গ্রীষ্মের দাবদাহে প্রাণ ওষ্ঠাগত। এই মরসুমে আট থেকে আশি, সকলেরই মন টানে ঠান্ডা ঠান্ডা আইসক্রিমে।ডায়েটের দফারফা করে দিচ্ছে আইসক্রিম। যতই লোভ সামলানোর চেষ্টা করুন না কেন, চোখের সামনে আইসক্রিম দেখলেই খাওয়ার অদম্য বাসনা জেগে ওঠে।
ছোটবেলায় সত্যজিৎ রায়ের এক আত্মীয় তাঁকে জীবনে প্রথম আইসক্রিম খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছিলেন। আইসক্রিম মুখে দিয়েই ছোট্ট সত্যজিৎ বলেছিলেন, “এটা একটু গরম করে দিলে ভালো হতো!”
এই হাল ছিলো আমার ছেলেরও।ছোটবেলায় সর্দি কাশি হত কিন্তু আইসক্রিম খাওয়ার লোভও ছাড়তে পারত না। প্রায় সময় বলতো, ‘মা আইসক্রিমটা একটু গরম করে আমাকে দাও না।’
ছোটবেলার আইসক্রিম খাওয়া মানেই ছিল এরাশ নস্টালজিয়া। স্কুল ছুটির পর গেটের সামনে সেই সাইকেলের ঘণ্টায় শিশুদের ভিড়, আইসক্রিমের কাঠের কাঠি চোষার আনন্দ, বা ১-২ টাকার বিনিময়ে রঙিন বরফের ললি — এই স্মৃতিগুলো আজও মনের কোণে অমলিন।

আমার ছোটবেলার আইসক্রিম বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে — বরফ আইসক্রিম (আইস ললি), কমলা বা লাল রঙের সেই বরফের টুকরো, যা রোদের দিনে পরম শান্তিতে চোষা হতো, নারকেল আইসক্রিম–আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিল, মালাই কুলফি — পাতার ঠোঙায় বা ছোট মাটির পাত্রে (কুলফি) মালাই আইসক্রিম, যার স্বাদ মুখে দিলেই মিলিয়ে যেত। হাতে টানা আইসক্রিম গাড়ির ঘণ্টা বাজানোর সেই পরিচিত শব্দটা আজও কানে বাজে। স্কুল টিফিন বা ছুটির সময় বাইরে ঠেলাগাড়ি করে আইসক্রিমকাকু গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতো। সেই আমলে হয়তো কুড়ি বা ত্রিশ পয়সা দাম ছিলো আইসক্রিমের। দাম বেশি থাকতো ছোট কাগজের কাপে কাঠের চামচ দিয়ে ভ্যানিলা বা চকোলেট আইসক্রিম।
আইসক্রিম চুষে জিভ লাল বা সবুজ করার কম্পিটিশন লাগতো বন্ধুদের মধ্যে। সমস্যা ছিলো ঘর থেকে পয়সা পাওয়া যেত মাঝে মধ্যে। তাই অধিকাংশ দিনই ভাগাভাগি করে একটা আইসক্রিম খাওয়া হতো।
ছোটবেলার সেই স্বাদ হয়তো এখনকার প্রিমিয়াম আইসক্রিমে পাওয়া যায় না, তবে সেই স্মৃতিগুলো আমাদের শৈশবের সবচেয়ে মিষ্টি মুহূর্তের অংশ।

আইসক্রিম প্রথম কে খুঁজে বের করেছে আবিষ্কার করেছে সে নিয়ে অনেক সংশয় আছে। শুরুতে বরফের সাথে লবণ মিশিয়ে খাবার হিমায়িত করা হতো।কারণ বরফের সাথে লবণ মেশালে এর হিমাঙ্ক -১৪° সেলসিয়াসের চেয়েও কমে যায়। তাপমাত্রা অর্জন করা বেশ সহজ। ঠিক কে এই প্রক্রিয়াটি আবিষ্কার করেছিলেন তা অজানা।
এই কৌশলটি মূলত প্রাচ্যের দেশগুলোতে, বিশেষ করে প্রাচীন চীনে পানীয় এবং মিষ্টি হিমায়িত করতে প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। খ্রিস্টপূর্ব ২০০ অব্দের দিকে চীনে দুধ ও চালের মিশ্রণ বরফে জমিয়ে একধরনের আইসক্রিম তৈরি করা হতো। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ইতালীয় পর্যটক মার্কো পোলো চীন থেকে ইতালিতে দুধ দিয়ে তৈরি বরফের শরবতের রেসিপি নিয়ে আসেন, যা পরবর্তীতে ‘শরবত’ বা ‘সোরবেট’ (Sorbet) নামে পরিচিত হয়।
তবে শোনা যায় খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে রোমরাজ নিরো একবার বাবুর্চির কাছে নতুন মুখরোচক কিছু খেতে চাইলেন। বাবুর্চিটি ছিলেন খুব বুদ্ধিমান। সে রাজাকে খুশি করতে আলপাইন পাহাড়ের জমাট বরফের সাথে ফলের রস, মধু এবং বাদাম মিশিয়ে যে সুস্বাদু ডেজার্ট তৈরি করেছিলেন, তা রাজদরবারে রীতিমতো আলোড়ন তুললো। রাজা এক চামচ মুখে দিয়েই পরম তৃপ্তিতে চোখ বুঝলেন, এমন আনন্দ তিনি আর কখনো আগে পাননি। ব্যাস বাবুর্চির ভাগ্য কেল্লাফতে। ঐতিহাসিক এবং রন্ধন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটিই ছিল বিশ্বের প্রথম আইসক্রিম তৈরির গল্প।

বরফ তখন এতটাই দুর্লভ এবং দামি ছিল যে, এটি কেবল রাজপরিবারের বিলাসবহুল খাবার হিসেবেই গণ্য হতো। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর এই রাজকীয় খাবারটিই কালক্রমে বিবর্তিত হয়ে আজকের আধুনিক আইসক্রিমে রূপ নিয়েছে।
পরবর্তীতে চতুর্দশ শতাব্দীতে ভারতীয় ও আরবীয় পাণ্ডুলিপিতেও এর উল্লেখ পাওয়া যায়। আরবীয় চিকিৎসা ইতিহাসবিদ ‘ইবনে আবু উসাইবি’ (Ibn Abi Usaybi’ah) বিভিন্ন লবণাক্ত মিশ্রণ ব্যবহার করে বরফ তৈরির পদ্ধতি ও প্রযুক্তিগত বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছিলেন।
খাদ্যরসিক মুঘলদের হাত ধরেই ভারতে হিমায়িত মিষ্টান্ন বা আইসক্রিমের যাত্রা শুরু। ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থ অনুযায়ী, আকবর নাকি হিমালয় থেকে বরফ আনিয়ে, তা দিয়ে পানীয় এবং খাবার ঠান্ডা রাখতেন। তাঁর বাবুর্চিরা ঘন দুধ, জাফরান, পেস্তা ও বাদাম মিশিয়ে সেটি ধাতব নলে ভরে হিমায়িত করার প্রক্রিয়া শুরু করে। যেটিকে আজকে আমরা কুলফি বলে চিনি।

১৯ শতকের শুরুর দিকে আমেরিকাসহ অন্যান্য দেশ থেকে জাহাজে করে ভারতে বরফ আমদানি শুরু হয়। এর ফলে বরফের সহজলভ্যতা বাড়ে এবং আইসক্রিম কুলফির চেয়ে আরও বিস্তৃত আকার পায়।সেই আমলে মেমসাহেব কিংবা বড় বড় গভর্নরদের পার্টিতে আইসক্রিম ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। আমেরিকা (বোস্টন) থেকে বড় বড় জাহাজে করে বরফ আনা হতো। এই বরফ গলতে না দেওয়ার জন্য ব্রিটিশরা কলকাতা, বোম্বে (মুম্বাই) এবং মাদ্রাজে আলাদা ‘আইস হাউস’ বা হিমঘর তৈরি করেছিল।
সময়ের সাথে সাথে প্রযুক্তি ও বিদ্যুতের প্রসারের ফলে বরফ উৎপাদন সহজতর হয়। ধীরে ধীরে এই ঠান্ডা খাবারটি কেবল অভিজাতদের গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষের নাগালে চলে আসে।
১৯০৭ সালে গুজরাতের আমদাবাদে ভাদিলাল গান্ধী সোডার দোকানের পাশাপাশি হাতে বানানো আইসক্রিম বিক্রি শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর ছেলে জার্মানি থেকে আধুনিক মেশিন এনে আইসক্রিম উৎপাদন শিল্পকে বিশাল আকার দেন।
১৬শ থেকে ১৭শ শতাব্দীর দিকে ইউরোপে ফলের রসের বদলে দুধ ও ক্রিম দিয়ে আইসক্রিম তৈরির আধুনিক কৌশলটি জনপ্রিয় হতে শুরু করে।
১৭৭৬ সালে নিউইয়র্কে আইসক্রিমের প্রথম আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। এরপর ১৮৫১ সালে জ্যাকব ফুসেল মেরিল্যান্ডে আইসক্রিমের প্রথম বাণিজ্যিক কারখানা খোলেন, যার ফলে এটি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেও চলে আসে।যদিও নির্দিষ্ট কোনো একজনের হাত ধরে আইসক্রিমের আবিষ্কার হয়নি, তবে হাজার হাজার বছরের ইতিহাস আর বিভিন্ন সভ্যতার হাত ধরেই আজকের এই প্রিয় ননীমিশ্রিত মিষ্টি ডেজার্টটি বর্তমান রূপ পেয়েছে।

এত আইসক্রিমের গল্প বলছি তার সঙ্গে ঘরে বানানো আইসক্রিমের একটা রেসিপি না দিলে ‘বহুত নাইনসাফি’ হবে। ঘরে খুব সহজেই বানাতে পারবেন পাইন্যাপেল আইসক্রিম, অরেঞ্জ, চকলেট, রোজ এন্ড টেন্ডার কোকোনাট আইসক্রিম, এগলেস ম্যাংগো মিন্ট আইসক্রিম….। কিছু ইনগ্রেডিয়েন্ট পাল্টে নিলেই ভিন্ন স্বাদের আইসক্রিম বানাতে পারবেন। বেসিক কনসেপ্টটা লিখলাম।
ঘরে বানানো আইসক্রিম মূলত দুধ, ক্রিম ও চিনির মিশ্রণে তৈরি হয়। ব্লেন্ডার বা ইলেকট্রিক বিটার ব্যবহার করে খুব সহজেই দোকানের মতো ক্রিমি আইসক্রিম তৈরি করা যায়। সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সহজলভ্য ভ্যানিলা আইসক্রিম তৈরির প্রণালী নিচে দেওয়া হলো : —
প্রয়োজনীয় উপকরণ :
তরল দুধ: ২ কাপ
হুইপড ক্রিম (বা হেভি ক্রিম): ১ কাপ
কনডেন্সড মিল্ক: ১/২ কাপ
চিনি: ১/৪ কাপ
ভ্যানিলা এসেন্স: ১ চা চামচ
কর্নফ্লাওয়ার: ১ টেবিল চামচ (দুধ ঘন করার জন্য)

তৈরির ধাপ :
প্রথমে সামান্য ঠান্ডা দুধে কর্নফ্লাওয়ার গুলে নিন। এবার বাকি দুধ ও চিনি দিয়ে গ্যাসে মাঝারি আঁচে জ্বাল দিন। দুধ ফুটে উঠলে কর্নফ্লাওয়ারের মিশ্রণটি ঢেলে দিন এবং ঘন হওয়া পর্যন্ত নাড়তে থাকুন। এরপর গ্যাস থেকে নামিয়ে সম্পূর্ণ ঠান্ডা করুন। অন্য একটি পাত্রে হুইপড ক্রিম, ভ্যানিলা এসেন্স এবং কনডেন্সড মিল্ক একসাথে বিট বা ব্লেন্ড করে নিন যতক্ষণ না মিশ্রণটি ঘন ও ফোমি হয়।ঠান্ডা করা দুধের মিশ্রণটি এবার হুইপড ক্রিমের সাথে আলতো করে মিশিয়ে নিন। পুরো মিশ্রণটি একটি এয়ার-টাইট বা প্লাস্টিকের পাত্রে ঢেকে ডিপ ফ্রিজে ৫-৬ ঘণ্টার জন্য রেখে দিন।
বরফ জমতে শুরু করার আগে (২-৩ ঘণ্টা পর) বের করে একবার ব্লেন্ড করে নিলে আইসক্রিম অনেক বেশি ক্রিমি ও মসৃণ হয়। ফ্রিজ থেকে বের করে আইসক্রিম স্কুপার দিয়ে কেটে উপরে শুকনো গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে ঠান্ডা ঠান্ডা পরিবেশন করুন।
পরিমিত আইসক্রিম খেলে মন ভালো থাকে ও শরীরে তাৎক্ষণিক এনার্জি আসে। তবে অতিরিক্ত চিনি ও ফ্যাট থাকায় তা ওজন বা মেদ বাড়াতে পারে। সুস্থ থাকতে দিনে অল্প পরিমাণে খান এবং খাওয়ার পরপরই সরাসরি ঠান্ডা জল খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। আইসক্রিম কেবল একটি মিষ্টি ডেজার্টই নয়, বরং মানুষের আবেগ, আনন্দ, স্মৃতি, শৈশব এবং রূপকথার প্রতীক।
খুব সুন্দর লেখনী।ধন্যবাদ আপনাকে আইসক্রিম সন্মধে কিছু তথ্য দেবার জন্য
চমৎকার !