প্রতি বছর হাজার হাজার ভক্তের সমাগমে মুখর হয়ে ওঠে আরামবাগের মনসাডাঙ্গার। দশহরাতে আরামবাগের মনসাডাঙ্গায় প্রাচীন মনসা মাতার পূজাকে ঘিরে আলাদা উন্মাদনা। শতাব্দী প্রাচীন এই পূজায় আচার অনুষ্ঠান আজও অমলিন। সাপের দেবীকে তুষ্ট করতে এবারেও আগামী ২৪ জুন এই দেবালয়ের সামনে ভক্তরা তাঁদের নৈবেদ্য সাজিয়ে মনোবাসনা পূর্ণ করবেন। তবে এবার ব্যতিক্রম হতে পারে ছাগবলি। কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবার থেকে ছাগবলি বন্ধ করা হবে এখানে।
প্রসঙ্গত, আরামবাগের মনসা ডাঙ্গায় মনসা মাতার পূজার ইতিহাস মূলত বাংলার লৌকিক নাগদেবী উপাসনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সাপের উপদ্রব থেকে রক্ষা, উর্বরতা বৃদ্ধি এবং মঙ্গল কামনায় স্থানীয়ভাবে বছরের পর বছর ধরে এই পূজা উদযাপিত হয়ে আসছে। পূজার ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করলে দেখা যাবে পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য অঞ্চলের মতো আরামবাগেও মনসা পূজা প্রধানত কৃষিজীবী ও গ্রামীণ সম্প্রদায়ের দ্বারা শুরু হয়েছিল। মধ্যযুগে মনসা মঙ্গলের কাহিনী এবং চাঁদ সওদাগর ও বেহুলার উপাখ্যানের মাধ্যমে এই অঞ্চলের লোকসমাজে দেবী মনসার মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়ে। কথিত আছে, মনসা ডাঙ্গা নামকরণের পেছনে জনশ্রুতি রয়েছে, প্রাচীনকালে ওই নির্দিষ্ট অঞ্চল বা ‘ডাঙ্গা’ (উঁচু জমি) এলাকাটি সর্পবহুল ছিল।

স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, মনসা মাতার কৃপাতেই তারা সর্পভয় ও অন্যান্য বিপদ থেকে রক্ষা পেতেন। বছরের অন্যান্য সময়ের পাশাপাশি, প্রধানত বাংলা শ্রাবণ সংক্রান্তি বা দশহরার মতো পবিত্র তিথিগুলোতে দেবী মনসার আরাধনা করা হয়। তবে অঞ্চলভেদে বিশেষ বিশেষ তিথিতেও এখানে পুজো সম্পন্ন হয়। এখানে মাটির প্রতিমায় বা সর্প-প্রতীক (অষ্টনাগ) এবং মনসা ঘটে পূজা দেওয়া হয়। মনসা ঘট মূলত উর্বরতা ও জীবনের প্রতীক হিসেবে পূজিত হয়।আরামবাগের এই মনসামাতা মন্দির ও ডাঙ্গায় আজও সাপের ভয় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে মুক্তির কামনায় মা মনসার নিত্য ও বার্ষিক পূজা মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয়।
উল্লেখ্য, আর মাসখানেক পড়েই দশহরা। এবারও ধূমধাম করে পূজা হবে। থাকবে না ছাগবলির রক্তের স্রোত। শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশে দেবীর আরাধনা। এখানকার পূজা কমিটির সেবাইতদের কোষাধ্যক্ষ আশীষ কুমার রায় জানান, এলাকার মানুষ চাইছিলেন যেভাবে বছরের পর বছর ছাগবলি বাড়ছে, তাকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। যেটা গুরুত্বপূর্ণ হল এখানকার বলি হাড়িকাঠে হয়না। ছাড় বলি। অর্থাৎ ঠাকুরের সামনাসামনি সিংয়ে সুতো ধরে কামার কোপ করেন। এখন সুতো ধরার ছেলে কমে যাচ্ছে, কোপ করতে গিয়ে সমস্যা হচ্ছে। তাই সেবাইতরা বৈঠক করে বলি প্রথা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আশীষবাবু আরও জানান, বছরের বিভিন্ন সময়ে পূজা দিতে আসেন। মানত করেন ছাগবলির। সপ্তাহে ২-৩ টা বলি হয়। ২৫০ বছর আগে তিনকড়ি হড়ের হাত ধরে তালপাতার ঘরে একটিমাত্র ছাগবলি দিয়ে মনসাপূজার সূচনা, আজও সেই পূজা আছে ও থাকবে।
এদিকে পাশ্ববর্তী মহেশপুরে শ্রী শ্রী ঠাকুরাণী রক্ষাকালীর ২৫০ বছরের বেশি পূজায় শতাধিক ছাগবলি এবছরও হবে। এখানকার প্রাচীন প্রথাকে ভাঙতে নারাজ কমিটি। গত বছরে মায়ের সামনে ৪০০ বলি হয়েছে। মানতে তুষ্ট এলাকার মানুষ।