চলে গেলেন স্বদেশরঞ্জন মণ্ডল। সামান্য ব্যাধিটা অসামান্য হয়ে উঠল। অনেকটাই বোধ হয় নিজের দোষে। একগুঁয়ে মানুষ। কান দিতেন না প্রিয়জনের কথায়। মনের ভেতরে ছিল প্রবল অভিমান। পরিণত বয়েসে বিশ্বাসভঙ্গের বেদনা নীরবে দগ্ধ করেছে তাঁকে। সে বেদনা নিজেই ভোগ করেছেন। হয়তো তাঁর অকাল মৃত্যুর জন্য সেই বেদনাই দায়ী। কাঁথির ভূমিপুত্র তিনি। থাকতেন কাঁথির ধানদিঘি প্রফেসর কলোনিতে। মাঝে মধ্যে বাড়ির লোকজনকে না জানিয়ে চলে যেতেন জানা-অজানা নানা স্থানে। ইতিহাসের উপাদান সংগ্রহের টানে।
১৯৪৫ সালে জন্ম তাঁর পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথির ৩নং ব্লকে। সরোজিনীদেবী তাঁর মা, আর বাবা হলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী সুন্দরনারায়ণ মণ্ডল। বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয় স্তরের পড়াশুনো করেছেন কাঁথিতে। ১৯৬৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এম এ পাশ করেন। ১৯৬৯ সালে স্নাতকোত্তর হন প্রাচীন ভারতের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে। বেলদা কলেজে তাঁর শিক্ষকতা শুরু। বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিসট্যান্ট এডুকেশন বিভাগে সহকারি ডাইরেক্টর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘The Cracked Portrait of a Pariot — Deshapran Birendranath Sasmal’ বিষয়ে গবেষণা করে লাভ করেছেন পিএইচডি ডিগ্রি। জড়িত ছিলেন ইন্সটিটিউট অব হিস্টোরিক্যাল স্টাডিজ, করপাস রিসার্চ ইন্সটিটিউট, ইণ্ডিয়ান হিস্ট্রি কংগ্রেস, পশ্চিমবঙ্গ ইতিহাস সংসদের সঙ্গে। কাঁথি দেশপ্রাণ ইতিহাস পরিষদ খুব যত্নের সঙ্গে গড়ে তুলেছিলেন তিনি। কাঁথির বিভিন্ন বিদগ্ধ ব্যক্তির বাড়িতে বছরে একবার বসত এই পরিষদের আসর।
অধ্যাপনা, সংঘ-সংগঠনের কাজ, পরিবারের দায়িত্ব পালনের পরেও স্বদেশরঞ্জন অভিনিবিষ্ট ছিলেন ইতিহাসের উপাদান সংগ্রহে। বলা যেতে পারে, তাঁর মূল আগ্রহ ছিল আঞ্চলিক ইতিহাসে। আরও স্পষ্ট করে বললে বলতে হয় মেদিনীপুর, বিশেষ করে কাঁথির ইতিহাসের অনুসন্ধানে অতন্দ্র ছিলেন তিনি। নিজের মতো করে ক্ষেত্র সমীক্ষা করেছেন, বহু অখ্যাত মানুষের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা করেছেন, সামান্য সূত্র পেলে ছুটে গেছেন সেখানে।

তাঁর চিন্তা ও চেতনার কেন্দ্র ছিলেন এই জেলার দুই সুপুত্র, যাঁরা মূল ধারার ইতিহাসে স্থান পান নি তেমন করে। আর সেইজন্য লব্ধ প্রতিষ্ঠ ঐতিহাসিকদের সঙ্গে বচসা করতেও তাঁর বাধে নি। অনেক সময়ে কাঁথি অঞ্চলের একটি পরিভাষা ব্যবহার করে তিনি এরকম লব্ধপ্রতিষ্ঠ ঐতিহাসিককে ‘আফুয়া’ বলতেও দ্বিধা করেন নি।
মেদিনীপুরে যে দুই সুপুত্রের কথা বলেছি, তাঁদের একজন হলেন দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমল। বহু পরিশ্রম করে স্বদেশবাবু বীরেন্দ্রনাথের রচনাবলি সংকলন করেছেন, যার মধ্যে আছে বীরেন্দ্রনাথের স্রোতের তৃণ, গল্প ও প্রবন্ধ, কবিতা, ভাষণ ও অভিভাষণ, বংশলতিকা ও জীবনপঞ্জি, চিঠিপত্র। রাজনীতিতে ছোটখাটো সমঝোতায় অপারগ বীরেন্দ্রনাথ স্রোতের বিপরীতে হেঁটেছিলেন বলেই মূল ধারার ইতিহাসে তেমন স্থান পান নি। তাঁর ইউনিয়ন বোর্ড বিরোধী আন্দোলনও মর্যাদা পায় নি। কলকাতা কর্পোরেশনের প্রধান কর্মসচিবের পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও অবহেলিত হয়েছেন তিনি। তাঁর স্বরাজ সংক্রান্ত ধারনারও যথাযথ মূল্যায়ন হয় নি। আক্ষেপ করে স্বদেশরঞ্জন লিখেছেন : —
‘ক্ষমতার রাজনীতি করতে গিয়ে কলকাতা শহরের উচ্চবর্ণের শিক্ষিত নেতৃবর্গ সেদিন যে আচরণ করেছিলেন সেটা তবু বোঝা যায়, কিন্তু ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল ধারার ঐতিহাসিকগণ কেন যে শাসমলের পরিচালিত ইউনিয়ন বোর্ড বিরোধী আন্দোলনকে উল্লেখ করতে এবং যথাযথ মর্যাদা দিতে ভুলে গেলেন, তা আমার মতো ক্ষুদ্র মানুষের সাধারণ বুদ্ধির অগম্য।’

বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের মতো স্বদেশরঞ্জন ছিলেন হেমচন্দ্র কানুনগোর অনুরাগী। এই হেমচন্দ্রও স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল ধারার ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য স্থান লাভ করতে পারেন নি। স্বদেশবাবু হেমচন্দ্র কানুনগোর রচনাবলি সংকলন করেছেন, যেখানে আছে হেমচন্দ্রের অবিস্মরণীয় স্মৃতিকথা : ‘আমার বিপ্লব প্রচেষ্টা’। সেকালের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সঙ্গে হেমচন্দ্রের চিন্তা-চেতনার পার্থক্য ধরা পড়ে এই বইটিতে। হেমচন্দ্রের আর একটি অসামান্য বই গ্রন্থিত হয়েছে রচনাবলিতে, তার নাম : ‘অনাগত সুদিনের তরে’। হেমচন্দ্র যে বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার মানুষ, তিনি যে ধর্মীয় কুসংস্কারমুক্ত, অরবিন্দ ঘোষ প্রমুখের ‘ভক্তিতত্ত্বকুজ্ঝটিকা’ তাঁকে যে আকৃষ্ট করতে পারে নি, সেটা স্বদেশরঞ্জন প্রমাণ করেছেন। প্রমাণ করেছেন যে ‘হাসি হাসি পরব ফাঁসি’ গানটি হেমচন্দ্রেরই রচনা, অভিরামই হলেন হেমচন্দ্র। রচনাবলিতে হেমচন্দ্রের পত্রাবলি, কবিতা ও গান, প্রতিকৃতি ও আলোকচিত্র সংকলিত হয়েছে, যা বিপ্লবী হেমচন্দ্রের জীবনবোধের আর একদিক।
স্বদেশরঞ্জন মণ্ডলের মতো নিষ্ঠাবান ঐতিহাসিকের প্রধান ত্রুটি হল একগুঁয়ে মানোভাব এবং ‘প্রতিভার গৃহিণীপণা’র অভাব। ঠিক এই কারণে তাঁর গবেষণার যথাযথ বিচার হয় নি। এখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তাঁর বহু মূল্যবান রচনা, আর বোধ হয় সেগুলি প্রকাশের আলো দেখবে না।