সপ্তদশ অধ্যায় : ১৭৮১-র পরিবর্তনসমূহ।
১৭৮০-র ১৭ই আগস্ট। ভোর ৫:৩০ । ওয়ারেন হেস্টিংস, ফিলিপ ফ্রান্সিস — তাঁদের ‘সেকেন্ড’, সহকারীদের সাথে নিয়ে — আলিপুরের বড় গাছের তলায় অসামান্য এক ঐতিহাসিক ডুয়েল, দ্বন্দ্বযুদ্ধ লড়তে মুখোমুখি। এই প্রাণঘাতী লড়াইকে শুধুই প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী দুই মহাতেজের মধ্যে দ্বন্দ্বযুদ্ধ হিসেবে দেখলে উপনিবেশের প্রথম যুগের ক্ষমতার দ্বন্দ্বের রূপ প্রকাশ পাবে না। এই দ্বন্দ্বযুদ্ধই ‘কাউন্সিল বোর্ড’-এ বিগত ছয় বছর ধরে হেস্টিংস ফ্রান্সিসের মধ্যে চলতে থাকা তাত্ত্বিক বিতর্কের নাটকীয় পরিসমাপ্তি। (Busteed: Echoes from old Calcutta. Chap. vi.) ৩রা ডিসেম্বর ফ্রান্সিস ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা হল। বিপজ্জনক প্রতিপক্ষের স্বদেশ যাত্রা হয়তো হেস্টিংসের সামনে বহু-লালিত পরিকল্পনা — রাজস্ব ব্যবস্থার পুনর্গঠন উদ্যম — নতুন করে বাস্তবায়নের সুযোগ খুলে দিয়েছিল। ১৭৭২-এ রাজস্ব কাঠামো পুনর্গঠন পরিকল্পনার রূপরেখা প্রস্তুত হলেও, পরের বছরেই তা স্থগিত হয়ে যায় কিছু সাময়িক ব্যবস্থা বা ‘অস্থায়ী উপায়’ কার্যকর করার নির্দেশে। ১৭৮১-র ২০শে ফেব্রুয়ারি গুরুত্বপূর্ণ এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়; এবং সেদিনের সেই “চিরস্থায়ী পরিকল্পনা”-র প্রারম্ভিক অনুচ্ছেদ শুরু হয়েছে একটি ব্যাখ্যা বার্তা দিয়ে:
“যে ব্যবস্থা বর্তমানেও বলবৎ রয়েছে — যদিও তাতে বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে — অর্থাৎ ‘প্রাদেশিক পরিষদ’-এর মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব তদারকি আর আদায়ের যে পদ্ধতিটি চালু করা; সেটা মূলত সাময়িক আর ঘোষিত উদ্দেশ্য সাধনে প্রবর্তন করা হয়েছিল। সেই উদ্দেশ্য হলো — সহজ আর ধীরগতির পরিবর্তনের মাধ্যমে এমন এক অধিকতর স্থায়ী পদ্ধতি প্রবর্তন করা, যার ফলে কোনো অতি-হঠাৎ বা আকস্মিক পরিবর্তনের সম্ভাব্য কুফল এড়ানো সম্ভব করা যায়। এই ‘চিরস্থায়ী পরিকল্পনা’-র বিস্তারিত এবং সুশৃঙ্খল রূপরেখা এই বিভাগেরই ১৭৭৩-এর ২৩শে নভেম্বরের কার্যবিবরণীতে সম্পূর্ণভাবে বর্ণিত হয়েছে, যে কার্যবিবরণীর মাধ্যমেই মূলত ‘প্রাদেশিক পরিষদ’গুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই পরিকল্পনার মূল নির্যাস হলো – প্রদেশগুলো থেকে আদায় করা সমস্ত রাজস্ব, ‘প্রেসিডেন্সি’ বা সদর দপ্তরে নিয়ে আসা হবে এবং সেখানে কোম্পানির ‘চুক্তিভুক্ত কর্মচারী’দের covenanted servants মধ্য থেকে নির্বাচিত সবচেয়ে দক্ষ আর অভিজ্ঞ ব্যক্তিদল নিয়ে তৈরি একটা কমিটির তত্ত্বাবধানে তা পরিচালিত হবে। কমিটি কাজ করবে গভর্নর-জেনারেল আর কাউন্সিলের প্রত্যক্ষ তদারকির অধীনে এবং প্রয়োজনে নির্দেশনার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের সাথে পরামর্শ করার সুযোগও থাকবে।”
এই পরিকল্পনা কার্যকর করার লক্ষ্যে কয়েকটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়:
১. “কোম্পানির চার চুক্তিভুক্ত কর্মচারীকে covenanted servants নিয়ে অবিলম্বে ‘রাজস্ব কমিটি’ গঠন করা হোক; এই কমিটিকেই উক্ত প্রদেশগুলোর সব সরকারি রাজস্বের তত্ত্বাবধান আর পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করা হবে। গভর্নর-জেনারেল আর কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণাধীন থেকে — এবং গভর্নর-জেনারেল আর কাউন্সিল নিজেদের জন্য যেসব ক্ষমতা আর কর্তৃত্ব একচেটিয়াভাবে সংরক্ষিত রাখেননি, সেগুলো ছাড়া — বাকি সমস্ত ক্ষমতা আর কর্তৃত্ব পূর্ণাঙ্গভাবে এই কমিটির ওপর ন্যস্ত করা হবে।” (এই কমিটিতে সর্বপ্রথম নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল — ডেভিড অ্যান্ডারসন, জন শোর, স্যামুয়েল চার্টার্স এবং চার্লস ক্রফটস। তবে অ্যান্ডারসন, হেস্টিংসের রাজনৈতিক কাজকর্ম পরিচালনায় এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে, রাজস্ব কমিটির বৈঠকগুলোতে তাঁর পক্ষে উপস্থিত থাকা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। শোরের সঙ্গে ফ্রান্সিসের বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল; আর তাঁর এই নিয়োগ ছিল হেস্টিংসের নিরপেক্ষতারই চরম নিদর্শন। হেস্টিংসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ক্রফটস শেষমেশ এই উচ্চপদ ছাড়তে বাধ্য হন এবং ‘চিফ’ হয়ে চট্টগ্রাম চলে যান; চট্টগ্রাম সে সময় তখন স্বাস্থ্যনিবাস হিসেবে গণ্য হতো; সেখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।)
২. (অনুচ্ছেদ-৩)। “যে, প্রাদেশিক পরিষদসমূহ বিলুপ্ত করা হবে এবং তাদের দায়িত্ব ও ক্ষমতা ‘রাজস্ব কমিটি’-র Committee of Revenueকে তুলে করা হবে; যে, পরিষদগুলোর সদস্যদের অবিলম্বে প্রেসিডেন্সিতে (সদর দপ্তরে) উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে — তবে প্রতিটি পরিষদের প্রধান এর ব্যতিক্রম হবেন; তাঁরা কমিটির নিয়ন্ত্রণে থেকে তাঁদের নিজ নিজ বিভাগের সাময়িক দায়িত্বে বহাল থাকবেন, যতক্ষণ না গভর্নর-জেনারেল ও কাউন্সিলের আদেশে তাঁদের প্রত্যাহার করা হয়।”
৩. (অনুচ্ছেদ-৪)। “যে, পৃথক পৃথক জেলাগুলোর কালেক্টরেরা একইভাবে কমিটির কর্তৃত্বাধীনে তাঁদের নিজ নিজ কর্মস্থলে বহাল থাকবেন, যতক্ষণ না গভর্নর-জেনারেল আর কাউন্সিলের আদেশে তাঁদের প্রত্যাহার করা হয়।”
৪. (অনুচ্ছেদ-৫)। “যে, ‘খালসা নথিপত্রের তত্ত্বাবধায়ক’-এর Superintendent of Khalsa Records) পদ লুপ্ত করা হবে; এবং ‘খালসা দপ্তর’ — এর অধীনে সমস্ত দপ্তর এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট সমস্ত কার্যভার আর ক্ষমতা — ‘রাজস্ব কমিটি’তে তুলে দেওয়া হবে।” (খালসা নথিপত্রের তত্ত্বাবধায়ক পদ হেস্টিংসের সৃষ্টি এবং এই পদের প্রথম পদাধিকারী ছিলেন প্রথম লর্ড মিন্টোর ছোট ভাই — দক্ষ ও দুঃসাহসী যুবক — আলেকজান্ডার এলিয়ট। এই পদ লুপ্ত করার সময় দায়িত্বে ছিলেন জি. জি. ডুকারেল। পরবর্তীকালে ‘রাজস্ব বোর্ডে প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী’ (Preparer of Reports to the Board of Revenue) নামে এক কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়; এই পদের প্রথম অধিকারী ছিলেন জোনাথন ডানকান, যিনি পরবর্তীতে বোম্বাইয়ের গভর্নর হয়েছিলেন এবং ভারতের জনহিতকর কীর্তির ইতিহাসে একটি বিশিষ্ট স্থান পাওয়ার যোগ্য।)
৫. (অনুচ্ছেদ-৬)। “যে, কানুনগোদের সেই পদের সাথে সাংবিধানিকভাবে সংশ্লিষ্ট সমস্ত কার্যভার ও ক্ষমতার পূর্ণ দায়িত্ব ও অধিকার পুনরায় অর্পণ করে স্বপদে বহাল করা হবে।” (কোলব্রুক: উল্লিখিত গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ২১৩-২০। অবশিষ্ট অনুচ্ছেদগুলো দাপ্তরিক কাজের বিস্তারিত বিবরণ সংক্রান্ত।)
এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল হেস্টিংসের ১৭৭২-৭৩ সালের রাজস্ব নীতির মূল বিষয়গুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এবং রাজস্ব প্রশাসনকে কলকাতায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় দপ্তরের অধীনে নিয়ে আসার উদ্দেশ্যে। এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে উত্থাপিত আপত্তি ছিল এই যে — প্রাদেশিক পরিষদগুলো তাদের আওতাধীন জেলাগুলোর সাথে অধিকতর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকার কারণে — কলকাতায় অবস্থিত একটি কেন্দ্রীয় রাজস্ব কমিটির তুলনায় তাদের কাছে পর্যাপ্ত স্থানীয় তথ্য থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি ছিল। এরূপ যুক্তির জবাবে বলা যেতে পারে যে, ইউরোপীয় কালেক্টরগণ দেশীয় নায়েবদের তুলনায় অধিকতর শ্রেষ্ঠ ছিলেন; তাছাড়া, বিশেষভাবে নির্বাচিত একদল অভিজ্ঞ কর্মচারীর ব্যাপক অভিজ্ঞতালব্ধ সুবিধাগুলো — সেসব স্থানীয় পরিষদের তুলনায় নিঃসন্দেহে অধিকতর কার্যকর হওয়ার কথা ছিল — যে পরিষদগুলো মূলত স্বল্প-অভিজ্ঞ ও নবীন কর্মচারীদের নিয়ে গঠিত ছিল। এই আপত্তির জবাবে যে, একটি কমিটি নিয়োগ করা পরিষদের ক্ষমতার ওপর এক ধরণের হস্তক্ষেপ — বলা যেতে পারে যে, উক্ত কমিটিটি ছিল পরিষদেরই অধীনস্থ; এবং প্রকৃতপক্ষে কমিটিটি পরিষদের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করেনি, বরং তারা কেবল সেই নিয়ন্ত্রণভারই গ্রহণ করেছিল যা এতদিন প্রাদেশিক পরিষদগুলোর ওপর ন্যস্ত ছিল। তবে ওয়ারেন হেস্টিংসের অভিশংসন চলাকালীন, এই পরিবর্তনের পেছনে গভর্নর-জেনারেলের কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল বলে অভিযোগ তোলা হয়। সেখানে এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয় যে — প্রাদেশিক পরিষদগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করার পরেও — তিনি সেগুলোকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিলেন; যাতে তিনি এমন সব হীনপ্রকৃতির ব্যক্তিদের লাভজনক পদ প্রদান করতে পারেন, যাদের কাছ থেকে (যেমনটা অভিযোগ করা হয়েছিল) তিনি ঘুষ গ্রহণ করতেন। অথচ এই সত্যটি — যে তিনি শুরু থেকেই প্রাদেশিক পরিষদগুলোকে কেবল একটি সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবেই রেখেছিলেন — চুপিসারে এবং অত্যন্ত কৌশলে ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ