৪. দত্ত বনাম হোসিয়া মামলা। জনাব হোসিয়া (হোসিয়া ছিলেন ঐতিহাসিক ওর্ম-এর ভাগ্নে; সমুদ্রে ‘গ্রসভেনর’ জাহাজ ধ্বংস হওয়ায় তিনি আর তার পরিবারের একযোগে প্রাণ হারান — দ্রষ্টব্য: ফে-র ‘অরিজিনাল লেটারস’ মেসার্স থ্যাকার স্পিঙ্ক-এর পুনর্মুদ্রণ) ছিলেন মুর্শিদাবাদ প্রাদেশিক রাজস্ব পরিষদের প্রধান এবং সেই শহরের দেওয়ানি আদালতের প্রধান বিচারক। এই মামলার বিস্তারিত বিবরণ বর্তমান আলোচনার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয়। মুর্শিদাবাদ দেওয়ানি আদালত অত্যন্ত অনিয়ম করে কাজকর্ম করছে — এমত বিশ্বাসে অ্যাডভোকেট-জেনারেল স্যার জন ডে, গভর্নর-জেনারেল এবং তাঁর পরিষদকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন যেন মামলা আপোষের মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলা হয় এবং এভাবে একে আদালতের রায়ের জন্য বিচার প্রক্রিয়ায় যাওয়া থেকে বিরত রাখা হয়। পরিষদ অবশ্য এই প্রস্তাব শুনতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল; কারণ — তাদের মতে — “এটিই ছিল প্রথম নজির যেখানে কোনো দেওয়ানি আদালতের সদস্যকে, তাঁর বিচার করার ক্ষমতাসূত্রে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করা হয়”; এবং তাই — “আইনি রায়ের মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে মামলা তার স্বাভাবিক গতিপথেই চলতে দেওয়া উচিত এটা বোঝার জন্য যে দেওয়ানি আদালতগুলো তাদের নিজস্ব গঠনতন্ত্রের মূলনীতির আলোকে বিচার ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে উপযুক্ত বা সক্ষম কি না।” প্রধান বিচারপতি বিবাদীর (হোসিয়ার) পক্ষে রায় দেন। এই রায়ের মূলনীতি ছিল — “প্রাদেশিক পরিষদগুলোর সামনে দায়েরকৃত মামলার ক্ষেত্রে — প্রকাশ্য দুর্নীতির ঘটনা ছাড়া — আদালত তাদের কার্যপ্রণালীর অনিয়ম নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ বা হস্তক্ষেপ করবে না।”
আরও দুটো বহুল পরিচিত মামলা রয়েছে — ‘পাটনা মামলা’ এবং ‘কসিজোড়া মামলা’ — যা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন; তবে সেগুলোর পর্যালোচনায় অগ্রসর হওয়ার আগে, পূর্বে উল্লিখিত রায়গুলো সম্পর্কে স্যার জে. এফ. স্টিফেন কী মন্তব্য করেছেন, সেটা পর্যবেক্ষণ করে নেওয়া দরকার হবে। তিনি লিখেছেন –
“আমি এখানে ক্ষণিকের জন্য বিরতি নিচ্ছি, যাতে ১৭৭৯ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের দেওয়া রায়গুলোর প্রভাব — যতটুকু টাচেট কমিটির প্রতিবেদন (ইন্ডিয়া অফিসের রেকর্ড বিভাগ, সংসদীয় শাখার সংকলন নং ৯) — থেকে প্রতীয়মান হয় — সংক্ষেপে তুলে ধরতে পারি। এই রায়গুলো মূলত কোম্পানির সেইসব কর্মচারীদের অবস্থান ও কর্তৃত্বের ওপর প্রভাব ফেলেছিল, যারা বিচার বিভাগীয় পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন — বিশেষ করে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে; এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ছিলেন প্রাদেশিক পরিষদগুলোর সদস্য। রায়গুলোর সারমর্ম ছিল এই: কোম্পানির প্রতিষ্ঠিত আদালতগুলো ‘বিচারালয়’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল; এই আদালতগুলোর বিচারকরা তাঁদের বিচার দেওয়ার কার্যক্রমের জন্য — এমনকি সেই কার্যক্রমগুলো যদি অনিয়মিতও হয়ে থাকে — কোনো আইনি মোকদ্দমার সম্মুখীন হতেন না, অবশ্য যদি না তাঁরা দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হতেন। আরও একটা সিদ্ধান্ত ছিল, রাজস্ব সংক্রান্ত ঋণের দায়ে ঋণগ্রহীতাদের জামিনে আটক রাখার অধিকার তাঁদের ছিল; দিওয়ানি আদালতে হাজির হওয়ার জন্য জামিন না হওয়া পর্যন্ত, তাঁরা ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে পেয়াদা মোতায়েন করে কিংবা কারাগারে নিক্ষেপ করে আটক রাখতে পারতেন। তবে তাঁদের এই অধিকার ছিল না যে, শেষ পর্যন্ত পাওনা হিসেবে যা নির্ধারিত হতে পারে, তা আদায়ের নিশ্চয়তা বিধানের উদ্দেশ্যে জামিন ছাড়াই কাউকে কারাগারে নিক্ষেপ করবেন। অন্য কথায়, সুপ্রিম কোর্ট রাজস্ব আদালতগুলোকে ‘মেসন প্রসেস’ (mesne process)-এর অধীনে জামিন ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে কারাগারে আটক রাখার অনুমতি দেয়নি। আমি যতটুকু অনুসন্ধান করে জানতে পেরেছি, কোম্পানির অস্তিত্বের প্রথম চার বছরে মূলত এইটুকুই করা হয়েছিল — যদিও এর ফলে প্রচুর ঈর্ষা, গভীর শঙ্কা এবং তীব্র বিদ্বেষের সৃষ্টি হয়েছিল।” (স্টিফেন: Op. cit., খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১৬১-৬২।)
এভাবে উপস্থাপন করলে, সুপ্রিম কোর্টের দাবিগুলো — যা রেগুলেটিং অ্যাক্টের প্রণেতাদের এমন একটি অভিপ্রায়কে স্বীকার করে নেয় যে, সরকারে চলতে থাকা অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা আদালতের দায়িত্ব — এটা মোটেই অযৌক্তিক বা অতিরঞ্জিত বলে মনে হয় না। তবে এ কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন, আদালতের প্রকৃত রায় সম্পর্কে যা-ই বলা হোক না কেন, বিচারকরা — কিংবা অন্তত তাঁদের অনেকেই — এমন কিছু ভাষা ব্যবহার করেছিলেন, যা কার্যত সরকারের সাংগঠনিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করার শামিল ছিল। লেমেস্ট্রে-র স্পষ্ট অভিমত ছিল যে, কোনো প্রাদেশিক রাজস্ব পরিষদের আদেশ ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তি দেখানোর চেয়ে বরং “কেউ যদি দাবি করে যে সে ‘পরীদের রাজার’ (King of the Fairies) কাছ থেকে আদেশ পেয়েছে, তবে সেটাও সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে।” প্রধান বিচারপতি স্বয়ং নবাবকে “আইনি অধিকার বা কোনো প্রকার ক্ষমতা প্রয়োগের সামর্থ্যহীন নিছক একটি নামসর্বস্ব সত্তা” হিসেবে গণ্য করেছিলেন বলে শোনা যায়। হাইড-এর একটা মন্তব্য বিশেষভাবে উল্লেখ্য: “পার্লামেন্টের আইন মোবারক-উদ-দৌলাকে সার্বভৌম শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না।” আর লেমেস্ট্রে বলেছিলেন: “এই মায়াময় ছায়া বা ‘খড়ের পুতুল’-এর মত ব্যক্তি — মোবারক-উদ-দৌলা — সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হয়, তাঁর সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলাটাই আদালতের প্রতি একটি চরম অবমাননা।” স্যার জে. এফ. স্টিফেন তাঁর আলোচনায় উল্লেখ করেছেন, ঢাকার প্রাদেশিক পরিষদকে বৈধ ‘কর্পোরেট সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে লেমেস্ট্রে-র অস্বীকৃতি যথার্থই ছিল; কারণ তৎকালীন ভারতে “গভর্নর-জেনারেল আর তাঁর পরিষদ এবং সুপ্রিম কোর্ট ছাড়া অন্য কারোই কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি অধিকার বা অবস্থান ছিল না।” তিনি আরও বলেন, “সরকারের কোনো আইন প্রণয়ন ক্ষমতা ছিল — কিংবা সেই ক্ষমতার কোনো কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা ছিল — এমন দাবি করা ছিল অসম্ভব।” (স্টিফেন: Op. cit., খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১৫৫)। যদি এই যুক্তি মেনে নেওয়া হয়, তবে এর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হতে হয় যে, প্রাদেশিক পরিষদগুলোর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত রাজস্ব আদালতগুলো আইনসম্মতভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনো বিচারালয় ছিল না; এবং স্যার জেমস নিজেও এই সত্য বাধ্য হয়ে স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন — “সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের মনে যদি সত্যিই কোনো হীন দলীয় স্বার্থ বা বিদ্বেষমূলক মনোভাব থাকত, তবে তাঁদের পক্ষে খুব সহজেই এই মতবাদটিকে বৈধতা দেওয়া এবং সেই অনুযায়ী কাজ করা সম্ভব হতো যে — বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা অঞ্চলে তাঁদের আদালত ছাড়া অন্য কোনো বিচারালয়ের অস্তিত্বই নেই।” “…যে ইংল্যান্ডের আইন সমগ্র দেশে প্রবর্তিত হয়েছিল — কেবল কলকাতার একটি নির্দিষ্ট অংশে নয়।” স্যার জেমস স্বীকার করেছেন, এমন একটা সিদ্ধান্ত বাস্তবে এক চরম ও অসহনীয় অসারতা হিসেবে গণ্য হতো; অথচ নিঃসন্দেহে বলা যায়, দিওয়ানি আদালতগুলোর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যদি বিচারকদের জন্য এতটাই চরম ও অসহনীয় অসার কাজ হয়ে থাকে, তবে এই মতবাদ প্রচার করাও ঠিক ততটাই চরম ও অসহনীয় অসার কাজ ছিল যে — রাজস্ব পরিষদগুলো ছিল নিছকই কাল্পনিক সংস্থা, এবং আইনের দৃষ্টিতে একজন রাজস্ব পরিষদের প্রধানের অস্তিত্ব ছিল ঠিক ততটাই বাস্তব, যতটা বাস্তব হলো ‘পরীদের রাজা’র অস্তিত্ব।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ