পরিশিষ্ট
১৮ই অক্টোবর, ১৭৭৪ তারিখে গভর্নর ও কাউন্সিলের পক্ষ থেকে ‘কোর্ট অফ ডিরেক্টরস’-এর উদ্দেশ্যে পাঠানো সাধারণ চিঠির নিচের অনুচ্ছেদগুলো বাংলায় দাসপ্রথার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়য়ে আরও কিছুটা আলোকপাত করবে: —
“২১. কলকাতা শহরের পুলিশি ব্যবস্থার জন্য এযাবৎ যে কাঠামো বা প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলা হয়েছিল, একটি অত্যন্ত জনবহুল নগরীর স্বাভাবিক বিশৃঙ্খলাগুলো দমনে সেগুলো অপর্যাপ্ত বলে প্রতীয়মান হয়েছে। অধিকন্তু, ‘ফৌজদারি আদালত’-এর কার্যসম্পাদন প্রক্রিয়াটি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে — মূলত ইউরোপীয় বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে তাদের ভৃত্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে আদালতে ক্রমাগত যে আপিলগুলো করা হয়, সেগুলোর কারণে; এর ফলে অত্যন্ত জঘন্য প্রকৃতির অপরাধগুলোও প্রায়শই মাসের পর মাস ধরে বিচারহীন অবস্থায় পড়ে থাকে এবং কারাগারগুলো বন্দিতে ঠাসা হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায়, গত মে মাসে আমরা এই বিষয়টি আমাদের বিবেচনার আওতায় আনি এবং এমন কিছু বিধিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি, যার উদ্দেশ্য হলো — ভৃত্যদের লঘু অপরাধের ক্ষেত্রে প্রভুদের অভিযোগগুলো নিষ্পত্তির ব্যাপারে ফৌজদারি আদালতের ওপর থেকে কাজের চাপ কমানো এবং পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্টের ওপর এ সংক্রান্ত বিষয়ে কিছুটা প্রশাসনিক ক্ষমতা অর্পণের মাধ্যমে এই বসতি এলাকার পুলিশি ব্যবস্থায় আরও উন্নত শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। এই বিধিমালাগুলো যাতে সর্বসাধারণের গোচরে আসে এবং সমাজে এগুলো কার্যকর করার জন্য প্রতিটি ব্যক্তির কাছ থেকে যে ধরনের সমর্থন প্রয়োজন, তা যেন লাভ করতে পারে — সেই লক্ষ্যে আমরা পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্টের মাধ্যমে এই বিধিমালাগুলো এখানকার বাসিন্দাদের বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করি। বাসিন্দারা তাদের নিজেদের মধ্য থেকেই বারো সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করেন এবং এই বিধিমালাগুলোকে কার্যকর ও ফলপ্রসূ করার লক্ষ্যে গৃহীত প্রতিটি পদক্ষেপে তারা পূর্ণ সম্মতি জ্ঞাপন করেন। আমরা দৃঢ়ভাবে আশা করি যে, সময়ের পরিক্রমায় এই বিধিমালাগুলোর যথাযথ প্রয়োগই এদের উপযোগিতা ও সুফল প্রমাণ করে দেবে।
“২২. এই বিধিমালাগুলোর মধ্য থেকে আমরা আপনাদের বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণের জন্য নবম ও দশম বিধিটি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই; এই বিধিগুলোর মাধ্যমেই — সেখানে উল্লিখিত কারণসমূহের ভিত্তিতে — আমরা এই দেশে দাসপ্রথার অধিকারকে ভবিষ্যতে চিরতরে বিলুপ্ত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।” সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লিখিত কারণসমূহের ফলে এই বর্বর বা অমানবিক বাণিজ্যের যে ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটেছে, তা আমাদের সরকারের একটি বিচক্ষণ নীতিগত পদক্ষেপ হিসেবে এই প্রবিধানটি গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে বলে মনে হয়েছে — যার উদ্দেশ্য হলো জনশূন্যতার দিকে দ্রুত ধাবিত হওয়া রোধ করা। তাছাড়া, এই বিষয়ে সর্বাধিক বিশ্বাসযোগ্য মুসলিম ও হিন্দু অধিবাসীদের মতামত গ্রহণ করে দেখা গেছে যে, দাস বিক্রয়ের অনুমোদিত প্রথাটি কোরআন ও শাস্ত্রের (Shaister) নির্দিষ্ট বিধানের পরিপন্থী, জনগণের প্রতি নিপীড়নমূলক এবং দেশের সামগ্রিক কল্যাণের জন্য ক্ষতিকর; এমতাবস্থায়, এমন জোরালো ও সর্বসম্মত যুক্তির ভিত্তিতে এই প্রস্তাবটি (Resolution) পাস করতে আমরা বিন্দুমাত্র দ্বিধা করিনি। আমরা নির্দেশ দিয়েছি যেন এই প্রস্তাবটি সকল প্রাদেশিক বিভাগে প্রকাশ করা হয় এবং যথাযথভাবে প্রতিপালন করা হয়।
“২৩. এই নির্দেশাবলির পরিপ্রেক্ষিতে, আমরা ঢাকা কাউন্সিল থেকে একটি পত্র বা পরামর্শ (reference) গ্রহণ করি। তাতে আমাদের জানানো হয় যে, ঢাকা জেলার সর্বত্রই এমন একটি প্রতিষ্ঠিত প্রথা প্রচলিত আছে যে, কোনো ব্যক্তি একবার দাসে পরিণত হলে তার সকল সন্তান-সন্ততি ও বংশধরকেও দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রাখা হয়। তাই তারা আমাদের কাছে নির্দেশ চেয়ে জানতে চান যে, আমাদের [দশম] প্রবিধানের সুফল কি সেই প্রবিধানে উল্লিখিত সময়ের পরবর্তীকালে জন্মগ্রহণকারী দাস-সন্তানদের ক্ষেত্রেও প্রসারিত হবে কি না।
“২৪. এই পরামর্শপত্রটি বিবেচনার পর আমরা আমাদের পূর্ববর্তী প্রস্তাবের সাথে একটি ব্যাখ্যা সংযোজন করা আবশ্যক মনে করি — যা আমাদের ১২ই জুলাইয়ের কার্যবিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ব্যাখ্যাটি হলো: যেসব জেলায় দাসপ্রথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল, অথবা যা কোনো না কোনোভাবে কৃষিকাজ বা রাজস্ব ব্যবস্থার সাথে যুক্ত ছিল কিংবা সেগুলোর ওপর প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা ছিল, সেসব ক্ষেত্রে উক্ত প্রথা এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য বা পরামর্শ প্রেরণ করতে হবে। সেই তথ্য পাওয়ার পর আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযথ নির্দেশাবলি প্রদান করব। তবে, এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে তাদের পরামর্শটিকে একটি সাধারণ প্রস্তাব হিসেবে বিবেচনা করে আমরা এই মত পোষণ করি যে — দাসদের সন্তানদের ওপর মালিকদের যে অধিকার রয়েছে, তা প্রথম প্রজন্মের ক্ষেত্রে আইনগতভাবে মালিকদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া সম্ভব নয়; কিন্তু এই অধিকার দ্বিতীয় প্রজন্ম পর্যন্ত প্রসারিত হতে পারে না এবং হওয়াও উচিত নয়। সেই অনুযায়ী আমরা বিভিন্ন প্রাদেশিক বিভাগকে এই নির্দেশটি প্রচার করার নির্দেশ প্রদান করি।
“২৫. আমরা নিঃসংশয়ে বিশ্বাস করি যে, এই প্রবিধানটি প্রণয়নের পেছনে যে নীতিগত ও মানবিক উদ্দেশ্যসমূহ কাজ করেছে, তা আপনাদের অনুমোদন লাভ করবে। তবে আমরা এও প্রত্যাশা করি যে, এই বিষয়ে আপনাদের মতামত ও নির্দেশাবলি দ্বারা আমাদের ধন্য করবেন; যাতে বিভিন্ন প্রাদেশিক কাউন্সিল থেকে তাদের নিজ নিজ জেলায় দাসপ্রথার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে যে প্রতিবেদনগুলো তলব করা হয়েছে — সেগুলো হাতে পাওয়ার পর, আমরা আপনাদের নির্দেশনার আলোকে আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ বা আচরণ নির্ধারণ করতে পারি। এই প্রতিবেদনগুলোর মধ্যে কয়েকটি ইতিমধ্যে আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে; এবং বাকিগুলোর জন্য আমরা এখনো অপেক্ষা করছি।”
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ