বিচারকদের অনুসৃত মতবাদ অনুযায়ী, সরকারের এমন কাজ — সে কাজ যতই প্রয়োজনীয় বা হিতকর হোক না কেন — খুব কমই আছে, যদি ব্যক্তির কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করতে বা তাদের স্বার্থে ব্যাঘাত ঘটাতে উদ্যত হয়, তবে সেটা কাউন্সিলের সদস্যদের সুপ্রিম কোর্টে মামলার সম্মুখীন করতে পারে না। এমনকি আমাদের এ বিষয়ে যথেষ্টই সন্দেহ রয়েছে যে, কোনো ব্যক্তিকে প্রদেশ ত্যাগ করে দেশের অভ্যন্তরভাগে (up-country) চলে যাওয়া থেকে বিরত রাখার অধিকার আদৌ আমাদের আছে কি না — যদিও আমরা নিশ্চিতভাবে জানি যে, তাদের উদ্দেশ্য বিদেশি শক্তির সেবায় নিয়োজিত হওয়া। এমতাবস্থায়, দেশের মঙ্গলের জন্য বহু প্রয়োজনীয় ও সুস্পষ্ট বিধিবিধান অনিবার্যভাবেই অবহেলিত থেকে যাচ্ছে। ‘কোর্ট অফ ডিরেক্টরস’ (পরিচালক পর্ষদ) আমাদের কাছে বারবার সমগ্র মুদ্রাব্যবস্থার পুনর্গঠনের সুপারিশ করেছেন; নিঃসন্দেহে, এমন একটি পদক্ষেপ অত্যন্ত অপরিহার্য। কিন্তু এই সংস্কারের প্রকৃতি এতটাই সংবেদনশীল আর এতটাই গুরুত্বপূর্ণ — এবং এর বাস্তবায়নে এত বেশি জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে — একটি দ্বিধাবিভক্ত সরকার এবং একটি সরকার বিদ্বেষী বিচারালয়ের উপস্থিতিতে নিরাপদে এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব নয়। আমরা আরও বহু বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারি, যা আমাদের মনোযোগের দাবি রাখে; এবং এমন অনেক অনিয়ম বা দুর্নীতির কথা উল্লেখ করতে পারি, যার প্রতিকার করা আমাদের আশু কর্তব্য। কিন্তু বর্তমান সময় কাউন্সিলের কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের জনসেবামূলক এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য উপযুক্ত নয়, যার মধ্যে ইংল্যান্ডের আইন পণ্ডিতরা খুঁত ধরার বা সমালোচনা করার মতো কিছু খুঁজে পান। যখন আমাদের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিদ্রোহের পতাকা উত্তোলিত হচ্ছে এবং দেশের প্রতিটি ব্যক্তিকে সেই পতাকাতলে সমবেত হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে; যখন সরকারের কর্তৃত্ব অস্বীকারকারী বা প্রতিরোধকারী প্রতিটি ব্যক্তিকে সুরক্ষা প্রদান করা হচ্ছে; এবং যখন গভর্নর-জেনারেল এমন প্রতিটি পদক্ষেপে সানন্দে ও দৃঢ়ভাবে অংশ নিচ্ছেন, যা কাউন্সিলের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করতে এবং আমাদের বৈধ ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করতে উদ্যত — এমতাবস্থায় আমরা এতটা আশাবাদী হতে পারছি না যে, আমাদের সব ধরণের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আমাদের ওপর অর্পিত গুরুদায়িত্ব আমরা যথাযথভাবে পালন করতে সক্ষম হব। আমরা রাজস্ব আদায়ের বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারি না; দেশের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা কিংবা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার বিষয়েও আমরা কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারি না। তবে দেশে নতুন প্রশাসনিক বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা বা উপযোগিতা সম্পর্কে ‘স্বদেশ’ (ইংল্যান্ড) থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত, শান্তি বজায় রাখা এবং দেশের কল্যাণ সাধনের লক্ষ্যে আমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। কিন্তু যেহেতু আমরা বর্তমানে সব ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত — তাই নিজেদের নিরাপত্তা ও সুনাম রক্ষার স্বার্থেই আমরা অত্যন্ত আনুষ্ঠানিক ও দৃঢ়ভাবে আমাদের ওপর অর্পিত সকল দায়ভার থেকে নিজেদের মুক্ত ঘোষণা করছি। (Forrest: Selections, ইত্যাদি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৬২-৬৩। হেস্টিংসের মন্তব্যের জন্য দেখুন: ঐ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৯৪।)
যে সময়ে এই কার্যবিবরণীটি (minute) রচিত হয়েছিল, সে পর্যন্ত বিচারকরা এমন কিছুই করেননি যা দেশের সুশাসনের দায়িত্ব থেকে কাউন্সিলের তিনজন সদস্যের আনুষ্ঠানিকভাবে দায়মুক্ত হওয়ার ঘোষণাকে যৌক্তিকতা দিতে পারে। এর চেয়েও অনেক বেশি গুরুতর প্রকৃতির ছিল ১৭৭৭-এ নভেম্বর মাসে ‘কোর্ট অফ ডিরেক্টরস’-এর রাজ-মন্ত্রীদের (Ministers of the Crown) কাছে পেশ করা একটি আবেদন — এমন একটি নথিপত্র যার দীর্ঘ ও নির্ভুল বিবরণ মিল (Mill) তাঁর রচনায় প্রদান করেছেন।
তবে, ১৭৭৭-এর জুন মাসে কাউন্সিল এমন এক পরিস্থিতির সম্মুখীন হলো যেখানে তারা বিচারকদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য হলো; আর সেই সিদ্ধান্ত ছিল এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মীমাংসা — কে হবেন গভর্নর-জেনারেল? হেস্টিংস, নাকি ক্ল্যাভারিং? ১৯শে জুন বাংলায় এই সংবাদ এসে পৌঁছাল যে, ডিরেক্টররা গভর্নর-জেনারেলের পদ থেকে হেস্টিংসের পদত্যাগপত্রটি গ্রহণ করেছেন — যে পদত্যাগপত্র হেস্টিংসের প্রতিনিধি হিসেবে ম্যাকলিন (Macleane) তাঁদের কাছে পেশ করেছিলেন — এবং সেই শূন্যপদ পূরণের জন্য নতুন কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। ২০শে জুন হেস্টিংস — যিনি তাঁর প্রতিনিধির এই কাজ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন — বারওয়েলের সহায়তায় একটা বিভাগে গভর্নর-জেনারেল হিসেবে নিজের আসনে সমাসীন হলেন; অন্যদিকে ক্ল্যাভারিং অন্য এক বিভাগে সেই পদের মর্যাদা ও দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। সেই সংক্ষিপ্ত সংঘাতের বিচিত্র ঘটনাবলি বহুবার আলোচনা হয়েছে; পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে আছে যে, এই বিরোধপূর্ণ বিষয়টি বিচারকদের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেওয়ার জন্য হেস্টিংস যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, ক্ল্যাভারিং ও ফ্রান্সিস অনিচ্ছাসত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তা মেনে নিয়েছিলেন। প্রধান বিচারপতির বাসভবনে দীর্ঘ এক নৈশ-অধিবেশন শেষে বিচারকরা রায় দিলেন যে, ইংল্যান্ডে ম্যাকলিনের পেশ করা পদত্যাগপত্র ছিল অকার্যকর বা অবৈধ; সুতরাং হেস্টিংসই যে নিঃসন্দেহে গভর্নর-জেনারেল, তা প্রমাণিত হলো। (দেখুন: Bengal: Past and Present, খণ্ড ১ ও খণ্ড ১২: “The Governor-General of a Day” বা ‘এক দিনের গভর্নর-জেনারেল’।) পরবর্তীতে বিচারকরা হেস্টিংস, বারওয়েলের তোলা এই যুক্তিকেও খারিজ করে দিলেন — গভর্নরের আসনে সমাসীন হওয়ার মধ্য দিয়ে ক্ল্যাভারিং পরোক্ষভাবে কাউন্সিলে নিজের আসন শূন্য করে ফেলেছেন। এতসব ঘটনার পর, এই দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে বিচারকদের সিদ্ধান্তের জন্য প্রেরণ করাটা স্বয়ং ‘সুপ্রিম কোর্ট’-এর জন্যই একটি বিজয় হিসেবে গণ্য হতে পারত; কিন্তু সেই সংঘাতের চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি তখনো ঘটেনি।
বিবেচনার জন্য অবশিষ্ট দুটো মামলায়, সুপ্রিম কাউন্সিল এবং আদালতের মধ্যকার সংঘাত চরম সীমায় উপনীত হয়েছে।
১। পাটনা মামলা। সৌভাগ্যবশত, যে জটিলতাগুলোর কারণে এই মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের সামনে উপস্থাপিত হয়েছিল, সেগুলোর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই; এই মামলার দুই পক্ষ ভোগ করা অন্যায়ের প্রশ্ন নিয়ে নয়, বরং দেশের শাসনের ওপর বিচারকদের রায়ের প্রভাব নিয়েই আমাদের মূল আলোচনা। ১৭৭৬-এর শেষের দিকে, কাবুল থেকে আসা এক সামরিক অভিযাত্রী — নাম শাহবাজ বেগ — পাটনায় মৃত্যুবরণ করেন এবং পেছনে রেখে যান বিপুল পরিমাণ ধনসম্পদ। শাহবাজ বেগের মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ পর, তাঁর এক ভ্রাতুষ্পুত্র — বাহাদুর বেগ — প্রাদেশিক কাউন্সিলকে অবহিত করেন যে, মৃত ব্যক্তির বিধবা স্ত্রী সম্পত্তির কিছু অংশ আত্মসাৎ করেছেন। তিনি এই মর্মে আবেদন জানান যে, কাউন্সিলের মুসলিম আইন কর্মকর্তা — কাজি ও মুফতিদের — যেন নির্দেশ দেওয়া হয় আবেদনকারীর অধিকার যাচাই করার জন্য, “এবং ‘হুজুরে’ (অর্থাৎ কাউন্সিলের নিকট) তথ্য পেশ করার জন্য, যাতে আপনার এই আবেদনকারী তাঁর প্রাপ্য অধিকার লাভ করতে পারেন।” পাটনার প্রধান ইওয়ান ল যেমনটি ধারণা করেছিলেন, বাহাদুর বেগের প্রাথমিক উদ্দেশ্য সম্ভবত এটাই ছিল যে, তিনি যেন “বিধবা স্ত্রীর তত্ত্বাবধান এবং সম্পত্তির দখল” লাভ করতে পারেন; “আর যেখানেই বিধবা স্ত্রীর কোনো উল্লেখযোগ্য উত্তরাধিকারের ওপর দাবি থাকে, সেখানেই সচরাচর এমনটি ঘটে থাকে।” কাউন্সিল কাজি ও মুফতিদের প্রতি একটি পরোয়ানা জারি করে নির্দেশ দেয় যে, তারা যেন সম্পত্তির একটি তালিকা প্রস্তুত করেন, সম্পত্তির বণ্টন সংক্রান্ত চূড়ান্ত আদেশ না আসা পর্যন্ত সেগুলোর নিরাপত্তা বিধান করেন, এবং যাচাইকৃত তথ্য ও আইনি ন্যায়বিচারের বিষয়টি কাউন্সিলের নিকট প্রতিবেদন আকারে পেশ করেন।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ