| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ডোকরা শিল্পীদের কাহিনি : স্বর্ণাভা কাঁড়ার পীযূষ কান্তি দাস-এর ছোটগল্প ‘ছমছম পায়েল বাজে’ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শাশ্বত বোস-এর বড়োগল্প এক বসন্ত স্বাধীনতার জন্যে নন্দিনী অধিকারী-র বড়োগল্প ‘দুর্গাদালান’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নকশালবাড়ি স্থাননামের নকশাল শব্দটির উৎসের সন্ধান : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিনয় মজুমদারের কবিতা — বিজ্ঞান ও দর্শনের রসায়নজাত স্বতন্ত্র নির্মাণ : আনন্দগোপাল হালদার উৎসবে মানুষ নতুন হয়ে ওঠে : হাসান আজিজুল হক ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-র ছোটগল্প ‘চার্বাক দর্শন’ দুর্গা যখন মাঠংমা : শ্যামলী কর ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার গিরমিটিয়া ভারতীয়দের ইতিহাস — কলকাতা বন্দর থেকে বিশ্বজুড়ে এক সংগ্রামের কাহিনী : কমল ব্যানার্জী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সৃজন-মানসের অন্তর্বয়ন ও লেখাজীবনের প্রেক্ষিত : আনন্দগোপাল হালদার কেতকী কুশারী ডাইসন, রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা ও আমাদের রক্ষণশীল সমাজ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাষ্ট্রের বিধি বনাম মায়ের শেষ ইচ্ছে — চিন্ময়কৃষ্ণের ঘটনা যে প্রশ্ন রেখে গেল : যশোবন্ত রায় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার নেপালের পর কি কলকাতা জলের তলায় চলে যাবে — চিন্তায় বিশেষজ্ঞরা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় বিশ্বাসঘাতকতার পরিণতি : রিঙ্কি সামন্ত
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com, আমাদের পোর্টালের কিছু ছবি বাদে প্রায় সব ছবিই অন্তর্জাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। কারুর যদি কপিরাইট থাকে জানাবেন। আমরা সেই ছবি পোর্টাল থেকে ডিলিট করে দেব।

ডোকরা শিল্পীদের কাহিনি : স্বর্ণাভা কাঁড়ার

Reporter
স্বর্ণাভা কাঁড়ার / ৭৭ Views জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

(গল্প আকারে আমি বাবার থেকে এই ‘যাপন গাথা’ শুনলেও আসলে এটা সত্যি কাহিনি। ঢালাই পিতলের একটি বিশিষ্ট শিল্পবিদ্যার নাম ডোকরা। এই বিরল ঘরানা আজ বিলুপ্তি ও সঙ্কটের মুখে। আগ্রহী মানুষ, সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলির সহমর্মিতায় ডোকরা শিল্পীর জীবন ও শিল্প আজ নতুন করে ঢালাই হবার অপেক্ষায়।)

উনিশশো চল্লিশ সালের কাছাকাছি। শম্ভুর বাবা তার দলবল নিয়ে বছর দুই হলো বেরিয়েছে পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড় অঞ্চলের তাদের পুরোন আড্ডা থেকে। সেখানেও বেশীদিন ছিল না তাঁরা। এক জায়গায় বেশী দিন থাকতে ওদের ভালও লাগে না। তাছাড়া জঙ্গলের ধারে গাছগাছালির নীচেও বেশী দিন থাকলে যাদের জমি জিরাৎ তারা এসে তাড়া করে। ভয় পায় ওখানেই বুঝি গেড়ে বসবে ভবঘুরে ঘরুয়া কামারেরা।

গ্রামের বাইরে সম্ভব হলে জঙ্গলের কাছে বেদেদের মতো ওই ঘরুয়া বা ডোকরা কামারের দল এসে তাদের সংসার পাতে দু’চার মাসের জন্য। জঙ্গলের ডালপালা দিয়ে নীচু নীচু ঝুপড়ি তৈরি করে নেয় কিছুদিন থাকবার মতো করে। তারপর আশপাশের আট দশ মাইল জুড়ে গ্রামেগঞ্জে ঘোরে তারা জীবিকার তাগিদে। কাজ পেলে কোন গ্রামের গাছতলায় তাদের ছোট কোন দল দু’চির দিন থেকে আবার ফিরে যায় তাদের মূল আড্ডায়। কাজ হল গৃহস্থ বাড়ির পেতলের বাসনপত্র ঝালাই করা আর অবসর সময়ে তৈরি ভরন বা পিতলের ধান মাপবার পালি, ছোট্ট রাধাকেষ্ট, বা হাতির পিঠে বসা মা ভগবতী কিংবা লক্ষ্মী নারায়ণ ইত্যাদি মূর্তি বা তৈজসপত্র বিক্রী করা।

রাঢ় অঞ্চলের গ্রামের মেয়ের বিয়ের সময় একমুখ হাসি নিয়ে ঠিক ডোকরা কামার হাজির— “মা নখ্যির আসন বসাইবে না মা? এই লাও মা বড় সোন্দর নখ্যি বনাইছি। বাহনটিও আছে গো— পেঁচাটি। একখান পালি লাও মা সিনদুর লাগাই, ধানটুকভরি মা নখ্যির পাশটিতে রাইকবে। অভাব কিছু থাইকবেক নাই। ধনের বাড় বাড়ন্ত হবেক।”— যদি কিছু বিক্রীবাটা হল তো একটু চাল নুন জুটিয়ে ডোকরা গিন্নী রান্না করল। না হলে দু চারদিন আধপেটা আর উপবাস দিয়ে গৃহস্থ ঘরের বাগান থেকে লাউটা মুলোটা বা ক্ষেত থেকে ধানটা আলুটা রাত্রির অন্ধকারে হাতিয়ে নিয়ে খিদে মেটাতে হয় তাঁদের। হাতে তৈরি ‘মা নখ্যিরা’ কোনও দিন ওই হতভাগাদের ঘরে আসন পাতেন নি। গাঁয়ের মা লক্ষ্মীরা তাঁদের ভাঙ্গা ফুটো বাসনপত্র সারিয়ে নেবার জন্য ডোকরাদের অপেক্ষায় থাকেন বটে কিন্তু ক্ষেত খামারে ছিঁচকে চুরির ভয়ে কামারদের বেশীদিন থাকাটাও পছন্দ করেন না।

ডোকরা-কামারদের ‘বিদ্যেটি’ হ’ল ঢালাই পিতলের শিল্পে। এ বিদ্যায় তাঁরা শিল্পী। মোম, বা ধুনো-সরষের তেলে তৈরী এক ধরনের গালার তার মাটির আদরার উপর জড়িয়ে মূল মূর্তি বা পাত্রটি বানিয়ে তার উপর সেই তারেরই অনবদ্য কারুকার্য করে সেটিকে পিতলে ঢালাই করে ডোকরা শিল্পীরা। প্রতিটি কাজ আলাদা করে হাতে তৈরী করতে হয়। ঢালাইয়ের কারণকৌশল এবং হয়তো কাজের ধরন-ধারণটিও অন্তত পাঁচ হাজার বছরের পুরনো। মহেঞ্জোদারো, হরপ্পাতেও এদের আদলের কাজ পাওয়া গেছে। মোমের গালার কাজ হয়ে গেলে সেটি আবার পোড়াবার উপযুক্ত বালি মাটি ইত্যাদি দিয়ে  ঢেকে দেওয়া হয়। এবারে ভেতরে ও উপরে আদরা ও ছাঁচের মাঝখানে মোমের কাজ। ঢালাইয়ের সময় এই মোমটি পুড়ে গিয়ে সেই ফাঁকা জায়গায় গলন্ত পিতল ঢুকে পড়ে। এককালে রাঢ় বঙ্গের ঘরে ঘরে এই শিল্পীরা পৌঁছে দিত পিতলের কারুকার্য করা নানা দেবদেবীর মূর্তি। নানা শৌখিন ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। শিল্পীরা গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরু ঘুরে এগুলো তৈরিও করতেন, বিক্রীও করতেন।

শম্ভুর বাবার দলে ছিল আট-দশ ঘর মানুষ। সে ছিল দলের ওস্তাদ শিল্পী। যেমন পিতলের মূর্তি বা তৈজসপত্রের কারুকার্যে সবার সেরা তেমনি গান বাজনায় চৌকস।

ডোকরা বা ঘরুয়া কারিগররা ছড়িয়ে আছে মধ্যপ্রদেশের বাস্তার অঞ্চলে, ওড়িষ্যার নানা জেলায়, রাঁচি, হাজারিবাগ, দুমকার পাহাড় অঞ্চলে আর পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া বর্ধমান এমনকি গঙ্গার ওপারে মালদা জেলায় পর্যন্ত। কিন্তু যেখানে যে অবস্থাতেই থাকুক তাঁরা খেতে না পেলেও নাচ, গান বাজনার অফুরন্ত উৎসাহ তাঁদের বাঁচিয়ে রেখেছে শিল্পী হিসেবে। শম্ভুর বাবা ‘হারমণি’ বাজাবার ওস্তাদ। নিজের একটা হারমনিয়ম তার বহুদিনের স্বপ্ন। কিন্তু হারমনিয়ম কেনার অর্থ একসাথে সে কোনও দিন দেখেনি। ছোটবেলায় কোথায় বাবুদের কেষ্টযাত্রার দলের সঙ্গে ঘুরে ছিল ক’বছর। তখন শিখেছিল তবলা আর হারমনিয়ম বাজাতে। বড় হতে যাত্রার দল ছাড়লেও নেশা ছাড়ে নি। কারিগর ভাই বন্ধুদের নিয়ে সুযোগ পেলেই পালা গেয়ে বেড়াতো। নিজেদের মুখে মুখে তৈরি পালা। এখনও শম্ভুরা সুযোগ পেলে যাত্রা গান করতে পেছপা হয় না। আর তাদের অন্য নাচ গান তো আছেই। একটু পচাই বা তাড়ি জুটলেই নাচ গান জমে যায় সাঁওতালদের মতো।

প্রায় ৮০-৮৫ বছব আগে শম্ভুর বাবা তার দলবল নিয়ে বর্ধমানের জঙ্গলমহল পেরিয়ে গুসকরা অঞ্চলের গ্রামগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে। একদিন দিন সন্ধ্যাবেলায় গুসকরার মাইল চার পাঁচ দূরে দরিয়াপুর গ্রামে বাবুদের বাড়িতে শৌখিন যাত্রাগানের মহলা চলছিল তখন। শখ ছিল গাঁয়ের ছেলে ছোকরাদের কন্তু গান বাজনার সে রকম এলেমদার লোক ছিল না। জমিদারবাবু নতুন হারমনিয়ম কিনে এনেছিলেন কলকাতা থেকে। কিন্তু তাতে ভাল সুর তোলবার মতো হাত কারুর ছিল না।

শম্ভুদের দু’তিনটি পরিবার গাঁয়ের পাশে পুকুর ধারে বটগাছের নীচে ডেরা বেঁধেছিল ক’দিন আগে থেকে। আগের দিনই শম্ভুর বাবা সন্ধ্যাবেলায় গাঁয়ে গান বাজনার আওয়াজ পেয়েছিলেন। সেদিন গুটি গুটি এসে দাঁড়াল মহলার আসরের পাশে। গানবাজনা তাল গোল পাকিয়ে যাচ্ছে দেখে সবিনয়ে ‘হারমোনি’টা তাকে বাজাতে দেবার অনুরোধ করায় ত্যক্তবিরক্ত জমিদার মশাই বললেন, তাই দে, তোদের চাইতে হয়েতা এই জংলী কামার বেটাই ভালো বাজাবে।

শম্ভুর বাবা নতুন হারমনিয়ম হাতে পেয়ে ভেল্কি দেখিয়ে দিল একেবারে। জমিদারের আসরে তার স্থান পাকা হয়ে গেল সেদিন থেকে। শুধু তাই না শম্ভুর বাবা যখন তাঁর তালিম দেওয়া গানবাজনার ভাইবোনদের নিয়ে যাত্রার আসর জমিয়ে দিল তখন খুশী হয়ে জমিদার শম্ভুর বাবাকে তাঁর গাঁয়ের ওই পুকুর ধারেই লোকজন নিয়ে ঘর বেঁধে থাকতে অনুমতি দিয়ে দিলেন।

১৯৫৬ সালে কলকাতায় কেন্দ্রীয় নকশা কেন্দ্রের দাওয়ায় বসে শম্ভু বলেছিল কি ভাবে তার বাপের দৌলতে দরিয়াপুরের পুকুর ধারে তাদের মোটামুটি স্থায়ী একটা বসতি গড়ে উঠেছিল। ধীরে ধীরে সতেরো আঠারোটি পরিবার সেখানে এসে জুটেছিল বছর ঘুরে না যেতে।

তারপর বছর বিশেকের ইতিহাস শুধু ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য আর হতাশার ইতিহাস। দেশের স্বাধীনতার পর নানা ওলট পালটের একটি ছিল গ্রামীন জীবন যাত্রা আর মূল্যবোধের দ্রুত পরিবর্তনষ শম্ভুদের বসতির ডোকরা শিল্পীদের সঙ্গে আরও অনেক গ্রামীণ শিল্পীদের এই ওলটপালটের মাসুল দিতে হয়েছে।

ইংরেজ আমলেই যান্ত্রিক শিল্পের জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার সঙ্গে কারুশিল্পীদের পশ্চাৎ অপসারণ। স্বাধীনতার পর দুইই হল দ্রুততর। কৃষিপণ্যের দামের সঙ্গে সঙ্গে সব জিনিসের দাম বেড়ে উঠল অবিশ্বাস্য ভাবে। পেতল কাঁসার দাম হল আকাশ ছোঁয়া। ডোকরা কারিগরের ঝালাই-এর ব্যবসার ক্ষেত্র সংকীর্ণ হয়ে গেল। কারণ গ্রামের মানুষ চাপে পড়ে ফুটোফাটা কাঁসা পেতল বিক্রী করে অ্যালুমিনিয়াম আর প্লাস্টিকের ব্যবহার শুরু করেছে দেশের বেশিরভাগ অঞ্চল। গ্রামের নুতন শিক্ষিত তরুণ সমাজও শহরের ঘনিষ্ঠ সংযোগে এসে ডোকরার মা লক্ষ্মী আর রাধাকেষ্টতে নিষ্ঠা হারিয়ে ফেলল। লক্ষ্মীর ঝাঁপি বা চাল মাপবার কারু কাজ করা সুন্দর পেতলের পাই বা পালির জায়গা নিয়ে নিল টিনের কিংবা প্লাস্টিকের কৌটো আর অ্যালুমিনিয়মের মগ। ফলে ডোকরা শিল্পীদের দুরব্থা ক্রমশ যে রূপ নিল তা প্রায় অবিশ্বাস্য।

পঞ্চাশের দশকের শেষ ভাগে এই ছিল মোটামুটি পশ্চিম বাঙলার ডোকরা শিল্পীদের অবস্থা। ষাট একষট্টি সালে যখন ডোকরাদের সম্পর্কে কলকাতা দিল্লীতে সবে নতুন আগ্রহটা গড়ে উঠছে, তখন ভারত সরকারের সেন্সাস কমিশনারের অফিস থেকে দয়িয়াপুর ডোকরাদের একটি সামাজিক অর্থনৈতিক সমীক্ষা করা হয়েছিল। যত দূর জানা যায়, তাঁরা ডোকরাদের মাথা প্রতি মাসিক রোজগার দেখিয়েছিল সে সময়ে মাত্র ছয় টাকার মতো। বেঁচে থাকবার জন্য তাঁদের আশপাশের গ্রাম থেকে যে সব কলাটা মূলোটা বা ক্ষেত থেকে রাত্রে পাকাধান না বলে আনতে হলো সেগুলো অবশ্য সরকারী সমীক্ষায় ধরা হয় নি। তবে এ সবের মূল্য তাঁদের দিতে হতো প্রায়ই প্রচণ্ড মারধোর খেয়ে বা আরও অপমানকর নানা অত্যাচার সহ্য করে।

পঞ্চাশ-ছাপ্পান্ন সালে সরকার কারু শিল্পীদের উন্নতির জন্য অখিল ভারত কারুশিল্প পর্ষদ বা অল ইন্ডিয়া হ্যান্ডিক্রাফটস্‌ বোর্ড গঠন করেন। এই কারুশিল্প পর্যদের কলকাতা নক্‌শা কেন্দ্রে ডোকরা শিল্পীদের নিয়ে কাজ শুরু হয় ১৯৫৮ সাল নাগাদ দরিয়াপুরের কারিগরদের মধ্যে। বাঁকুড়া শহরের উপকণ্ঠে মেথর পটির পাশে বসবাস করছিল আর একদল ডোকরা কারিগর। তাঁদের ও বছর দুয়েকের ভেতর এই উন্নয়ন কর্মসূচীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই দুই দলের শিল্পীরা পরস্পরের আত্মীয় ছিল। প্রায় একই ধরনের কাজ করলেও বাঁকুড়া জেলার মাটির কাজের ঐতিহ্য তাদের কাজে কিছু ছাপ ফেলতে শুরু করেছিল। ধীরে ধীরে দেশের কারুশিল্পপ্রেমীরা ডোকরা শিল্পীদের কাজের সৌন্দর্য ও অনন্যতা সম্বন্ধে সজাগ হয়ে উঠলেন এবং দেশের নানা জায়গায় ডোকরা বা ঘরুয়া কামারদের খোঁজ পাওয়া গেল ক্রমে ক্রমে। বিহারে ছোটনাগপুরের জঙ্গলমহল থেকে কয়েক ঘর ডোকরাকে খুঁজে এনে রাঁচী শহরের মাঝখানে সরকারী অফিস আদালতের সান্নিধ্যে একটি পাকা বাড়িতে ধামধাম করে বসানো হলো। কিন্তু ক’মাস পরে দেখা গেল সরকার প্রদত্ত নানা তৈজসপত্র হেলায় ফেলে রেখে তাঁরা আবার উধাও হয়ে গেছে। মাসখানের খোঁজাখুঁজির পর তাদের পাওয়া গেল গভীর জঙ্গলের সাঁওতাল বস্তিগুলোর আশপাশে। মুক্ত আকাশের নীচে মস্ত মস্ত গাছের ছায়ায় ছেলেমেয়েরা খেলা করছে। মেয়েরা রান্না করচে জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করা মূলকন্দ এবং সম্ভবত সাঁওতালদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা মোটা চালের ভাত। এইভাবে বার বার শিল্পীদের তাদের মুক্ত জীবন থেকে সরিয়ে নিয়ে শহরে বসাবার চেষ্টা করেছেন বিহার সরকার কিন্তু তার ফল ভাল হয়নি। ছোটনাগপুরের ডোকরা শিল্পীরা বোধ হয় সব চাইতে বেশী যাযাবর মনোভাবাপন্ন। একেবারেই ভবঘুরে। জঙ্গলের ভেতর আদিবাসী সমাজের তারা কাছের মানুষ। এক আদিবাসী বসতিতে থেকে আর এক বসতি তাদের আনাগোনা। সরকার এই শিল্পীদের একত্র করে সরিয়ে এনে তাদের শিল্পের একটা বৃহত্তর সামাজিক স্বীকৃতির মাধ্যমে মোটামুটি অর্থনৈতিক স্থিতাবস্থায় পৌঁছে দেবার প্রয়োজন বোধ করেছিলেন। বড় শহরে না নিয়ে যদি জঙ্গল মহলের সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে কোথাও তাদের পুনর্বাসনের চেষ্টা হত তাবে বোধহয় সরকারী প্রচেষ্টা অনেক বেশী ফলপ্রসূ হত।

পশ্চিমবঙ্গের যে ডোকরা শিল্পীদের নিয়ে এই কাহিনির শুরু সেই দরিয়াপুরের শিল্পীরা কিন্তু আজও সেখানেই আচে। শুধু পুকুর ধার থেকে সরে গিয়ে নিজস্ব জমির ওপর ২০-২৪টি পরিবারের একটি শিল্পীপাড়া গড়ে উঠেছে তাদের। আটান্ন ঊনষাট সাল থকে কারুশিল্প পর্ষদে ও দু’এক বছরের ভেতর রাজ্য সরকারেরও প্রচুর সাহায্য পায় দরিয়াপুরের শিল্পীরা। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের ডোকরা শিল্প দেশের কারুশিল্পগুলির মধ্যে একটি বিশিষ্ট স্থান লাভ করেছে। বালিগঞ্জ সারকুলার রোডের নক্‌শা কেন্দ্রে এদের কাজের প্রথম প্রদর্শনী দেখে পশ্চিমবঙ্গের তখনকার রাজ্যপাল প্রয়াতা পদ্মজা নাইডু সেখানে বসে কলকাতার খবরের কাগজ সম্পাদকদের নিজে ফোন করে এই শিল্পীদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে অনুরোধ করেন। কলকাতার প্রায় প্রতিটি খবরের কাগজ সে সময় থেকে সর্বদা দুঃস্থ অথচ অত্যন্ত সৃজনশীল এই ডোকরা শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছেন। এই প্রদর্শনীর পর দরিয়াপুরের এবং পরে সম্ভবত বাঁকুড়ারও ডোকরা শিল্পীদের শিল্প সম্ভার প্রথম দেশের রসিক সমাজের হাতে তুলে দেবার ব্যবস্থা করেন কলকাতার বেঙ্গল হোম ইণ্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন। পরে অবশ্য রাজ্য ও ভারত সরকারের বিভিন্ন নানা বিপণন সংস্থাগুলিও বিভিন্ন রাজ্যের ডোকরা শিল্পের বিপণন ব্যবস্থা করেন।

ষাটের দশকের প্রথম দিকেই পশ্চিমবঙ্গ সরকার দরিয়াপুরের শিল্পীদের একটি সমবায় সমিতির মধ্যে নিয়ে এলেন। ডোকরা শিল্পকম৪এর চাহিদা বাড়তে থাকল। বিদেশী বাজারেও কদর হল ডোকরা শিল্পের। ষাটের দশকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রচেষ্টায় সমবায় সমিতির মাধ্যমে শিল্পীরা এই প্রথম জায়গা কিনে নিজেদের বাড়িঘর তৈরি করে নিতে সক্ষম হলেন বটে কিন্তু আগেকার তুলনায় আকাশ পাতাল ফারাক সত্ত্বেও তাদের অবস্থার আশানুরূপ উন্নতি লক্ষ করা গেল না। কারণ প্রথমত, তাদের কাজে যে সব নান্দনিক ও কারিগরি গুণাগুণ দেখতে পেয়ে শহরের মানুষ আকৃষ্ট হলেন সেগুলি প্রায় বন জঙ্গলের আদিবাসী এই শিল্পীরা বুঝতে পারল না। যখন তাদের শিল্প দ্রব্যের চাহিদা বাড়তে থাকল এই সচেচনতার অভাবে প্রায়ই তারা কাজে নান্দনিক বা কারিগরি মানটি রাখতে অপারগ হল। ফলে তাদের কাজের যে মূল্য শহরের সংবেদনশীল শিল্পামোদিরা দিতে পারতেন তা তারা পেল না।

পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী শিল্পীরা যেভাবে চাহিদার অভাবে ক্রমশ সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অর্থনৈতিকভাবে তলিয়ে যাচ্ছিল বিহার ওড়িষ্যা বা বাস্তারের শিল্পীদের অবস্থা কখনই অতটা খারাপ হয়না। কারণ পশ্চিমবঙ্গে শিল্পীরা স্থান নিয়েছিল বাঙালী হিন্দু সমাজের নিম্নবর্গের পাশে অন্ত্যজ মানুষের কাছাকাছি। হিন্দু সমাজের সঙ্গেই কাজকারবার করলেও হিন্দু সমাজের কাঠামোর ভিতর তারা ঠিক প্রবেশ করতে পারেনি। চারদিকের আদিবাসী সমাজ বা মুশ্লিম সমাজ থেকেও তারা বিচ্ছিন্ন। বাঙালী গ্রামীন হিন্দু সংস্কৃতির দ্রুত পরিবর্তনের ফলে ডোকরা শিল্পের সামাজিক চাহিদা এখানে প্রায় নিশ্চিহ্ন। বেঁচে থাকবার জন্য তাদের এখন প্রয়োজন হয়েছে সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে নতুন ভাবমূর্তি নিয়ে শিল্প পরিবেষক করবার। তবে একথা মানতেই হবে বর্তমান সকরার এই শিল্পীদের প্রতি সহমর্মিতা দেখিয়েছে। ডোকরা শিল্পীরা তাদের শিল্পকর্ম নিয়ে এখন শহরের প্রায় সব মেলাতেই হাজির হন। ফলে গ্রামের সঙ্গে শহরের এক মেলবন্ধন গড়ে ওঠে এই শিল্পের মাধ্যমে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে ডোকরা শিল্পের গহনা খুবই জনপ্রিয় হয়েছে। এছাড়া ঘর সাজাবার বিভিন্ন জিনিস ডোকরা শিল্পিদের সৌজন্যে এখন আমরা হাতের কাছে পাচ্ছি।

বিহার, ওড়িষ্যা বা বাস্তারের শিল্পীদের আমরা পাই প্রধানত আদিবাসী সমাজের কাছাকাছি। যাঁদের সমাজ সংস্কৃতির পরিবর্তনের গতি অনেক শ্লথ। এই সমাজে বিশেষ করে বাস্তার অঞ্চলের আদিবাসী সমাজে ডোকরাদের শিল্পকর্ম এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। নানা আদিবাসী ধর্মীয় বা সমাজিক আচার আচরণে অবশ্যব্যবহার্য উপকরণ ছাড়াও ডোকরা শিল্পকর্ম এ অঞ্চলে বহু জায়গায় মুদ্রার বদলে জিনিসপত্র বেচা কেনাতে ব্যবহৃত হতো। যেমন কেষ্ট ডোকরার দেবী মূর্তির বদলে দু বস্তা চাল ও একটি ছোট মূর্তির বদলে আর এক জায়গায় দুটি মুরগী কিনে বাড়ি গেল। বাস্তারের এই সব অঞ্চলে ডোকরা শিল্পীরা পয়সায় হাত নি ছুঁইয়েই সমস্ত নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহ করতে পারত বছর ৩০-৪০ আগে পর্যন্তও।

বাস্তার ও জগদলপুর অঞ্চলেই ঘরুয়া বা ডোকরা শিল্পীদের বসবাস সর্বাপেক্ষা বেশী এবং সামাজিক ও আর্থিক অবস্থাও অন্য রাজ্যগুলির থেকে ভাল। শিল্পীদের নিজস্ব পরিবেশ ও সামাজিক স্তর থেকে চাহিদার ফলে শিল্পকর্মের প্রত্যাশিত গুণাগুণ সম্বন্ধে তাঁরা সম্পূর্ণ সচেতন এবং নিজেদের মানসিকতা, বিশ্বাস ও সংস্কারের সঙ্গে মেলে বলে এখানে শিল্পকর্মে নান্দনিক গুণও বিদ্যমান থাকে। করণকৌশলের দিকেও বাস্তার অঞ্চলের শিল্পমান উন্নত। মনে হয় এই বাস্তার অঞ্চলেরই কোনও আদিবাসী সমাজ ভেঙে সুদূর অতীতে কিছু কিছু নানা জাতের কারিগর ছোট ছোট দলে নান রাজ্যে ছড়িয় পড়ে। বহু দিন থেকেই এরা স্থানীয় সমাজে মিশে যাবার চেষ্টা করচে। কিন্তু ছোট এসব গোষ্ঠী এখনও কোন সমাজে স্থিতি লাভ করতে পারেনি।

এদেশের লোক সংস্কৃতি নায়ে যাঁরা চর্চা করেন তাঁরা জানেন আমাদের চারপাশে বেশ কতগুলি জনগোষ্ঠী আছে একটি বিচিত্র ধর্মীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের ভেতর। এরা সবাই নানা শিল্প মাধ্যমের কারবারী এবং মোটামুটি ভবঘুরে।— এদের অধিকাংশের আদিবাস খুঁজতে থাকলে মধ্যপ্রদেশের বাস্তার অঞ্চলে পৌঁছন যাবে। সবাই প্রায় নিজেদের মধ্যে একটা পাঁচমিশালী সাংকেতিক ভাষায় কথা বলতে পারে। ধর্মের দিক থেকে এরা না হিন্দু না মুসলমান না আদিবাসী কোন দেবদেবীর পূজারী। অনেকক্ষেত্রে এরা নিজেরাই জানে না এরা কোন ধর্মাবলম্বী। হিন্দুদের কাছাকাছি যারা থাকে তারা হিন্দু বলে পরিচয় দেয় নিজেদের। কিন্তু প্রশ্ন করলে জানা যায় বিয়ে দেয় মোল্লাতে এবং মৃত্যুর পর গোর দেওয়া হয়। কোথাও দু’চার মাসের বসতি গড়ে উঠলেও একটা বোঙ্গার (আদিবাসী দেবতা) থান তৈরি হয়ে যায়। হিন্দুদের সব পালা পার্বণেও এরা মহা আনন্দে যোগ দেয়। মুসলমান সমাজের কাছাকাছি যারা তারাও মুসলমান পরিচয় দিয়ে সে সমাজে ঠিক স্থান পান না। অনেক ক্ষেত্রে এদের মসজিদে প্রবেশ নিষেধ শোনা যায়।

এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডোকরা এবং পটুয়ারা ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গে আমরা ঘোরাফেরা করতে দেখি বেদে, সাপুড়ে, বাজিকর, বাঁদর বা ভাল্লুক নাচানেওয়াল ইত্যাদি। সুদূর অতীতে আদিবাসী সমাজ থেকে বেরিয়ে এলেও এরা যে এখনও বৃহত্তরভারতীয় সমাজের প্রধান স্রোতে মিশে যেতে পারেনি তার কারণ বোধ হয় তাদের ভবঘুরে স্বভাব ও ধর্মসম্বন্ধে তাদের অসাধারণ দৃষ্টিভঙ্গী। নিরাপত্তার আশায় এরা যখন যে জনগোষ্ঠীর কাছে থেকেছে তাদেরই ধর্মেকর্মে নিজেদের মানিয়ে নিতে চেষ্টা করচে, আবার আদিবাসী সংস্কারও একেবারে ছাড়তে পারেনি। মুসলমান রাজত্বের সময় বোধ হয় নিরাপত্তার আশায় এদের বেশীর ভাগই মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ডোকরা বা পটুয়ারা তাদের জীবিকার তাগিদে ক্রমশ এখন হিন্দু সমাজের কাছাকাছি সরে এসেছে।

বাস্তারে ডোকরা শিল্পীরা ঘরুয়া কামার বলে পরিচিত। এরা থাকে বাস্তারের আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে আর হিন্দুদেরও কাছাকাছি। তৈরি করে আদিবাসী ও স্থানীয় হিন্দু সমাজে প্রচলিত নানা লৌকিক দেবদেবীর মূর্তি, বহু নিত্য ব্যবহার্য জিনিস ও লৌকিক ক্রিয়াকলাপে ব্যবহৃত নানা জন্তুজানোয়ারের মূর্তি সহ বহু অনবদ্য শিল্পকর্ম। বিহার ও ওড়িষ্যায় আমরা দেখি নানা ধরনের মাপবার পালি, বিচিত্র নক্‌শার প্রদীপ ও ভেতরে তেল ভরে কুপির মতো জ্বালাবার বাতিদান, হাতি ও হাতিতে চড়া মানুষ, বিভিন্ন নক্‌শার বাক্স বা কৌটো, সিঁদুর দান এবং লৌকিক ক্রিয়াকলাপে ব্যবহারের জন্য কিছু আদিবাসী দেবদেবীর ও নানা জন্তু জানোয়ারের মূর্তি।

বাস্তার এবং পশ্চিমবঙ্গের অথবা বিহার কি ওড়িষ্যার ডোকরাদের কারণকৌশলে সামান্যই তফাত আছে কিন্তু সেই সামান্য তফাতেই কাজের মানের অনেক পরিবর্তন ঘটে যায়। যেমন দেখা গেল দরিয়াপুরের ঢালাইতে অনেক সময় দু’এক জায়গায় পেতলটা পৌঁছোয় না এবং ফুটো বেরোয়। ঝালাই করে সেগুলি বন্ধ করবার ফলে কাজটির শিল্পগুণ মার খায়। বাস্তারের মতো কটি ‘পিন’ ব্যবহার করে মোমের ভেতরের ও বাইরের ছাঁচকে এক সঙ্গে গেঁথে নিতে পারলে এটা অনেকাংশে নিবারণ করা যায়। প্রসঙ্গত আধুনিক ‘লস্টওয়াকস’ ধরনের ঢালাইতেও ‘পিন’ সর্বদা ব্যবহার করা হয়। ইটালির প্রসিদ্ধ মূর্তি ঢালাইকররা মোমের ওপর ছাঁচ জমাবার সময় প্রথম আস্তরনটা দেন নরম মিহি গোবর মাটির। দেখা গেল বাস্তারের শিল্পীও তাই দিচ্ছে কিন্তু দরিয়াপুরের শিল্পীরা বহু পূর্বেই নকশা কেন্দ্র থেকে এটা বলা সত্ত্বেও এবং তার ভাল ফল দেখানোর সত্ত্বেও এর ব্যবহার তাদের কাজে দেখা দেয়নি। আমাদের দেশের ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পীরা অত্যন্ত রক্ষণশীল। এই রক্ষণশীলতা শিল্পগুলিকে কিছুটা পিছিয়ে দিয়েছে। দরিয়াপুরের শিল্পীরা কারিগর গোষ্ঠীর বাইরে থেকে কোনও করণকোশল মেনে নেয়নি। সময়পর্যায়ের লোকশিল্পীর কাছ থেকে সেটা গ্রহণ করে কিনা তা ভবিষ্যতে বোঝা যাবে।

পেজফোরনিউজ ২০২৫ পুজা সংখ্যায় প্রকাশিত

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev