ত্রয়োদশ অধ্যায়
সুপ্রিম কোর্ট অফ জুডিকেচার
[ফিলিপ] ফ্রান্সিস এমন এক “বিভ্রমের কাল”-এর কথা উল্লেখ করেছেন, “যে সময়ে কেউ কেউ জোর দিয়ে বলতেন — এবং অনেকেই তা বিশ্বাস করতেন — যে, দেওয়ানি-ভুক্ত এলাকাগুলোর রাজস্বের ভাণ্ডার অফুরন্ত।” আর মিল তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন যে, ১৭৬৬-তে “সমগ্র জাতির মধ্যে ভারত-সম্পর্কিত যে অতিরঞ্জিত ও স্ফীত ধারণা প্রচলিত ছিল, তার ফলে ‘ইন্ডিয়া স্টক’ বা কোম্পানির শেয়ার কেনার হিড়িক পড়ে যায়; এমনকি এর দর বেড়ে ২৬৩ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল।” (মিল : Op. cit., ১৮৪০ সংস্করণ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৪৩২)। ভারতীয় শেয়ার কেনাবেচার মাধ্যমে রাতারাতি বিপুল বিত্তবৈভব অর্জনের যে স্বপ্ন মানুষ দেখছিল, তার প্রভাবে ‘কোর্ট অফ প্রোপাইটার্স’ বা শেয়ারহোল্ডারদের পরিষদ কার্যত শেয়ার দালাল এবং শেয়ার বাজারের (The Alley) প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থের বিষয়টি সামনে রেখে পরিচালকরা (Directors) কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক দুরবস্থা ও ঋণের বোঝা সম্পর্কে অত্যন্ত বেদনাদায়কভাবে সচেতন ছিলেন; অন্যদিকে শেয়ারহোল্ডারদের (Proprietors) স্বার্থ নিহিত ছিল কেবল তাদের কেনা শেয়ারের লাভজনক কেনাবেচার মধ্যেই। তাই কোম্পানির কোষাগারে জমা হওয়া অর্থ থেকে লভ্যাংশ (dividend) দেওয়া হলো, নাকি ভবিষ্যতে বিনিয়োগ বিক্রির প্রত্যাশায় ঋণ করে সেই লভ্যাংশ মেটানো হলো — সে বিষয়ে তারা ছিলেন সম্পূর্ণ উদাসীন। ১৭৬৭-তে স্বার্থের এই পারস্পরিক সংঘাতের ফলে একটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার সূত্রপাত ঘটল। পরিচালকদের নির্দেশ ছিল, কোম্পানির যেসব কর্মচারী ১৭৬৪-তে নজম-উদ-দৌলার মসনদ-আরোহণের সময় উপহারসামগ্রী নিয়েছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। অভিযুক্ত কর্মচারীদের মধ্যে যারা অধিকতর প্রভাবশালী ছিলেন — এবং যাদের ১৭৬৫-তে ক্লাইভ বাংলা থেকে বিতাড়িত করেছিলেন — তারা ততদিনে ইংল্যান্ডে পৌঁছে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে তারা দেখলেন যে, লভ্যাংশ দেওয়ার বিয়ে শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে পরিচালকদের তীব্র বিরোধ আর মুখোমুখি সংঘাত চরমে পৌঁছেছে; এই সুযোগে তারা নিজেদের স্বার্থের দাবিগুলো ইংল্যান্ডের শক্তিশালী বিরোধী দলের (Opposition) দাবির সঙ্গে জুড়ে দিতে পারলেন। ৬ই মে অনুষ্ঠিত পরিষদের সাধারণ সভায় শেয়ারহোল্ডাররা ১২৫ শতাংশ হারে লভ্যাংশ প্রদানের প্রস্তাব বিপুল ভোটে পাস করলেন। লভ্যাংশ বৃদ্ধির এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে পরিচালকরা চরম বিরোধিতা করার ফলে শেয়ারহোল্ডারদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের মধ্যে বিপুল তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়; সেই ক্ষোভে জ্বলতে জ্বলতে তারা এক প্রস্তাব পাস করে বললেন, কোম্পানির কর্মচারীদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা দায়ের করা হয়েছিল, সব কটা অবিলম্বে প্রত্যাহার করে নিতে হবে। বিভিন্ন গবেষক এই সময়ে কোম্পানির অন্দরমহলের গোলোযোগ প্রসঙ্গে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু মন্তব্য করেছেন, এবং সে সব মন্তব্য সত্যের খুব কাছাকাছি ছিল বলেই এমন মন্তব্য করা হয়েছে, যে মন্তব্যগুলোর সারমর্ম হল — শেষ পর্যন্ত কোম্পানির অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পার্লামেন্টের হস্তক্ষেপের পথ প্রশস্ত করেছিল ভারতকে উন্নততর শাসনব্যবস্থা উপহার দেওয়ার মতো কোনো রাষ্ট্রনায়কোচিত মহৎ আকাঙ্ক্ষা থেকে নয়, বরং আমলা আর কর্তাদের মধ্যে গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব আর পরম্পর রেষারেষির নগ্ন প্রকাশের কারনেই। ১৭৬৭-তে পার্লামেন্ট অত্যন্ত কোম্পানি বছর শেষে যে অর্থ বন্টন করে, সেই সংক্রান্ত কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের দৃঢ় অধিকার দাবি করে। এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে একটা আইন পাস করা হয় — যে আইনে নির্দেশ দেওয়া হয় যে — ১৭৬৭-র ২৪ জুনের পর — শুধুমাত্র এই নির্দিষ্ট লক্ষ্যেই আহূত ‘সাধারণ সভা’ বা ‘জেনারেল কোর্ট’-এ গোপন ব্যালটের মাধ্যমে লভ্যাংশ (ডিভিডেন্ড) অনুমোদিত হতে হবে; লভ্যাংশের সর্বোচ্চ হার ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয় — এবং এর বেশি ডিভিডেন্ড বিতরণ করা যাবে না; এবং এটাও আদেশ দেওয়া হল, পার্লামেন্টের পরের অধিবেশন বসার আগে কোনো রকম লভ্যাংশ ঘোষণা করা যাবে না। ১৭৬৯-এর এপ্রিল মাসে আরেকটা আইন পাস করা হয়, যেটা মূলত ইংরেজ সরকার এবং কোম্পানির মধ্যকার একটা সমঝোতারই প্রতিফলন ছিল বলেই মনে হয়। পরের পাঁচ বছর ধরে ভারতের রাজস্ব ভোগ করার অধিকার অব্যাহত রাখার বিনিময়ে, কোম্পানিকে রাজকোষে (Exchequer) বার্ষিক ৪,০০,০০০ পাউন্ড জমা দেওয়ার প্রবিধান করা হল। যদি রাজস্বের পরিমাণ এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য পর্যাপ্ত বলে প্রমাণিত হতো, তবে কোম্পানি প্রতি বছর তাদের লভ্যাংশের হার ১ শতাংশ করে বৃদ্ধি করতে পারত — যতক্ষণ না তা সর্বোচ্চ ১২.৫ শতাংশের সীমায় পৌঁছাত; কিন্তু, যদি লভ্যাংশের হার ১০ শতাংশের নিচে নেমে যেত, তবে রাজকোষে প্রদেয় অর্থের ক্ষেত্রে আনুপাতিক হারে ছাড় বা রেয়াত পাওয়ার বিধান রাখা হয়েছিল; আর যদি লভ্যাংশের হার কমে ৬ শতাংশে নেমে আসত, তবে রাজকোষে কোনো অর্থই জমা দিতে হতো না। ১৭৬৭ আর ১৭৬৯-এর এই আইন দুটো — যদিও সার্বভৌমত্বের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সম্পূর্ণ নীরব ছিল — তবুও এগুলো কোম্পানির অর্জিত সম্পদের ওপর জাতির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এবং সেই সম্পদে অংশীদার হওয়ার অধিকারের মূলনীতিটি সুপ্রতিষ্ঠিত করে।
যখন ব্রিটিশ জনমানস প্রাচ্যের বিপুল ঐশ্বর্যের বিস্ময়কর সব কল্পনায় বিভোর ছিল, ঠিক তখনই কোম্পানির আর্থিক অবস্থা ঋণের ভারে এতটাই শোচনীয় ন্যুব্জ পড়ল যে, ১৭৭২-এর ১০ই আগস্ট কোম্পানির চেয়ারম্যান আর তাঁর ডেপুটি, মন্ত্রীমহোদয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইলেন এবং সেই বৈঠকে তাঁরা সরকারি কোষাগার থেকে এক মিলিয়ন পাউন্ড ঋণ প্রার্থনা করতে বাধ্য হন। কোম্পানির পক্ষে তাদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার দায়ভার সুদূর ভারতে অবস্থানরত তাদের কর্মচারীদের অপকর্মের ওপর চাপানো এবং সেই কর্মচারীদের শাস্তি ও সংশোধনের বিষয়কে পরিস্থিতি মোকাবিলার সব থেকে কার্যকর উপায় হিসেবে তুলে ধরা ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক একটা বিষয়। একইভাবে, সরকারের পক্ষেও ভারতের শাসনব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে একটা পরিকল্পনা পেশ করাটা ছিল স্বাভাবিক — এমন একগুচ্ছ পদক্ষেপ, যা লিডেনহলের কোম্পানির ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে ওয়েস্টমিনস্টারে অবস্থানরত মন্ত্রীদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার উদ্দেশ্যে প্রণীত হয়েছিল। যে নীতিমালার হাত ধরে ১৭৭৩-এর ‘রেগুলেটিং অ্যাক্ট’ (Regulating Act) বা নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়িত হল, সেটা মূলত দুটো বিষয়ের ওপর আলোকপাত করে — প্রথমত, কোম্পানির নিজস্ব সাংগঠনিক কাঠামোর অভ্যন্তরে চালু অসংগতি আর অনিয়মের নিরসন; এবং দ্বিতীয়ত, ভারতে কোম্পানির শাসনব্যবস্থায় বিদ্যমান ত্রুটি-বিচ্যুতির প্রতিকার। এমনটাই ধারণা করা হয়েছিল, ‘কোর্ট অফ প্রোপাইটার্স’ বা শেয়ারহোল্ডারদের সভার ভোটাধিকারের সংখ্যা কমিয়ে এবং পরিচালকদের (Directors) নির্বাচনের মেয়াদ দীর্ঘায়িত করার মাধ্যমে কোম্পানির পরিচালনা ব্যবস্থাকে “বিশৃঙ্খলতা ও অরাজকতা” থেকে মুক্ত করা সম্ভব হবে। ফলে, ১৭৭৩-এর আইনে ‘কোর্ট অফ প্রোপাইটার্স’-এ ভোটাধিকার প্রয়োগের ন্যূনতম শেয়ারের পরিমাণ ৫০০ পাউন্ড থেকে বাড়িয়ে ১০০০ পাউন্ডে তোলা হয়; পাশাপাশি, প্রতি বছর সব ক’জন পরিচালককে নতুন করে নির্বাচনের প্রচলিত প্রথাটি বাতিল করে তার পরিবর্তে প্রতি বছর মোট পরিচালকদের এক-চতুর্থাংশকে নির্বাচনের নতুন নিয়ম চালু করা হয়। ভারতবর্ষে কোম্পানির শাসনব্যবস্থায় চালু অনিয়ম আর ত্রুটি দূর করার লক্ষ্যে একটা নতুন নির্বাহী সরকার এবং একটা ‘সুপ্রিম কোর্ট অফ জুডিকেচার’ বা সর্বোচ্চ বিচারালয় গঠন করা হয়।
‘রেগুলেটিং অ্যাক্ট’ (ভারতের সাথে সম্পর্কিত সংবিধিবদ্ধ আইনসমূহের সংকলন, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৬৯ ও তৎপরবর্তী অংশ; ১৩ জিও. ৩, অধ্যায় ৬৩) অনুযায়ী বিধান রাখা হয় যে, ১৭৭৪-এর ১লা আগস্ট থেকে বাংলায় কোম্পানির শাসনভার একজন ‘গভর্নর-জেনারেল’-এর ওপর ন্যস্ত থাকবে — যিনি বার্ষিক ২৫,০০০ পাউন্ড বেতন পাবেন; তাঁর সহায়তায় থাকবেন চারজন ‘কাউন্সিলর’ বা পরিষদ সদস্য, যাঁদের প্রত্যেকের বার্ষিক বেতন নির্ধারিত হল ৮,০০০ পাউন্ড। এছাড়া, এই আইনেই মাদ্রাজ আর বোম্বাই প্রেসিডেন্সিগুলোকে — যদিও কিছুটা অস্পষ্ট ও অনির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে — ফোর্ট উইলিয়ামে অবস্থিত কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ করা হয়। এই আইনে প্রথম গভর্নর-জেনারেল এবং কাউন্সিলের সদস্যদের মনোনীত করা হল এবং তাঁদের পাঁচ বছরের মেয়াদে নিযুক্ত করা হল; এই মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কোম্পানিই পরের পদাধিকারীদের মনোনীত করার ক্ষমতা রাখত। গভর্নর-জেনারেল, কাউন্সিলর এবং বিচারকদের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার নিষেধাজ্ঞা জারি করা হল; পাশাপাশি ব্রিটিশ রাজশক্তি (Crown) এবং কোম্পানির কর্মচারীদের জন্য কোনো রকম উপহার নেওয়াও নিষিদ্ধ করা হল। একটা সর্বোচ্চ বিচারালয় (Supreme Court of Judicature) প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে, ৮,০০০ পাউন্ড বেতনে একজন প্রধান বিচারপতি এবং প্রত্যেকের ৬,০০০ পাউন্ড বেতনে তিনজন বিচারকের পদ সৃষ্টি করা হ। (দ্রষ্টব্য : সিলেক্ট কমিটির নবম প্রতিবেদন, ১৭৮৩, পৃষ্ঠা ৪ এবং মিল: Op. cit., খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৫০। এখানে যে মূল বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন সেটা হলো — অনেক শেয়ারহোল্ডারের (যাঁরা সরকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতেন, সরকারি দপ্তরের কেরানি হিসেবে কাজ করতেন ইত্যাদি) কাছে, লভ্যাংশের পরিমাণের চেয়েও ভোটার হিসেবে তাঁদের পদের সাথে যুক্ত প্রভাব-প্রতিপত্তিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ