১৭৭২-এ মুর্শিদাবাদে থাকার সময়, ওয়ারেন হেস্টিংস বেগম সাহেবার কাছে একটা প্রস্তাব পেশ করে তাঁর সম্মতি প্রার্থনা করেছিলেন। প্রস্তাবটা ছিল — এমন এক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া, যিনি “নবাবের প্রতিনিধি হিসেবে কলকাতায় থাকবেন এবং নিজামত আদালতের রায় বা দণ্ডাদেশ কার্যকর করার লক্ষ্যে জারি করা পরোয়ানায় নবাবের পক্ষে নিজামত-এর সীলমোহর ও স্বাক্ষর প্রদানের ক্ষমতা রাখবেন।” এর উদ্দেশ্য ছিল, “আদালতের ‘ফতোয়া’ বা রায়গুলো নবাবের কাছে পাঠিয়ে তাঁর পরোয়ানা ও স্বাক্ষরের অপেক্ষায় থাকার যে দীর্ঘসূত্রিতা বা বিলম্ব এতদিন প্রচলিত ছিল, তা দূর করা; পাশাপাশি নবাবের অপ্রাপ্তবয়স্ক থাকাকালীন তাঁর পারিপার্শ্বিক প্রভাবশালীদের দ্বারা এই ক্ষমতার যে অপব্যবহারের আশঙ্কা ছিল, তা প্রতিরোধ করা।” ১৭৭৩-এর ২৩শে নভেম্বর কাউন্সিল (পরিষদ) হেস্টিংসের এই পদক্ষেপ অনুমোদন করে। সেই অনুযায়ী, পূর্বনির্ধারিত ব্যক্তি — সদর-উল-হক খানকে “নিজামত ব্যবস্থার এই নির্দিষ্ট শাখার ‘নায়েব’ (Neabut) হিসেবে নিয়োগ করা হয়” এবং “নিজামত আদালতের দারোগা হিসেবে তাঁর বর্তমান বেতনের সাথে অতিরিক্ত ৫০০ টাকা যুক্ত করা হয়।” কাউন্সিল আরও “সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, নিজামত-এর সীলমোহর উক্ত নায়েবের জিম্মায় অর্পণ করা হবে; এবং কাউন্সিলের প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ জানানো হবে যেন তিনি নায়েবের প্রশাসনিক কার্যক্রমের ওপর সার্বিক তত্ত্বাবধান করেন — সেটা আদালতের রায়গুলো পুনর্বিবেচনা করার ক্ষেত্রেই হোক, কিংবা পরোয়ানা জারি ও সীলমোহর অঙ্কন করার ক্ষেত্রেই হোক।” মুহাম্মদ রেজা খানের খালাস পাওয়ার সংবাদ জেনে ‘কোর্ট অফ ডিরেক্টরস’ (পরিচালক সভা) নিম্নোক্ত মন্তব্য লিখে পাঠাল —
“মহম্মদ রেজা খানের বিরুদ্ধে নন্দকুমারের ভূমিকা আমাদের দৃষ্টিতে এতটাই অসংলগ্ন ও অযোগ্যতাপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়েছে যে, আমরা তার পুত্রকে প্রদেশের ‘রায় রায়ান’ (Roy Royan)-এর মতো উচ্চপদে বহাল রাখার বিষয়ে তীব্র অনীহা বোধ করছি। যেহেতু মহম্মদ রেজা খানের খালাস পাওয়ার বিষয়টি আমাদের তাকে পুনরায় কাজে নিয়োগ করার যৌক্তিকতা প্রদান করে, তাই আমরা নির্দেশ দিচ্ছি — যদি তিনি আমাদের প্রেসিডেন্ট আর কাউন্সিল নির্ধারিত বিধিমালা আর শর্তাবলির অধীনে এবং এই পদের দায়িত্ব পালনের জন্য রাজা গুরুদাসকে প্রদত্ত বেতনের বিনিময়ে সসম্মানে উক্ত পদ গ্রহণ করতে সম্মত হন — তবে অবিলম্বে তাকে সেই পদে নিয়োগ প্রদান করা হোক। পাশাপাশি, তাকে একটি উপযুক্ত ‘খিলাত’ (khellaut) এবং অনুরূপ উপলক্ষ্যে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাধারণত যেসব সম্মানসূচক নিদর্শন প্রদান করা হয়, সেটা প্রদান করা হোক। এই নিয়োগের মাধ্যমে মহম্মদ রেজা খানকে আমরা কোনো প্রকার অসংগত বা অতিরিক্ত ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে চাই না; বরং আমরা কেবল এই বিষয়টি জানিয়ে আমাদের সন্তুষ্টি প্রকাশ করতে চাই যে, তার পূর্ববর্তী আচরণ আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি সুষ্ঠু ও প্রশংসনীয় ছিল।”
“(৪৭) আর রাজা গুরুদাসের প্রসঙ্গে বলতে গেলে — যদিও আমরা তাকে প্রদেশের ‘রায় রায়ান’ পদে বহাল রাখার বিষয়ে সম্মতি দিতে পারছি না, তথাপি তার সম্পর্কে আমরা যেসব ইতিবাচক ও প্রশংসনীয় তথ্য পেয়েছি, তা বিবেচনা করে আমরা তাকে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ অন্য কোনো পদে নিয়োগ করার বিষয়ে কোনো আপত্তি জানাব না; অবশ্য শর্ত হলো, আপনাদের (কাউন্সিলের) যদি এমন অভিমত হয় যে, তার আচরণ তাকে আমাদের এই বিশেষ অনুগ্রহ বা আনুকূল্য লাভের যোগ্য করে তুলেছে।”
দুর্ভাগ্যবশত, ‘কোর্ট অফ ডিরেক্টরস’-এর এই বিষয়টা নিয়ে ব্যাপক ভ্রান্ত ধারণা ছিল। ‘রায় রায়ান’ পদ প্রকৃতপক্ষে কখনোই গুরুদাসের দখলে ছিল না; বরং এই পদের অধিকারী ছিলেন মহারাজ রাজবল্লভ — যিনি ছিলেন রায় দুর্লভের (Dulabram) পুত্র। উল্লেখ্য যে, এই পদটি প্রথাগতভাবে সর্বদা কোনো একজন হিন্দুর দখলেই থাকত।
কাউন্সিলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য ‘কোর্ট অফ ডিরেক্টরস’-এর সেই ভুল নির্দেশকে অত্যন্ত বিস্ময়কর আর অভিনব পন্থায় কার্যকর করেছিলেন। তারা ‘নায়েব-সুবাহ’ পদ নতুন করে চালু করেন, অথচযে পদ ইতিপূর্বে ‘কোর্ট অফ ডিরেক্টরস’-এর সুনির্দিষ্ট এবং প্রত্যক্ষ নির্দেশে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছিল; এবং সেই পদে তারা মহম্মদ রেজা খানকে বসালেন। অন্যদিকে, রাজবল্লভকে ‘অত্যন্ত অল্পবয়স্ক ও অনভিজ্ঞ’ — এই অজুহাত দেখিয়ে তাকে সেই পদ থেকে বরখাস্ত করেন, যে পদে তিনি বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন; এবং রাজবল্লভের শূন্যস্থানে তারা গুরুদাসকে নিয়োগ করেন — যিনি বয়সে রাজবল্লভের চেয়েও প্রায় সাত বছরের ছোট এবং রাজস্ব সংক্রান্ত প্রশাসনিক কাজে যার পূর্বের কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না। এই পরিবর্তনের ফল ১৮ই অক্টোবর, ১৭৭৫ তারিখে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা পালিত আদেশের শর্তাবলীতে প্রতিফলিত হয়েছে :
“আদেশ করা হলো যে, সচিব যেন মহম্মদ রেজা খানকে অবহিত করেন যে — সম্মানিত ‘কোর্ট অফ ডিরেক্টরস’ তাঁর (রেজা খানের) কার্যকলাপ তদন্তের বিষয়ে পূর্ববর্তী বোর্ডের গৃহীত কার্যধারায় অনুমোদন প্রদান করে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন… এবং তাঁকে যেন আরও জানানো হয় যে — সম্মানিত গভর্নর-জেনারেল ও তাঁর পরিষদ, সেই কারণে, নবাব মোবারক-উদ-দৌলার কাছে তাঁকে ‘নায়েব সুবা’ অথবা সরকারের মন্ত্রী এবং নবাবের নাবালকত্বকালীন অভিভাবক হিসেবে নিয়োগের সুপারিশ করেছেন; এবং এই নিয়োগের সাথে তাঁকে সরকারের রাজনৈতিক বিষয়াবলি পরিচালনার, ফৌজদারি আদালতসমূহ ও সমগ্র দেশজুড়ে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার তদারকি করার, এবং বর্তমান কাঠামোর অধীনে ওই বিচারব্যবস্থা কার্যকর করার — কিংবা প্রয়োজনবোধে তাকে নতুন করে ঢেলে সাজানো বা সংশোধন করার — পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। যেহেতু বোর্ড চায় যে, ‘নায়েব সুবা’ হিসেবে ফৌজদারি আদালতের ওপর তাঁর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকুক, তাই তাঁরা প্রস্তাব করছেন যে — বর্তমানে কলকাতার ‘নিজামত আদালত’-কে এখান থেকে সরিয়ে ভবিষ্যতে মুর্শিদাবাদে স্থাপন করা হোক।” (সংখ্যাগরিষ্ঠ পক্ষের গৃহীত পদক্ষেপের সমর্থনে একটি যুক্তি বা কৈফিয়ত জানতে দেখুন — ‘The State of British Authority in Bengal under Mr. Hastings exemplified in the case of Mahomed Resa Khan’ শীর্ষক পুস্তিকা। লন্ডন, ১৭৮০)
তবে, নিজামত আদালতের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের সুবাদে পড়ে পাওয়া সুযোগ কাজে লাগিয়ে হেস্টিংস সমসাময়িক বাংলার ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা ও পুলিশের অবস্থা সম্পর্কে গভীরতর অধ্যয়ন করেছিলেন। ১৭৭৪-এর ১৯শে এপ্রিল তারিখের একটি পত্রে তিনি মন্তব্য করেন যে, বিচারব্যবস্থা ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার একটি সংস্কারকৃত ব্যবস্থা থেকে উদ্ভূত সুফলগুলি অনিবার্যভাবে “এমন এক সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার জন্য সংরক্ষিত ছিল, যা কার্যকর করার মতো সময় বর্তমান প্রশাসন এখনও পায়নি।” তিনি লেখেন —
অথবা “১. ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা এবং এর উপর নির্ভরশীল তন্না-দারিদের (Tanna darries) বিলোপ। এই প্রতিষ্ঠান জনশান্তির নিরাপত্তা দিত এবং প্রদেশের যেকোনো অংশে ঘটতে থাকা যেকোনো বিশৃঙ্খলা বা আকস্মিক ঘটনার নিয়মিত সংবাদ জানানোর সরকারি মাধ্যম হিসেবে কাজ করত। এটা অপসারণের ফলে ডাকাতদের আস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং দেশের শান্তির সঙ্গে সম্পর্কিত এই ধরনের ঘটনা সম্পর্কে সরকারকে সংবাদ দেওয়ার জন্য অন্য কোনো উপায় এর বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি।” (একই চিঠিতে হেস্টিংস লিখেছেন : “এই মুহূর্তে আমি এই প্রদেশের সব প্রান্ত থেকে অসংখ্য দস্যু বিষয়ে বারবার অভিযোগ পেয়েছি, যারা বিগত কয়েক বছর ধরে এখানে উপদ্রব করে চলেছে এবং অত্যন্ত দুঃসাহসিক ও উদ্বেগজনক বাড়াবাড়ির জন্য দোষী। আমি জানি না এই অশুভ বিষয়গুলোর খবর বোর্ডের সদস্যদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে কি না। আমার কাছে এই খবর কেবল ব্যক্তিগত সূত্রেই এসেছে, কারণ জমিদার, কৃষক বা রাজস্ব বিভাগের অন্য কোনো কর্মকর্তার থেকে এ বিষয়ে সামান্যতম ইঙ্গিতও শুনেছি বলে আমার মনে পড়ে না, যা অস্বাভাবিক বলে মনে হতে পারে। কিন্তু আমাকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে জমিদাররা নিজেরাই প্রায়শই তাদের আশ্রয় দেন এবং এই ধ্বংসযজ্ঞের প্রধান শিকার হওয়া রায়তরা অভিযোগ করার সাহস করে না, কারণ দস্যুদের মধ্যে এটি একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি যে তাদের বিরুদ্ধে দেওয়া প্রতিটি তথ্যের শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড।”)
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ