শুক্রবার | ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | সকাল ৬:০১
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সিন্ধুসভ্যতা বিশেষজ্ঞ র‍্যান্ডাল ল’-র সুতকাগেনদোর-সফরের নির্যাস : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘পঞ্চাশ নম্বরে নাম’ ক্ষয়িষ্ণু পুরুষ লেখক সসীম কুমার বাড়ৈ আলোচক সুতপা দত্ত দাশগুপ্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতার হকার, উচ্ছেদ অভিযান, ইতিহাসের প্যারাডক্স : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিনোদিনী দিন ফিরিবার নয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আইসক্রিমের দারুন স্বাদে গরম হোক উধাও : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-এর ছোটগল্প ‘পদ্মপাতার জল’ নজরুলের চোখে ক্ষুদিরাম : শৌনক ঠাকুর ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ইতিহাসসাধক স্বদেশরঞ্জন মণ্ডল : দিলীপ মজুমদার এবারে দশহরাতে আরামবাগের মনসাডাঙ্গার মনসা মাতার পূজায় ছাগবলি বন্ধের সিদ্ধান্ত : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বরেন্দ্র ও গৌড়ীয় ব্রাহ্মণ সমাজের ইতিহাস, কুলপঞ্জি ও অভিলিখনের সমন্বয়ে একটি পুনঃপাঠ : অত্রি ভট্টাচার্য ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘ছেঁড়া জামার ঈশ্বর’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অশুভ শক্তির বিনাশ ও ভক্তের সুরক্ষায় নৃসিংহ চতুর্দশী : রিঙ্কি সামন্ত বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বিনোদিনী দিন ফিরিবার নয়

শৌনক দত্ত / ১২৭ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ১ জুন, ২০২৬

যে সময়ের কথা লিখবো বলে আজ বসেছি সেই সময়ের বাংলার সমাজ-জীবনে মেয়েদের মুখ ছিল অন্ধকারের ঘোমটায় ঢাকা। একেবারেই অসহায় এবং অত্যাচার, অবিচারের সর্বশেষ পর্যায়ে ছিল। অশিক্ষা, প্রাচীন সংস্কার, অসহনীয় প্রচলিত প্রথার বেড়াজালে নারীর জীবন ছিল সর্বনাশের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। বাল্য বিবাহের নামে অপরিণত জীবন যুদ্ধ, কৌলিন্য প্রথার অভিশাপে কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার সীমাহীন দুর্ভোগ, বিধবা বিবাহ নিষিদ্ধের জাঁতাকালে অসহায় মেয়েদের অবর্ণনীয় সামাজিক বঞ্চনা। আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে জ্বলন্ত চিতায় মৃত স্বামীর সঙ্গে সহমরণের মতো লোমহর্ষক ঘটনা নারী জাতির এক সমস্যা সঙ্কুল কালো অধ্যায়। বাঙালির চেতনা জগতে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল উনিশ শতকে। নব আলোকদীপ্ত বাঙালি সমাজের পাশ্চাত্য ভাবধারার অভিঘাত উপেক্ষা করার ক্ষমতা ছিল না। অচল অনড় প্রাচীন বিশ্বাসের জগতে পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। এই পরিবর্তনের সিংহভাগ জুড়ে ছিল কর্মহীন গর্বহীন দীপ্তিহীন সুখে অভ্যস্ত নারীরা। বিধি-নিষেধের ঘেরাটোপের আড়ালে বসবাসকারী নারী এতোকাল অশিক্ষা আর সামাজিক নানান ব্যাধির বলি হয়ে এসেছে। পুরুষের ইচ্ছায় এবং প্রয়োজনে গড়ে ওঠা জীবনে স্বাভাবিকভাবেই নারীর আলাদা কোনো অস্তিত্ব, ইতিহাস এতকাল ছিল না।

ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বেশিসংখ্যক মেয়েরা শিক্ষিত হয়ে উঠেছিলেন। শিক্ষিত নারী শিক্ষার আলোয় সমাজে তাদের অবমাননাকর অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হতে শুরু করেছিলেন। নিজেদের দুরবস্থা প্রকাশ করার তাগিদ ছিল প্রবল। ইচ্ছের জোরই বুকের মধ্যে সাহস যোগায় আর সেই সাহসেই চিঠি পত্র, গদ্য, কবিতা, গল্পে একটু একটু করে তারা নিজেদের প্রকাশ করতে শুরু করেন। মেকলে ও বেন্টিঙ্কের চেষ্টায় ইংরেজি শেখানো শুরু হয়েছে তখন শহরে।সেই চারাগাছের মূলে জল সিঞ্চন করলেন রামমোহন রায় ও ডেভিড হেয়ার।স্বাধীন চিন্তার ধারা ছড়িয়ে পড়তে লাগলো হিন্দু কলেজ থেকে; ডিরোজিও হয়ে উঠলেন বাংলার নবজাগরণের সক্রেটিস ও তাঁর ছাত্রেরা এই বাংলার প্রাচীন দেওয়ালে আগুন ধরিয়ে দিতে লাগলো। রামমোহন রায়ের অদ্বৈতবাদী ব্রাহ্মধর্ম প্রাচীন ধর্মের বুকে তুলে দিল আঘাতের ঝড়। জলন্ত চিতা থেকে তুলে আনতে শুরু করলেন সদ্য কিশোরী ও একই সঙ্গে কুলীন স্বামীর মৃত্যুতে বিধবা হওয়া মেয়েদের। ঘা খেতে শুরু করল সনাতনবাদ। ব্রাহ্মরা শুধু তাদের মনোযোগ ধর্ম ও উপাসনার দিকে না স্থির রেখে, ছড়িয়ে দিতে থাকলো সমাজের অন্যান্য উপেক্ষিত ক্ষেত্রে।ক্রমশ রঙ্গমঞ্চে অবতীর্ণ হলেন আরো এক নায়ক — যার হাতে বিদ্যুতের ন্যায় শক্তি এবং বুকে একশো হাতির বল। তাঁকে বাধা দিতে প্রায় বলা যায় একজোট হলো সনাতনবাদে বিশ্বাসী উচ্চ- নিম্ন সবাই, কিন্তু তিনি একা নিজের মনোবল ও কাজ দিয়ে নস্যাৎ করে দিলেন সেসব কে। জয়ী হলেন “বীরসিংহের বীর শিশু” বিদ্যাসাগর। পাশ হলো বিধবা বিবাহ আইন এবং জনমত গড়ে উঠতে লাগলো বহু বিবাহের বিরুদ্ধে। একই সময় বাংলার রাজনৈতিক আকাশেও দেখা গেল দুর্যোগের ঘনঘটা; ১৮৫৭ সালে গোটা দেশে প্রায় জ্বলে উঠলো অত্যাচারী কোম্পানির বিরুদ্ধে সিপাহি বিদ্রোহের আগুন। লড়তে লাগলেন লক্ষ্মীবাঈ, তাঁতিয়া টোপি, নানা সাহেব, বেগম হজরত মহল। ঠিক সেই সময়েই বাংলার এক প্রান্তে শুরু হল প্রথম গণ আন্দোলন। স্থান — নদীয়া জেলার চৌগাছা ও গোবিন্দপুর জেলা, বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস এবং দিগম্বর বিশ্বাসের নেতৃত্বে। দরিদ্র, নিরুপায় অত্যাচারিত নীল চাষিরা এতদিন যে অত্যাচার সহ্য করে আসছিল নীলকর সাহেবদের হাতে সেই অত্যাচার চরম সীমায় এসে পৌঁছায় ১৮৫৯ বঙ্গাব্দে। তারা দৃপ্ত মুষ্টিতে সেই আন্দলনের হাল ধরেন, সেই ঘা খেতে শুরু করে নীলকর সাহেব সমেত বাকি সব ইংরেজ শাসকও। সেইদিন থেকে বাঙালার সর্বহারার দল বুঝে নিতে শুরু করে তাদের অধিকার ও ফিরিয়ে দিতে থাকে তাদের ওপর হওয়া অন্যায্য অত্যাচারের যথোচিত উত্তর। বাংলার এই সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই উত্থান ঘটে সেকালের বেশিরভাগ নাট্যকারেদের। সমাজের এই নবজাগরিত ভাবতরঙ্গ প্রবেশ করতে থাকে তাদের চিন্তায়, মনে, মননে ও লেখায়।নাট্যচিন্তা ও ভাবনা ক্রমশ প্রবেশ করতে থাকে সমাজে। ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতে থাকে থিয়েটার ও নাটক।

উনিশ শতকের বাংলায় তখনো গণিকা বা বেশ্যাদের অবস্থা ছিল প্রায় শোচনীয়। শিক্ষার আলোয় উজ্জ্বল বাংলার কাছে তখনো এরা নষ্ট মেয়েছেলে। এদের তাই প্রবেশ ছিল না কোনো শুভ কাজে বা চিন্তায়। সেই রেশ থেকে বাদ যায়নি নাট্যচর্চাও। বাংলায় থিয়েটার চর্চা মোটামুটি যখন এক সম্মানীয় জায়গায় পৌঁছে গিয়েছে তখন প্রশ্ন আসে নায়িকাদের নিয়ে। এতদিন অব্দি মহিলাদের চরিত্রে অভিনয় করে গেছেন পুরুষেরাই।এবং থিয়েটার মোটামুটি ছিল ভদ্রলোকেদের জায়গা। অর্থাৎ যাদের হাতে টাকা আছে, ঠোঁটে দামি পানের পিক আছে এবং গায়ে দামি জামা আছে, তাদের। কিন্তু ১৮৭০ সাল থেকে এ চিত্রে পরিবর্তন আসে। ১৮৭২ সাল থেকে থিয়েটার দেখতে প্রবেশ পেতে শুরু করে হাতে টাকা থাকা শ্রেণীর মধ্যবিত্তেরাও। এবং আবশ্যিক ভাবেই এর প্রভাব পড়ে অভিনীত নাটকের গুণমানে। প্রয়োজন পড়ে অভিনেত্রীদের যাদের মোটামুটি নিয়ে আসা হত বেশ্যাপল্লি থেকে এবং জন্মগত ভাবে তাঁরা ছিলেন সেই বেশ্যাদের সন্তান যাঁদের বয়স ৮-১৬ এর মধ্যে এবং সামান্য হলেও থাকতে হত নৃত্য গীতের সঙ্গে পরিচিতি। ‘দি বেঙ্গল থিয়েটার’ ১৮৭৩ সালে চারজন বেশ্যাকে নিয়ে আসে অভিনয় করার জন্যে। এই কর্মকাণ্ড দেখে ‘মধ্যস্থ’ পত্রিকার সম্পাদক মনোমোহন বসু লেখেন – “ … With this the prostitutes get equal rights to socialize. At last the bengali audience have used their eyes and ears to the best and the social norms have become pure and kinetic (just like Kolkata’s newly fitted drain pipe water)!… This is certainly not the last surprise of my life but it is indeed tough to survive this exuberance of this ultra – civilization’ ( Translation from – Article by Moloy Rakshit) স্বাভাবিক ভাবেই এই সিদ্ধান্তে এক মত হতে পারেনি সমাজের এক বিরাট অংশ। একমত হতে পারেনি ব্রাহ্ম সমাজের মতো উদারমনস্ক ও নব্যপন্থী দলও। তাদের কাছে বেশ্যাদের নাট্যাভিনয় শুধু না, বাড়ির মহিলাদের নাটক দেখতে যাওয়া বিষয়টিও ছিল ঘোরতর পাপ কাজ। বঙ্কিমচন্দ্র চট্ট্যপাধ্যায় এই কাজ দেখে শ্রী গিরিশ ঘোষকে বলেছিলেন – “ … Theatre are no longer places for civilized people to visit; Hooligans and prostitute keep on lagging aloud” (Translation from – Article by Moloy Rakshit) ক্রমশ যারা বেশ্যাদ্বারা অভিনীত নাটক দেখতে যেতেন তাদের একঘরে করে দেওয়া শুরু হল। হুমকির মুখে পড়ে তাদের পরিবার পরিজন এবং দাগিয়ে দেওয়া হতে থাকে ‘অধার্মিক’ আখ্যায়। শুধু সামাজিক ভাবেনা, তৎকালীন গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মীয় প্রথা ও ভাবাবেগে আঘাত হানছে এই নব্য অভিনেত্রীদের দল – এ কথাও শোনা যায়। এবিষয়কে সমর্থন করে, ১৮৭৭ সালে ‘দি স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় একটি চিঠি লেখা হয়, যাতে বলা ছিল – “ … No doubt religious dramas…are calculated to elevate the human character, but when we consider the vicious and immoral persons who represent these characters, we are overpowered by a feeling of disgust. It has been suggested more than once that women of the town should not be allowed to act in those theatres, but I regret to state that they are still freely engaged and allowed to personate such holy and sublime characters as Prohlad and Chaitanya without evoking any protest. These women are so many pitfalls for our young men, and should be removed from the theatre as speedily as possible.” কিছু মানুষ এও বলেন এই বেশ্যাপল্লি থেকে অভিনেত্রী ধরে এনে তাদের দিয়ে অভিনয় করিয়ে থিয়েটার থেকে শুধুমাত্র আর্থিক মুনাফার বিষয়টি দেখতে গিয়ে ক্রমশ থিয়েটার থেকে হারিয়ে যাচ্ছে তার সংস্কৃতিক গুনমান।অথচ কি আশ্চর্য ! বিরুদ্ধে যুক্তি দেওয়া মানুষেরা একবারও ভেবে দেখলেন না এই নাটকে অভিনয় করে,সামাজিক না হলেও অর্থ নৈতিক সাফল্য আসতে শুরু করে বেশ্যাদের হাতে। সমাজের একটা গোটা গোষ্ঠী যারা কিনা নির্ভরশীল ছিল অন্যের ওপর, নির্ভরশীল ছিল তাদের দেহ ও দেহ ব্যাবসার ওপর, এখন সেই তারা নিজেদের অভিনয় করার দক্ষতায় উপার্জন করতে থাকে নিজেরাই। বহু জায়গায় এও বলা হয়েছে, এই অভিনেত্রীরা তাদের ‘ছলা কলার ‘ মাধ্যমে ক্রমশ বশ করে ফেলছিল স্কুল – কলেজ পড়ুয়া গৃহস্থ বাড়ির ছেলেদের। এই বিষয়ের সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে শ্রী গিরিশ ঘোষ বলেন – “ … that they were enticing young boys away from their studies by leering at them or making overtures from the stage, was false. For a good performance, it was imperative that the actresses face the audience – and if an impressionable youth was impressed by the beauty and allure of an actress, then the audience was to blame, not the actress. If they had been really impure, how could they have performed the purest characters so realistically, and how could their art have been blessed by Sri Ramkrishna?” ( translation by – article by Sarvani Gooptu)

১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দের ১৬ আগস্ট তারিখে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব নাটক দেখতে আসেন। বঙ্গীয় নাট্যসমাজ এতে ধন্য হয়। কেননা শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস যখন তাঁর শেষ বয়সে অসুস্থ সেই সময়ে তার অন্যতম শিষ্য, শ্রী গিরিশ ঘোষের অনুরধে তাঁরই পরিচালিত নাটক দেখতে যান স্টার থিয়েটারে। থিয়েটার দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। কিন্তু তাঁর সামনে বসে থাকা ভক্তমণ্ডলীর সকলেই যে ঠাকুরের সেই ইচ্ছাকে সেদিন মেনে নিতে পারছিলেন তা নয়। ‘চৈতন্যলীলা’ নাটক দেখতে গিয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ। ওই সালের ২১ সেপ্টেম্বর তারিখে তিনি আবার ওখানে ‘চৈতন্যলীলা’ নাটকের অভিনয় দেখেন। ঠাকুর ওখানে আরও দুখানা নাটকের অভিনয় দেখেছিলেন— ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দের ১৪ ডিসেম্বর তারিখে ‘প্রহ্লাদচরিত্র’ ও ১৮৮৫ খ্রীষ্টাব্দের ২৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে ‘বৃষকেতু’। চৈতন্যের চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছিলেন কথিত আছে যে অভিনয়ের সময় সে হবিষ্যান্ন করত। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব চৈতন্যের অভিনয় দেখে এতটাই অভিভূত হয়ে যান যে তাঁকে আশীর্বাদ করার জন্যে গিয়ে উপস্থিত হন তার সাজঘরে। রামকৃষ্ণ তাঁকে বলেছিলেন, ‘চৈতন্য হোক’। মঞ্চের সেই ‘চৈতন্য’কে রামকৃষ্ণ প্রথমে পুরুষ বলে ভুল করেছিলেন। পরে জানতে পারেন, অভিনয় করেছেন বছর বাইশের এক তরুণী। লোকমুখে, ইতিহাসের পাতায়, বাঙালির মনে ও মননে মিলেমিশে সেই ঘটনা আজও জীবন্ত! স্বয়ং অভিনেত্রীও তাঁর আত্মজীবনীতে এই ঘটনার উল্লেখ করে গেছেন। এর দ্বারা, শুধুমাত্র যে ‘বেশ্যা দ্বারা অভিনীত থিয়েটার’ খারাপ, নীচ ইত্যাদির তকমা সরে যেতে থাকে তাই নয় এই পেশায় নিযুক্ত হওয়া প্রায় সকল বেশ্যার মনে এই ধারণা তৈরি হয় যে থিয়েটারে যোগদান করলে হয়ত তাদের পূর্ববর্তী পাপ জীবনের কিছুটা পাপ স্খালন হবে ও তারা শুদ্ধ হতে পারবে। একবার ভাবুন তো যে যুগে নারীদের আলাদা কোনো অস্তিত্ব স্বীকার করতনা পরিবার সমাজ এমনকি দেশের শাসককুলও, সে সময়ে দাঁড়িয়ে নিজের অভিনয় প্রতিভার জোরে এক তরুণী নিজেকে সসম্মানে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন শুধু অভিনয় জগতে নয় সংস্কৃতমনস্ক অভিজাত লোকেদের সভাতেও যেখানে আলোচিত হত বাংলা, ইংরেজী সাহিত্য। সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সেসব আলোচনায় যোগ দিতেন এই অসামান্যা প্রতিভাময়ী সুন্দরী তরুণী, যদিও তাঁর প্রথাগত শিক্ষা ছিল সামান্যই। যার কথা লিখতে বসেছি তাঁর নাম শ্রীমতি বিনোদিনী দাসী। যে মেয়ে একদিন লিখেছিল, ‘‘মনের কথা জানাইবার লোক জগতে নাই,’’ আজ দেখা যাচ্ছে তার কথা শুনে শুনে লোকের আর মন ভরছে না। তার সময়ের মেয়েরা, এমনকী তার চাইতে অনেক পরের মেয়েরাও সেই কবে সেকেলে হয়ে গেল। তাদের ন্যাপথালিন-নিমপাতা দিয়ে তুলে রাখা যায়। কিন্তু বিনোদিনী? জ্বলন্ত মশাল আলমারিতে তুলে রাখবে, এত সাহস কার? মেয়েদের মধ্যে কে প্রথম গ্র্যাজুয়েট, প্রথম ডাক্তার, প্রথম ট্রেড ইউনিয়ন লিডার, প্রথম হ্যানোত্যানো, সব কুইজের বইতে রয়ে গিয়েছে। বিনোদিনী কোনও কিছুতে প্রথম না হয়েও অদ্বিতীয়া। মাত্র বারো বছরের অভিনয় জীবন, স্রেফ দুটি গদ্য লেখা প্রকাশিত। তাতেই অলটাইম সুপারহিট। বিনোদিনীর কথা উঠলে গিরিশ ঘোষের কথা ওঠে ঠিকই। তা বলে গিরিশকে চিনলে মোটেই চেনা হয় না বিনোদিনীকে। বরং বিনোদিনী গিরিশকে বেশ কিছুটা চিনিয়ে দিতে পারে। বিনোদিনী তাঁর আত্মজীবনীর জন্য গিরিশকে ভূমিকা লিখতে বলেছিল, কিন্তু সে লেখা তার পছন্দ হয়নি। বিনোদিনীর মনে হয়েছিল, সত্যি কথাগুলো চেপে গিয়েছেন গিরিশ। গিরিশের ভূমিকা স্রেফ বাদ দিয়ে নিজের বই ছাপিয়ে দিয়েছিল বিনোদিনী। পরের বছরই সেই বইয়ের দ্বিতীয় মুদ্রণ বার হয়েছিল।

১৮৬৩ সালে বিনোদিনীর জন্ম ঠিকানা ছিল ১৫৪ নং কর্ণওয়ালিশ স্ট্রীট। মা, দিদিমার তত্ত্বাবধানে বড় হওয়া। অত্যন্ত গরীব অবস্থা ছিলো তাঁদের। খোলার চালের বাড়ী তারই দু একটি ঘর আবার ভাড়া দেওয়া অন্নসংস্থানের জন্য। পুঁটি নামে ডাকত সবাই ফুটফুটে ছোট্ট মেয়েটিকে। মা ভাই আর দিদিমাকে নিয়ে সংসার। ঘর ভাড়া আর মা, দিদিমার সামান্য অলংকার এই ছিলো আয়ের পথ। খুবই দরিদ্র জীবন দিদিমা তারই মধ্যে বিয়ে দিয়ে দিলেন পুঁটির তাঁরই খেলার সাথীর সঙ্গে কিন্তু সে বিয়ে স্থায়ী হলনা। পুঁটির স্বামীকে তার বাড়ীর লোকেরা নিয়ে চলে গেল। ভাইয়ের এক সময়ে বিয়ে হল, কিন্তু ভাই-বৌ থাকলনা শ্বশুরবাড়ী। পুঁটি একেবারে একা হয়ে গেল। তখন তাঁকে ভর্তি করা হল কর্ণওয়ালিশ স্ট্রীটের অবৈতনিক স্কুলে — নাম লেখান হল বিনোদিনী দাসী, পুঁটি থেকে বিনোদিনীতে রূপান্তরিত হওয়া শুরু হল সেই মুহূর্ত থেকে। পড়াশুনাতে তাঁর মেধার পরিচয় পাওয়া এক আশ্চর্য কথাই! পরিবেশ তো অনুকূল ছিলনা। গানের গলাও ছিল অদ্ভুত রকমের ভাল। বিনোদিনীর বাড়ীতে গঙ্গাবাঈ নামে এক গায়িকা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতেন মাঝে মাঝে। বয়সে বিনোদিনীর থেকে অনেক বড়। তাও বিনোদিনী তার সাথে সই পাতালেন, গোলাপফুল বলে ডাকতেন তাকে। দারিদ্রের সঙ্গে যুঝতে না পেরে বিনোদিনীর মা দিদিমা এই গঙ্গাবাঈয়ের কাছেই গান শিখতে দিলেন তাঁকে। আশ্চর্য দরদভরা কণ্ঠ সুর লয় তালের জ্ঞান যেন এই মেয়ের সহজাত ক্ষমতা। তাই অল্প কদিনেই সে আয়ত্ত করে নিল সুমধুর সব গান। এদিকে গঙ্গাঈের ঘরে গানের আসর বসত প্রায়ই। আসতেন তখনকার সমাজের গানের সমঝদার জ্ঞানীগুণীরা। বিনোদিনীর এই গান গাইবার ক্ষমতা পালটে দিল তাঁর জীবন। যদিও দারিদ্রদোষ তাঁর জীবন পরিবর্ত্তনের অন্যতম কারণ। আর কারণ- গঙ্গাবাঈ নিজে। তিনি বিনোদিনীকে নামিয়ে দিলেন বারাঙ্গনার ভূমিকায়। তখনকার সমাজে আসরে গান গাইতেন এরাই। গঙ্গাবাঈয়ের আসরে আসতেন পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায় আর ব্রজনাথ শেঠ। তাঁরা বিনোদিনীকে ভর্তি করে দিলেন ‘গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে’-দশ টাকা বেতনে। মহেন্দ্রলাল বসুর উপর তাঁকে শেখানোর ভার পড়ল। পরে অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফী, অমৃতলাল মুখোপাধ্যায় -নাট্যজগতের এইসব দিকপালেরা তাঁর শিক্ষার ভার নিলেন। ১৮৭৪ সালের ১২ই ডিসেম্বর মাত্র ১১ বছর বয়সে দু’চারটি মাত্র সংলাপের মাধ্যমে অভিনয় করলেন ‘শত্রুসংহার’ নাটকে। দ্রৌপদীর সখীর ভূমিকায়। শুরুতে মাসিক বেতন ছিল দশ টাকা। জীবনের দ্বিতীয় নাটকেই পান নায়িকার রোল। এবং মাতিয়ে দেন দর্শককুল ও নাট্যজগতকে। স্টার থিয়েটার গড়ে উঠতে তখনও ঢের দেরি। সেই সময় বিনোদিনী গ্রেট ন্যাশন্যাল থিয়েটারে। কিন্তু মঞ্চে যেভাবে দাপটের সঙ্গে বিভিন্ন চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা বুঝিয়ে দেয় ভিতরে ভিতরে আত্মবিশ্বাসের আগুন কতটা গনগনে ছিল।

বিনোদিনীর ছবি দেখলে আশ্চর্য লাগে। বিনোদিনীর রং কালো। চেহারা সেই ২২-২৩ বছর বয়সেই বেশ ভারী। কালো রং, ভরাট গাল, সুগোল বাহু, পুষ্ট কোমর। দুধে-আলতা বর্ণ কি পানপাতা মুখ, কোনওটাই ছিল না। অথচ সে মেয়ের আকর্ষণ ছিল এমন যে লাহোরে থিয়েটারের পর বাড়ির সামনে লেঠেল খাড়া করতে হয়েছিল। আর কলকাতায় রংপুরের জমিদারের সঙ্গে কলকাতার মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীর লেঠেলদের লাঠালাঠি হয়ে গিয়েছিল। বিনোদিনী সেকালের সবকটি মঞ্চে– ন্যাশনাল, গ্রেট ন্যাশনাল, বেঙ্গল ও ষ্টার থিয়েটারে ৮০টি নাটকে ৯০টিরও বেশি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। অভিনয় জীবন থেকে অন্তরালে চলে যাবার সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৩ বছর। তারপরও দীর্ঘ ৫৫ বছর জীবিত ছিলেন বিনোদিনী কিন্তু অভিনয়ে ফিরে আসেননি। আজকের দিনে যে বয়সে অভিনয়ের কেরিয়ার হয়তো সবে শুরু হয়, সেই বয়সেই রঙ্গমঞ্চকে বিদায় জানিয়েও তিনি কিংবদন্তি। ফিরে আসার জন্য কোন ডাকও পাননি। অথচ মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’ সাতটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। আবার ‘দুর্গেশনন্দিনী’ নাটকে দু’টি চরিত্রে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। আয়েষা ও তিলোত্তমা দুই-ই তিনি। একই রাতে মঞ্চে বিভিন্ন চরিত্রে তাঁর অভিনয়ের দীপ্তি দর্শককে মুগ্ধ করত। শুধু একই নাটক নয়, বিভিন্ন নাটকে। কেবল এইটুকুই বুঝিয়ে দেয় তাঁর অভিনয়ের ‘রেঞ্জ’টা। করুণ থেকে হাস্যরস, সব ধরনের অভিনয়েই কাঁপিয়ে দিতেন মঞ্চ। এহেন অভিনেত্রী যে অল্পদিনেই নাম করে ফেলবেন তা বলাই বাহুল্য। খুব দ্রুতই সেকালের সংবাদপত্রে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘ফ্লাওয়ার অব দ্য নেটিভ স্টেজ’ কিংবা ‘প্রাইমাডোনা অফ দি বেঙ্গলি স্টেজ’। তাঁর এই উত্থানের পিছনে গিরিশচন্দ্র ঘোষের অবদানের কথাও সর্বজনবিদিত। বিনোদিনীর লেখা থেকেই পরিষ্কার, গিরিশ ঘোষকে তিনি ‘গুরু’ মানতেন। নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করেছিলেন তিনি গিরিশের কাছে। নিষিদ্ধপল্লি থেকে আসতেন সেদিনের অভিনেত্রীরা। ফলে, একটা পুরুষনির্ভরতাও তৈরি হত। তাছাড়া তাঁদের কোনও ছুঁৎমার্গও ছিল না। শুধু তো মহড়়া বা নাট্যশিক্ষা নয়, এক ধরনের দৈনন্দিনতায় এঁরা জড়িয়ে যেতেন। বিনোদিনী নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন, গিরিশও এমন প্রতিভা পেয়ে ওঁকে পাগলের মতো ভালবেসে ফেলেছিলেন। শুধু তো গিরিশ ঘোষ নন, বিনোদিনীর ‘ভুনিদা’, অর্থাৎ, রসরাজ অমৃতলাল বসু, অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফির মতো অভিনেতারাও জড়িয়ে ছিলেন বিনোদিনীর জীবনে। এঁরাই ছিলেন বিনোদিনীর বৃহত্তর পরিবার। এঁদের সঙ্গে মিশে বিনোদিনী একরকম ঠিকই করেছিলেন, আর তিনি বড়লোক বাবুদের রক্ষিতা হয়ে থাকবেন না। দু’টি সম্পর্ক ওঁর ব্যর্থ হয়। তারপরেও তিনি গুর্মুখ রায়কে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, কারণ, গুর্মুখ অবাঙালি, সংস্কৃতিসচেতন মোটেই ছিলেন না। গুর্মুখকে বড়লোকের রামবখাটে ছেলে বলা যায়। গুর্মুখকে গ্রহণ করতে বিনোদিনী কতকটা বাধ্যই হয়েছিলেন। গুর্মুখ বয়সেও ছোট ছিলেন বিনোদিনীর থেকে। তখন সে সবে গোঁফ-গজানো ছেলে। বিনোদিনী তাঁকে বলছেন, থিয়েটার বানিয়ে দিতে। তা না হলে, বিনোদিনীকে কোন জোরে পাবে গুর্মুখ? বিনোদিনীর ছিল প্রতিভার অবলম্বন, গুর্মুখের জোর ছিল টাকার। তবে, গুর্মুখ কিন্তু জানতে পারেননি, ‘বিনোদিনী থিয়েটার’ নামে রেজিস্ট্রেশনটা হচ্ছে না। বিনোদিনীকে গ্রুপের মিটিংয়ে ডেকে বলা হয়, তাঁর নামে থিয়েটার করলে থিয়েটার নাকি চলবে না। গিরিশ ঘোষের চরিত্র যদি খতিয়ে দেখা যায়, তাহলে দেখা যাবে, মহৎ প্রতিভার পাশাপাশিই সুবিধেবাদের নানা আভাস সেই জীবনে রয়েছে। হয়তো অন্য কেউ এই আঘাতটা বিনোদিনীকে করলে হয়তো তাঁর অতটা বাজত না। কিন্তু চূড়ান্ত আঘাতটা গিরিশচন্দ্রই দেন বিনোদিনীকে, তিনিই বলেন, ‘তোর নামে থিয়েটার করলে লোকে আসবে না বিনু।’ এই যুক্তিটা মানা সম্ভবই নয় এই কারণে, ‘য্যায়সা কা ত্যায়সা’, ‘কপালকুণ্ডলা’-র বিনোদিনীকে যেমন লোকে গ্রহণ করেছে, তেমনই এই গিরিশচন্দ্রই তো তাঁকে দিয়ে দু’বার চৈতন্যও করিয়েছেন। দেবতাতুল্য চরিত্রে যদি বিনোদিনীকে সাধারণ মানুষ মেনে নিয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর নামে থিয়েটার হলে মানুষ আসত না দেখতে! এটা যুক্তিগ্রাহ্যই নয়। রামকৃষ্ণ পরমহংস বিনোদিনীকে আশীর্বাদ করেছিলেন, এ তো ঐতিহাসিক ঘটনা। কিন্তু যে সাধারণ মানুষ, যাঁরা গাঁটের কড়়ি খরচ করে বিনোদিনীকে দেখতে যেতেন, তাঁদের শিখণ্ডী খাড়া করে এত বড়় বিশ্বাসঘাতকতাটা কি করা চলে! আসল কথা কি এই, বিনোদিনীর নামে থিয়েটার হলে তা আসলে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন হত, যা গিরিশরা চাননি? এ-কথাও জানা যায়, বিনোদিনী ধীরে-ধীরে খুবই দাম্ভিক হয়ে উঠছিলেন। সেই দম্ভ, সেই স্পর্ধা মাঝেমধ্যে গিরিশকেও ছাড়িয়ে যেত। তাই হয়তো, গিরিশও চাননি বিনোদিনী আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠুন। তাই তিনি সহজেই বিনোদিনীকে পরিত্যাগ করেছিলেন। বিনোদিনী যে থিয়েটার ছেড়ে দিয়েছিলেন, তার মূল কারণ তাঁকে ক্রমশ প্রধান চরিত্র থেকে সরিয়ে এনে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করানো হচ্ছিল।

থিয়েটার ছেড়ে এক ধনীমানী ব্যক্তির সঙ্গে ‘সংসার’ শুরু করল বছর তেইশের বিনোদিনী, একটি মেয়েও হল তার। মধ্যচল্লিশে ফের বিপর্যয়, ১৩ বছরের কন্যা মারা গেল। পরপর চলে গেলেন জীবনসঙ্গী, গুরু গিরিশ। শোকের আঘাতে জীবনের সব খেদ, আক্ষেপ যেন দলা পাকিয়ে উঠে এল কলমে – ‘‘ইহা কেবল অভাগিনীর হৃদয়-জ্বালার ছায়া! এ পৃথিবীতে আমার কিছুই নাই, শুধুই অনন্ত নিরাশা, শুধুই দুঃখময় প্রাণের কাতরতা।’’ আর এই প্রথম লাইনেই প্রকাশিত হয়ে পড়ে বিনোদিনীর সত্য পরিচয়, যা বিনোদিনী নিজেও হয়তো টের পায়নি, দাবিও করেনি। জীবনের উনপঞ্চাশতম বছরে বিনোদিনী চিনিয়ে দিল, সে এক অসামান্য লেখক। পাঠককে ঘাড় ধরে গোটা একটা লেখা পড়িয়ে নেওয়ার ক্ষমতা খুব কম লেখকের থাকে। বুকে মোচড় দেওয়ার শক্তি থাকে হাতে-গোনা কয়েকজনের। একত্রিশ বছরের জীবনসঙ্গীর অকস্মাৎ মৃত্যুর আঘাতের যে বর্ণনা বিনোদিনী দিয়েছেন, বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি তার তুলনা মেলে না—‘‘পৃথিবীর ভাগ্যবান লোকেরা শুন, শুনিয়া ঘৃণায় মুখি ফিরাইও। আর ওগো অনাথিনীর আশ্রয়তরু, স্বর্গের দেবতা, তুমিও শুন গো শুন। দেবতাই হোক আর মানুষই হোক, মুখে যাহা বলা যায় কার্যে করা বড়ই দুষ্কর। ভালবাসায় ভাগ্য ফেরে না গো, ভাগ্য ফেরে না!! ওই দেখ চিতাভস্মগুলি দূরে দূরে চলে যাচ্ছে, আর হায়-হায় করিতেছে।’’ এ যদি গুমরে-ওঠা কান্না হয়, তো রয়েছে বুক-ফাটা আর্তনাদও— ‘‘ওগো! আমার আর শেষও নাই, আরম্ভ নাই গো! … আর তো একেবারে মৃত্যু হবে না গো, হবে না! এখন একটু একটু করিয়া মৃত্যুর যাতনাটিকে বুকে করিয়া চিতাভস্মের হায়-হায় ধ্বনি শুনিতেছি!’’ যেকোন সাহিত্য সমালোচককে এই লেখা নিয়ে সমালোচনা করতে বললে হলফ করে বলা যায় তিনি বলবেন না এটি বিনোদিনীর প্রায় প্রথম গদ্য লেখা। অদ্ভুত এক ঐশ্বরিক ক্ষমতায় বিনোদিনী তৈরি করে নিয়েছে নিজের ভাষা, যা একান্ত মেয়েলি মুখের ভাষা অথচ বলিষ্ঠ, সতেজ। ফের ৬২ বছর বয়সে বিনোদিনী যখন ‘আমার অভিনেত্রী জীবন’ লিখছেন, তখন তাঁর ভাষা চলিত বাংলা, লেখনী আরও ঝরঝরে, গল্প বলার ভঙ্গি সরস। গরুর গাড়ির উপর বাঘ কেমন হামলা করেছিল, বাঁদরেরা কেমন ঘিরে ধরে খাবার কেড়ে নিয়েছিল, কিংবা ট্রেনে মুমূর্ষু সঙ্গীকে এক ফোঁটা জল দিতে না পেরে কীভাবে বুকের দুধ নিয়ে তার মুখে দিয়েছিলেন দলেরই এক মহিলা, সে সব ছবির মতো মনে গেঁথে যায় একটি বার পড়লেই। অথচ বিনোদিনীর লেখা কোনও ভাল পত্রপত্রিকায় বেরোয়নি। রবীন্দ্রনাথের চাইতে দু’বছরের ছোট, একই বছরে দু’জনের মৃত্যু। কলকাতায় দু’জনের বাসগৃহের দূরত্ব মেরেকেটে দু’ কিলোমিটার। কিন্তু সামাজিক দূরত্ব অকল্পনীয়। থিয়েটার থেকে প্রতারিত হয়ে বিদায় নেবার পর দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন।কিন্তু বাংলা সাহিত্যের একাডেমিক ইতিহাস একথা উল্লেখ করতে কুন্ঠিত হয় আজও। হয়ত বারাঙ্গনা থেকে সম্রাজ্ঞী হওয়া নারীর রচনা বলে!

বাংলা নাট্যাভিনয়ের আদিপর্বের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী বিনোদিনী সম্পর্কে একালে আমরা কিছুই জানতে পারতাম না যদি না বিনোদিনী রঙ্গমঞ্চের সঙ্গে সংস্রব ত্যাগ করার ছাব্বিশ বছর পরে তিনি নিজের দুটো আত্মজীবনীতে নিজেকে সম্পূর্ণ উজাড় করে না দিতেন। এমনটা আরও অনেক অভিনেত্রীর সঙ্গেই হয়তো ঘটে বা ঘটেছে, কিন্তু তাঁদের আত্মকথা না থাকার দরুন তা অজানাই থেকে যায়। বিনোদিনী এখানেই অসাধারণ হয়ে রয়ে গেলেন। ‘আমার কথা’ ও ‘আমার অভিনেত্রী জীবন’— এই দুই আত্মজীবনীর মধ্যে এক যুগেরও বেশি সময়ের তফাত। বিনোদিনীর ‘আমার কথা’ পরপর দু’বছর (১৯১২-১৩) বেরিয়ে নিঃশেষিত। দ্বিতীয় জীবনীতে বিনোদিনী আরও ক্ষুরধার ও শাণিত। তখন আর কাউকেই তিনি পরোয়া করেন না। অনেকেই খেয়াল করেন না, এটির প্রকাশক হিসেবে নাম যাচ্ছে, নির্মলচন্দ্র চন্দ্র ও জনৈক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের। অনেক নাট্য গবেষকই মনে করেন, এই শরৎচন্দ্র এক নাট্য প্রযোজক। কিন্তু গোপালচন্দ্র রায়ের লেখা শরৎচন্দ্রর জীবনী থেকে আমরা আবার দেখি, ‘রূপ ও রঙ্গ’ নামে যে-পত্রিকায় এই আত্মজীবনী প্রকাশিত হয়েছিল, তার সম্পাদক এককালে ছিলেন কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। এমনকী, শরৎচন্দ্রর ব্যক্তিগত অনুরোধেই বিনোদিনী দ্বিতীয় পর্বের জীবনী লিখতে শুরু করেন। মাঝপথে সেই লেখা বন্ধও করে দেন, কেন বন্ধ করেন, তার কোনও বিজ্ঞপ্তি ওই পত্রিকায় কিন্তু পাওয়া যায়নি। বিনোদিনী সে-সময়ে হয়তো কিছুটা ভারসাম্যও হারাচ্ছেন। যাঁর সঙ্গে প্রায় ১৭ বছর থেকেছেন, তাঁর সঙ্গে এক কন্যাও হয়, যাঁর নাম তিনি রেখেছিলেন শকুন্তলা। ভেবে দেখলে, মহাভারতে শকুন্তলাও অবৈধ সন্তান। শেষ যে বাড়িতে তিনি এসে উঠলেন, তা থেকে স্টার থিয়েটারের বাড়ির ছাদ দেখা যেত! অহীন্দ্র চৌধুরীর স্মৃতিকথায় রয়েছে, ‘বিনোদিনী প্রায়ই থিয়েটার দেখতে আসতেন, যথেষ্ট বৃদ্ধা হয়েছেন, কিন্তু থিয়েটার দেখবার আগ্রহটা যায়নি। নতুন বই হলে তো উনি আসতেনই…’ শোনা যায়, স্টার থিয়েটারের দারোয়ানদের নির্দেশ দেওয়া ছিল, উনি যখনই আসুন, যেন ঢুকতে দেওয়া হয়। কেননা সকলেরই জানা ছিল, এই মানুষটি না থাকলে স্টার থিয়েটার হতই না। এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হয়?

ভাগ্যের কি করুণ পরিহাস! সম্রাজ্ঞীকে লাঞ্ছিত হতে হল নিয়তির কাছে! ১৯৪১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ৭৯ বছর বয়সে তার মৃত্যুর পর এক লাইনও লেখেনি কোনও কাগজ। তবুও এই কথা বলা যায় মৃত্যু তাঁকে শান্তি দিল। লেডিজ গ্রীনরুমের আড়াল থেকে বেরিয়ে নারীর অধিকার দাবী করা বিনোদিনী দিন ফিরিবার নয়। তাঁর লেখা কবিতাতেই বলতে হয় —

অবসাদ

বিষাদে ফুলের মালা গাঁথিছে কিরণবালা

ঘুমায়ে ঘুমায়ে বহে মলয় পবন।

বসিয়া অবশ কায় যামিনী জাগিয়ে যায়

ঢুলু ঢুলু করে সব তারার নয়ন।।

 

শরৎ-চাঁদের হাসি মেঘের কোলেতে আসি

আপনা আপনি সব যেতেছে নিবিয়া।

কমলদলের পরে খেলে নাকো মধুকরে

তরঙ্গে তরঙ্গে তারা যেতেছে ভাঙ্গিয়া।।

 

কোকিলেতে গান গায় প্রাণ যেন ভেঙ্গে যায়,

হাসিব ভাসিব বলে কাঁদিয়া আকুল।

নিকুঞ্জে ফুলের রাশি হাসিয়া অবশ হাসি

ঝরে ঝরে পড়ে গেল সব ফোটা ফুল।।

 

যার যে মাধুরী ছিল সব তারা নিয়ে গেল

ফেলে রেখ গেল শুধু অশ্রুমাখা হাসি।

অবশেষে যেবা ছিল হাসিটি কুড়ায়ে নিল

বিনিময়ে দিয়ে গেল বিষাদের রাশি।।

 

হাসি কান্না ক’রে শেষ তারা গেছে কোন দেশ

আমারে রাখিয়ে গেছে না দেখিতে পেয়ে।

পাব না তাদের দেখা আমি শুধু আছি একা

কুটীর-দুয়ারে বসে অশ্রুপানে চেয়ে।।

তথ্যসুত্রঃ

আমার কথা, বিনোদিনী দাসী, ১৩২০, কলকাতা। বিনোদিনী সমগ্র, সম্পাদনা- বুলবুল চৌধুরী, ২০০৮, সময়, ঢাকা। বাংলা থিয়েটারের ইতিহাস, দর্শন চৌধুরী। পুস্তক বিপনী, কলকাতা। নটী বিনোদিনী রচনাসমগ্র— বিনোদিনী দাসী (সম্পাদনা : আশুতোষ ভট্টাচার্য, সাহিত্য সংস্থা, ১ বৈশাখ ১৩১৪)। ইতিহাসের ক্ষত ও বিনোদিনী, শিবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। নিজেরে হারায়ে খুঁজি, অহীন্দ্র চৌধুরী। তিনকড়ি, বিনোদিনী ও তারাসুন্দরী- উপেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষন। রঙ্গালয়ে রঙ্গনটী- অমিত মৈত্র। বরণীয়াদের পদপ্রান্তে, সম্পাদনা-শিবানী চট্রোপাধ্যায়, সেবিকা প্রকাশন, ২০০৩, কলকাতা। নটী বিনোদিনী,মণিকা মুখার্জী। বিশ্বাস সুখেন্দু,ভারতীয় সমাজ ও পতিতার ক্রমবিকাশ, রে : ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ মাল্টি ডিসিপ্লিলিনারি স্টাডিজ, দ্বিতীয় খণ্ড, অক্টোবর ২, ২০১৭। বন্দোপাধ্যায়, ব্রজেন্দ্রনাথ,বঙ্গীয় নাট্যশালার ইতিহাস (১৭৯৫-১৮৭৬) দ্বিতীয় মুদ্রণ, কলকাতা : করুণা প্রকাশনী। ডিসেম্বর ২০১৯। আনন্দবাজার পত্রিকা। সংবাদ প্রতিদিন। Rakshit, Moloy, Communication Through Public Stage : A Study In 19TH Century Bengali Theatre : Global Media Journal Edition, Volume 4, Winter Issue, December 2013 .। Gooptu, Sarvani, Theatre And Society : The Response Of Bengali Society To The Actress In Public Theatre In The Late 19TH To Early 20TH Century : Global Media Journal Edition, Volume 4, Winter Issue, December 2013 .। Dasi, Binodini, My Story and My Life As An Actress, edited and translated by Rimli Bhattacharya . Delhi, Kali For Women, 1998 .

পেজফোরনিউজ ২০২৫ পুজা সংখ্যায় প্রকাশিত


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন