সমকালীন বাংলা কথাসাহিত্যে সমাজবাস্তবতা, নারীর সংগ্রাম এবং ইতিহাস-সচেতন জীবনদর্শনের এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন সত্যজিৎ নাথের উপন্যাস “শেষের বেলা”। উপন্যাসটি কেবল একজন নারীর ব্যক্তিগত জীবনকাহিনি নয়; বরং স্বাধীনতা-উত্তর বাঙালি সমাজ, দেশভাগ-পরবর্তী বাস্তবতা, ভাষা-সংস্কৃতির সংকট এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক দলিল। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বৃহত্তর সামাজিক ইতিহাসকে একসূত্রে গাঁথার ক্ষেত্রে লেখক অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বেলা। সাধারণ পরিবারের একজন মেয়ে হলেও তাঁর জীবনসংগ্রাম তাঁকে অসাধারণ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। গায়ের রঙ কালো হওয়ার কারণে শৈশব থেকেই তাঁকে সমাজের অবহেলা ও কটূক্তির মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু তিনি কখনও আত্মবিশ্বাস হারান না। মেধা, অধ্যবসায় এবং আত্মমর্যাদাবোধের শক্তিতে তিনি উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন এবং বাংলা সাম্মানিক নিয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। লেখক অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে দেখিয়েছেন, আমাদের সমাজে একজন নারীর গুণ ও মেধার চেয়ে বাহ্যিক সৌন্দর্যকে কত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। বেলার নীরব প্রতিবাদ ও আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম পাঠকের মনে গভীর রেখাপাত করে।
বিয়ের পর বেলার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয় মিজোরামের দারলনে। পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশে স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন এক সুখী সংসার। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের অভিঘাতে সেই স্বপ্নভুবন মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে। ‘ভাই খেদা’র নির্মম বাস্তবতার শিকার হয়ে পরিবারসহ তাঁকে সর্বস্ব হারিয়ে ফিরে আসতে হয়। এই ঘটনাপ্রবাহ শুধু একটি পরিবারের বিপর্যয়ের কাহিনি নয়; বরং উত্তর-পূর্ব ভারতের বহু বাস্তুচ্যুত মানুষের বেদনার প্রতিচ্ছবি। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বেলার অদম্য মানসিক শক্তি ও সংগ্রামী মনোভাব উপন্যাসটিকে বিশেষ তাৎপর্য প্রদান করেছে।
উপন্যাসে নারীর আত্মপরিচয় ও সামাজিক অবস্থানের প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে এসেছে। শিক্ষিতা ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও বেলাকে বিবাহিত জীবনে বারবার পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে আপস করতে হয়। এমনকি নিজের সন্তানের নামকরণের অধিকার থেকেও তিনি বঞ্চিত হন। আপাতদৃষ্টিতে ক্ষুদ্র এসব ঘটনা প্রকৃতপক্ষে নারীর ওপর সামাজিক আধিপত্যের গভীর প্রতীক। লেখক কোনো উচ্চকিত ভাষা ব্যবহার না করেও এই বঞ্চনার বেদনাকে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছেন।
শশাঙ্ক চরিত্রটি উপন্যাসে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিসংযোগ সৃষ্টি করে। বাহ্যিকভাবে সুদর্শন ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হলেও তাঁর ব্যক্তিত্বে দায়িত্ববোধের ঘাটতি ও আত্মকেন্দ্রিকতার উপস্থিতি লক্ষণীয়। বেলার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের মধ্য দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন যে, বিবাহিত জীবনের প্রকৃত ভিত্তি বাহ্যিক চাকচিক্য বা সামাজিক মর্যাদা নয়; বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতা। শশাঙ্কের সীমাবদ্ধতার বিপরীতে বেলার ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও আত্মত্যাগ আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
উপন্যাসটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর মানবিকতার বিস্তৃত পরিসর। মিজো বাড়িওয়ালা পুবুকা এবং তাঁর কন্যা মারলিয়ানির চরিত্র দুটি বিশেষভাবে স্মরণীয়। জাতি, ভাষা ও ধর্মের ভিন্নতা সত্ত্বেও তাঁদের আন্তরিকতা ও সহমর্মিতা প্রমাণ করে যে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মানবিকতা। বরাক উপত্যকা ও মিজোরামের সাংস্কৃতিক যোগাযোগকে লেখক যে আন্তরিকতার সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন, তা উপন্যাসটিকে আঞ্চলিকতার সীমা অতিক্রম করে বৃহত্তর মানবিক সাহিত্যের পর্যায়ে উন্নীত করেছে।
“শেষের বেলা”-র অন্যতম শক্তি এর আত্মজৈবনিক আবহ। লেখক কোথাও সরাসরি আত্মজীবনী রচনা করেননি, আবার সম্পূর্ণ কল্পনার আশ্রয়ও নেননি। বাস্তব জীবন, পারিবারিক স্মৃতি, সামাজিক অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিগত বেদনাকে শিল্পরূপ দেওয়ার ফলে উপন্যাসটি বিশ্বাসযোগ্যতা ও গভীরতা অর্জন করেছে। পাঠক শুধু একটি গল্পের পাঠক হয়ে থাকেন না; বরং একটি সময়, একটি সমাজ এবং একটি পরিবারের দীর্ঘ যাত্রার সহযাত্রী হয়ে ওঠেন।
ভাষা ও ইতিহাসের প্রতি লেখকের দায়বদ্ধতাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৬১ সালের একাদশ শহিদের আত্মত্যাগের প্রসঙ্গ উপন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য বহন করে। বেলার ব্যক্তিগত জীবনসংগ্রামের সঙ্গে ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সংগ্রাম একসূত্রে গাঁথা হয়ে গেছে। ফলে উপন্যাসটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গণ্ডি অতিক্রম করে বৃহত্তর জাতিসত্তার ইতিহাসের অংশে পরিণত হয়েছে।
সত্যজিৎ নাথের বর্ণনাশৈলী সংযত, সহজ এবং হৃদয়গ্রাহী। তিনি অপ্রয়োজনীয় আবেগপ্রবণতা এড়িয়ে ঘটনা ও চরিত্রের স্বাভাবিক বিকাশের মধ্য দিয়েই পাঠকের অনুভূতিকে স্পর্শ করেছেন। শিলচর, দারলন, লামডিং ও বরাক উপত্যকার জনজীবনের বর্ণনা অত্যন্ত জীবন্ত ও বাস্তবধর্মী। বিশেষত মিজোরামের প্রকৃতি ও মানুষের মানবিক রূপের চিত্রায়ণ উপন্যাসটিকে স্বতন্ত্র মাত্রা প্রদান করেছে।
উপন্যাসটির প্রাসঙ্গিকতা আজও সমানভাবে বিদ্যমান। গায়ের রঙ নিয়ে বৈষম্য, নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সীমাবদ্ধতা, সংসারে নারীর অদৃশ্য শ্রমের অবমূল্যায়ন এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের সংকট আজও আমাদের সমাজে বর্তমান। তাই বেলা কেবল অতীতের কোনো চরিত্র নন; তিনি আজও অসংখ্য সংগ্রামী নারীর প্রতিরূপ। উপন্যাসের শেষাংশে বেলার মৃত্যু পাঠককে গভীরভাবে স্পর্শ করে; তবে তাঁর আদর্শ, সংগ্রাম ও আত্মমর্যাদাবোধ উত্তরসূরিদের মধ্যে বেঁচে থাকে — এই বিশ্বাসই উপন্যাসের মূল মানবিক শক্তি।
সবশেষে বলা যায়, “শেষের বেলা” কেবল একজন নারীর জীবনের গল্প নয়; এটি সংগ্রাম, আত্মমর্যাদা, ভালোবাসা ও মানবিকতার এক অনন্য জীবনকাব্য। সত্যজিৎ নাথ তাঁর শিল্পসচেতনতা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং জীবনঘনিষ্ঠ বর্ণনার মাধ্যমে এমন এক চরিত্র নির্মাণ করেছেন, যিনি পাঠকের মনে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবেন। সমকালীন বাংলা সাহিত্যে “শেষের বেলা” নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস এবং একটি স্মরণীয় সাহিত্যিক সংযোজন।
উপন্যাস “শেষের বেলা”, লেখক : সত্যজিৎ নাথ, প্রকাশক : একুশ শতক, কলকাতা, মূল্য : ৩০০ টাকা