এ পাড়ায় সকাল শুরু হয় মা কালির জয়জয়কারে। রোয়াকে বসে লাল দন্তমঞ্জন দিয়ে দাঁত ঘষতে ঘষতে একটু লাল থুতু ফেলে নেয় বাচ্চু। মর্নিং ওয়াক ফেরতা সুধীরকাকাকে দেখে চেঁচিয়ে ওঠে “জ্যায় কালি!” মুদিখানার মালিক গণেশবাবু সঙ্গে সঙ্গে দোকানের একফালি জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলে “জ্যায় জ্যায় কালি”। পঁচাত্তুরে সুধীর অতটা ভক্তটাইপ নয়! সে শুধু নিজের হাতের লাঠিটি ওপরে তুলে স্মার্টলি এদের অভিবাদনের উত্তর দেয়। এরপরে জয় কালি হাওয়া কমবেশি ঘোরাফেরা করে এ পাড়ার আনাচেকানাচে।
পাড়ার মোড়ে একটি মা কালির বাঁধানো থান আছে। প্রতিদিন গঙ্গাস্নান সেরে শ্যামাপদ সেই থানটি গঙ্গাজলে ধুয়ে প্রণাম করে। শ্যামাপদর বৌ বেলা শনি-মঙ্গলবারের সন্ধ্যেয় সেখানে জবাফুল রেখে, দুটি ধূপ গুঁজে কর্তব্য সারে। বেলার শাশুড়ি বলেছিল, “এ বাড়ির কর্তারা চোতমাসের অমাবস্যেয় এপাড়ায় রক্ষেকালি পুজো শুরু করেছিল। তুমি শনি-মঙ্গলে কালির থানে সন্ধ্যে করতে ভুলোনা মা।”
এছাড়া কালির থানটি নিয়ে সারাবছর কারোর তেমন মাথাব্যথা নেই। কেউ কেউ আসতে যেতে কপালে আঙুল ঠেকিয়ে উড়ে পেন্নাম করে। পাড়ার ভুলোটা পা তুলে মাঝে মাঝে সেখানে ইয়ে করে আসে।
চৈতী অমাবস্যার রক্ষাকালি পুজোয় অবশ্য পাড়ার সবাই একত্র হয়। পুজোর শেষে মিলেমিশে খিচুড়ি ভোগ খায়। এ পুজোর সিংহভাগ খরচ বহন করে শ্যামাপদর পরিবার। বড়বাজারে তাদের তিন পুরুষের রঙের চলতি দোকান। তাদের দোকানে হরেক কিসিমের রঙ থাকলেও শ্যামাপদর বৌ বেলার গাত্রবর্ণে মা কালির দয়া আছে। শ্যামাপদর বাবা ফটিকবাবু বলতেন, “বৌমার রঙ যেন আমাদের দোকানের মিডনাইট ব্ল্যাকের ডাব্বা!”
লোহার ব্যবসায়ীর একমাত্র মেয়ে বেলার বিয়েতে রূপগুণ নয়, কাঞ্চনমূল্য প্রাধান্য পেয়েছিল। তবে ক্লাস নাইনে পড়ার পাট চুকোনো মেয়ে বেলা এখন ঘোরতর সংসারী এবং সুখী। শ্যামাপদ বৌকে মাঝে মাঝে আদর করে ‘রক্ষেকালির ঝি’ বলে হাঁক পাড়ে। সহজসরল বেলার অবশ্য তাতে কোনো অভিযোগ নেই!
এবছর রক্ষেকালি পুজোয় ধূমধাম খুব বেশি। কালিকেত্তন হবে। কাঙালি ভোজনের আয়োজন হচ্ছে। সব খরচা শ্যামাপদর। সাধে কি এবারের পুজো স্পেশাল! তাদের একমাত্র ছেলে বুবলু ডেঙ্গিতে যায় যায় হয়েছিল ভাদ্রমাসে। শ্যামাপদর পরিবার জানে এ রক্ষেকালিই তাদের বুবলুকে বাঁচিয়েছেন। হাসপাতালে ছেলের মাথার গোড়ায় বসে দিনরাত এক করে ফেলেছিল বুবলুর মা বেলা। তখন কত মানত, জলপড়া! ঠাকুরের আশীর্বাদী ফুল রোগীর মাথায় ছোঁয়ানো!
এবছর মায়ের সামনে সেই মানত রক্ষা করার পালা। বেলার ইচ্ছেয় ঠাকুরের মাথায় এবার ঝলমলে চাঁদোয়া। চাঁদোয়ার তলায় ঠাকুরের আসনবেদির সামনে পাড়ার মেয়েবৌরা শতরঞ্জিতে বসেছে। বয়স্করা একটু দূরে চেয়ারে। পুরোহিত ঘন্টা নাড়লেই ঢাকের বাদ্যি বাজছে, ড্যাডাং ড্যাডাং ড্যাং। কোত্থেকে এক জটাজুট গেরুয়াধারী এক সাধু এসে জুটেছে। সে মাঝে মাঝেই হাত তুলে বলছে ‘জ্যায় তারা!’ অন্যরাও সমস্বরে চেঁচাচ্ছে ‘জ্যায় জ্যায় তারা!’ কেত্তনের দল গাইছে “মায়ের পায়ের জবা হয়ে উঠনা ফুটে মন”।
লাল পাড় গরদের শাড়ি, এক গা গয়নাতেও বেলার মুখখানা সারাদিনের উপোসের ধকলে একটু শুকনো। তার হাতের পেতলের সাজিতে টাটকা ফুল বেলপাতা। পুষ্পাঞ্জলি দেবার পর মানত রক্ষা। বুকের দু-ফোঁটা রক্ত আর চোখের জল মায়ের রাঙা পায়ে নিবেদন। ছেলে বুবলু পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি করে খেলছিল। শ্যামাপদ তাকে ডাকল, “যা মায়ের কাছে যা। কাজ আছে।”
বেলার খুড়শাশুড়ি বলল, “বুবলু, মায়ের বুকে কুলকাঁটা বিঁধিয়ে দু-ফোঁটা রক্ত এই বেলপাতায় ধরতো বাবা।”
বুবলু একটু অবাক হয়ে থমকে দাঁড়াল। তারপর অবশ্য যন্ত্রের মত কাজটা করে ফেলল। সে রক্তমাখা বেলপাতা পুরুতের হাতে তুলে দিয়ে জোড়হাত করল বেলা। এবার চোখের জল বেলপাতায় ধরার পালা। কিন্তু চোখের জল কোথায় উধাও হল বেলার! তার গোলগোল দুই চোখে একফোঁটাও যে অশ্রুবিন্দু নেই। পুরুত মশাই দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে এবার অধৈর্য।
পাড়ার মেয়েরা ফিসফিসিয়ে বলল, বাবা, “এত ধূপধূনোর ধোঁয়াতেও চোখে জল নেই!”
দশ বছরের পাকা মেয়ে ময়না কলকলিয়ে বলল, “সিনেমাটিসরা তো শুনেছি গিলিসারিন লাগিয়ে কাঁদে। কারো বাড়িতে একটুস পাওয়া যাবে না!”
পাশ থেকে খুড়শাশুড়ি বলছে, “কাঁদো বেলা। পুরুত মশাই কতক্ষণ ডাঁইড়ে থাকবে! তোমার ছেলে ভাদ্দর মাসে মরতে বসে ছিল! তখন কত চোখের জল ফেলেছ! সে কথা মনে করে কাঁদো! বাপ সোহাগী মেয়ে তুমি। গেল বছর তোমার বাপ গত হল। বাপের জন্যে একটু চোখের জল ফেলো।”
বেলার চোখ তবু মরুভূমির মত খটখটে। কোথাও কোনো জলের ছিটেফোঁটাও নেই। কেমন মা আমি! ছেলের অসুখের কথা ভেবেও চোখে জল আসে না!
মা বলতেই নিজের মায়ের কথা মনে পড়ল বেলার। বাপ সোহাগী হলেও মা বড় শাসনে রাখত বেলাকে। পান থেকে চুন খসলেই এই মার কি সেই মার! সেবার কেলাস নাইনে বিচ্ছিরিভাবে ফেল করে নীচ দরজায় গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল বেলা। মায়ের সুমুখে যাবার সাহস নেই এমন লাল রঙের ফুল ফোটা রেজাল্ট নিয়ে!
মা দোতলার সিঁড়ি দিয়ে নামছিল। বেলাকে ওভাবে সদরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই সবটা বুঝে গে’ল। তরতরিয়ে নিচে নেমেই চোটপাট, “হতচ্ছাড়ি মেয়ে, এই তো কালোকুচ্ছিত চেহারা! গুণের ও কোনো ঘাটতি নেই! লেখাপড়া করবি নে, কোথায় গতি হবে তোর! আমি কি করব তোকে নিয়ে!”
এরপর কিলঘুঁষি, চুলের মুঠি ধরে চড়-থাপ্পড় কোনো কিচ্ছুটি বাকি রইল না। মারের চোটে সেদিন পিঠ বেঁকে গেছিল বেলার। কালো গালে কালসিটে। ফেল করার দুঃখের থেকে মায়ের চোটপাট-বকুনি, মার আরো আরো বেশি দাগা দিয়েছিল। ঘরের কোণে, বিছানায় মুখ গুঁজে বেলা কাঁদল সে দিন। কিচ্ছুটি দাঁতে কাটেনি। সে’কথা মনে করতেই আজও যেন ব্যথায় টনটন করে উঠল শরীর। সে কবেকার ভয়ানক মার খাওয়ার দুঃখ উথলে উঠল মনের মধ্যে। চোখের জল আর কোনো বাঁধ মানল না! বেলপাতা টলটল করে ভ’রে উঠল বেলার সে পুরনো বেদনার জলে!
বুবলু পটাস পটাস করে সেসব ছবি তুলে রাখল তার মোবাইলে।