রথ নিয়ে বাংলাভাষায় অনেক প্রবাদ আছে। কিন্তু একটি -দুটির বেশি লোকমুখে প্রচলিত নয়। ‘রথ দেখা, কলা বেচা’-র সহাবস্থানের কথা কেই বা না জানে। বাকি প্রবাদগুলি কিন্তু মোটেই বহুশ্রুত নয়।
যথা, —
১. এক চাকায় রথ চলে না। (অর্থ, দশের লাঠি, একের বোঝা, এই গোত্রের)
২. চাকা ছাড়া রথ, শাস্ত্র ছাড়া মত।
৩. চোদ্দ চাকার রথ দেখানো। (কাউকে মুশকিলে ফেলা)
৪. জটায়ু পক্ষীর রথ গেলা। (যা অসম্ভব কাজ, মনিবের জন্যে তাই করতে যাওয়া। কথিত আছে, রাবণের সীতাহরণের সময় তার পুষ্পক রথকে প্রতিহত করার ব্যর্থ চেষ্টা করে জটায়ু। এটাকেই অতিরঞ্জিত করে কেউ কেউ বলে, জটায়ু রথটি গিলে খেতে উদ্যত হয়েছিল। বাল্মীকি রামায়ণ বা কৃত্তিবাসী রামায়ণে এর সমর্থন নেই, তবে পাখার ঝাপটায় জটায়ু যে রাবণের রথকে চূর্ণ করতে চেয়েছিল, সেটার কথা বলা আছে)।
৫. দোল দেখতে ভাতার ম’লো, রথ দেখতে যাই। (নারীজীবন নিয়ে এই সিরিওকমিক প্রবাদটি আক্ষরিক অর্থেই হৃদয়বিদারক)।
৬. পথের গু রথে যায়।
৭. রাম লক্ষ্মণ দু’টি ভাই, রথে চড়ে স্বর্গে যাই।
৮. সতী যায় সোঁতে(স্রোতে), অসতী যায় রথে।
৯. তোদের হলুদ মাখা গা, তোরা রথ দেখতে যা/আমরা হলুদ কোথা পাব, আমরা উলটারথে যাব।(প্রাচীন পল্লীগীতি থেকে গৃহীত)।
১০. রথ দেখা, কলা বেচা। (একযাত্রাতেই উভয় উদ্দেশ্য সিদ্ধ করা)।
রথযাত্রা আর্যদের একটি প্রাচীন ধর্মোৎসব। এখন রথযাত্রা বললে সাধারণত জগন্নাথদেবের রথযাত্রাকেই বোঝায়। কিন্তু একসময় ভারতবর্ষে সৌর, শক্তি, শৈব, বৈষ্ণব, জৈন, বৌদ্ধ, সব ধর্ম-সম্প্রদায়ের মধ্যে স্ব স্ব উপাস্যদেবের উৎসববিশেষে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হতো। রথ নিয়ে প্রবাদগুলি দেখলে মনে হয়, রামায়ণ-প্রভাবিত ভারতের লোকসমাজে রথযাত্রার বিশাল ব্যাপ্তি ও প্রসার ছিল। প্রবাদে তাই জটায়ু পক্ষীর কথা, রাম-লক্ষ্মণের কথা অনিবার্যভাবেই এসেছে।
প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থ ব্রহ্মাণ্ডপুরাণ এবং পদ্মপুরাণ-এও এই রথযাত্রার উল্লেখ পাওয়া যায়। জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার রথ কেমন হবে, সে সম্পর্কে বলা আছে গ্রন্থে। বিষ্ণুধর্মোত্তরে একই রথে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা — এই মূর্তিত্রয়ের স্থাপন নির্দেশ থাকলেও পুরুষোত্তম মাহাতো ও নীলাদ্রি মহোদয়ের পদ্ধতি অনুসারে পুরীধামে আজ অবধি তিনজনের জন্য তিনটি বৃহৎ রথ প্রস্তুত হয়ে থাকে।
রথযাত্রার প্রচলন ঠিক কোন সময়ে হয়, তা এখনো সুনিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কারও কারও মতে, বুদ্ধদেবের জন্মোৎসব উপলক্ষে বৌদ্ধরা যে রথযাত্রা উৎসব করত, তা থেকেই হিন্দু সম্প্রদায়ের রথযাত্রার উৎপত্তি। আবার অনেকে বিশ্বাস করেন, এদেশে প্রতিমাপূজা প্রচলনের সঙ্গে সঙ্গে রথযাত্রার উৎসব প্রচলিত হয়।
উৎকলখণ্ড এবং দেউলতোলা নামক ওড়িশার প্রাচীন পুঁথিতে জগন্নাথদেবের রথযাত্রার ইতিহাস প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে সত্যযুগে অবন্তীনগরী রাজ্যে ইন্দ্র নামে সূর্যবংশীয় এক পরম বিষ্ণুভক্ত রাজা ভগবান বিষ্ণুর এই জগন্নাথরূপী মূর্তির রথযাত্রা শুরু করার স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে রাজা ইন্দ্র পুরীর এই জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ ও রথযাত্রার প্রচলন করেন।
বৌদ্ধযুগেও জগন্নাথদেবের রথযাত্রার অনুরূপ রথে বুদ্ধদেবের মূর্তি স্থাপন করে রথযাত্রার প্রচলন ছিল। বিখ্যাত চীনা পর্যটক ফা হিয়ান খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতকে তৎকালীন মধ্য এশিয়ার খোটান নামক স্থানে যে বুদ্ধ রথযাত্রার বর্ণনা দিয়েছেন, তা অনেকাংশে পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ত্রিশ ফুট উঁচু চার চাকার একটি রথকে বিভিন্ন রত্ন, অলংকার ও বস্ত্রে সুন্দরভাবে সাজানো হতো। রথটির চারপাশে থাকত নানা দেবদেবীর মূর্তি। মাঝখানে স্থাপন করা হতো বুদ্ধদেবের মূর্তি। এরপর সে দেশের রাজা তাঁর মুকুট খুলে রেখে খালি পায়ে রথের সামনে এসে নতমস্তকে বুদ্ধদেবের উদ্দেশে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার পর মহাসমারোহে রথযাত্রা শুরু হতো। পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রায় আজও আমরা দেখে থাকি যে প্রতিবছর রথযাত্রার উদ্বোধন করেন সেখানকার রাজা। রাজত্ব না থাকলেও বংশপরম্পরাক্রমে পুরীর রাজপরিবারের নিয়মানুযায়ী যিনি রাজা উপাধিপ্রাপ্ত হন, তিনি জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাদেবীর পরপর তিনটি রথের সামনে এসে পুষ্পাঞ্জলি প্রদান ও সোনার ঝাড়ু দিয়ে রথের সম্মুখভাগ ঝাঁট দেওয়ার পরই পুরীর রথের রশিতে টান পড়ে। শুরু হয় জগন্নাথদেবের রথযাত্রা।
ইউরোপেও একসময় রথযাত্রার প্রমাণ পাওয়া যায়। এখনও ভাদ্র মাসের প্রথমেই ইউরোপের অন্তর্গত সিসিলি দ্বীপে রথযাত্রার অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। ওই বিলাতি রথযাত্রা মেরির উদ্দেশে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তবে সূর্য-রথই যে সব রথের প্রথম, তা পুরাণে বলা আছে।
পূর্বে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মধ্যে কার্তিক মাসে শ্রীকৃষ্ণের রথযাত্রার অনুষ্ঠান হতো। বৌদ্ধ প্রভাবকালে তা বিলুপ্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। হিন্দুধর্মের পুনরুদ্ভবকালে উৎকলবাসীর মনোরঞ্জনের জন্য সেই সময়েই জগন্নাথদেবের রথযাত্রা প্রচলিত হলো। এই জগন্নাথদেবের রথযাত্রা ক্রমে সর্বত্র প্রচলিত হলে শ্রীকৃষ্ণের রথযাত্রার বিষয় অনেকেই ভুলে গেল। তবে হিমালয়ের কোনো কোনো স্থানে দেবীর রথযাত্রার কথা এখনো শোনা যায়। নেপালে কী বৌদ্ধ, কী শৈব সর্বসাধারণের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রকার রথযাত্রা প্রচলিত আছে।
পুরীর রথের কথা তো আমরা সবাই জানি। সেখানে সমুদ্রকেও ছাপিয়ে ওঠে রথের মেলার জনসমুদ্র। মেদিনীপুর জেলার প্রাচীন ঐতিহ্যমণ্ডিত মহিষাদলের রাজপরিবারের বিখ্যাত কাঠের রথ, বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের মল্লরাজাদের অতীত গৌরবের সাক্ষী পাথরের রথ। দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের প্রতিষ্ঠাত্রী রানি রাসমণি ১৮৩৮ সালে এক লাখ ২২ হাজার টাকা খরচ করে তৈরি করেছিলেন রুপার রথ। মেদিনীপুর জেলার রামগড়ের রাজারা রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহ নিয়ে টানতেন পিতলের রথ। কাঁঠালপাড়ার ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের পারিবারিক রথ ছিল টিনের। কাঠের কাঠামোয় পাঁচটি স্বর্ণচূড়ামণ্ডিত রথ আছে মধ্য কলকাতার সুরি লেনে মল্লিক পরিবারের। ওবঙ্গে সবচেয়ে বড় রথ ছিল মানিকগঞ্জের ধামরাইয়ে। রথটির উচ্চতা ছিল ১৮ মিটার। দানবীর রণদাপ্রসাদ সাহা ওই রথটির দেখাশোনা এবং ব্যয়ভার বহন করতেন।
মাহেশের রথের একটি দীর্ঘ ইতিহাস আছে। যতদূর জানা যায় প্রথমত বৈদ্যবাটি এক ভক্ত মন্দিরের রথ দান করেছিলেন সেটা ১৪৯৭ সাল। শুরুতে মাহেশ থেকে দোলতলা পর্যন্ত রথযাত্রা হত বলে জানা যায়। বর্তমানে স্নানপিঁড়ি মাঠ থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ পেরিয়ে মাসির বাড়ি পর্যন্ত রথ টানা হয়। হুতোম প্যাঁচার নকশায় সরাসরি মাহেশের রথের কথা বলা না হলেও রিষড়ায় স্নানযাত্রার বিবরণ আছে। গুরুদাসবাবু বিস্তর টাকা খরচ করে ইয়ারবন্ধুদের নিয়ে কলকাতার বাগবাজার ঘাট থেকে নৌকা করে আসেন জগন্নাথের স্নানযাত্রা দেখতে। রিষড়ার ঘাটের পাশে নানান আমোদফূর্তি করেন তাঁরা। রথদেখা, কলা বেচা, দুটোই হয়েছিল। ‘বসেছে আজ রথের তলায়, স্নানযাত্রার মেলা’।
গঙ্গার জলে বিষ্ঠার উল্লেখ আছে একটি বাংলা প্রবাদে। ‘তর্পণের কোষাকুষিতে জোয়ারের বিষ্ঠা’। রথবিষয়ক প্রবাদে পাই, ‘পথের গু রথে যায়’। সত্যিই, নৌকা করে বাগবাজার থেকে রিষড়া আসার সময় গুরুদাসবাবু গঙ্গার দুপারে মানুষের প্রাতঃকৃত্যের চাক্ষুষ বিবরণ দিয়েছেন নকশায়!
১৭৯৭ সালে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের এক বিখ্যাত শিষ্য বলরাম বসুর দাদা কৃষ্ণ রাম বসু একটি রথ দান করেছিলেন। সেই রথ অনেক অংশে ভেঙেচুরে গেলে কৃষ্ণ রামের পুত্র গুরুপ্রসাদ পরবর্তী বছরে আরো সুন্দর করে নয় চুড়া বিশিষ্ট নতুন রথ বানিয়ে দেন। ১৮৮৪ সালে রথযাত্রার দিন একটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটে। এদিন বল্লভপুর গুন্ডিচা বাড়িতে আগুন লেগে যাওয়ায় রথটি নষ্ট হয়ে যায়। তখন শ্যাম বাজারের বসু পরিবারের সদস্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হুগলির দেওয়ান কৃষ্ণচন্দ্র বসু রথ নির্মাণ করিয়ে দেন। ১৮৮৫ সাল থেকেই সেই রথ টানা শুরু হয়। বর্তমানেও সেই রথটি আমরা দেখতে পাই। চার তলা বিশিষ্ট এই রথটি সম্পূর্ণ লোহার কাঠামোর উপর কাঠ দিয়ে তৈরি। উচ্চতা ৫০ ফুট, ওজন ১২৫ টন। এক ফুট বেড়-এর বারোটি লোহার চাকা আছে, রথের সামনে তামার তৈরি দুটি ঘোড়া জুড়ে দেওয়া হয়। রথের চারতলায় দেবতাদের বিগ্রহ বসানো হয়। মার্টিন বার্ন কোম্পানি রথটি তৈরি করেছে।গুপ্তিপাড়ার রথও বেশ নামকরা।
তবে রথ নিয়ে প্রবাদগুলি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে প্রবাদগুলির শিকড় লোকসমাজের অনেক গভীরে প্রোথিত। সমাজের বিভিন্নক্ষেত্র থেকে রথসম্পর্কিত প্রবাদগুলি উঠে এসেছে। আমাদের অভ্যাস ও যাপনের বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িয়ে আছে প্রবাদের শাখাপ্রশাখা। তবে প্রবাদ না হয়েও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কবিতাটি তো প্রবাদেরও বাড়া,-
রথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধূমধাম,
ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম।
পথ ভাবে আমি দেব রথ ভাবে আমি,
মূর্তি ভাবে আমি দেব — হাসে অন্তর্যামী।