
[সংক্ষিপ্তসার — গ্রান্ট এখানে দ্বিতীয় পর্যায় শুরু করেছেন — যা আবওয়াব সুবাদারি (প্রাদেশিক শাসনকর্তার অতিরিক্ত কর) নামে পরিচিত। তিনি স্পষ্ট করেছেন — এই আবওয়াবের উদ্ভবের কারণগুলো অন্য বইতে (Northern Circars-এর রাজনৈতিক সমীক্ষা) আংশিক আলোচিত হয়েছে; তাই এখন তিনি তার পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণে যাবেন না। গ্রান্ট বলেন — ১৫৮২ আকবরের মূল তুমার জমার শুরুর পরের দুই শতাব্দীজুড়ে আমেরিকার খনি থেকে বিপুল পরিমাণ সোনা-রূপো হিন্দুস্তানে প্রবাহিত হয়েছে — কিন্তুয় বাংলায় তুলনামূলকভাবে রূপো কম এসেছে। ফলে হিন্দুস্তানে মুদ্রার মান কমে যায় এবং পণ্য, জীবনধারণের সামগ্রী ও শ্রমের মূল্যে নামমাত্র বৃদ্ধি ঘটে। তাই সরকারের বর্ধিত ব্যয়ভার মেটাতে ভূ-রাজস্বের পরিমাণও আনুপাতিক হারে বাড়ানো প্রয়োজন হয়। গ্রান্ট বলছেন — জাফর খাঁ আর সুজার আমলে প্রতিষ্ঠিত জমিদারি এখতিয়ারে রাজস্ব আদায় ছিল নীতিগতভাবে অনিয়মিত, অসাংবিধানিক ও কৃষকদের ওপর নিপীড়নমূলক। তবুও, রাজকোষের ন্যায্য পাওনার (উৎপাদনের এক-চতুর্থাংশ) তুলনায় এই আদায়ের পরিমাণ সম্ভবত অনেক কমই ছিল। এরপর গ্রান্ট গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন কওরে বলেন — রাষ্ট্রবিজ্ঞানে যাদের প্রাথমিক জ্ঞান রয়েছে তাদের কাছে নির্দিষ্ট ও সুনিশ্চিত মানদণ্ডের অভাব নিশ্চিতভাবে বিভ্রান্তিকর ও উদ্বেগজনক মনে হবে; যে মানদণ্ড রাষ্ট্রের প্রকৃত প্রয়োজন অনুযায়ী রাজস্বের পরিমাণ সীমিত রাখবে এবং দেশের আয়তন, সক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ আয়ের উৎসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যায্যভাবে করের বোঝা বণ্টন করবে। এই অভাববোধ থেকেই ভারতে প্রগতিশীল শাসনব্যবস্থার অধীনে যেসব পদক্ষেপ গৃহীত হয় — যার লক্ষ্য ছিল সুশৃঙ্খল অর্থব্যবস্থার মূল নীতি নির্ধারণ। এর মধ্যে ছিল সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক কাঠামো, সুনির্ধারিত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি এবং মোট খাজনামূল্যের ওপর ভিত্তি করে বহু বছরের গড় হিসাবে আনুপাতিক কর-নির্ধারণ। গ্রান্ট উল্লেখ করেন — ১৭৬৯ সালের তত্ত্বাবধানের উদ্যোগ, ১৭৭৩ সালের কমিটি অফ সার্কিট এবং ১৭৭৬ সালের আমিনি ব্যবস্থা — সবই এই অভাববোধ থেকে উদ্ভূত হয়েছিল। কিন্তু এগুলোর প্রয়োগ সদুদ্দেশ্যপ্রণোদিত হলেও অকার্যকর ও ধ্বংসাত্মক ছিল। সবশেষে গ্রান্ট দেখান — ১৭৬৩-তে কাসিম আলীর শাসনের শেষে জনগণের অসন্তোষের মূল কারণ করের পরিমাণ বা অনিয়ম ছিল না; বরং মূল সমস্যা ছিল বর্ধিত রাজস্বের অসম ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বণ্টন — যা অনির্ধারিত আঞ্চলিক বিভাজনের ওপর ভিত্তি করে এবং কোনো সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই স্বৈরাচারী জমিদারদের খেয়ালখুশিমতো চাপানো হয়েছিল।]
দ্বিতীয় পর্যায়
আবওয়াব সুবাদারি (প্রাদেশিক শাসনকর্তার অতিরিক্ত কর)
বাংলার মূল রাজকীয় কর (যা পূর্ববর্তী অংশে আলোচিত হয়েছে) পাশাপাশি এখন যে সব প্রাদেশিক ভূ-রাজস্বের হিসাব বা আবওয়াবের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোর উদ্ভবের কারণসমূহ সম্পর্কে বর্তমান ও আমাদের পূর্ববর্তী গ্রন্থে (যা নর্দার্ন সরকারস-এর রাজনৈতিক সমীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত ছিল) ইতিপূর্বে আংশিক আলোচিত হয়েছে। এই বিষয়টির খুঁটিনাটি বিস্তারিত বিবরণে যাওয়া, কিংবা প্রচলিত ভিত্তিহীন ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত কোনো মতামতের সপক্ষে প্রমাণ ও দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা — কোনোটাই আমাদের বর্তমান উদ্দেশ্য নয়। এ এক অত্যন্ত শ্রমসাধ্য ও অন্তহীন কাজ; বিশেষ করে যখন এ দেশের মানুষ ও পরিস্থিতির প্রকৃত ইতিহাস ও অবস্থা এখনো গভীর অস্পষ্টতায় আচ্ছন্ন। তাছাড়া, এসব কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়ের নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে যেসব ফারসি পাণ্ডুলিপি রয়েছে, সেগুলো কেবল বিদেশি ভাষার জটিলতায় আবৃতই নয়, বরং তা মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তির হাতেই সীমাবদ্ধ; যাদের অনেকেরই আবার প্রাচ্যের রাজস্ব-ব্যবস্থা বিষয়ক কারিগরি জ্ঞানের অভাব থাকায় ওই তথ্যাবলি অনেকাংশেই অকেজো হয়ে পড়ে আছে। অধিকন্তু, ভারতে অবস্থানকারী আমাদের নিজেদের জাতির অনেক সুধী রাষ্ট্রনায়কও অত্যন্ত সুপরিচিত একটা রাজনৈতিক ঘটনার প্রভাবকে উপেক্ষা করে এমন সব ধারণা পোষণ করেছেন যা বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের সর্বজনীন অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তাঁরা ক্ষণিকের জন্যও এমনটা ভেবেছেন যে, ১৫৮২-তে আকবরের মূল তুমার জমার (রাজস্বের হিসাব) পরের দুই শতাব্দী — যে সময়ে কেপ বা উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে ইওরোপিয় বাণিজ্যের নানা পথে আমেরিকার নব-আবিষ্কৃত সম্পদ বিপুল পরিমাণে হিন্দুস্তানে প্রবাহিত হয়েছে — সেই সময়ে (বিশেষ করে বাংলার মতো বড় বাণিজ্যিক প্রদেশে) প্রচুর পরিমাণে নগদ অর্থ বা মুদ্রার আগমন ঘটেনি। অথচ মুদ্রার এই বিপুল প্রবাহ বিনিময়ের সর্বজনীন মাধ্যম হিসেবে [হিন্দুস্তানজুড়ে] অর্থের মূল মান কমিয়ে দিয়েছিল এবং অনিবার্যভাবেই তার ফলে পণ্যসামগ্রী, জীবনধারণের প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও শ্রমের মূল্যে এক ধরনের নামমাত্র (nominal) বৃদ্ধি ঘটিয়েছিল; যার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের কৃত্রিমভাবে বর্ধিত ব্যয়ভার মেটানোর জন্য শেষ পর্যন্ত ভূ-রাজস্বের পরিমাণও আনুপাতিক হারে বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। তাই আমরা এখানে কেবল এটুকু উল্লেখ করেই ক্ষান্ত হব যে, এদেশের ভূমির ওপর বর্ধিত হারে কর বা রাজস্ব ধার্য করার প্রয়োজনীয়তা — যা সাধারণত সরকারি আয়ের একমাত্র উৎস — অত্যন্ত স্পষ্ট। যে বিশেষ পরিস্থিতির কারণে এই ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছিল, তা জনগণের থেকে এ ধরনের অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের যৌক্তিকতা প্রমাণের জন্য সর্বতোভাবে যথেষ্ট বলে গণ্য হওয়া উচিত — তা সে অর্থ অতীতে আদায় করা হয়ে থাকুক, বর্তমানে হচ্ছে বা ভবিষ্যতেও রাষ্ট্রের অনুকূলে আদায় করা হতে পারে। যদিও নিঃসন্দেহে জাফর খাঁ তাঁর উত্তরসূরি সুজার শাসনামলে (বর্তমান শতাব্দীর ৩০-এর দশকের দিকে) যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত জমিদারি এখতিয়ার-এর মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের পদ্ধতিটি নীতিগতভাবে ছিল অনিয়মিত ও অসাংবিধানিক এবং এর প্রয়োগ ছিল অত্যন্ত ক্ষতিকর; এটা যেমন সার্বভৌম অধিকারের পরিপন্থী ছিল, তেমনি সমগ্র কৃষক সমাজের ওপর ছিল চরম নিপীড়নমূলক এবং সাধারণ জনগোষ্ঠী তথা সমাজের সুব্যবস্থা, সুশাসন ও শান্তিপূর্ণ সমৃদ্ধির জন্যও ছিল ধ্বংসাত্মক। তবুও, রাজকোষের ন্যায্য ও মূল নির্ধারিত পাওনার — যা হওয়া উচিত ছিল ভূমির মোট উৎপাদনের এক-চতুর্থাংশ — তুলনায় এই আদায়ের পরিমাণ সম্ভবত অনেক কমই ছিল।
যাঁরা রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা শাসনব্যবস্থা সংক্রান্ত জ্ঞানের প্রাথমিক বিষয়গুলোর সাথে পরিচিত, তাঁদের কাছে একটা নির্দিষ্ট ও সুনিশ্চিত মানদণ্ডের অভাব — যা রাষ্ট্রের প্রকৃত ও সাময়িক প্রয়োজন অনুযায়ী বার্ষিক রাজস্বের পরিমাণ সীমিত রাখবে এবং দেশের আয়তন, সক্ষমতা, ভূমির প্রকৃতি কিংবা স্থানীয় বাণিজ্য ও শিল্পোৎপাদন-জনিত অভ্যন্তরীণ আয়ের উৎসের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সমগ্র দেশ ও তার বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর ন্যায়সঙ্গতভাবে করর বোঝা বণ্টন করবে — তা একই সাথে বিভ্রান্তিকর ও উদ্বেগজনক বলে মনে হবে। কিন্তু প্রাচ্যের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বা অর্থব্যবস্থা বিষয়ে যাঁরা অত্যন্ত অভিজ্ঞ — যাঁদের মনোযোগ আকর্ষণ করাই আমাদের বর্তমান লক্ষ্য — তাঁরা যদি কখনও এই ঘাটতির বিষয়টি স্বীকার করে নিতেন (তা সে ঘাটতি শুরু থেকেই থাকুক কিংবা পরবর্তীতে বাংলা থেকে কাসিম আলীর বিতাড়নজনিত বিশৃঙ্খলা ও ক্ষতির ফলে সৃষ্টি হয়ে থাকুক), তবে একে অত্যন্ত শোচনীয় দুর্ভাগ্য হিসেবেই বিবেচনা করা হতো; কারণ এর ফলে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পেত এবং কোনো শক্তিশালী পদক্ষেপের মাধ্যমে সময়মতো তা রোধ করা না গেলে অনিবার্য ধ্বংস নেমে আসত। সেই অনুযায়ী, ভারতে আমাদের নিজেদের দেশের ও সময়ের অত্যন্ত প্রগতিশীল ও সুচিন্তিত শাসনব্যবস্থার অধীনে যেসব পদক্ষেপ গৃহীত বা প্রস্তাবিত হয়েছে — যার লক্ষ্য ছিল সুশৃঙ্খল অর্থব্যবস্থার মূল নীতিসমূহ অনুসন্ধান, নির্ধারণ বা প্রতিষ্ঠা করা — তা মূলত এই অভাববোধ থেকেই উদ্ভূত। এই নীতিগুলোর মধ্যে ছিল সুনির্দিষ্ট ও স্থায়ী প্রশাসনিক কাঠামো, ব্যবস্থাপনার সুনির্ধারিত পদ্ধতি এবং দেশের প্রকৃত বা মোট ভাড়ামূল্যের (gross rental বা মোট রাজস্ব) ওপর ভিত্তি করে বহু বছরের গড় হিসাব অনুযায়ী নির্ধারিত আনুপাতিক ও সুনির্দিষ্ট কর-নির্ধারণ ব্যবস্থা, অথবা বিদ্যমান প্রাচীনতম নথিপত্র থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে অতীতের রাজস্ব সংগ্রহের তুলনামূলক পর্যালোচনার মাধ্যমে একটা ধারণা গড়ে তোলা যেতে পারত — বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন অপ্রত্যাশিত ও অসাধারণ সব ঘটনা ধারাবাহিকভাবে রাজস্বের পরিমাণে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছিল, যদিও জনগণের ওপর প্রকৃত করের বোঝা হয়তো কমে আসছিল। এই ধরনের পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটেই ১৭৬৯ সালে তত্ত্বাবধানের (supervision) এক বুদ্ধিদীপ্ত ও সুপরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল; যদি সেই উদ্যোগটি শুরুর মতোই দক্ষতা ও জোরালোভাবে চালিয়ে যাওয়া হতো, তবে তা স্বার্থান্বেষী স্থানীয়দের কারচুপি ও দুর্নীতি উন্মোচন করতে পারত অথবা দেওয়ানি লাভের সময় আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া আর্থিক ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো স্পষ্ট করে দিতে পারত — যা শেষ পর্যন্ত হয়তো সেই কাঙ্ক্ষিত জ্ঞানের সন্ধান দিত, যা যেকোনো প্রকৃত ও কার্যকর সংস্কারের জন্য অপরিহার্য ছিল। একইভাবে, ১৭৭৩ সালের কমিটি অফ সার্কিট-এর কার্যক্রম বা প্রস্তাবিত লক্ষ্যগুলোর ভিত্তিও ছিল এই ধরনের পরিস্থিতি; যদিও তাদের গৃহীত ব্যবস্থাটি ছিল সদুদ্দেশ্যপ্রণোদিত হওয়া সত্ত্বেও অকার্যকর ও ধ্বংসাত্মক — যেখানে জমিদারি ব্যবস্থার প্রথাগত নিয়ম লঙ্ঘন করে সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে প্রকাশ্য নিলামে জমি ইজারা দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে, অভাবী ও সাময়িক ইজারাদারদের একটা দল দেশের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, যারা নিজেদের হাতে আসা জমির প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে খোদ মূল জমিদারদের মতোই অজ্ঞ ছিল; তারা প্রত্যাশিত লাভের বদলে সামান্য উৎকোচ বা ব্যক্তিগত জরিমানার বিনিময়ে অপসারিত পুরোনো ইজারাদারদের পুনর্বহাল করতে বাধ্য হয়েছিল — আর এই পুরোনো ইজারাদাররা আবার সরকারের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার পথ বেছে নিয়েছিল। নিঃসন্দেহে, ১৭৭৬ সালের স্থানীয় আমিনি (amaney) ব্যবস্থার উদ্ভবও হয়েছিল এই প্রেক্ষাপটে — যা ছিল তৎকালীন আলোচিত বিষয়গুলোর একটা দিক এবং সেই সাথে বহু-আলোচিত বন্দোবস্ত পরিকল্পনার (settlement plan) বিরোধী; উল্লেখ্য যে, ইওরোপিয় নীতিমালার উপযুক্ততম আদর্শের ওপর ভিত্তি করে প্রণীত সেই বন্দোবস্ত পরিকল্পনার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল একটা স্থায়ী ও সহনীয় মাত্রার কর, কুইট-রেন্ট quit rent। অথচ, সেই সময় পাওয়া সামান্য ইঙ্গিত বা তথ্যগুলোও যদি সহজে সবার সামনে তুলে ধরা যেত, তবে আর্থিক জ্ঞান অর্জনের সহজ ও সরল পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার ফলে যে চরম বিভ্রান্তি, সময়ের অপচয় এবং শ্রম ও অর্থের বিপুল ক্ষতি হয়েছিল — তা অনেকাংশেই এড়ানো সম্ভব হতো। মন্ত্রীপর্যায়ে বিবেচনার জন্য পূর্বে বা বর্তমানে পেশ করা কোনো রাজনৈতিক গবেষণাপত্রে — যেখানে আমরা ভূ-সম্পত্তির ওপর সর্বোচ্চ মালিকানা স্বত্ব নিয়ে কর্তৃত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছি, প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছি এবং এশিয়ার সার্বভৌম ক্ষমতার হাতে এমন অধিকার ন্যস্ত করেছি যা ইওরোপে আইনগত কাল্পনিকতা বা কার্যত প্রজার হাতেই ন্যস্ত থাকে — সেসবের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস এটাই হওয়া উচিত। আমরা জমির মোট উৎপাদনের সেই নির্দিষ্ট অংশটি নির্ধারণ করেছি যা ভূ-স্বামী হিসেবে সরকার বা শাসকের প্রাপ্য এবং যা রায়ত বা শ্রমজীবী নিম্নস্তরের প্রজাদের সাথে ভাগ করে নেওয়া হয়; এই অংশটি হলো রেব্বা চৌত বা উৎপাদনের এক-চতুর্থাংশ। তবে এই অনুপাতের প্রায় এক-দশমাংশ পরিমাণ অর্থ কেটে রাখা হয় জমিদারদের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার ব্যয় নির্বাহের জন্য। এই জমিদাররা সরকারের উচ্চপদস্থ দেওয়ানি প্রতিনিধির থেকে পাওয়া সনদ বা বিশেষ আদেশের বলে স্থায়ীভাবে নিম্নলিখিত এক বা একাধিক সরকারি দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন- সরকারি রাজস্ব আদায়ের জন্য বার্ষিক চুক্তিবদ্ধ ইজারাদার; কৃষকদের আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধি; রাজকীয় মালিকানাধীন রাজস্ব আদায়কারী (যাঁরা মফস্বল বা অধীনস্থ কোষাগারের নিট আয়ের ওপর পাঁচ শতাংশ হারে রসুম বা কমিশন পাওয়ার অধিকারী); অথবা নির্দিষ্ট স্থানীয় এখতিয়ারভুক্ত এলাকার আর্থিক তত্ত্বাবধায়ক — যার আয়তন পর্যায়ক্রমে পরিবর্তিত হতে পারে এবং যাকে এহতিমাম, ট্রাস্ট বা জমিদারী, তালুকদারী কিংবা আঞ্চলিক প্রজাস্বত্ব হিসেবে অভিহিত করা হয়। অবশ্য এই ব্যবস্থার মধ্যেই নানকার নামে পরিচিত জমির একটা ছোট অংশ বরাদ্দ থাকে, যা অনেকটা ফ্রি-হোল্ড বা নিরঙ্কুশ মালিকানাধীন জমির মতো; এটা উচ্চপদস্থ ভূ-স্বামীর পারিবারিক জীবিকা নির্বাহের উৎস হিসেবে কাজ করে, তাকে ভূমির সাথে সংযুক্ত রাখে এবং রাষ্ট্রের পক্ষে ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনার বিনিময়ে তার বার্ষিক নির্ধারিত আয়ের ঘাটতি পূরণ করে। তবে বিশেষ করে আমাদের দৃঢ় রাজনৈতিক বিশ্বাস এটাই হওয়া উচিত — যেহেতু আমরা সমগ্র দেশের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত একটা আনুপাতিক কর-নির্ধারণ পদ্ধতি নির্দেশ বা উপস্থাপন করেছি (যা ব্রিটিশদের জানা মতে প্রথমবারের মতো বিভিন্ন আর্থিক আঞ্চলিক উপ-বিভাগে প্রয়োগ করা হয়েছিল) এবং এই বিখ্যাত রাজস্ব তালিকা — যা ফারসি পরিভাষায় বাংলার আসল জমা তুমারি (Ausil Jumma Toomary) নামে পরিচিত — তার প্রারম্ভিক প্রবর্তন থেকে শুরু করে চূড়ান্ত সংস্কার এবং সম্ভবত পূর্ণতা প্রাপ্তি পর্যন্ত বিভিন্ন ক্রমবিকাশ বা উন্নয়নের ধারা চিহ্নিত করেছি। এই শতাব্দীর বাইশতম বছর থেকে শুরু করে কোম্পানির দেওয়ানি লাভের মুহূর্ত পর্যন্ত — বার্ষিক বন্দোবস্ত নির্ধারণ এবং জায়গির বা জমিদারি অনুদান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে — যা অপরিহার্যভাবে ও ক্রমাগত ব্যবহৃত হতো; ইতিমধ্যেই যেমন উল্লেখ করা হয়েছে, এখানে এমন এক আধুনিক, সুনির্দিষ্ট, নির্ভুল, তুলনামূলকভাবে ন্যায্য ও সুসামঞ্জস্যপূর্ণ কর-ব্যবস্থার চিত্র পাওয়া যায় — যেখানে সমগ্রের সাথে অংশের এবং অংশগুলোর নিজেদের মধ্যে পর্যায়ক্রমিক সামঞ্জস্য বিদ্যমান — যা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের সম-আয়তনের কোনো রাষ্ট্রের নথিপত্রেও হয়তো আজ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। অন্যদের মনেও আমাদের নিজস্ব বিশ্বাস বা ধারণাটি গেঁথে দেওয়ার ব্যাপারে আমরা আশাবাদী; বিশেষ করে যখন মুঘল অর্থব্যবস্থার এই মৌলিক নীতিগুলোর পাশাপাশি আমরা প্রসারিত বাণিজ্যের প্রভাব এবং আমেরিকার খনি থেকে বিপুল পরিমাণ মুদ্রার (ধাতব অর্থের) আগমনকে বিবেচনায় নিই। এই বিষয়গুলো বার্ষিক রাজস্বের ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে যৌক্তিকতা প্রদান করেছিল, যা পরবর্তীতে আবওয়াব সুবাদারি বা নতুন স্থায়ী কর হিসেবে ধার্য করা হয়। বর্তমান শতাব্দীর শুরুর দিকে প্রাদেশিক শাসনকর্তারা যখন স্বাধীনতার পথে অগ্রসর হচ্ছিলেন, তখন তাঁরা প্রচলিত রাজকীয় করর অতিরিক্ত হিসেবে এই করগুলো আরোপ করেছিলেন। আর যখন এটা স্পষ্ট করা হবে যে, ১৭৬৩ সালে কাসিম আলীর শাসনকালের সমাপ্তিলগ্নে জনগণের অভিযোগ ও অসন্তোষের মূল কারণ এই কর-নির্ধারণের বিশালতা বা অনিয়ম (অর্থাৎ প্রাথমিক পরিমাণ বা বৈষম্য কিংবা সরকারি কোষাগারের জন্য কথিত অত্যধিক আদায়ের হার) ছিল না; বরং মূল সমস্যাটি ছিল বর্ধিত রাজস্বের সেই অংশটির অসম ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বণ্টন — যা অনির্ধারিত আঞ্চলিক বিভাজনের ওপর ভিত্তি করে এবং কোনো সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই স্বৈরাচারী জমিদারদের খেয়ালখুশিমতো চাপানো হয়েছিল। এই প্রক্রিয়ায় দেশীয় তত্ত্বাবধায়কদের অজ্ঞতা, ইচ্ছাকরা অবহেলা বা অসততাও ভূমিকা রেখেছিল; কারণ তারা জমির সুনির্দিষ্ট মূল্যায়নের বিষয়টি হয় আংশিক ভুলে গিয়েছিল, অথবা ইচ্ছাকরাভাবে তা এড়িয়ে গিয়েছিল কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে গোপন রেখেছিল — অথচ অর্থসংক্রান্ত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে এবং চরম দুর্নীতিপরায়ণ ও অদক্ষ ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণে এই মূল্যায়ন অত্যন্ত কার্যকর ছিল।
টীকা ১
১. আবওয়াব সুবাদারি — প্রাদেশিক শাসনকর্তার অতিরিক্ত কর — যা মূল রাজকীয় করের বাইরে ধার্য করা হতো।
২. তুমার জমা — মুঘল আমলে ভূমির ওপর ধার্য নির্ধারিত রাজস্ব-তালিকা।
৩. জমিদারি এখতিয়ার — জাফর খাঁ প্রবর্তিত ও সুজার আমলে প্রতিষ্ঠিত রাজস্ব আদায়ের পদ্ধতি — যা জমিদারদের মাধ্যমে পরিচালিত হতো।
৪. রেব্বা চৌত — উৎপাদনের এক-চতুর্থাংশ — যা সার্বভৌম শাসকের প্রাপ্য কর হিসেবে নির্ধারিত ছিল।
৫. নানকার — জমিদারের পারিবারিক জীবিকা নির্বাহের জন্য বরাদ্দকৃত জমি — যা ফ্রি-হোল্ড বা নিরঙ্কুশ মালিকানার মতো।
৬. এহতিমাম — জমিদারি এলাকা — যা সনদের মাধ্যমে অর্পণ করা হতো।
৭. কমিটি অফ সার্কিট — ১৭৭৩ সালে গঠিত কমিটি — যা জমিদারি ব্যবস্থার সংস্কারের প্রস্তাব করেছিল।
৮. আমিনি ব্যবস্থা — ১৭৭৬ সালে প্রবর্তিত স্থানীয় ব্যবস্থা — যা বন্দোবস্ত পরিকল্পনার বিরোধী ছিল।
৯. কুইট-রেন্ট — নামমাত্র ভূমি-কর — যা প্রদান করে সামন্ততান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি পাওয়া যেত।
১০. আসল জমা তুমারি — বাংলার প্রকৃত রাজস্ব-তালিকা — যা টোডরমল ১৫৮২ সালে নির্ধারণ করেন এবং সুলতান সুজা ১৬৫৮ সালে উন্নত করেন।
গ্রান্টের এই অংশটি আবওয়াব সুবাদারি-র উদ্ভবের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণ বিশ্লেষণ করে। তিনি দেখান — আমেরিকার সোনা-রুপার প্রবাহে মুদ্রার মান কমায় রাজস্ব বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়; কিন্তু সেই বৃদ্ধি ন্যায্যভাবে বণ্টিত হয়নি। বরং জমিদারদের খেয়ালখুশিমতো চাপানো হয়েছিল — যা ছিল কৃষকদের ওপর চরম নিপীড়ন। গ্রান্টের মূল বক্তব্য হলো — রাজস্বের পরিমাণ বা অনিয়ম নয়; বরং বণ্টনের অসামঞ্জস্য এবং সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণের অভাব — এই দুটোই ছিল জনগণের অসন্তোষের মূল কারণ। এই বিশ্লেষণই পরবর্তীতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও রাজস্ব সংস্কারের ভিত্তি তৈরি করে।
টিকা ২
কুইট-রেন্ট Quit-rent
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত শুরু হল সূত্রে কুইট-রেন্ট Quit-rent বা নামমাত্র ভূমি-কর ব্যবস্থা এবং এবসেন্টি ল্যান্ডলর্ডিজমের যুগ।
লুঠেরা ব্রিটিশ উপনিবেশের স্ট্রাকচারাল এডজাস্টমেন্ট পলিসির প্রেক্ষিতে বড়বাংলার জমিদারি কাঠামো এই প্রথম কার্যত দায়-দায়িত্বহীন আর্থিক হাতিয়ারে রূপান্তরিত হল। এম্পায়ার ফর প্রফিট, প্রফিট ফর এম্পায়ার বটমলাইন ক্যারি করা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রশ্রয়ে জমিদারের আর দায় রইল না, তার প্রজার, তার অঞ্চলের ভালমন্দ দেখার — যে অত্যাবশ্যক দাস ছিল মুঘল-নবাবি আমলে। যে অপ্রতিরোধ্য জমিদারবর্গ একবারের জন্য মুর্শিদাবাদের দরবারে পা দেন নি, সব কাজ সামলেছেন, উকিল পাঠিয়ে, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত শুরু হওয়ার এক দশকের মধ্যেই, সেই দায়-দায়িত্বহীন জমিদারদের উত্তর প্রজন্ম এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বিনিয়োগ করতে আসা বিভিন্ন ক্ষেত্রের ফাটকাবাজ কোলাবরেটর নব্য জমিদারেরা দলবেঁধে জমিদারির উদ্বৃত্ত বগলদাবা করে দলে দলে আসতে শুরু করল উপনিবেশিক কলকাতা পুণ্যভূমিতে, মধ্যসত্ত্বভোগীদের হাতে জমিদারি পরিচালনার সমস্ত দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে। বাংলায় অনুপস্থিত জমিদারিত্ব Absentee Landlordism-এর পাখা বিস্তার করল — এই পরম্পরার জমিদার পরিবার বা এদের উত্তর প্রজন্ম বা এদের উদ্বৃত্তে পালিত নবজাগরণীদের হাতে তৈরি হবে গ্রাম-বিদ্বেষ, মহিলা বিদ্বেষ, বিকেন্দ্রিভূত অর্থনীতি বিদ্বেষ, ছোটলোক বিদ্বেষের যুগ। অমিয় কুমার বাগচী কথিত উপনিবেশিক স্ট্রাকচারাল এডজাস্টমেন্টের অন্যতম ক্রীড়ানক হবে গ্রাম উদ্বৃত্তে কলকাতায় সাম্রাজ্যের অঙ্কে পালিত অনুপস্থিত জমিদারকুল।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ