Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলতলার ঝগড়ার ‘কলতলা’ ছিল জলের কল আসার অনেক আগেই : অসিত দাস মাড়ির অসুখ থেকে সাবধান সুগার ও প্রেগন্যান্সিরা! হতে পারে ক্যান্সার : ডাঃ পিয়ালী চট্টোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘সাড়ে তিন হাত বারান্দা’ গুণ্ডা দমন, মন উচাটন, আসছে শমন, বাপ রে বাপ : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ‘একা এক নারী’র জয়, পরাজয় এবং… : দিলীপ মজুমদার ভরতমুনির নাটকের ডিম ও ঘোড়ার ডিম : অসিত দাস পাণিহাটির মহোৎসব : স্বামী সারদানন্দ শিবশঙ্করের জীবনানন্দ দর্শন : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ব্যক্তিস্বাধীনতা পগার পার, বললেন বিচারক জামদার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মঙ্গল কাব্যে কারিগরি পণ্য এবং হাতিয়ার : ড. ললিতা ঘোষ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শতবার্ষিকী মুক্তি পত্রিকা ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলন : ড. দয়াময় রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘রাত পাহারা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বই পড়া : প্রসেনজিৎ দাস অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘নীলমণির প্রত্যাবর্তন’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্যাটা গরম করে দেওয়া, স্যাটা ভেঙে দেওয়ার গোড়ার কথা : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ভাসামানিক ভাসামানিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ হুগলি-চুঁচুড়ার স্মৃতি ও বঙ্কিম প্রতিভার উন্মেষ : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আর্ট কলেজ থেকে পাশ করে মুখ্যমন্ত্রী — বলে কি রে : বিজয় চৌধুরী
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কলতলার ঝগড়ার ‘কলতলা’ ছিল জলের কল আসার অনেক আগেই : অসিত দাস

অসিত দাস / ৬৮ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬

হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ অভিধানে ‘কল’ শব্দের একটি প্রধান অর্থ দেওয়া হয়েছে, ‘বিবাদ, কলহ’। এটি এসেছে সংস্কৃত ‘কলি’ থেকে। প্রাচীন সাহিত্য থেকে তিনি উদাহরণ দিয়েছেন, — “গৃধ্র কঙ্ক বক পরস্পরে করে কল/ বিনাদোষে পরস্পর লোকে করে কল”।

আরও উদাহরণ, “কলা কুচা করে রুক্মি বড়ই অবুধ”।

অর্থাৎ কলতলা মানেই হচ্ছে কলহ-বিবাদ -ঝগড়া-র জায়গা বা থান। সাধারণত এগুলি পাড়ার কয়েকটি বাড়ির মাঝখানে উঠোন বা চত্বর ধরনের একটি সালিশী বসানোর জায়গা হত। যেখানে তর্কাতর্কি, ঝগড়া থেকে হাতাহাতি পর্যন্ত হত গ্রামীণ সমাজে। এগুলিকেই ‘কলতলা’ বলে ডাকা হত সেকালের গ্রামগঞ্জে। এখনও কলতলা, কলাতলা নামে জায়গা আছে দুই বঙ্গে।

জলের কল তখন সমাজজীবনে কোথায়? পুকুরের জল, নদীর জল পান করত লোকে। তারপর এলো কুয়োর জল। শ্রীরামপুরের বটতলায় ‘কোম্পানিপুকুর’ বলে একটি জায়গাই আছে। তিন-চারশ বছর আগে সেই পুকুরের জল পান করত দিনেমাররা। বলাবাহুল্য ইংরেজের আগে শ্রীরামপুরের শাসক ছিল ড্যানিশরা। ডেনমার্কের রাজা ষষ্ঠ ফ্রেডেরিকের নাম থেকেই শ্রীরামপুরের নাম হয় ফ্রেডেরিকনগর।

এবার দেখব এক লেখকের চোখে কলতলার চেহারা কেমন, — ‘কলতলা বললেই যে ছবিটি ভেসে ওঠে, তা হল একদল খেটে খাওয়া মানুষের শহরে বেঁচে থাকার লড়াইয়ের একটি অনন্য দিক : রাস্তার ধারে মোটা পাইপ থেকে অনর্গল পড়তে থাকা ঘোলাটে জলের চারদিকে মহিলা-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষের দৈনন্দিনতা। কেউ মাথা ঘষছে, কেউ সাবান মাখছে, কেউ কাপড় কাচছে, কেউ বা পরচর্চা। কার বালতি আগে ছিল, কারটা ছিল পরে; কে সেই বালতি রাখার সাক্ষী ছিল, কে ছিল না সেইটে নিয়ে কাজিয়া। কলতলাকে ঘিরে কলহমুখরতা যেন এক অতি পরিচিত নাগরিক দৃশ্য। কলকাতা শহরে যাদেরই একটা সুনির্দিষ্ট মাথা গোঁজার ঠিকানা রয়েছে, তাদের সকলেরই নানা কৌতূহল কাজ করে রাস্তার ধারে স্নানরত অর্ধ-উলঙ্গ কিছু মানুষের যাপনক্রিয়া প্রত্যক্ষ করে।

প্রকাশ্য দিবালোকে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে রাস্তার ধারে এ হেন স্নান — এ দেশের সমাজে কেবল শহুরে বিষয় তো নয়। গ্রামে মানুষ এখনও পুকুর বা নদীর ঘাটে স্নান সারে। মেয়েরা কাপড় কেচে, বাসন মেজে ফিরে আসে। কাঁখে কলসি নিয়ে জল আনতে যায়। ঘাটে রাই কিশোরীর প্রেমের খবর কে না জানে! ঘাটের ধারে মহিলা জমায়েতের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা কেচ্ছা-কাহিনিও সুবিদিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘ঘাটের কথা’য় লিখে গিয়েছেন ছোট মেয়ে কুসুমের জলের সঙ্গে ভালোবাসার কথা; তার পায়ের মলের সঙ্গে শ্যাওলা ও ঘাটের সখীভাবের কাহিনি। আর সেই রাক্কুসি মেয়ের শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার কথা। রবীন্দ্রনাথের লেখায় বেজে উঠেছে আক্ষেপের সুর, ‘জলের পদ্মটিকে কে যেন ডাঙায় রোপণ করিতে লইয়া গেল’।

সেই আক্ষেপ তো শেষ হওয়ার নয়। কারণ গ্রাম্য মেয়ে-বউদের হৃদয়ের সঙ্গে ঘাটের যে আত্মিক বন্ধনের কথা লেখা হয়ে রয়েছে সাহিত্যিক বা কবিদের লেখায়। ওই মেয়েদের কাজিয়া ও পরকীয়ার যে মিঠে-কড়া আখ্যানটি শহুরে পাঠককে প্রেমের রসদ যুগিয়ে এসেছে বরাবর। অথচ, একইভাবে শহরের কলতলায় স্নান বিলাসিনীরা মর্যাদা পাননি। উল্টে, কলতলা যেন হয়ে উঠেছে মেয়েলি কাজিয়ার প্রাঙ্গণ। তার মান অধোমুখী, রুচি নিম্নগামী। এ যেন ‘সংস্কৃতি’-র অপর পিঠ; প্রান্তিক সমাজের বিষয়।

উপনিবেশিক নগরায়নে জল সরবরাহ একটি বিশেষ অধ্যায় রচনা করেছিল কলকাতায়। উনিশ শতকে বিশেষত ১৮১৭ সাল থেকে প্রায় উনিশ শতকের শেষ অবধি লাগাতার কলেরা মহামারীর প্রকোপ ব্রিটিশ শাসকদের বাধ্য করেছিল কলকাতা নগরীর নিষ্কাশনী ব্যবস্থা অর্থাৎ পয়ঃপ্রণালী এবং জল সরবরাহের ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করতে। কারণ কলেরা মহামারীতে বহু ব্রিটিশ নাবিকের মৃত্যুতে ব্রিটিশ প্রশাসনকে ভাবিয়ে তুলেছিল। তার ফলে নেটিভ টাউন অর্থাৎ কলকাতার উত্তরভাগে রাস্তাঘাট নির্মাণ, পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থা তৈরি করা এবং একইসঙ্গে পরিশ্রুত জল সরবরাহের ব্যবস্থা করা নগরায়ন পরিকল্পনার অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছিল।

নগর পরিকল্পনার প্রাথমিক ধাপে মধ্য কলকাতা থাকে উত্তর ও দক্ষিণে রাস্তা তৈরি, সেইসব রাস্তার নাম ব্রিটিশ সাহেবদের নামে নামাঙ্কিত করে আধিপত্যের বিস্তারের নিশান গেঁথে দেওয়া হয়। এই রাস্তা তৈরির পাশাপাশি রাস্তার মোড়ে পাইপ লাইন বসিয়ে নির্দিষ্ট সময় অন্তর গঙ্গার জল সরবরাহ করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এই নিয়ে শহরের উত্তরে বসবাসকারী ‘নেটিভ’দের মনে গঙ্গার জলের শুচিতা ঘুচে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলেও, তা বেশিদিন ধোপে টেঁকেনি। কারণ মহামারীর প্রকোপে উনিশ শতকে মানুষের মৃত্যুতে শহরের বড় অংশ বেশ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল।

তাই জল সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতি প্রাথমিকভাবে অনাস্থা থাকলেও যুক্তি উঠেছিল গঙ্গার জলের অকাট্য শুচিতাকে সাহেবদের তৈরি ব্যবস্থা কোনওভাবেই খণ্ডন করতে পারে না। উল্টোদিকে কলকাতার উত্তরভাগে রাজপথ নির্মাণের পাশাপাশি রাস্তার মোড়ের কলের জল সরবরাহ নিম্নবিত্ত মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কিছুটা সুবিধে করে দেয়। ১৮৬৫ সালে পলতায় হুগলি নদীর জল ধরে পরিশোধনের ব্যবস্থা নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়েছিল।

কলকাতা নগরীর পত্তন ও বাণিজ্য নগরী হিসেবে কলকাতার বিকাশ ক্রমে বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা ক্রমে পরিযায়ী মানুষের সংখ্যাও বাড়াতে থাকে। অর্থাৎ উনিশ শতকে মধ্যভাগের তুলনায় শেষ ভাগে এবং বিশ শতকে শহরে পরিযায়ী মানুষের সংখ্যা অনেকাংশে বেড়ে যায়। তার অন্যতম প্রমাণ যেমন ১৮৭১ এবং ১৯০১ সালের আদমসুমারি তেমনই, ১৮৮৮ থেকে ১৮৯৩ সালের মধ্যে এবং পরবর্তীকালে ১৯০৩, ১৯০৭ সালেও পলতা পরিশোধনের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়াতে থাকে সরকার। কলকাতায় ব্রিটিশ পাড়া এবং এদেশীয় এলাকাবাসীদের পাড়াগুলিতে পর্যাপ্ত পরিশ্রুত জল সরবরাহের কাজে বদ্ধপরিকর থাকার চেষ্টা করতে থাকে প্রশাসন। পলতা জল পরিশোধনের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মিউনিসিপ্যালিটির অনুমোদিত জমিতে তৈরি হওয়া বাড়ির ভেতরেও জল সরবরাহ ব্যবস্থা অর্থাৎ জলের পাইপ পৌঁছয়। স্নানঘরে কল বসতে থাকে। কিন্তু রাস্তার ধারের কলতলাগুলি ক্রমেই চলে যেতে থাকে পরিযায়ীদের দখলে।

এই পরিযায়ী জনসমষ্টির একটা বড় অংশই শ্রমিক শ্রেণির মানুষ, বস্তিবাসী। তাঁদের কাছে পাড়ার মোড়ের জলের টাইম কলে দৈনন্দিন কাজ মিটিয়ে নেওয়া ছাড়া কোনও উপায়ান্তর ছিল না। ফলবশত, রাস্তার মোড়ের এই কলের জলের নলগুলি শহরে নিম্নবিত্তের দিনযাপনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল। বিশ শতকে কলকাতার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার অনুপাতে জল সরবরাহ অপ্রতুল হয়ে উঠতে থাকে। তার ফলে নিম্নবিত্তের সমাজে যারা রাস্তার ধারের নলগুলির উপরে নির্ভর করে দৈনন্দিন কাজের জলের চাহিদা মিটিয়ে নিতেন, তাঁদের মধ্যে বিবাদ ও কলহ ছিল সাধারণ বিষয়। এবং এই নলগুলিকে কেন্দ্র করে এলাকায় এলাকায় মেয়েদের অনেক বেশি সময় কাজ করতে হত। খেটে খাওয়া শ্রেণির মহিলারা যারা এই কলগুলির উপরে নির্ভর করতে বাধ্য হতেন, তাঁদের মধ্যে বিসম্বাদ ছিল নিত্য ও অনিবার্য।

নদীর বা পুকুরের স্নানের ঘাটেও মহিলাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক, মান-অভিমান, কেচ্ছা, ঝগড়া চলত; এবং হয়ত আজও চলছে। কিন্তু ঝগড়া বা কেচ্ছায় অংশগ্রহণকারীরা গ্রামসমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়ার ফলে ওই সব ছুটকো কথার রাশি, চিৎকার চেঁচামেচি গ্রামীণ জীবন থেকে আলাদা বা পৃথক কোনও বিষয় ছিল না। বরং তা ছিল সেই চলতি সময়ের আখ্যান, স্মৃতির অংশবিশেষ; তার একটি ধারাবাহিকতা ছিল, সমাদরও ছিল। কিন্তু শহরে কলের জলের সরবরাহকে কেন্দ্র করে যে বিবদমান পরিস্থিতি তৈরি হয় তা ক্রমেই হয়ে থাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা। নিম্নবিত্তের পরিসর, যে তার শ্রেণিগত কারণে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা সমাজের অংশ।

ফলে ‘কলতলা’ শব্দটির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জুড়ে যায় ‘মেয়েলি’ কাজিয়ার প্রসঙ্গ। সচেতনভাবে ভুলে যাওয়া হয় যে কলতলায় অশান্তির একটি অন্যতম কারণ হতে পারত ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ এবং সেই অনুপাতে জল সরবরাহের অপ্রতুলতা। নিম্নবিত্তের প্রতি উচ্চ ও মধ্যবিত্তের শ্রেণিঘটিত অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্যের বোধ কলতলার কাজিয়াকে ক্রমেই হাস্যস্পদ এবং নিম্নরুচির একটি বিশেষ উপমায় পরিণত করে। যা ‘মেয়েলি’, অ-নাগরিক, অ-সভ্য– শহুরে জীবনের সঙ্গে খাপ না খাওয়া কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বিশেষ; অভাবী জীবনের অংশ যা নৈমিত্তিক এবং অনিবার্য। উচ্চ ও মধ্যবিত্তের তথা ভদ্রলোক সমাজের পশ্চিমের ‘আধুনিক শিক্ষা’র মিশেলে তৈরি হওয়া যাপন রুচির বিপরীতগামী; ‘রাখঢাকে’ অবিশ্বাসী। অন্দরের কথা বাইরে এনে ফেলার প্রবণতা কেচ্ছার মোড়কে, সেটাই যেন কলতলার মূলে। অতি সামান্য তুচ্ছ জলের জন্য বাপ-মা তুলে খিস্তি-খেউড় — যৌনগন্ধি শব্দ প্রয়োগে বিবমিষার প্রকাশই বৈশিষ্ট্য তার।

স্বাধীনতার পরে উদ্বাস্তুদের ভিড় কলতলার কাজিয়াকে আরও সুস্পষ্ট চেহারা দিয়েছিল। উদ্বাস্তু পল্লিতে জীবনের অনিশ্চয়তা, স্থান সংকুলান ও অভাব যেন সমস্ত উদ্বাস্তু পাড়াকেই কলতলার রূপক হিসেবে নির্মাণ করে দেয়। যে কোনও রকম ঝগড়া, বিশেষত তা যদি জল সরবরাহের বা জল সংগ্রহের ক্ষেত্র, জলের অপ্রতুলতা এবং সেই অভাবকে কেন্দ্র করে গজিয়ে ওঠে, তবে তা পেয়েছে কলতলায় কাজিয়ার আখ্যা। যেমন জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর ‘বারো ঘর এক উঠোন’ উপন্যাসে শিবনাথের পরিবার, রুচি কখনও কলতলার কাজিয়ার মধ্যে পড়েনি। রুচি ইংরেজি জানা বি.এ. পাশ শিক্ষিতা। মুক্তারাম স্ট্রিটের উচ্চবিত্তীয় ফ্ল্যাটবাড়ি থেকে সোজা বেলেঘাটা এলাকার বস্তিতে ঠাঁই নিলেও কুয়োকে ঘিরে তৈরি হয়ে ওঠা কলতলার কাজিয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। দূর থেকে কাজিয়ার গতি ও প্রকৃতি সে নিরীক্ষণ করলেও কাজিয়ায় অংশ নেওয়া তার কম্ম ছিল না। যদিও কাজিয়ায় অংশগ্রহণকারী মহিলাদের প্রতি রুচির সমবেদনা কখনও হারিয়ে যায়নি। বরং রুচি দেখতে পেয়েছে কীভাবে কিছু মহিলার পরিচ্ছন্নতার প্রতি দায়িত্ববোধ কাজিয়ার ঊর্ধ্বে উঠে বস্তির মানুষকে সামান্য আরাম দিয়েছে।

আসলে সাধারণভাবে মেয়েলি দৈনন্দিনতার পরিসরকে যে আঙ্গিকে দেখা হয়, তাতে মহিলাদের ‘কলহপ্রিয়া’ প্রমাণ করার মধ্যে একটি বিশেষ পুরুষালি দৃষ্টি কাজ করে। যেটি মেয়েদের চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে না দেখে অসংবেদী, বুদ্ধি-যুক্তিহীন পদার্থ হিসেবেই দেখতে বেশি আরাম বোধ করে। এই পুরুষালি দৃষ্টি দিয়ে উচ্চ ও মধ্যবিত্তের মহিলারাও বহুলাংশে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। তাঁদের চোখেও স্নানের জলের জন্য নিম্নবিত্তের মানুষের নিজের প্রতিবেশিনীর সঙ্গে কলহ যেন নির্বুদ্ধিতার প্রতিফলন হিসেবেই ধরা দিতে থাকে। শ্রেণিভেদে যুক্তিহীনতার পরিমাপও বদলে যেতে থাকে। মহিলা যত নিম্নশ্রেণি ও নিম্নজাতির প্রতিভূ হন তাঁর প্রতি এই শ্রেণিগত তাচ্ছিল্যের বোধ তাঁকে তত বেশি কলহমুখর, শিক্ষা ও সহবতহীন মানুষ হিসেবে দেখতে চায়।

কিন্তু কলহ বা কাজিয়ার মধ্যে দিয়ে তার অভাবী সংসারে নিত্যদিনের বেঁচে থাকার লড়াই বা ইংরেজিতে যাকে বলে ‘রেজিলিয়েন্স’– তা নিয়ে মাথা ঘামায় না। নিম্নবিত্ত অভাবী পরিবারের মেয়েদের এই রেজিলিয়েন্স বা বেঁচে থাকার লড়াই যে তাঁদের চরিত্র গঠনের শক্ত ভিত তৈরি করে দেয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে শেখার পাঠ দেয় বা খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য তিলে তিলে তৈরি করে ফেলে তা কয়জন মনে রাখে!’

লেখক কলতলা নিয়ে সুস্বাদু, সুখপাঠ্য থিসিস লিখেছেন যেন। ইনি কিন্তু কলতলার গোড়ার কথায় গেলেন না। কল মানে ‘টিউবওয়েল বা পুরসভার জলের কল’ ধরেই নিয়েছেন।

জীবনানন্দের সময়েও কলকাতায় হাইড্র্যান্ট ছিল। তাঁর লেখা রাত্রি নামক কবিতাতেও তার উল্লেখ আছে।

“হাইড্র্যাণ্ট খুলে দিয়ে কুষ্ঠরোগী চেটে নেয় জল;

অথবা সে-হাইড্র্যাণ্ট হয়তো বা গিয়েছিলো ফেঁসে

এখন দুপুর রাত নগরীতে দল বেঁধে নামে।

একটি মোটরকার গাড়লের মতো গেল কেশে

 

অস্থির পেট্রল ঝেড়ে; সতত সতর্ক থেকে তবু

কেউ যেন ভয়াবহভাবে প’ড়ে গেছে জলে।

তিনটি রিক্‌শ ছুটে মিশে গেল শেষ গ্যাসল্যাম্পে

মায়াবীর মতো জাদুবলে।

আমিও ফিয়ার লেন ছেড়ে দিয়ে— হঠকারিতায়

মাইল-মাইল পথ হেঁটে— দেয়ালের পাশে

দাঁড়ালাম বেণ্টিঙ্ক স্ট্রিটে গিয়ে— টেরিটিবাজারে;

চীনেবাদামের মতো বিশুষ্ক বাতাসে।

 

মদির আলোর তাপ চুমো খায় গালে।

কেরোসিন কাঠ, গালা, গুনচট, চামড়ার ঘ্রাণ

ডাইনামোর গুঞ্জনের সাথে মিশে গিয়ে

ধনুকের ছিলা রাখে টান।

 

টান রাখে মৃত ও জাগ্রত পুথিবীকে।

টান রাথে জীবনের ধনুকের ছিলা।

শ্লোক আওড়ায়ে গেছে মৈত্রেয়ী কবে;

রাজ্য জয় ক’রে গেছে অমর আত্তিলা।

 

নিতান্ত নিজের সুরে তবুও তো উপরের জানালার থেকে

গান গায় অধো জেগে ইহুদী রমণী;

পিতৃলোক হেসে ভাবে, কাকে বলে গান—

আর কাকে সোনা, তেল, কাগজের খনি।

 

ফিরিঙ্গি যুবক কটি চ’লে যায় ছিমছাম।

থামে ঠেস দিয়ে এক লোল নিগ্রো হাসে;

হাতের ব্রায়ার পাইপ পরিষ্কার ক’রে

বুড়ো এক গরিলার মতন বিশ্বাসে।

 

নগরীর মহৎ রাত্রিকে তার মনে হয়

লিবিয়ার জঙ্গলের মতো।

তবুও জন্তুগুলো আনুপূর্ব— অতিবৈতনিক,

বস্তুত কাপড় পরে লজ্জাবশত।”

কলকাতা যে বোদলেয়রীয় পারী নগরীর মত রাতচরা, তা কবি জীবনানন্দ সেই কবেই বুঝে নিয়েছিলেন।

তাঁর মাল্যবান উপন্যাসে সত্যিই বারবার ঘুরেফিরে আসে বারোয়ারি বা ভাগের কলতলায় স্নান করার মোটিফ।

দোতলায় উৎপলার ঘরে সংগীত সম্পন্ন করে নেমে অমরেশ নামধারী যুবক একতলায় বসে থাকা মাঝবয়সী মাল্যবানকে আহিরিটোলা ঘাটে যেতে আমন্ত্রণ জানায় গঙ্গাবক্ষে রাতের সাঁতার দেখতে। সে সাঁতার দেখতে গেরস্ত রমণীরা যেমন আসবে, তেমনি আসবে বেবুশ্যা রমণীরাও। মাল্যবানে মাছের পিস, মাছের কাঁটাকুঁটোর কথা যেমন আছে, তেমনি আছে কলতলার হৃদয়কণ্টকের কথাও।

কিন্তু এইসব কলতলার আগেও ছিল, ঝগড়া-কলহ-বিবাদের সত্যিকারের ‘কলতলা’।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন