৪৫. কলকাতার রথসচাইল্ড মতিলাল শীল
বউবাজারের বাইজি হীরা বুলবুলের ছেলেকে নিয়ে হই হই কাণ্ড কলকাতায়। ১৮৫৩ সালের কথা। হীরা বুলবুল তার ছেলেকে ভর্তি করিয়েছে হিন্দু কলেজে। তাই নিয়ে হই হই। কেন এক বাইজির ছেলে পড়বে এই কলেজে? যেখানে উচ্চবর্ণের ছেলেরা পড়ে! ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায় লেখা হল, ‘কী আক্ষেপ! যবন ও খ্রিস্টান এই দুই দোষ ছিল, এই ক্ষণে বেশ্যাপুত্র আসিয়া ত্রিদোষ প্রাপ্ত করাইল…’।
ঘটনাটা দাগ কাটল এক ব্যবসায়ীর মনে। হতে পারে বাইজির সন্তান। তা বলে সে পড়তে পারবে না হিন্দু কলেজে! মানুষের অধিকারের মৌলিক প্রশ্নে বিচলিত হলেন সেকালের সেই ধনী ব্যবসায়ী।
এই ব্যবসায়ীর নাম মতিলাল শীল (১৭৯২-১৮৫৪)।
মতিলালের পূর্বপরুষেরা বিহারের রামগড় থেকে ব্রহ্মপুত্রতীরস্থ সুবর্ণগ্রাম হয়ে চলে আসেন হুগলির সপ্তগ্রামে। স্বর্ণব্যবসায়ী ছিলেন তাঁরা। মতিলালের পিতা চৈতন্যচরণ শীল সপ্তগ্রাম থেকে কলকাতার কলুটোলা অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন। কাপড়ের ব্যবসা ছিল তাঁর। কিন্তু যখন মতিলালের মাত্র পাঁচ বৎসর বয়েস, তখন মৃত্যু হল চৈতন্যচরণের। তাই মতিলাল পড়াশুনোর সুযোগ পেলেন না।
জীবিকার সন্ধানে তাঁর যাত্রা শুরু হয় ১৮১৫ সালে।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে গুদাম সরকারের চাকরি পেলেন মতিলাল। শুধু চাকরি নয়, বাড়তি আয়েরও ব্যবস্থা হল। শ্বশুরমশায়ের পরামর্শে তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরবরাহ করতে লাগলেন। তারপর বালিখালের কাস্টমস দারোগার চাকরি। মতিলাল সন্তুষ্ট নন। চাই নিজের ব্যবসা।
১৮১৯ সালে একটা সুযোগ এল। কম দামে খালি বোতল কিনলেন। বেশি দামে সেগুলি বিক্রি করে দিলেন বিয়ার কোম্পানির মিঃ হাডসনের কাছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন কোম্পানির — যেমন স্ট্যাণ্ড ফ্লাওয়ার মিল, মেসার্স লিচ কেটেল অয়েল, লিভিংস্টোন সাইরেসেস অ্যাণ্ড কোং, টুলো অ্যাণ্ড কোং, চ্যাপম্যান কোং — বেনিয়ান হিসেবেও অর্থ উপার্জন করেন তিনি।
এরপরে তিনি নেমে পড়লেন আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে। বিদেশি জাহাজের প্রধানরা আমদানি করা জিনিস বিক্রি করার জন্য নির্ভর করতেন মতিলালের উপর। মতিলাল দেশীয় বাজার থেকে তাঁদের কমদামে জিনিসপত্র কিনে দিতেন। তার মানে তিনি হয়ে উঠলেন দেশীয় ও বিদেশীয় বাণিজ্যিক লেনদেনের নির্ভরযোগ্য যোগসূত্র।
এরপর তিনি নিজে শুরু করলেন আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য। দ্বারকানাথ ঠাকুর, রামদুলাল দে, নিমাইচরণ দত্ত, প্রাণকৃষ্ণ লাহা, অক্রূর দত্ত, সাগরলাল দত্ত আর মতিলাল শীল নেমে পড়লেন সেই কাজে। মতিলাল ইউরোপে নীল,. রেশম, চিনি, চাল রপ্তানি করলেন ; সেখান থেকে আমদানি করলেন লোহা, সুতির পোশাক।
এভাবে প্রচুর অর্থ উপার্জিত হল। তারপর পণ্যবাহী জাহাজের বাজারে প্রবেশ করলেন তিনি। অতীতের গৌরব ফিরিয়ে আনলেন তিনি। বাংলার বণিকরা অতীতে যে বহির্বাণিজ্যে সার্থক ছিলেন তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি হিউয়েন সাং, মেগাস্থিনিস, ইবন বতুতা, অলবিরুনির বিবরণ থেকে। মতিলালও বহির্বাণিজ্যে নেতৃত্ব দিলেন। ১২/১৩টি জাহাজের মালিক হলেন। নিজে তৈরি করলেন জাহাজ। তিনিই প্রথম কলকাতার অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের জন্য বাষ্পচালিত জাহাজ ব্যবহার করেন।
মতিলাল শীলেরা ব্যবসা-বাণিজ্যের জগতে যে সাফল্য অর্জন করেছিলেন, তা কিন্তু অব্যাহত ছিল না। বাঙালি বণিকদের জায়গা দখল করে নেন রাজস্থানি ও গুজরাটি বণিকরা। তাঁরা ইউরোপীয় বণিকদের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ভারতের সবচেয়ে কেন্দ্রীভূত বাজার ছিল কলকাতার বড়বাজার ; সেই বড়বাজার সুবর্ণ বণিক ব্যবসাদারদের হাত থেকে মাড়োয়ারিদের হাতে চলে যায়। তখনকার রাজশক্তি বাঙালিকে জব্দ করার জন্য মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীদের পক্ষাবলম্বন করে। এর ফলে অন্যান্য বাঙালি ব্যবসায়ীর মতো মতিলাল শীলও ব্যবসা গুটিয়ে নেন। জমিদারি কেনেন মঙ্গলঘাট, বাগনান, মহিষাদলে। কলকাতায় বাড়ি কিনে বা বাড়ি তৈরি করে রোজগারের চেষ্টা করেন।
ব্যবসা করে অর্থ উপার্জনই একমাত্র লক্ষ্য ছিল না মতিলাল শীলের। দেশের ও দশের কথা তিনি ভাবতেন। তখনকার প্রগতিশীল আন্দোলনে তিনি যুক্ত হন। সতীদাহ প্রথা বন্ধ করার জন্য তিনি রামমোহন রায়ের পাশে দাঁড়ান। বিধবাদের দুঃখ মোচনের জন্য ‘সাহায্য ভাণ্ডার’ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। সমর্থন করেন বিধবা বিবাহ। চিকিৎসাবিজ্ঞানে ছাত্রদের আগ্রহ সৃষ্টির জন্য পরিতোষিক বিতরণের জন্য তিনি ১ লক্ষ টাকা দান করেন। লক্ষ মুদ্রা বার্যিক ব্যয়ে ডাঃ ওসাগ্রসী সাহেবের অধীনে গর্ভবতী স্ত্রীলোকদের উপকারার্থে তিনি এক অস্থায়ী চিকিৎসালয় স্থাপন করেন। শীলস ফ্রি কলেজ তাঁরই সৃষ্টি ; যে কলেজের ছাত্র ছিলেন ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার আদিত্যনাথ মুখোপাধ্যায়, প্রেসিডেন্সি কলেজের গণিত বিভাগের প্রধান সুরেন্দ্রনাথ দাস, প্রখ্যাত চিকিৎসক মণি কুণ্ডু, ইসকন প্রতিষ্ঠাতা অভয়চরণ দে।
মতিলাল শীল তৎকালীন সময়ে এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল প্রশংসনীয়। তাঁর নামাঙ্কিত কলেজ (MuttyLall Seal’s Free College) আজও বর্তমান। পূর্বের জৌলুস এখন ম্রিয়মান। বর্তমান মেডিক্যাল কলেজের মূলভবন যে স্থানে তা ওনারই দান।
লেখাটির শুরুতে যে বুলবুল বাইজির পুত্রের হিন্দু কলেজে ভর্তির জন্য সমাজে যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল সে প্রসঙ্গে মতিলাল শীলের ভূমিকার কথা আরও স্পষ্ট হলে ওনার মানসিকতার পরিচয় আরও পরিষ্কার হত।
এই সিরিজের বিভিন্ন লেখা সংক্ষিপ্ত হলেও আগ্রহী মানুষজন তাঁদের সম্পর্কে আরও জানতে ইচ্ছুক হবেন, বিভিন্ন ভাবে তাঁদের সম্পর্কে জানতে নানাভাবে বিভিন্ন পুস্তক, তথ্য সংগ্রহ করবেন, তাতেই অনেক উপকার হবে। লেখকের উদ্দেশ্য সফল হবে মনে হয়।
লেখককে অনেক ধন্যবাদ।