“কৃষ্ণনগরের অনতিদূরে কোন গ্রামে চন্দ্রশেখর চট্টোপাধ্যায় নামে এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ বাস করিতেন। তাঁহার দুই পুত্র ছিল। তন্মধ্যে জ্যেষ্ঠের নাম শশিভূষণ ও কনিষ্ঠের নাম বিধুভূষণ।” — কোন এক লেখকের প্রথম উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদের প্রথম কয়েকটি বাক্য। উপন্যাসটি এভাবেই শুরু হয়েছে।
এই প্রশ্ন মনে আসাই স্বাভাবিক যে কলকাতার পথ নিয়ে আলোচনায় উপন্যাসের উল্লেখ কেন? সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে আর পেতে উপন্যাসটির প্রসঙ্গ আসবেই।
১৮৭২-৭৩ সালে রাজসাহী থেকে প্রকাশিত ‘জ্ঞানাঙ্কুর’ পত্রিকায় উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। পরের বছরে অর্থাৎ ১৮৭৪ সালে এক প্রকাশক সাহস করে এক অপরিচিত অনামী লেখকের প্রথম উপন্যাসটি প্রকাশ করলেন। সাধারণ মানুষের পল্লী জীবনের দৈনন্দিন সুখদুঃখ নিয়ে লেখা কাহিনীটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। পাঠকদের কাছে উপন্যাসটি সমাদৃত হলেও পাঠকদের মনে প্রশ্ন থেকে গেল, লেখক কে? বইতে লেখকের কোন নাম উল্লেখ ছিল না। “ক্যানিং লাইব্রেরী”, কলেজ স্ট্রীট থেকে প্রকাশিত বইতে কেবল লেখা ছিল — “শ্রী যোগেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক প্রকাশিত”। প্রকাশের নয় বছরের মধ্যে বইটির তিনটি সংস্করণ মুদ্রিত হয়ে গিয়েছিল এবং চতুর্থ মুদ্রণের আয়োজন চলছিল। তখনো লেখকের নাম পাঠকের অজানা। ফলে এমনও হতে শুরু করল যে বইটির জনপ্রিয়তায় আকৃষ্ট হয়ে কিছু ব্যাক্তি উপন্যাসটির রচয়িতা বলে নিজেদের পরিচয় দিতে শুরু করে দিল।

অবশেষে বন্ধু সাহিত্যিক ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপরোধে লেখক নিজের নাম প্রকাশ করতে রাজী হলেন। চতুর্থ মুদ্রণে লেখকের নাম প্রকাশিত হলো — তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। ক্রমে জানা গেল যে তারকনাথ পেশায় একজন চিকিৎসক, নেশায় লেখক। ‘স্বর্ণলতা’ এতটাই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল যে তারকনাথের জীবদ্দশায় উপন্যাসের সাতটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল। দক্ষিণাচরণ রায় স্বর্ণলতার ইংরেজী অনুবাদ করেছিলেন (Scenes from Hindu village life in Bengal)। প্রখ্যাত নাট্যকার অমৃতলাল বসুর করা উপন্যাসের নাট্যরূপ ‘সরলা’ স্টার থিয়েটারে প্রায় এক বছর ধরে চলেছিল। বাঙলা সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্রের প্রখর দীপ্তিময় উপস্থিতির সেই যুগে তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের বঙ্কিমচন্দ্রের প্রভাবমুক্ত ‘স্বর্ণলতা’ উপন্যাসটির বিপুল সমাদর যথেষ্ট কৃতিত্বের ও আশ্চর্যের।
এবার আসি রাস্তার নামকরণের প্রসঙ্গে। সেটিও কম আশ্চর্যের নয়। সাহিত্যিকের নামে রাস্তা বিশ্বের বহু জায়গাতেই আছে। কলকাতাতেই আছে রবীন্দ্র সরণি, শেক্সপীয়ার সরণি। সৃষ্ট চরিত্রের নামেও রাস্তা আছে। যেমন ফ্লোরিডায় আছে মার্ক টোয়েনের বিখ্যাত চরিত্রের নামে হাকলবেরি ফিন্ ড্রাইভ। কিন্তু কোনো গল্প-উপন্যাসের নামে পথের নাম? এই সেদিন ২০১৩ সালে ইংল্যান্ডের পোর্টস মাউথে একটি বইয়ের নামে রাস্তার নামকরণ হলো — দ্য ওশন্ অ্যাট দ্য এন্ড অফ দ্য লেন্। এই ব্যাপারে বহু বছর আগেই পথ দেখিয়েছে আমাদের কলকাতা। কলকাতার ভবানীপুর অঞ্চলে তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায় বাড়ি করেছিলেন। যে রাস্তায় তাঁর বাড়ি, সেই রাস্তাটি তারকনাথের নামে নামকরণ করা হয় নি। রাস্তাটির নাম হয়েছে —”স্বর্ণলতা স্ট্রীট”। কোনো উপন্যাসের নামে পথের নামকরণে কলকাতাই পথিকৃৎ এবং প্রথম। স্বর্ণলতা স্ট্রীট তারই স্বর্ণালী নিদর্শন।
তথ্যঋণ : সংসদ বাঙালী চরিতাভিধান, স্বর্ণলতা : তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, স্বর্ণলতা প্রসঙ্গে : দেবনারায়ণ গুপ্ত
Very much informative is your write up.We are enriched by this.
খুব সুন্দর অভিজ্ঞতা এরকম আরও বিষয় সম্পর্কে আলোকপাত করলে বর্তমান সমাজ জানতে পারবে তৎকালীন সমাজ ও সংস্কৃতি র মূল্য বোধ