Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কবি ধনঞ্জয় সাহার মুক্তছন্দে লেখা কাব্যগ্রন্থ বহুমাত্রিক স্বর : সসীমকুমার বাড়ৈ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তারাশঙ্করের উপন্যাসে সমাজগতির ধারা : ড. অলোক রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘নিউরাল কারেন্সি’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কালীঘাট পটচিত্রের ইতিকথা : মনোজিৎকুমার দাস খোলাখাম : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ জামা, জামি, জামাইষষ্ঠী : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় পলিসি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন আবশ্যক : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পলাশীর যুদ্ধ ও একটি সিদ্ধান্ত (শেষ পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পলাশীর যুদ্ধ ও একটি সিদ্ধান্ত (প্রথম পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিজুরিকা চক্রবর্তী-র ছোটগল্প ‘একাকিনী’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী-র ছোটগল্প ‘আবহমান’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সুস্বাদু ও রসালো আলুবোখারা–প্রকৃতির এক অনন্য উপহার : রিঙ্কি সামন্ত
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কবি ধনঞ্জয় সাহার মুক্তছন্দে লেখা কাব্যগ্রন্থ বহুমাত্রিক স্বর : সসীমকুমার বাড়ৈ

সসীমকুমার বাড়ৈ / ৮০ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

অখণ্ড ভারত যে দিন বিভাজিত হল সেদিন থেকেই পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের ভাষা সংস্কৃতির দ্বি-সত্তা গড়ে উঠতে শুরু করেছে। অবস্থান, ভাষার আঞ্চলিকতা ইত্যাদি পূর্বেই ছিল কিন্তু দ্বিজাতির তত্ত্বের সামাজিক, ধর্মীয়, রাজানৈতিক ও দেশভাগের বিষাক্ত অভিঘাতও জুড়েছে তাতে। দুই বাংলার সাহিত্যে তার প্রতিফলন ঘটেছে অনেকটাই। আগে শক, হুন, পাঠান, মোগল বা ইংরেজ আসায় ভাষায় বিদেশি শব্দের প্রভাব ঘটেছিল ধারাবাহিকভাবে কিন্তু দেশভাগে পূর্ব পাকিস্তানে খণ্ডিত সত্তার কৃত্তিমতা দেখা দিতে শুরু করে ভাষা ও সাহিত্য চর্চায়। সেখানে বসবাসকারী সংখ্যালঘুদের নীরাপত্তাহীনতা ও সংশয় থেকেও এক ধরনের রুদ্ধশ্বাসের কবিতা, কথাসাহিত্য জন্ম নিতে থাকে। আর বিগত পাঁচ দশক বলতে বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে বার্তমান পর্যন্ত বুঝায়, যেখানে স্বাধীনতার স্বর আছে আবার পাক সত্তার চোরা স্রোতও বহমান। ফলে দুইয়ের মিশ্রণেই গড়ে উঠতে থাকল বাংলাদেশের কবিতা, গদ্য সাহিত্য। কবি ধনঞ্জয় সাহার ‘পাঁচ দশকের পাঁয়তারা’ কাব্যগ্রন্থে তেমন পাঁচটি দশকের বাংলাদেশের সত্তা ধরা পড়েছে। তা অনেকটাই রাজনৈতিক ও সামাজিক। শ্রী সাহা মূলত একজন শিশু সাহিত্যিক, ছড়াকার এবং বিজ্ঞানী। বাংলাদেশে জন্ম ও বেড়ে ওঠার পাঠ এবং পরে পড়াশুনার জন্য অনেকটা সময় কাটিয়েছেন ইংল্যান্ডে। থাকেন আমেরিকায়, শ্বশুরবাড়ি কলকাতায়। স্বাভাবিকভাবে তার চলন অনেকটা বিশ্বব্যাপি। সেদিক থেকে দেখলে তাঁর কবিতার ক্যানভাস বিস্তৃত। তাঁর কবিতায় প্রতিফলন ঘটে ফেলে দেশ, তার সামাজিক জীবন থেকে বৈশ্বিক চলন। গত কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা-২০২৬এ ‘বই টার্মিনাস’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ‘পাঁচ দশকের পাঁয়তারা’ নামের কাব্যগ্রন্থটি। নামকরণে একটু হেঁয়ালির আড়ালে সংকটের অনেকগুলো স্তর ধরেছেন কবি। এই আলোচনায় সেই ব্যতিক্রমী স্বরের কিছুটা আলোকপাত চেষ্টা হল।

শ্রী সাহার কবিতায় আছে গদ্য পদ্যের সম্মিলিত চলন। মূলত গদ্য, অক্ষরবৃত্ত ও অন্তঃমিলের কবিতা। এই কাব্যগ্রন্থটি ছোট বড়ো মিলিয়ে মোট ৩২টি কবিতার সংকলন। তার কিছু কবিতা ধরে আলোচনা করলে দেখা যেতে পারে কোথায় তিনি ব্যতিক্রমী আবার কোথায় প্রচলিত। কিন্তু সমস্ত সৃষ্টির মূলে থাকে মানবতা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার। সেই কাজটি করেছেন কবি ধনঞ্জয় সাহা এই কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘নষ্ট থেকে কষ্ট হলে’য়। তিনি নষ্ট মানুষকে আহ্বান করেছেন-

     নষ্ট হলে কষ্ট হলে আমার কাছে আসতে পারো

          দাওয়াই দেবো, যন্ত্র দেবো

          অমোঘ চাঁদের মন্ত্র দিয়ে শক্ত হাতে তন্ত্র দেবো

          একটু চষে নিষাদপুরের বিষাদ রসে তারার রোদে

          মৃদু হাওয়ায় দাওয়ায় বসে হালের হিসাব কষে নেবো।

পথ হারানো পথিকের বিপন্নতায় শুধু মাত্র নৈতিক সহানুভূতিই নয় তাকে হালের হিসাব কষে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন কবি। মানবিক প্রতিশ্রুতিতে যোগ হয়েছে মনুষ্যকুলের টিকে থাকার মন্ত্র, শস্য উৎপাদনের গান। মানুষের অস্তিত্ব অনস্তিত্ব সভ্যতার আধুনিকতায় নয়, বরঞ্চ শস্য উৎপাদন রহস্যে। সেই রহস্যের নিগূঢ় কথা জানে কৃষক, অনেক কষ্টের বিনিময়ে। তাদের কষ্টে গড়ে উঠেছে সভ্যতার ভিত। ধনাঢ্য, শিল্পপতি, সৃজনশীল শিল্পী দিনের শেষে কৃষকের উৎপাদিত শস্যদানার গরম ভাত বা নরম-গরম রুটি ছাড়া বাঁচতে পারে না। কবি তাঁকে নষ্ট জীবন থেকে বসুন্ধরার শ্রেষ্টতম শিল্প কৃষিতে নিয়োজিত হওয়ার স্বপ্ন দেখান।

কুম্ভিলকবৃত্তি বর্তমানে ছোঁয়াছে রোগের আকার ধারণ করেছে। কুম্ভিলকবৃত্তি অল্পস্বল্প হয়তো আগেও ছিল কিন্তু এই সময়ে তার ব্যাপ্তি অনেক প্রসারিত হয়েছে। এই সময়ে অধিকাংশ মানুষ সহজে পাওয়ার সহজ রাস্তা খোঁজায় ব্যস্ত। ধন, সম্পদ থেকে প্রভাব প্রতিপত্তি সব কিছুই সহজে করায়ত্ব করার অসীম তাড়া। এসবের পিছনে যে শ্রম সাধনা ধৈর্য দরকার, তা মানুষ ভোগবাদী তাড়নায় হারিয়ে ফেলছে দিনকে দিন। পিছনে এক বিবর্ণ নৈতিক অবক্ষয়ের ইতিহাস। এই চৌর্যবর্ত্তি শিল্প সাধনাকে ব্যহত করছে সবচেয়ে বেশি। তা কিন্তু কবির নজর এড়ায়নি বা হতে পারে তিনি নিজেও তেমন চৌর্যবৃত্তির শিকার। তাই তিনি ‘মিথ্যে প্রয়াস’ কবিতায় লেখেন —

          অন্যের লেখা নিজের নামে মস্ত বড়ো কবি

          পড়লে লেখা স্পষ্ট ভাসে মৃত মানুষের ছবি

          তাইতো কারা গুনছে বসে গরম গরম টাকা

          সনদ পেতে এবার তারা করবে পকেট ফাঁকা।

সত্যিই তো চটজলদি কবি, সাহিত্যিক হয়ে উঠতে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার, অন্যের লেখা ঝেড়ে দেওয়া, টাকার বিনিময়ে সনদ-সম্মান ক্রয় সবই ক্রমশ চাক্ষুষ হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি এক তথাকথিক অধ্যাপক কবি রাজনৈতি উদ্দেশ্য সাধনে কলকাতার এক কথাসাহিত্যিকের উপন্যাসের অংশ ঝেরে একই বিষয়ে একটি রাজনৈতিক গণহত্যার উপর উপন্যাস লিখেছে। বিষয়টি নিয়ে অনেক হৈ-চৈ হয়েছে কিন্তু এই কলঙ্কে তার নৈতিকবোধে আঘাত লাগেনি বরঞ্চ বুক ফুলিয়ে চলছে। এটাই দুঃসময়ের চরিত্র। কবি এই সব ভোগবাদী সমাজের নৈতিক সংকট দেখেন শোনেন অনুভব করেন, কিন্তু আশাহত হন না। আশাবাদ ব্যক্ত করেন এভাবে–গুনছে গুটি গাঁথছে খুঁটি অদৃশ্য এক মানব/ আসবে নিয়ে জয়ের মালা হারবে মিথ্যে দানব।/ এটাও ঠিক দীর্ঘ মেয়াদি লড়াইয়ে সত্যেরই জয় হয়ই। মিথ্যার ফানুস চুপশে যায়।

‘চরিত্রহীন’ নামের একটি মুক্তগদ্য কবিতায় কবি লিখেছেন ‘অনেক দিন আগের কথা। পাদ্রীকুল তখনও মসৃণ চাদরে টেকে রেখেছিল শিশু যৌন-উৎপীড়নের দুর্বিষহ ঘটনা। বিল ক্লিনটন পড়েনি মনিকা লিওনস্কি দুর্যোগে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আসেনি ধর্ষণের অভিযোগ। তবু শুনেছি বাংলাদেশি এক তরুণীর বুলি — আমেরিকা? যাবো না। মনে হলো কারো জন-জীবনের শেখানো বুলি। ওদেশের সব মানুষের চরিত্র খারাপ। রং খেলায়, অবৈধ যৌনতায় মাতে খোলাখুলি।’ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আজকাল শিশুরা আকছার যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশে তা ভয়বহ রূপ ধারণ করেছে। আবাসিক মাদ্রাসায় নাবালকরা শিক্ষক-হুজুরদের লালসায় ক্ষত বিক্ষত হচ্ছে শৈশবে। কিন্তু প্রচার ঘটছে উল্টোটা, পাশ্চাত্য যেন চরিত্রহীন মানুষের দেশ। ঘরের মধ্যে এমন জমাট বাঁধা অন্ধকার না জানতে দিয়ে পশ্চিমী যৌনতাকে অন্য মোড়কে প্রচার চালায়, অথচ বড়ো হলে তারাই স্বপ্নে বিভোর হয় হাডসন নদীর তীরে সুখের নিবাস গড়ার। এই চরিত্রহীন দ্বিচারিতা কবির জন্মস্থান বাংলাদেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবাহিত। পুরো কবিতাটি লেখা হয়েছে মুক্তগদ্য ছন্দে। কিন্তু কবিতার শরীর জুড়ে রূপক, শ্লেষ, অপ্রিয় সত্য সন্ধানী পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়। বর্তমান বিশ্ব যে এইড্‌স, কভিড অতিমারির মতো দানবীয় অভিঘাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সে সব উঠে আসছে কবিতার আখ্যান বিন্যাসে। কবি মানুষের চরিত্রবান ও চরিত্রহীনতার তুলনায় পাঠককে নিয়ে চলেন বর্তমান সময়ের টাইম স্পেসে। লেখক এখানে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক বৈপরীত্য (Paradox) তুলে ধরেছেন। বাস্তবতা বনাম ধারণা, মার্কিন বা পশ্চিমা সমাজের উচ্চপর্যায়ের আসল অপরাধগুলো (যথা, চার্চের শিশু নির্যাতন বা রাষ্ট্রপ্রধানদের কেলেঙ্কারি) যখন সমাজ বা ওই তরুণী স্পষ্টভাবে জানতও না, তখনও তাদের মনে আমেরিকা সম্পর্কে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে দিয়েছিল। পশ্চিমা সংস্কৃতির ভুল মূল্যায়ন ছিল, পশ্চিমা বিশ্বের ব্যক্তি স্বাধীনতা ও খোলাখুলি জীবনযাপনকে প্রাচ্যের রক্ষণশীল সমাজ প্রায়শই ঢালাওভাবে “খারাপ চরিত্র” বা “অবৈধ” বলে ভুল ব্যাখ্যা করে। কবিতাটি দেখায় যে, কোনো একটি দেশের সমাজকে দূর থেকে সম্পূর্ণ ভালো বা সম্পূর্ণ মন্দ হিসেবে বিচার করাটা কতটা একপেশে এবং পূর্বনির্ধারিত ধারণার (Prejudice) ওপর নির্ভরশীল।

কবি ধনঞ্জয় সাহার কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ঠ্য হল আধুনিক বিজ্ঞান, যুদ্ধ-মারণাস্ত্র, সমাজ, প্রকৃতির মেলবন্ধন। প্রায় প্রতিটি কবিতায় কোনো না কোনো ভাবে এই সব অনুষঙ্গগুলো আসেই। তাঁর কবিতায় বিজ্ঞান আসা স্বাভাবিক ও সহজাত। তিনি নিজে একজন প্রাণী-কৃষিপ্রযুক্তি বিজ্ঞানী। নিউইয়র্ক-এর অ্যালবার্ট আইনস্টাইন মেডিকেল কলেজের মেডিসিনের অধ্যাপক পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে পুরোপুরি কবিতা চর্চায় নিয়োজিত হয়েছেন তিনি। তাঁর নামে The Saha Method নামে একটি ছত্রাক রঞ্জন পদ্ধতি আছে। Dr Saha invented an innovative plant-matter staining technique using Rose Bengal dye to detect fungi in grass varietals. বহু বছর বিজ্ঞানের অলিন্দে ঘোরা একজন সচেতন সংবেদনশীল মানুষ ড. ধনঞ্জয় সাহা। বিজ্ঞানও তাঁর সত্তা জুড়ে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তাঁর কবিতায় বিজ্ঞানের আবিষ্কারগুলো আসে আশির্বাদ নিয়ে আবার অবিশাপের মতো গোপনে ‘নাকি তুমি গভীর জলে শব্দ বিহীন/ সাবমেরিনে যেমন ছলে প্রতিশোধের রুদ্র কলে/ ঘুরে বেড়াও সন্তর্পণে/’ আসে। এ যেন মানুষের ক্রান্তিকালে ভ্রান্তি যাত্রা। কবি লেখেন–নাকি তুমি ইলিশ ফেলে ভীম তিমির এক দোষণ-দোষে/ ওই শোষণে ক্রান্তি কালে ভ্রান্তি হলে ওড়ো তুমি উল্টো রথে/ চাকায় চাকায় উড়ে উড়ে/ পরচুলে চুল মন রাঙিয়ে বাপ-বাসরের নাম ভাঙিয়ে/ আর কত দিন, কোথায় যাবে?’ (কোথাও তুমি যাচ্ছো নাকি)। এই কবিতায় কবি পাঠককে ক্রমশ নিয়ে চলেন এক অলীক দেশে, যেখানে আজন্ম লালিত চেনা পথের পথ বাঁক নেয় এক অচিন ধাঁধায়। কবি সহজ সরল পথ অনুসরণ করতে করতে ঢুকে পড়েন কবিতার ধূসর অন্ধকারে। সেখানে বিরাজ করে আলো আঁধারি ছায়া।

কবি ধনঞ্জয় সাহা তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রেম পাথরের কারখানা’য় অনেক পরিণত বোধের পরিচয় রেখেছেন শব্দ চয়নে এবং অন্তর্নিহিত বক্তব্যে। দেশভাগে সংখ্যালঘু তথা সনাতনী হিন্দু সম্প্রদায়ের বিপন্নতার কথা এসেছে পরোক্ষে। দেশের ঘনঘন রাজনৈতিক ও সামরিক পালা বদল এবং সংখ্যালঘু সংকটের কথা এসেছে তাঁর কবিতায়। সংখ্যালঘু বিতাড়নে তাদের যে মানসিক অবস্থা হয় তার প্রতিফলন ঘটেছে ‘যাব না’ নামক কবিতায়। দাঁত কামড়ে দেশের মাটি আগলে থাকার প্রতিজ্ঞা করে যেতে হয় তাদের। কবি যেন তাদের প্রতিনিধি  —

এখানে আমার ঘর, দেয়ালে আমার

দেবতার ছবি, এ মাটিতে মিশে আছে

আমার আশৈশবের স্মৃতি

আমাকে যদি যেতে বাধ্য করো

আমি রুখে দাঁড়াবো

এই মাটি ছেড়ে আমি কোথাও যাবো না।

উদ্ধৃত কবিতার লাইন ক’টি বাংলাদেশের একজন সংখ্যালঘু (প্রধানত সনাতন ধর্মাবলম্বী) কবির গভীর অস্তিত্বের সংকট, মাটির প্রতি টান এবং অনমনীয় প্রতিরোধের মনস্তাত্ত্বিক দিকটি অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন কবি। এই পঙক্তিগুলোর আলোকে কবির মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাকে এভাবে বিশ্লেষণ করা যায়, নিজস্বতা ও ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যের মনস্তত্ত্ব (Identity and Belonging) “এখানে আমার ঘর, দেয়ালে আমার দেবতার ছবি”। ঘর মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। দেয়ালে নিজের দেবতার ছবি থাকা মানে কেবল একটি বাসস্থান নয়, বরং সেখানে নিজের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাকে সগর্বে বজায় রাখা। কবি মানসিকভাবে এই স্থানটিকে নিজের পরম আশ্রয় মনে করেন, যেখানে তাঁর বিশ্বাস এবং দৈনন্দিন জীবন একাকার হয়ে আছে। নাড়ির টান ও স্মৃতিকাতরতা (Nostalgia and Rootedness) “এ মাটিতে মিশে আছে আমার আশৈশবের স্মৃতি”। এই লাইনটি কবির মনস্তাত্ত্বিক “রুটেডনেস” বা শিকড়ের গভীরতাকে নির্দেশ করেছে। শৈশবের স্মৃতি মানুষের মনস্তত্ত্বের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ। কবি নিজেকে এই মাটির পরগাছা ভাবেন না; বরং তাঁর জীবনের শুরু, তাঁর আনন্দ-বেদনা এই মাটির সাথে মিশে আছে। ভৌগোলিক মানচিত্রের চেয়েও এই মাটি তাঁর কাছে একটি মানসিক অনুভূতি। দেশান্তরি হওয়ার আশঙ্কা ও নিরাপত্তাহীনতা (Fear of Displacement) “আমাকে যদি যেতে বাধ্য করো”: এই লাইনের মধ্যে লুকিয়ে আছে একজন সংখ্যালঘুর অবচেতন মনের এক গভীর ভয়, ঐতিহাসিক ট্রমা ও সংকট। “বাধ্য করো” শব্দবন্ধটি ইঙ্গিত করে যে, তিনি স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়তে চান না, কিন্তু পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, সামাজিক চাপ বা সাম্প্রদায়িক অস্থিতিশীলতা তাঁকে বাস্তুচ্যুত করার হুমকি দিচ্ছে। এটি তাঁর ভেতরের এক চরম নিরাপত্তাহীনতার মনস্তত্ত্বকে উন্মোচন করে। প্রতিরোধ ও আত্মমর্যাদার মনস্তত্ত্ব (Psychology of Resistance) “আমি রুখে দাঁড়াবো / এই মাটি ছেড়ে আমি কোথাও যাবো না”, এটি কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক মোড় (Turning Point)। কবি এখানে আর কোনো অসহায়, ভীত সংখ্যালঘু নন, বরং তিনি একজন আত্মমর্যাদাশীল নাগরিক। ভয় জয় করার মানসিকতায় যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা দেশত্যাগের বা “উদ্বাস্তু” হওয়ার নিয়তিকে তিনি মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে, জোরপূর্বক তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টার বিরুদ্ধে তাঁর মনস্তত্ত্বে এক তীব্র ক্ষোভ এবং “রুখে দাঁড়ানোর” সংকল্প তৈরি হয়েছে। সামগ্রিক মূল্যায়ন লাইন কটিতে কবির মনস্তত্ত্ব এক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে — স্মৃতিকাতরতা ও ভালোবাসার কোমল অনুভূতি থেকে তা রূপান্তরিত হয়েছে এক অনমনীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক আত্মপ্রত্যয়ে। এটি প্রমাণ করে যে, নিপীড়ন বা তাড়িয়ে দেওয়ার ভয় সংখ্যালঘুর মনকে কেবল দুর্বলই করে না, বরং এক পর্যায়ে তা অধিকার আদায়ের জন্য চরম সাহসী ও প্রতিবাদী করে তোলে। তবে কবি যতই আত্মপ্রত্যয়ী হন না কেন, সবচেয়ে বড়ো বাস্তবিক ট্রাজেডি যে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুকে নিঃশব্দে দেশ থেকে হারিয়ে যেতেই হয়।

ড. সাহা মূলত একজন ছড়াকার কবি। ছড়াকার হিসেবে তিনি পেয়েছেন একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার। তিনি শৈশবকালের জন্য ছড়া লেখেন যা শিশুদের মনজগতে আনন্দের সঙ্গে প্রবেশ করতে পারে, স্থান করে নিতে পারে। ছড়াগুলো হয়ে ওঠে সহজ, সরল এবং গ্রহণযোগ্য। ছড়া বাংলা সাহিত্যে অনেকটা অবহেলিত কাব্যধারা। ননসেন্স রাইম ও খেলারসের ছড়ার জন্য চিরস্মরণীয় সুকুমার রায় একেবারে শীর্ষে পৌঁছেছিলেন। ধ্রুপদী যুগের প্রধান ছড়াকারগণ সুকুমার রায় বাদেও ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজি নজরুল ইসলাম, যোগীন্দ্রনাথ সরকার প্রমুখ। আধুনিক যুগে ধারাকে সমৃদ্ধ করেছেন সুকুমার বড়ুয়া, ভবানীপ্রসাদ মজুমদার, অন্নদাশঙ্কর রায়, শামসুর রহমান। কিন্তু সামগ্রিকভাবে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ছড়া চর্চা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ধনঞ্জয় সাহা আমেরিকায় বসবাস করেও সেই ধারাকে সজিব করে তোলার চর্চা করে চলেছেন। তাঁর প্রথম ছড়াকাব্য ‘সোনামণিদের ছড়া’। সোনামণিদের ছড়া’র সঙ্গে একে একে শব্দ বা শব্দবন্ধ যেমন ‘হুতুম রাজা, হুতুম রাজার দেশে, ভূত-প্রেত আর জ্বিনি, মাছ, স্বাধীনতার ইতিহাস, অঙ্ক, জীব-জন্তু, টাবু, গণনা, পাখি, দাঁতের যত্ন ও স্বাস্থ্য’ জুড়ে দিয়ে লিখেছেন অনেকগুলো ছড়াগ্রন্থ। প্রতি ছড়ায় তিনি হয়ে ওঠেন সোনামণিদের প্রাণের মানুষ।

আলোচ্য কাব্যগ্রন্থ ‘পাঁচ দশকের পাঁয়তারা’র প্রতিটি কবিতাই বিষয়বৈচিত্রে আলাদা এবং গভীর অনুভবের দিশারী। ছন্দ ভাঙা এবং গড়ার দক্ষতা কবির আছে, খেলেছেনও তেমনি। কোথাও কোথাও ছড়া কবিতাকে ও ছন্দকে সামান্য প্রভাবিত করেছে। কবিতার উপস্থাপন পশ্চিমবঙ্গের ধারা থেকে অনেকটাই আলাদা। বাংলাদেশের জলমাটির গন্ধমাখা। সেটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের উত্থান-পতনের আস্ফালন, আড়ম্বর, কুস্তি বা মল্লযুদ্ধের প্রস্তুতি তিনি দেখেছেন পাঁচ দশক ধরে। সে সব নিয়েই তাঁর কবিতা। তাই তাঁর কাব্যগ্রন্থের নাম ‘পাঁচ দশকের পাঁয়তারা,’ যা হয়তো ব্যক্তির নয়, সমস্টিগত স্বাধীনতা উত্তর পাঁচ দশকের আখ্যান-কাব্য। বাংলাদেশের কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা লিখেছেন — ‘ধনঞ্জয় সাহা এক বহুমাত্রিক স্রষ্টা। …প্রবহমান গদ্যে রচিত কবির ব্যতিক্রমী লেখাগুলো পাঠক-পাঠিকার চিত্তে নতুনভাবে দোলা দেবে বলে মনে করি।’ তিনিই যথার্থ ব্যক্তি, যিনি বিশ্ব ক্যানভাসে প্রবহমান চিত্র কবিতার শরীরে নান্দনিক স্বর দিতে পারেন।

(কবিতায় কবির ব্যবহৃত বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে)।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন