শুক্রবার | ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | সকাল ৬:৫৯
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সিন্ধুসভ্যতা বিশেষজ্ঞ র‍্যান্ডাল ল’-র সুতকাগেনদোর-সফরের নির্যাস : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘পঞ্চাশ নম্বরে নাম’ ক্ষয়িষ্ণু পুরুষ লেখক সসীম কুমার বাড়ৈ আলোচক সুতপা দত্ত দাশগুপ্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতার হকার, উচ্ছেদ অভিযান, ইতিহাসের প্যারাডক্স : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিনোদিনী দিন ফিরিবার নয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আইসক্রিমের দারুন স্বাদে গরম হোক উধাও : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-এর ছোটগল্প ‘পদ্মপাতার জল’ নজরুলের চোখে ক্ষুদিরাম : শৌনক ঠাকুর ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ইতিহাসসাধক স্বদেশরঞ্জন মণ্ডল : দিলীপ মজুমদার এবারে দশহরাতে আরামবাগের মনসাডাঙ্গার মনসা মাতার পূজায় ছাগবলি বন্ধের সিদ্ধান্ত : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বরেন্দ্র ও গৌড়ীয় ব্রাহ্মণ সমাজের ইতিহাস, কুলপঞ্জি ও অভিলিখনের সমন্বয়ে একটি পুনঃপাঠ : অত্রি ভট্টাচার্য ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘ছেঁড়া জামার ঈশ্বর’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অশুভ শক্তির বিনাশ ও ভক্তের সুরক্ষায় নৃসিংহ চতুর্দশী : রিঙ্কি সামন্ত বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

অয়ন মুখোপাধ্যায়-এ ছোটগল্প ‘লেটার মিস’

অয়ন মুখোপাধ্যায় / ৯৬৪ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬

১৯৯৯ সাল। উচ্চমাধ্যমিকের ফল বেরোনোর দিন সন্ধেবেলা শ্যামবাজারের গলিতে অদ্ভুত একটা দৃশ্য দেখা গেল। প্রতিবেশীরা দলে দলে ছুটছেন মৃন্ময় চট্টোপাধ্যায়দের বাড়ির দিকে। সকলেই খবর পেয়েছেন সেখানে বিনামূল্যে রসগোল্লা বিতরণ হচ্ছে।

খবরটা অবশ্য তার চেয়েও মিষ্টি।

মৃন্ময় স্টার পেয়েছে। বিজ্ঞান বিভাগে।

সেবার প্রশ্ন ছিল এমন, পরীক্ষার্থীরা হল থেকে বেরিয়ে সরাসরি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কথা ভেবেছিল। তবু মৃন্ময় স্টার পেয়েছে। এ খবর শুনে পাড়ার লোকেদের মুখে এমন বিস্ময় ফুটল, যে তারা এইমাত্র জানতে পেরেছে নিউটনের আপেলটা আসলে মাটিতে পড়েনি, ওপর দিকেই উঠেছিল।

মৃন্ময়ের মা সরস্বতী বারান্দায় দাঁড়িয়ে লোকজনের ভিড় দেখলেন। বুকের ভেতর গর্ব জমছে। কিন্তু সেই গর্ব মুখ দিয়ে বেরোনোর আগেই মাথায় এলো একটা বিপজ্জনক প্রশ্ন।

প্রশ্নটা সাধারণত পশ্চিম বাংলার মায়েদের কমন কৌতুহল । আর এই কৌতুহল জাগলে সহজে নামে না।

তমুকের ছেলে-মেয়ে কত পেল?

তমুক অর্থাৎ বিপিন মাস্টারের মেয়ে ঈশিতা। মৃন্ময়দের পাড়াতেই থাকে। একই পাড়া একই ক্লাস একই বয়স। এবং জন্ম থেকেই মৃন্ময়ের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগী হওয়ার ভার বহন করে আসছে।

ঈশিতা নিজে অবশ্য এই প্রতিযোগিতার কথা জানে না। কারণ প্রতিযোগিতাটা আসলে দুই মায়ের মধ্যে। দুই সন্তান নিছক সেখানে দাবার ঘুঁটি।

পাড়ার কাকিমারা ঘরে ঢুকে মৃন্ময়ের গাল টিপে ধরলেন। এই বয়সে গাল টেপা একটু অপমান জনক হলেও কাকিমারা এটাকে স্নেহ বলেন। আর স্নেহের বিরুদ্ধে বাঙালি ছেলেদের কোনো সাংবিধানিক অধিকার নেই।

নীলিমা কাকিমা বললেন, “কী রে মৃন্ময়, স্টার পেয়েছিস? এই প্রশ্নে? বাবাঃ! তোর বাবা কিন্তু ম্যাট্রিকে থার্ড ডিভিশন পেয়েছিল, মনে আছে সরস্বতী?”

সরস্বতীর মুখে হাসি আর অস্বস্তির এক অদ্ভুত মিশেল ফুটে উঠল। স্বামীর থার্ড ডিভিশনের কথা যে পাড়া এখনো মনে রেখেছে, সে পাড়ায় বসবাস করা সত্যিই একটা সাহসিকতার কাজ।

সরস্বতী বললেন, “হ্যাঁ, স্টার পেয়েছে। তবে ফিজিক্সে লেটার পেলে আরো ভালো হতো। ঈশিতা কত পেয়েছে শুনলাম?”

ঘরের হাসিঠাট্টা মুহূর্তে থেমে গেল।

যারা উপস্থিত ছিলেন, তাঁরা নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করলেন। মৃন্ময় মনে মনে ভাবল, মা একটু আগেও জানতেন না ঈশিতা কত পেয়েছে। অথচ প্রশ্নটা এমনভাবে করলেন, যেন ঈশিতার নম্বরটাই এখন রাষ্ট্রপতির জরুরি বার্তা।

খবর এলো — ঈশিতা স্টার পেয়েছে। টোটালে মৃন্ময়ের চেয়ে পাঁচ নম্বর বেশি। এবং ফিজিক্সে লেটার আছে।

এই পাঁচ নম্বর শুনে সরস্বতীর মুখে যে ভাব ফুটে উঠল, তা দেখে মনে হলো পাঁচ নম্বর নয়, পাঁচশো নম্বরের ব্যবধান হয়েছে।

ঘরে যারা আদর করতে এসেছিলেন, তাঁদের হঠাৎ মনে পড়ল রান্নাঘরে গ্যাসে দুধ চাপানো আছে। কারও মনে পড়ল রাস্তায় ছেলেকে রেখে এসেছেন। কারও মনে পড়ল পাশের বাড়িতে একটু দরকার আছে।

তাঁরা এমন দ্রুতগতিতে বিদায় নিলেন যে মৃন্ময়ের মনে হলো, তাঁরা বোধহয় আগে থেকেই জানতেন এরকম হবে। তাই পালানোর রাস্তা ঠিক করে রেখেছিলেন।

মৃন্ময়ের মা বললেন,

“একই প্রশ্নে দুজন পরীক্ষা দিয়েছিস। ঈশিতা ফিজিক্সে লেটার পেল, তুই পেলি না—এটা কী করে হয়?”

মৃন্ময় বলল, “মা, একই প্রশ্নে দুজন পরীক্ষা দিলেই একই নম্বর পাওয়া যায় না। নইলে পরীক্ষাই হতো না, লটারি হতো।”

সরস্বতী বললেন, “বেশি বুদ্ধি দেখাস না। ঈশিতা কি তোর চেয়ে বেশি পড়েছিল?”

মৃন্ময় বলল, “সেটা তো আমি জানি না মা। তুমি ওর মাকে জিজ্ঞেস করো।”

এবার সরস্বতী স্বামীর দিকে তাকালেন।

“তোর বাবাকে দেখ। সারা জীবন বলে এসেছে, ‘আমি ঠিক করে দেব।’ ফিজিক্সে লেটার দিতে পারল না?”

মৃন্ময়ের বাবা নিবারণ চট্টোপাধ্যায় এতক্ষণ খবরের কাগজের আড়ালে বসে ছিলেন। তিনি সাবধানী মানুষ। ঘরে ঝড় উঠলে খবরের কাগজ টাকে চমৎকার একটা বাংকার হিসেবে কাজে লাগিয়ে নেন।

কিন্তু নিজের নাম শুনে কাগজ নামাতে হলো।

নিবারণ বাবু বললেন, “আমি? আমি কী করলাম? আমি তো পরীক্ষা দিইনি!”

সরস্বতী বললেন, “তুমি বলেছিলে ছেলে ঠিকঠাক পড়ছে। ঠিকঠাক পড়লে ফিজিক্সে লেটার আসত।”

নিবারণ বাবু কিছু বলতে গিয়ে থামলেন। বহু বছরের দাম্পত্য অভিজ্ঞতায় তিনি শিখেছেন — এই মুহূর্তে যা-ই বলবেন, সেটাই ভুল হবে।

তিনি আবার কাগজ তুললেন।

কাগজের ওপারে তাঁর মুখে এমন একটা ভাব ছিল, যেন তিনি মনে মনে বলছেন — “এই কাগজটাই আমার একমাত্র বন্ধু।”

সেই রাতে মৃন্ময় ঘরে বসে ভাবল, সে স্টার পেয়েছে। উচ্চমাধ্যমিকে। বিজ্ঞানে। সেই দুর্ধর্ষ প্রশ্নে।

এটা কি কম কথা?

কিন্তু ঘরের পরিবেশ দেখে মনে হচ্ছে, সে ফেল করেছে। এবং বাড়তি অপরাধ হিসেবে পাঁচ নম্বর কম পেয়ে পাড়ার মুখ পুড়িয়েছে।

পরদিন সকালে ঈশিতার মা মিষ্টি নিয়ে এলেন। দুই বাড়িতেই স্টার। মিষ্টি দেওয়া নেওয়া করা স্বাভাবিক।

ঈশিতার মা বললেন, “সরস্বতীদি, দুই ছেলেমেয়েই স্টার পেয়েছে। বলো দেখি! কপাল ভালো আমাদের।”

সরস্বতী বললেন, “হ্যাঁ, তবে মৃন্ময়ের ফিজিক্সটা একটু কম হলো।”

ঈশিতার মা বললেন, “আরে দিদি, টোটালে তো প্রায় সমান। আর মৃন্ময়ের কেমিস্ট্রিতে ঈশিতার চেয়ে বেশি।”

সরস্বতী বললেন, “কেমিস্ট্রিতে বেশি পেলে কী হবে? ফিজিক্সে কম পেলে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হওয়া যায়?”

মৃন্ময় পাশ থেকে ভাবল, মা জানেন না যে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তিতে কেমিস্ট্রিও লাগে। কিন্তু এই মুহূর্তে এই তথ্যটি জানানো যাবে না। সেটা হবে আগুনে ঘি ঢালা।

আর পশ্চিমবাংলার সংসারে অনেক বিপ্লব জ্ঞানের অভাবে থেমে থাকে না। সময়জ্ঞান থাকার কারণে থেমে যায়।

সাত বছর কেটে গেল।

মৃন্ময় ইঞ্জিনিয়ার হলো। চাকরি পেল। ভালো মাইনে। অফিসে তার কদর আছে। আত্মীয়রা ফোন করে পরামর্শ নেয়। পাড়ার লোকেরা এখন তাকে “আমাদের মৃন্ময়” বলে পরিচয় করায়।

শুধু সরস্বতী মাঝে মাঝে বলেন, “ফিজিক্সে লেটার থাকলে আরো ভালো কোম্পানিতে যেতে পারতিস।”

মৃন্ময় বুঝল, এই বাক্যটা মায়ের জীবনে একটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়ে গেছে। যেমন কালীপুজোর আগে বাড়ি রং করা হয়, তেমনই সুযোগ পেলেই ফিজিক্সে লেটার না পাওয়ার স্মৃতি নতুন করে রং করা একটা স্বাভাবিক ঘটনা।

এদিকে ঈশিতাও ভালো করেছে। ডাক্তার হয়েছে। পাড়ায় তার সুনাম। কেউ জ্বর হলে ঈশিতার কথা ওঠে। কেউ প্রেসার মাপলে ঈশিতার কথা ওঠে। কেউ বেশি মিষ্টি খেলে ঈশিতার কথা ওঠে।

পাড়ার কাকিমারা বলেন, “ঈশিতা ডাক্তার হয়েছে।”

এই কথা সরস্বতীর কানে পৌঁছালে তিনি বলেন, “ইঞ্জিনিয়ারিংও কিন্তু কম কঠিন নয়।”

কিন্তু কণ্ঠে একটু জোরের অভাব থাকে।

ডাক্তারি পেশার সামনে বাঙালি মায়েরাও একটু থমকে যান। কারণ শরীর খারাপ হলে ইঞ্জিনিয়ারকে ডাকা যায় না। কিন্তু ডাক্তারকে ডাকা যায়। এই বাস্তবতা বড় নির্মম।

সেই বছর শীতের সন্ধ্যায় দরজায় টোকা পড়ল।

সরস্বতী দরজা খুললেন। দরজায় ঈশিতা। পরনে হালকা শাড়ি। চোখে অস্বস্তির হাসি। পাশে তার মা। হাতে মিষ্টির বাক্স।

ঈশিতার মা একটু লজ্জা লজ্জা মুখে বললেন, “সরস্বতীদি, একটা কথা বলতে এলাম।”

সরস্বতী বললেন, “বলুন না।”

ঈশিতার মা বললেন, “ঈশিতা মৃন্ময়কে পছন্দ করে। মানে ছোটবেলা থেকেই। যদি তোমরা রাজি থাকো, আমরা বিয়ের কথা বলতে চাই।”

সরস্বতী এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন।

মৃন্ময় পেছন থেকে দেখল মায়ের মুখের ভাব। প্রথমে বিস্ময়। তারপর একটু হিসেব। তারপর সেই চিরপরিচিত ভঙ্গি, যেটা দেখলে বোঝা যায়, এবার এমন কিছু বলা হবে যাতে ঘরের জলও শুকিয়ে যেতে পারে।

সরস্বতী খুব গম্ভীর মুখে বললেন,

“দেখো, ঈশিতা ভালো মেয়ে, সে নিয়ে কথা নেই। কিন্তু উচ্চমাধ্যমিকে তো তোমার মেয়ে আর আমার মৃন্ময়ের মধ্যে তেমন তফাৎ ছিল না। আমি ভেবেছিলাম আরো বিদুষী কাউকে খুঁজব মৃন্ময়ের জন্য।”

ঘরে নিস্তব্ধতা নামল।

ঈশিতা যে এতক্ষণ সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সে হঠাৎ যেন একটু ছোট হয়ে গেল। তার মা হাতের মিষ্টির বাক্সটা শক্ত করে ধরলেন।

মৃন্ময় পেছন থেকে বলল। কণ্ঠে সে আজীবন লালিত ক্ষোভটুকু সংযত রাখার বহু চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো।

“মা, ঈশিতা ডাক্তার। তার চেয়ে বিদুষী কাউকে খুঁজতে গেলে নোবেল বিজয়িনী লাগবে। এবং নোবেল বিজয়িনীদের বিয়ে দেওয়ার জন্য সাধারণত পাড়ার কাকিমারা আসে না।”

সরস্বতী মৃন্ময়ের দিকে তাকালেন।

“তুই চুপ কর। তোর ফিজিক্সে লেটার নেই, তুই মতামত দিতে এসেছিস?”

মৃন্ময় থ হয়ে গেল।

সাত বছর পরেও — সাত বছর পরেও — ফিজিক্সের লেটার ফিরে এলো।

নিবারণ বাবু এবার খবরের কাগজ নামিয়ে রাখলেন। সংকটকালে নীরব থাকা তাঁর অভ্যাস। কিন্তু কিছু মুহূর্ত আসে, যখন নীরবতাও একটা বক্তব্য হয়ে যায়।

তিনি উঠে গিয়ে রান্নাঘরে চা বসালেন।

এটা ছিল তাঁর দীর্ঘ দাম্পত্যজীবনের সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

বিয়েটা অবশেষে হলো।

শেষ পর্যন্ত সরস্বতী রাজি হলেন। তবে শর্ত দিলেন, বিয়ের কার্ডে লেখা হবে — “মৃন্ময়ের পাত্রী নির্বাচনে তার মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম ও বিচক্ষণতা বিশেষভাবে স্মর্তব্য।”

এই শর্ত পরিবারের কেউ মানেনি। কিন্তু সরস্বতী বিষয়টি যাকে পাচ্ছেন, তাকেই জানিয়ে চলেছেন।

বিয়ের বাড়িতে মৃন্ময়ের বন্ধুরা বলল, “তুই তো ছোটবেলা থেকেই কেসটা সেট করে রেখেছিলি!”

মৃন্ময় বলল, “কেস আমি সেট করিনি। আমাদের মায়েরা নম্বর মিলিয়ে মিলিয়ে সংসার বানিয়ে দিয়েছেন।”

ঈশিতা পাশ থেকে বলল, “তবু দেখ, ফিজিক্সে আমার লেটারটা কাজে লাগল।”

মৃন্ময় বলল, “হ্যাঁ, সেটা না থাকলে মা হয়তো তোকে এখনো ওয়েটিং লিস্টে রাখতেন।”

ঈশিতা হেসে ফেলল।

বিয়ের রাতে মৃন্ময় ঈশিতাকে একটু আড়ালে ডেকে বলল, “তুই ডাক্তার, আমি ইঞ্জিনিয়ার, বিয়েটাও হয়ে গেল। এখন খুশি?”

ঈশিতা বলল, “খুশি। কিন্তু তোর মা বললেন, আমার টোটাল নম্বর তোর চেয়ে বেশি ছিল, তাও নাকি তেমন তফাৎ নয়। মানে আমি এখনো ঠিক বুঝলাম না, আমি পাস করলাম কিনা।”

মৃন্ময় বলল, “এটাই আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য। মায়েদের পরীক্ষায় কেউ কোনোদিন পুরো পাস করে না। আজ তুই বউ হলি, তবু এক্সামিনেশন শেষ হলো না।”

ঈশিতা একটু চুপ করে থাকল। তারপর বলল, “তোর মা এখন আমার শাশুড়ি হলেন?”

মৃন্ময় বলল, “হ্যাঁ।”

ঈশিতা বলল, “এবং তিনি জানতে পারবেন আমার প্রতিটা ব্যর্থতার কথা?”

মৃন্ময় বলল, “এবং সেগুলো উচ্চমাধ্যমিকের নম্বরের সঙ্গে তুলনা করবেন।”

ঈশিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

বাইরে শানাই বাজছে। ফুলের গন্ধ ভাসছে। নতুন সম্পর্কের আলোয় রাতটা উজ্জ্বল। তবু দুজনেই বুঝল, জীবনের কিছু পরীক্ষা আছে যার কোনো উত্তরপত্র নেই, কোনো পাসমার্ক নেই, এবং পরীক্ষক কোনোদিন সন্তুষ্ট হন না।

মৃন্ময় আরো একটু ভেবে বলল, “তবে একটা সান্ত্বনা আছে।”

ঈশিতা বলল, “কী?”

মৃন্ময় বলল, “মা এখন তোর নম্বর নিয়ে আমার সঙ্গে তুলনা করবেন না।”

ঈশিতা বলল, “তাহলে?”

মৃন্ময় বলল, “তোর সন্তানের সঙ্গে তুলনা করবেন। সমস্যাটা শুধু এক প্রজন্ম সরে গেল।”

ঈশিতা এবার সত্যিকারের হাসল।

ঠিক তখন রান্নাঘর থেকে নিবারণবাবুর গলা ভেসে এলো।

“চা দেব?”

মৃন্ময় আর ঈশিতা একসঙ্গে বলল, “দাও।”

নিবারণবাবু চা নিয়ে এলেন। মুখে কোনো বড় কথা নেই। কোনো উপদেশ নেই। কোনো বিচার নেই।

শুধু তিন কাপ চা।


আপনার মতামত লিখুন :

2 responses to “অয়ন মুখোপাধ্যায়-এ ছোটগল্প ‘লেটার মিস’”

  1. Lopamudra Seth says:

    দারুন দারুন

  2. Rina Pramanik says:

    আমার অন্যতম প্রিয় দাদাভাই অয়ন দাদার লেখা বললাম খুব ভালো লাগলো,

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন