
স্ট্রিং থিয়োরি নিয়ে দুই বাঙালি পদার্থবিজ্ঞানীর অবদান বিশ্বে গভীরভাবে সমাদৃত। তাঁরা হলেন অশোক সেন ও গৌতম মণ্ডল। যদিও অশোক সেন বহুপুরস্কারে ভূষিত ও বিশ্ববন্দিত পদার্থবিদ, গৌতম মণ্ডলও কিন্তু ধারে ও ভারে কম যান না।
এক.
ভূমিকা: মহাবিশ্বের অন্তিম রহস্য ও স্ট্রিং থিয়োরি
বিজ্ঞান দীর্ঘকাল ধরে এমন একটি সর্বগ্রাসী তত্ত্ব বা “থিওরি অব এভরিথিং” (Theory of Everything)-এর সন্ধান করে আসছে, যা মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রতম কণা থেকে শুরু করে বিশাল গ্যালাক্সি পর্যন্ত সবকিছুকে একই নিয়মে ব্যাখ্যা করতে পারবে। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব (General Relativity) মহাকর্ষ বল ও মহাজাগতিক বস্তুর গতিবিধি নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করে, আবার কোয়ান্টাম বলবিদ্যা (Quantum Mechanics) পরমাণুর ভেতরের অতিক্ষুদ্র জগতের নিয়ম নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই দুটি তত্ত্ব মৌলিকভাবে একে অপরের বিপরীত।
এই সংকট সমাধানের জন্য আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো স্ট্রিং থিয়োরি বা স্ট্রিং তত্ত্ব (String Theory)। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্বের মৌলিক উপাদান কোনো বিন্দু-সদৃশ কণা নয়, বরং অতি ক্ষুদ্র, কম্পনশীল শক্তির রেখা বা “স্ট্রিং”। এই স্ট্রিংগুলোর বিভিন্ন কম্পাঙ্কের ফলেই সৃষ্টি হয় ইলেকট্রন, কোয়ার্ক বা গ্র্যাভিটনের মতো বিভিন্ন কণা।
এই জটিল ও যুগান্তকারী গবেষণাক্ষেত্রে বিশ্বমঞ্চে ভারতের নাম উজ্জ্বল করেছেন যে কজন বিজ্ঞানী, তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য হলেন অধ্যাপক অশোক সেন এবং অধ্যাপক গৌতম মণ্ডল। এই প্রবন্ধে স্ট্রিং থিয়োরির দুনিয়ায় এই দুই প্রতিভাবান বাঙালির অবিস্মরণীয় অবদান ও বৈজ্ঞানিক কৃতিত্ব আলোচনা করা হলো।
দুই.
অধ্যাপক অশোক সেন: স্ট্রিং থিয়োরির পুরোধা
পরিচিতি ও প্রাথমিক জীবন
অশোক সেন (Ashoke Sen) ১৯৫৬ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। প্রেসিডেন্সি কলেজ ও আইআইটি কানপুর থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি আমেরিকার স্টোনি ব্রুক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ (TIFR)-এর অধ্যাপক ছিলেন এবং বর্তমানে হরিয়ানার হরিশচন্দ্র রিসার্চ ইনস্টিটিউট (HRI)-এর মাননীয় অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী।
সেন কনজেকচার (Sen’s Conjecture): স্ট্রিং থিয়োরির বড় বাঁক
১৯৯০-এর দশকের শেষভাগে অধ্যাপক সেন স্ট্রিং থিয়োরিতে একটি যুগান্তকারী ধারণা দেন, যা বৈজ্ঞানিক মহলে ‘সেন কনজেকচার’ (Sen’s Conjecture) নামে পরিচিত।
ট্যাকিয়ন কনডেন্সেশন (Tachyon Condensation): স্ট্রিং থিয়োরিতে এমন কিছু অস্থায়ী বা অনাবশ্যক কণার উপস্থিতি দেখা দিত যেগুলোকে ‘ট্যাকিয়ন’ বলা হতো। এই কণাগুলোর ভর কাল্পনিক হওয়ায় তত্ত্বটি অস্থির হয়ে পড়ত।
অশোক সেন গাণিতিক প্রমাণের মাধ্যমে দেখালেন কীভাবে এই ট্যাকিয়নগুলো ঘনীভূত হয়ে (condense) একটি স্থিতিশীল ও নিম্ন শক্তির দশায় পৌঁছাতে পারে।
তাঁর এই আবিষ্কার স্ট্রিং থিয়োরির “ডুয়ালিটি” (Duality) এবং ‘ডি-ব্রেন’ (D-Brane) ধারণাকে বুঝতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
স্ট্রিং ডুয়ালিটি (String Duality) ও এস-ডুয়ালিটি
পদার্থবিজ্ঞানে ডুয়ালিটি বা দ্বৈততা বলতে বোঝায় — দুটি সম্পূর্ণ আলাদা মনে হওয়া তত্ত্ব বা সমীকরণ যদি একই বাস্তবতাকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণনা করে।
অশোক সেন প্রথম দেখিয়েছিলেন যে, শক্তিশালী কাপলিং (Strong coupling) এবং দুর্বল কাপলিং (Weak coupling)-এর মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট গাণিতিক সম্পর্ক রয়েছে, যাকে এস-ডুয়ালিটি (S-duality) বলা হয়।
এর অর্থ হলো, যে জটিল সমস্যাগুলো দুর্বল বলের নিয়মে সমাধান করা অসম্ভব ছিল, এস-ডুয়ালিটির মাধ্যমে সেগুলোকে শক্তিশালী বলের ক্ষেত্রে সহজ উপায়ে সমাধান করা সম্ভব হলো। এই আবিষ্কার স্ট্রিং থিয়োরিকে একটি সুসংহত রূপ দিতে সাহায্য করেছিল।
ব্লাক হোল এন্ট্রপি এবং কোয়ান্টাম মাধ্যাকর্ষণ
কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাক হোলের থার্মোডাইনামিকস এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণায় অশোক সেনের অবদান অতুলনীয়। হকিং ও বেকেনস্টাইনের ব্ল্যাক হোল এন্ট্রপির সূত্রকে কোয়ান্টাম স্তরে নিখুঁতভাবে প্রমাণ করতে তিনি স্ট্রিং থিয়োরির সাহায্য নেন। তাঁর এই কাজ মহাকর্ষ ও কোয়ান্টাম বলবিদ্যার মেলবন্ধন ঘটানোর পথে অন্যতম প্রধান মাইলফলক।
আন্তর্জাতিক সম্মাননা
স্ট্রিং থিয়োরিতে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ২০১২ সালে বিশ্বের প্রথম ফান্ডামেন্টাল ফিজিক্স প্রাইজ (Fundamental Physics Prize) লাভ করেন। এছাড়া তিনি পদ্মভূষণ ও রয়্যাল সোসাইটির ফেলো (Fellow of the Royal Society) সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী ‘দ্য গার্ডিয়ান’ তাঁকে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানীদের একজন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তিনি ডিরাক মেডেলও পেয়েছেন। সম্প্রতি (২০২৬) পেয়েছেন অসকার ক্লেইন পুরস্কার।

তিন.
অধ্যাপক গৌতম মণ্ডল: কোয়ান্টাম মহাকর্ষ ও স্ট্রিং ডাইনামিকসের রূপকার
পরিচিতি ও পটভূমি
গৌতম মণ্ডল (Gautam Mandal) সমসাময়িক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি মূলত টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ (TIFR)-এর সঙ্গে যুক্ত থেকে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান ও স্ট্রিং থিয়োরির বিভিন্ন জটিল দিক নিয়ে গবেষণা করে চলেছেন। তাঁর গবেষণার মূল ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্ব (Quantum Field Theory), স্ট্রিং তত্ত্ব এবং ব্ল্যাক হোল পদার্থবিদ্যা।
কম-মাত্রিক স্ট্রিং থিয়োরি (Low-Dimensional String Theory) এবং ম্যাট্রিক্স মডেল
১০ বা ১১ মাত্রার মহাবিশ্বের পরিবর্তে কম মাত্রায় (যেমন ২ মাত্রা) স্ট্রিং থিয়োরি নিয়ে গবেষণা করা অনেক সময় গণিতের জটিলতা কাটাতে সাহায্য করে।
অধ্যাপক গৌতম মণ্ডল কম-মাত্রিক স্ট্রিং থিয়োরি এবং ম্যাট্রিক্স মডেল (Matrix Models) নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন।
তিনি এবং তাঁর সহকর্মীরা দেখিয়েছেন কীভাবে ম্যাট্রিক্স মডেলের সাহায্যে স্ট্রিং থিয়োরির গতিপ্রকৃতি এবং স্থান-কালের (Spacetime) কোয়ান্টাম রূপান্তরগুলো বোঝা সম্ভব।
তাঁর গবেষণা স্ট্রিং থিয়োরির নন-পার্টার্বেটিভ (Non-perturbative) দিকগুলোকে বুঝতে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
ব্ল্যাক হোল ইনফরমেশন প্যারাডক্স ও গেজ-গ্র্যাভিটি ডুয়ালিটি
বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের দেওয়া ব্ল্যাক হোল ইনফরমেশন প্যারাডক্স (ব্ল্যাক হোলে তথ্য চিরতরে হারিয়ে যায় কি না এই বিতর্ক) আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম বড় ধাঁধা।
গৌতম মণ্ডল এই ব্ল্যাক হোলের তাপগতিবিদ্যা এবং কোয়ান্টাম ইনফরমেশন থিওরি নিয়ে গভীর গবেষণা করেছেন।
তিনি ADS/CFT করসপন্ডেন্স এবং গেজ-গ্র্যাভিটি ডুয়ালিটির ক্ষেত্রটিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। তাঁর কাজ আমাদের বুঝতে সাহায্য করেছে কীভাবে মহাকর্ষ বল কোয়ান্টাম তথ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
স্থান-কালের উদ্ভব (Emergence of Spacetime) এবং কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্টের সম্পর্ক নিয়ে তাঁর কাজ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।
চার.
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে দুই বাঙালির যৌথ প্রভাব ও মেলবন্ধন
অশোক সেন এবং গৌতম মণ্ডল—উভয়েই ভারতীয় তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁদের কাজের মধ্যে বেশ কিছু সুন্দর মিল ও পরিপূরক বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়।
দুজনেই ভারতীয় তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণাগারগুলোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থেকে প্রমাণ করেছেন যে বিশ্বমানের গবেষণার জন্য উন্নত বিশ্বের ল্যাবরেটরির পাশাপাশি দৃঢ় মেধা ও তাত্ত্বিক সাধনা সবচেয়ে বেশি জরুরি।
ডুয়ালিটি ও ব্ল্যাক হোল নিয়ে ফোকাস: যেখানে অশোক সেন এস-ডুয়ালিটি ও ব্ল্যাক হোল এন্ট্রপির সঠিক গণিতে সিদ্ধহস্ত, সেখানে গৌতম মণ্ডল কম-মাত্রিক মডেল ও কোয়ান্টাম তথ্যের দিক থেকে বিষয়গুলোকে আরও গভীরে নিয়ে গেছেন। তাঁদের সম্মিলিত কাজ স্ট্রিং থিয়োরির ভিত্তি মজবুত করেছে।
পাঁচ.
বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রেক্ষাপট
আজকের দিনে স্ট্রিং থিয়োরি কেবল কিছু গাণিতিক সমীকরণের সমষ্টি নয়, বরং এটি মহাবিশ্বের বহু অজানা রহস্য উন্মোচনের চাবিকাঠি। সার্স (CERN)-এর লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার বা ভবিষ্যতের কণা ত্বরণকারীগুলো যখনই নতুন কণার সন্ধান করছে, তখন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীরা অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকেন সেন বা মণ্ডলের মতো বিজ্ঞানীদের তত্ত্বগুলোর দিকে।
স্ট্রিং থিয়োরির মাধ্যমে আমাদের মহাবিশ্ব যে আসলে বহু-মাত্রিক (Multi-dimensional) এবং স্থান-কাল নিছক কোনো ফাঁকা জায়গা নয়, বরং এক জটিল শক্তির জাল — এই সত্য প্রতিষ্ঠার পেছনে এই দুই বাঙালির অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
বিজ্ঞান সাধনা এক অন্তহীন যাত্রা। আলবার্ট আইনস্টাইন থেকে শুরু করে রিচার্ড ফাইনম্যান — সকলেই চেয়েছিলেন এমন একটি সর্বগ্রাসী তত্ত্ব যা সমস্ত বলকে এক সুতোয় বাঁধবে। সেই লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার যাত্রায় বাঙালি বিজ্ঞানীরা বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করেছেন যে মেধা ও সাধনার জোরে বাংলার মাটি থেকেই বিশ্বসেরা আবিষ্কার করা সম্ভব।
বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বোস, মেঘনাদ সাহার সার্থক উত্তরসূরী অধ্যাপক অশোক সেন ও অধ্যাপক গৌতম মণ্ডলের গবেষণা শুধু তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ভাণ্ডারকেই সমৃদ্ধ করেনি, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাজারো তরুণ শিক্ষার্থীকে মহাবিশ্বের গভীরতম রহস্য উদ্ঘাটনে অনুপ্রাণিত করে চলেছে। তাঁদের এই অবদান ভারতের বিজ্ঞান ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে।
যেদিন স্ট্রিং থিওরির সফল প্রয়োগ ঘটিয়ে আর্টিফিশিয়াল ব্ল্যাকহোল তৈরি সম্ভবপর হবে, সেদিনই এই দুই বাঙালি পদার্থবিজ্ঞানীর পরিশ্রম সার্থক হবে। ধন্য হবে বঙ্গের বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীমহল।
Pix Courtesy NASA