
৭৫. বেণীমাধব দাস ও তাঁর পরিবার
১৯১১ সালের ১১ আগস্ট। ওড়িশার কটকের র্যাভেনশ কলেজিয়েট স্কুলে ছেলেদের খুব ব্যস্ততা। আজকের দিনটিকে তারা স্মরণ করবে শ্রদ্ধায়। আজ থেকে তিন বছর আগে এই ১১আগস্ট ফাঁসি হয়েছিল মেদিনীপুরের তরুণ বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর। হাসতে হাসতে ফাঁসির দড়ি গলায় পরেছিলেন সেই তরুণ। তাই ছাত্ররা ঠিক করেছিল ১১ আগস্ট তারা অনশন পালন করবে। স্কুল হস্টেলের পাচককে সেদিন তারা ছুটি দিয়েছিল। স্কুলের পরে তারা আয়োজন করেছিল এক সভার। স্কুলের হেডমাস্টারমশাই দেখছিলেন সব। হয়তো তাঁর প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল। বিশেষ করে তাঁর নজরে ছিল একটি ছাত্রের তৎপরতা। নাম তার সুভাষ। কটকের বিশিষ্ট উকিল জানকীনাথ বসুর ছেলে। যেমন মেধাবী তেমনি দেশভক্ত।
সে প্রথমে পড়ত কটকের প্রোটেস্ট্যান্ট ইউরোপীয়ান স্কুলে। সেখান থেকে এসেছিল এই স্কলে। প্রথম দিন এসেছিল স্যুট-বুট পরে। কিন্তু পরের দিন খাঁটি দেশি পোশাক। কারণ জানতে চেয়েছিলেন হেডমাস্টারমশাই। সুভাষ বলেছিল, ‘আজ্ঞে, ওটা মিশনারি স্কুলের পোশাক ছিল। কিন্তু এই স্কুলে যখন দেখলাম সবাই দেশি পোশাক পরে তখন ভাবলাম দেশি পোশাক পরেই আসতে হবে।’
কিশোর সুভাষের কথা শুনে মুচকি হেসেছিলেন হেডমাস্টারমশাই। মানুষ গড়ার কারিগর তিনি বুঝেছিলেন এই ছেলের মধ্যে আগুন আছে। পড়ার বইএর বাইরে আরও নানা বই পড়তে তিনি উৎসাহিত করেছিলেন ছাত্রকে।
এই হেডমাস্টারমশাই-এর নাম বেণীমাধব দাস (১৮৮৬-১৯৫২)।
বেণীমাধবের জন্ম চট্টগ্রামের শেওড়াতলি গ্রামে। কৃষ্ণচন্দ্র দাসের ছেলে। দর্শনশাস্ত্র নিয়ে পড়াশুনো করেছেন। চট্টগ্রাম জেলা স্কুলে শুরু করেন শিক্ষকতা। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় এই স্কুল এক আদর্শ স্কুলে পরিণত হয়। তারপর চলে আসেন কটকে। র্যা নশ কলেজিয়েট স্কুলে। তাঁর দেশপ্রমিক কার্যকলাপ, ক্ষুদিরামের প্রয়াণ দিবস পালনের সম্মতি ভালো চোখে দেখেন নি ব্রিটিশ শাসকেরা। শাস্তি পেতে হয়েছিল বেণীমাধবকে। বদলি করা হয়েছিল কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলে।
কৃষ্ণনগর চলে যাবার ফলে সুভাষ বসুর সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিন্ন হয়। কিন্তু বন্ধ হয় নি যোগাযোগ। সুভাষের গতিবিধির সব খবর তিনি রাখতেন। চিঠিতে ছিল যোগাযোগ। ‘ভারত পথিক’ বইতে সুভাষচন্দ্র তাঁর এই শিক্ষকের অবদানের কথা লিখেছেন পরম শ্রদ্ধায়। দেশত্যাগের আগে সুভাষ তাঁর শিক্ষকের আশীর্বাদ প্রার্থনা করেছিলেন।
বেণীমাধব দাস শুধু নিজে দেশপ্রেমিক ছিলেন না। তাঁর পুরো পরিবারই যুক্ত ছিল দেশপ্রেমিক কার্যকলাপে। তাঁর স্ত্রীর নাম সরলা। বেণীমাধবের সুযোগ্য স্ত্রী। মানবসেবায় অতন্দ্র। পরিচালনা করতেন ‘পুণ্যাশ্রম’। সেখানে আশ্রয় পেত সমাজের দুঃস্থ নারীরা। বাবা-মা দুজনের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হন তাঁদের দুই কন্যা — কল্যাণী ও বীণা। তাঁদের মেজো ছেলে জাতীয় আন্দোলনে যোগ দিয়ে কারাবরণ করেন।
বড় মেয়ে কল্যাণী সমাজসেবা ও বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি ‘ছাত্রসংঘে’র সম্পাদিকা ছিলেন। এই সংঘের সঙ্গে জড়িত ছিলেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত, সুহাসিনী গাঙ্গুলি, ইলা সেন, সুলতা কর, কমলা দাশগুপ্ত, সুরমা মিত্র প্রভৃতিরা। এই সংঘে মেয়েদের লাঠি ও ছোরাখেলা শেখাতেন বিপ্লবী দীনেশ মজুমদার। বিভিন্ন পিকেটিংএ অংশগ্রহণ করতেন সংঘের সদস্যরা। হাজরা পার্কে বেআইনি সভা করতে গিয়ে কল্যাণীকে আট মাস কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়।
বেথুন কলেজের ছাত্রী ছিলেন বেণীমাধবের আর এক মেয়ে বীণা দাস (বিয়ের পরে ভৌমিক পদবী যুক্ত হয়)। প্রধমে বীণা ছিলেন গান্ধীজির অহিংসা নীতিতে বিশ্বাসী। কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উপর ইংরেজ পুলিশের নির্মম অত্যাচার তাঁকে সশস্ত্র বিপ্লবের দিকে এগিয়ে দেয়। গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন বিপ্লবীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবেই হবে জ্যাকসনবধ। অস্ত্র আনার ভার পড়ে বীণা দাসের উপর। নিজের খোঁপাতে রিভলবার লুকিয়ে রেখে সমাবর্তনে এলেন বীণা। জ্যাকসনকে লক্ষ্য করে ছুঁড়লেন গুলি। কিন্তু গুলি লক্ষ্যভ্রস্ট হল। ধরা পড়ে গেলেন বীণা।
বীণার উপর নেমে এল পুলিশের অত্যাচার। পুলিশ জানতে চায় বীণা কোথা থেকে পেলেন আগ্নেয়াস্ত্র, অন্যান্য বিপ্লবীর নাম জানতে চায় পুলিশ। কিন্তু বীণা সমস্ত অত্যাচার সহ্য করেও নির্বাক থাকেন। বীণার পিতা বেণীমাধবের উপরেও চাপ দেওয়া হয়। পুলিশের ধারণা ছিল মেয়ের উপরে অত্যাচার চালালে বাবা গোপন তথ্য ফাঁস করে দেবেন।
কিন্তু বাবা ও মেয়ে যে এক ধাতুতে তৈরি, তা বুঝতে পারে নি পুলিশ। দীর্ঘ ৯ বছর কারান্তরালে কাটাতে হয়েছিল বীণাকে।
এই সব ঘটনা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আরও বেশি করে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন যাতে তারা প্রকৃত দেশপ্রেমের পাঠ পায়।
খুবই সময়োপযোগী এই প্রতিবেদন।