগার ও প্রেগন্যান্সিরা! হতে পারে ক্যান্সার : ডাঃ পিয়ালী চট্টোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘সাড়ে তিন হাত বারান্দা’ গুণ্ডা দমন, মন উচাটন, আসছে শমন, বাপ রে বাপ : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ‘একা এক নারী’র জয়, পরাজয় এবং… : দিলীপ মজুমদার ভরতমুনির নাটকের ডিম ও ঘোড়ার ডিম : অসিত দাস পাণিহাটির মহোৎসব : স্বামী সারদানন্দ শিবশঙ্করের জীবনানন্দ দর্শন : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ব্যক্তিস্বাধীনতা পগার পার, বললেন বিচারক জামদার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মঙ্গল কাব্যে কারিগরি পণ্য এবং হাতিয়ার : ড. ললিতা ঘোষ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শতবার্ষিকী মুক্তি পত্রিকা ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলন : ড. দয়াময় রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘রাত পাহারা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বই পড়া : প্রসেনজিৎ দাস
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গা / ৫৬ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬

অনুবাদকের বিস্তৃত ভূমিকা শেষ পর্ব

আমার এই ভূমিকা শেষ হবে ‘ফিফথ রিপোর্ট — লুঠ ও নিয়ন্ত্রণের ‘মাস্টারপিস’ আলোচনা সূত্রে। এই দলিল শুধু ঐতিহাসিক রেকর্ড নয়; লুঠ গণহত্যা আর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার পথ বোঝার শক্তিশালী কৌশলী অস্ত্র, যাকে ভিত্তি করে পুঁজিবাদী কর্পোরেশন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য ইতিহাস পুনর্লিখন করছিল। একই সঙ্গে এই সমীক্ষা সেই ‘মাস্কেড সিস্টেমের’ আভিধানিক সমাপ্তি, যা ক্লাইভ থেকে শুরু করে হেস্টিংস পর্যন্ত বাংলার শাসনকে চিনির সিরা দিয়ে ঢেকে রেখেছিল।

‘মাস্টারপিস’ কেন বলছি? আগেই বলেছি ফিফথ রিপোর্ট টার্নিং পয়েন্ট দলিল। কেন? এর আগে পুঁজিবাদ ইওরোপের নানা দেশে রপ্তানি শুরু হয়েগিয়েছিল বলেই, ২০০ বছরের জরাগ্রস্ত কর্পোরেটের হাত থেক্মে উপনিবেশি ভারতের বাজার নব্য পুঁজিবাদীদের জন্য খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া অতীব গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল। ফিফথ রিপোর্ট জাস্ট এই কাজটাই করেছে সুচারুভাবে — মহোদ্ভয় অমিয় কুমার বাগচীর ভাষায় বিশ্বের প্রথম এম্পায়ার ফর প্রফিট আর প্রফিট ফর এম্পায়াররের প্রধান কাজই ছিল নব্য কর্পোর্টদের জন্য বাজার দখল করা।

১৮১২-র এই রিপোর্ট তৈরি হয়েছিল ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নির্দেশে। প্রথম খণ্ডের ভূমিকায় বলেছি, কোন কোন সাম্রাজ্য পণ্ডিত এই রিপোর্ট প্রস্তুত করেছিলেন, সেই নথি আজ লুপ্ত — কিন্তু এর ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল কোম্পানির রাজস্ব ও বিচার ব্যবস্থার অবস্থা অনুসন্ধান করা আর লুকোনো উদ্দেশ্য ভারতের বাজার কর্পোরেটের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য নীরব লবি করা। এর পেছনে ছিল মুক্ত বাণিজ্য সমর্থক আর ধর্মপ্রচারকদের জোরালো আন্দোলন; তারা কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্য, বাজার দখলে রাখা আর ‘অত্যাচারী’ শাসনের বিরুদ্ধে নিরন্তর সরব হচ্ছিল। এদের পক্ষে ঘোমটা টেনে দাঁড়াল ফিফথ রিপোর্ট। তার কৌশল ছিল অসাধারণ; প্রথমত’দ্বৈত বক্তব্য’ তৈরি করা। রিপোর্ট কোম্পানির শাসনকে ‘সফল’ ‘সংস্কারবাদী’ বলেও তার ত্রুটির ভাঁড়ার এত বিস্তারিত তুলে ধরে যে সেই অভিযোগ শেষ পর্যন্ত কোম্পানি পরিচালনায় রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের ‘বৈজ্ঞানিক’ অজুহাত হয়ে উঠল সঙ্গে জুটল ভারত বাজার খোলার পার্লামেন্টারি প্রণোদনা। অর্থাৎ, রিপোর্ট নির্মাণ কোম্পানির স্বার্থে তৈরি করার কথা হলেও, শেষ পর্যন্ত হয়ে দাঁড়াল কোম্পানির ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কঠোর করার হাতিয়ার।

রিপোর্টকে ব্যবহার করা হল তথ্য ‘বোমা’ হিসেবে। রিপোর্টের আকার ছিল বিশাল — ১০০২ পৃষ্ঠা, যার ৮০০ পৃষ্ঠাই পরিশিষ্ট। এই পরিশিষ্টে জোড়া ছিল জেমস গ্র্যান্টের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ, জন শোর আর লর্ড কর্নওয়ালিসের মধ্যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নিয়ে তর্কাতর্কির নথি, জেলার কালেক্টরদের রিপোর্ট, জমিদার আর প্রজাদের আবেদনপত্র। এই বিপুল তথ্য রিপোর্টকে ‘নির্ভরযোগ্য’ ‘বস্তুনিষ্ঠ’ দলিলের মর্যাদা দিল। ফিফথ রিপোর্টের সময়কালেই পত্তনি প্রথা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা জমির মালিকানা ও ভোগদখলের মধ্যে অসংখ্য স্তর তৈরি করে।

এই রিপোর্ট লুঠ আর শোষণের দলিলায়ন। রাজস্ব আদায় নিশ্চিত আর সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যেতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পাখির চোখ। এই রিপোর্টের মূল আলোচ্য চিরস্থায়ী বন্দোবস্তর প্রভাব বিশ্লেষণ। সমীক্ষা যদিও প্রকাশ্যে বলছে লর্ড কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত রাজস্ব ব্যবস্থা স্থিতিশীল করেছে। কিন্তু রিপোর্টের পরিশিষ্টের নথি — বিশেষ করে শোর-গ্র্যান্টের বিতর্ক থেকে স্পষ্ট এই সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য ছিল লুঠেরা কোম্পানির রাজস্ব নিশ্চিত আর সর্বোচ্চ করা।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ব্যাকগ্রাউন্ডে কী ঘটেছিল? জন শোর-কর্নওয়ালিস বিতর্কে জন শোরের বক্তব্য ছিল রাজস্ব বণ্টনের অসাম্য inequitable distribution দীর্ঘমেয়াদে কোম্পানির জন্যও ক্ষতিকর। তিনি ভয় করছিলেন জমিদারি নিলামে বিক্রি হলে সে সব খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাবে এবং রাজস্ব আদায় কঠিন হবে। অন্যদিকে, কর্নওয়ালিস মনে করছিলেন যে এই সংস্কার দেশের প্রশাসনিক উন্নয়নের জন্য জরুরি। ফিফথ রিপোর্ট কর্নওয়ালিসের পক্ষেই রায় দেয়। অন্যদিকে কোম্পানির সেরেস্তাদার জেমস গ্র্যান্টের বিশ্লেষণ ছিল অন্য ধরণের। গ্র্যান্ট বলেন বাংলার জমি প্রকৃতপক্ষে under-assessed এবং কোম্পানি আরও বেশি করে খাজনা আরোপ করে আরও বেশি রাজস্ব আদায় করতের পারে। গ্রান্টের এই বিশ্লেষণ কোম্পানির স্বার্থে রাজস্ব বাড়ানোর পক্ষে সওয়াল করে। ঠিক এর আগে ফিলিপ ফ্রান্সিস মুঘল আমলের জমিদারি ব্যবস্থাপনার সূত্র ধরে বলেছেন, জমি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সম্পত্তি নয়, বরং জমিদারদের; সরকারের প্রাপ্য উৎপাদনের নির্দিষ্ট অংশ। অন্যদিকে, হেস্টিংসের বক্তব্য ছিল ‘যতদিন প্রজা তার কর দেয়, জমিদারের তাকে উচ্ছেদ করার অধিকার নেই’। ফিফথ রিপোর্ট ফ্রান্সিসের এই মতকে প্রাধান্য দেয়, যা জমিদারি স্বার্থ শক্তিশালী করে।

প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর- পরিশিষ্টের নীরব সাক্ষ্য – ফিফথ রিপোর্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর পরিশিষ্ট। এই ৮০০ পৃষ্ঠার পরিশিষ্টে জমিদার ও প্রজাদের নানান ধরণের আবেদনপত্র জুড়ে দেওয়া ছিল। রিপোর্টের মূল বক্তব্য কোম্পানির পক্ষে গেলেও এই আবেদনপত্রগুলো লুঠ আর শোষণের বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তোলে। প্রজাদের আবেদন, জেলাগুলোর কালেক্টরদের রিপোর্ট, প্রজাদের ফরিয়াদ থেকে বোঝা যায় কীভাবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর জমিদাররা প্রজাদের ওপর অত্যাচার বাড়িয়েছিল। অতিরিক্ত খাজনা-আবওয়াব, বেগার খাটুনি, জমি দখলের হুমকি — ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। অন্যদিকে, জমিদারদের আবেদনপত্রে উঠে আসে রাজস্ব আদায়ের কঠোর নীতির বিরুদ্ধে তাদের অসন্তোষ। জমিদারি নিলামে বিক্রি হওয়ার ভয় তাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছিল। আর ছিল তথ্যের দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বপূর্ণ আবেদনপত্রগুলোর মধ্য দিয়েই ফিফথ রিপোর্টের প্রকৃত চেহারা ফুটে ওঠে — এটাই হয়ে উঠেছিল শাসক আর শাসিতের মধ্যে সংগ্রামের এক দলিলায়ন।

‘মাস্টারপিস’-এর পরিণতি কি হল? ফিফথ রিপোর্টের বড় সাফল্য ছিল ১৮১৩-র সনদ আইন বা Charter Act of ১৮১৩-কে প্রভাবিত করা। এই আইনে কোম্পানির বাণিজ্যিক একচেটিয়া শেষ হয়। ‘আউটপোর্ট’ ব্লকের লিভারপুল, ম্যানচেস্টার ইত্যাদি অঞ্চলের শিল্পপুঁজির দাবি পূরণ করে ভারতীয় বাণিজ্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হল, একই সঙ্গে কোম্পানির প্রশাসনিক অস্তিত্বও টিকে গেল — ফিফথ রিপোর্ট প্রমাণ করেছে কোম্পানি দক্ষভাবে ‘সফল’ প্রশাসন পরিচালনা করেছে, তাই তার শাসন ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রইল – তা সত্ত্বেও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হল। ১৮১৩র সনদ বোর্ড অফ কন্ট্রোলের ক্ষমতা বাড়ায় এবং কোম্পানির রাজস্ব আর প্রশাসনের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করে।

ফিফথ রিপোর্ট তাই কোম্পানির ‘শেষ অধ্যায়’। শেষ পর্যন্ত কোম্পানি তার প্রশাসনিক অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারলেও বাণিজ্যিক স্বায়ত্তশাসন শেষ করে দেওয়া হয়; এর ফলে রাষ্ট্রীয় শাসনের পথ প্রশস্ত হয় এবং এর চার দশক পার করে ১৮৫৮ সালে কোম্পানির অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়।

আমরা বলছি ফিফথ রিপোর্ট লুঠ আর নিয়ন্ত্রণের অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ ‘মাস্টারপিস’। বিশাল তথ্য ভাণ্ডার, ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ, আইনি যুক্তির ককটেল ‘বৈজ্ঞানিকতার’ আবরণ তৈরি করে শেষ পর্যন্ত কোম্পানির অর্ধ-স্বার্থ রক্ষা করেও তার ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে ভারত উপনিবেশের বাজার নব্য আউটপোর্ট পুঁজিপতিদের হাতে উপহার হিসেবে তুলে দেওয়া হয়। ফিফথ রিপোর্ট প্রমাণ করে উপনিবেশিক শাসন আর লুঠ শুধুই বলপ্রয়োগে নয়, তথ্য, আইন ও ‘বৈজ্ঞানিক’ বিশ্লেষণেও পরিচালিত হয়ে লুঠকে আরও সুসংহত আর দীর্ঘস্থায়ী করতে সক্ষম। ফিফথ রিপোর্টের প্রথম, দ্বিতীয় খণ্ডের অনুবাদ ও বিশ্লেষণ এই মাস্টারপিসের হৃদিঅক্ষ উন্মোচনের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র — সেই লুঠ-কাঠামোর বিরুদ্ধে সংগ্রামের ধারাবাহিকতা, যার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল এই রিপোর্ট আর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সূচনায়।

উপসংহার

আমরা সদ্য এই ওয়েবসাইটে ফিফথ রিপোর্টের প্রথম খণ্ড অনুবাদ শেষ করেছি। ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডের প্রাসঙ্গিকতা বুঝতে প্রথম খণ্ডে আলোচ্য বিষয়ের প্রেক্ষাপট বোঝা জরুরি — যদিও অত্যাবশ্যক নয়। দ্বিতীয় খণ্ডের পরিশিষ্টে জেমস গ্র্যান্টের ‘বাংলার অর্থনীতির বিশ্লেষণ’, শোর-কর্নওয়ালিস বিতর্ক ও অন্য নথিপত্র থেকে স্পষ্ট, বাস্তব তথ্য আর আদর্শগত বর্ণনার মধ্যে ফারাক বহুদূর। ফার্মিঙ্গারের ‘ঐতিহাসিক ভূমিকা’ যেখানে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে ‘সংস্কার’ আখ্যা দিচ্ছে, সেখানে দ্বিতীয় খণ্ডের নথিপত্র থেকে বোঝা যায় এর মূল উদ্দেশ্য ছিল কোম্পানির রাজস্ব নিশ্চিত করা, প্রজার কল্যাণ নয়। তাছাড়া শোষণের প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়নের একটা চিত্রও এই রিপোর্টে স্পষ্ট দেখি। দ্বিতীয় খণ্ডের নথি দেখায় কীভাবে জমিদারি অধিকার, রাজস্ব আদায়ের পদ্ধতি আর প্রজার অধিকার — সবকিছুই কোম্পানির স্বার্থে পুনঃসংজ্ঞায়িত করা হচ্ছিল দ্রুতলয়ে। এখন আমাদের বোঝা দরকার এই সমীক্ষার দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি কি? এই বন্দোবস্তের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি ছিল স্থবির অর্থনীতি, কৃষকের ঋণগ্রস্ততা, ও সামাজিক অস্থিরতা — যার প্রভাব ভারতবর্ষের স্বাধীনতা-পরবর্তী ভূমি সংস্কার পর্যন্ত বর্তমান।

ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডের অনুবাদ ও বিশ্লেষণ তাই রাজনৈতিক কাজ — ঐতিহাসিক সত্যের পুনরুদ্ধার, শোষিতের পক্ষে ভাষ্য, এবং লুঠ-কাঠামোর বিরুদ্ধে সংগ্রামের অস্ত্র, যার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল এই রিপোর্ট ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমেই। হকার, কারিগর, চাষী — যাঁরা মাটি, হাত ও ঘাম দিয়ে গড়ে তোলেন উৎপাদনের ভিত্তি, তাঁদের কর্পোরেট-নিরপেক্ষ উৎপাদন ব্যবস্থার জয় হোক। যে কর্পোরেট-জাতি-রাষ্ট্র জোট আজও লুঠ করে তাঁদের শ্রমের উদ্বৃত্ত, তার পতন হোক। উপনিবেশের পতন হোক — সেই পুরোনো লুঠ-কাঠামোর, আর তার আধুনিক সংস্করণের। লড়াই দীর্ঘজীবী হোক।

উপনিবেশের পতন হোক।

পরের কিস্তি থেকে আমরা দ্য ফিফথ রিপোর্ট অনুবাদে প্রবেশ করব।

চলবে

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভলিউম-২, ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড বেঙ্গল এপেন্ডিক্স।

বিশ্বেন্দু নন্দ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন